ভ্রমণ গদ্য—৬ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ || শাহাব আহমেদ ফ্লোরিডা
এখন বসে বসে সমীকরণ মেলাতে চেষ্টা করি।
মেলে না।
প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।
উত্তর পাই না।
বরং নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়।
এই নিয়ে আছি।
রুটি—রোজগারের ঝঞ্ঝা নেই, দার্শনিকতার সময় প্রচুর।
পরিতৃপ্তের দুঃখবিলাসও বলা যায়।
জারতন্ত্রের অসারতা, যুদ্ধ, ক্ষুধা ও বিশৃঙ্খলায় রাশিয়া নিঃস্ব হয়ে পড়লে ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক মহাবিপ্লব জারকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
কিন্তু যারা ক্ষমতায় আসে, তারা বিশাল দেশটিকে স্থিতিশীল করতে পারে না।
তাদের প্রথম সরকারের প্রধান ছিলেন প্রিন্স গিওর্গি ইয়েভগেনিয়েভিচ লভভ।
জারের আমলে তিনি স্থানীয় স্বশাসন ও জনসেবার কাজে পরিচিত ছিলেন। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত সাময়িক সরকার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেয়, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করে, বহু পুরনো সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ তুলে দেয় এবং জনগণের ভোটে গণপরিষদ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু মানুষ তখন শুধু স্বাধীনভাবে কথা বলতে চাইছিল না।
যুদ্ধ থেকে ঘরে ফিরতে চাইছিল।
কৃষক জমি চাইছিল।
সৈন্য বাঁচতে চাইছিল।
লভভের সরকার যুদ্ধ বন্ধ করতে পারেনি। জমির প্রশ্নও মেটাতে পারেনি। অন্যদিকে পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সঙ্গে দ্বৈত ক্ষমতার টানাপোড়েনে সরকারের কর্তৃত্ব ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
কয়েক মাসের মধ্যেই লভভ পদত্যাগ করেন।
তাঁর জায়গায় আসেন কেরেনস্কি।
অস্থিরতা আরও গভীর হয়।
ভালো উদ্দেশ্য আর সফল রাষ্ট্র পরিচালনা যে একই জিনিস নয়, লভভের অল্প কয়েক মাসের সরকার তারও একটি উদাহরণ।
বিপ্লবের ধর্মই হয়তো এমনÑএকবার বাঁধ ভাঙলে তার নিয়ন্ত্রণ আর মানুষের হাতে থাকে না, সময়ের হাতে চলে যায়।
হয়তো এই কারণেই তলস্তয় বা দস্তয়েভস্কির মতো মানুষেরা বিপ্লবকে ভয় পেতেন।
দ্বৈত ক্ষমতার অরাজকতার মধ্যে লেনিন ও ট্রটস্কির নেতৃত্বে বলশেভিকরা অক্টোবর বিপ্লব সম্পন্ন করেন।
শুরু হয় নতুন যুদ্ধ।
সাম্রাজ্যের নানা অংশ বেরিয়ে যেতে শুরু করে। পুরনো সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে। রাজকোষ শূন্য। সৈন্য, অফিসার, জেনারেলরা হতভম্ব, অনেকেই বিভ্রান্ত।
এতদিন তাদের সামনে ছিল বাতুশকা—জার—জার—পিতা—এবং মাতুশকা—রসিয়া—মা—রাশিয়া।
হঠাৎ জার নেই।
রাশিয়া আছে।
কিন্তু রাশিয়া কার?
একদল ভাবল জার ছাড়া রাশিয়া বাঁচবে না। তারা বলশেভিকদের রাশিয়ার শত্রু মনে করল।
একদল বলশেভিকদের সমর্থন করল।
বহু সৈন্য অস্ত্র ফেলে গ্রামে ফিরে গেল।
গতকালও তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মা—রাশিয়ার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন আরেকজনের জীবনের পাহারাদার হয়েছে। আহত বন্ধুকে কাঁধে তুলে এনেছে, নিজের রুটি ভাগ করে খেয়েছে।
আজ তারাই একে অন্যের দিকে বন্দুক তাকিয়েছে।
একজন লাল।
আরেকজন সাদা।
গতকাল সহযোদ্ধা হিসেবে যাকে রক্ষা করেছে, আজ তাকে হত্যা করছে।
দুই পক্ষই রাশিয়ার জন্য লড়ছে।
কথাটা যখন মনে আসে, গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে।
মা—রাশিয়া একই।
শুধু তাকে বাঁচানোর সত্যটা দু—ভাগ হয়ে গেছে।
শান্ত দন পড়েছেন যারা, তাঁরা জানেন সেই যুদ্ধ মানুষের জীবনকে কীভাবে ছিন্নভিন্ন করেছিল।
গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, রোগ, সন্ত্রাসÑসব মিলিয়ে বহু মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়।
রুশ রুশকে হত্যা করেছে।
শেষ পর্যন্ত লালরা জিতেছে।
কে দেশপ্রেমিক?
লালরা?
কে দেশের শত্রু?
সাদারা?
যারা পরাজিত হয়েছিল তাদের একটি বড় অংশ ফ্রান্সে চলে আসে। অভিজাত, সামরিক কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, লেখকÑঅনেকেই বিপ্লবের পরে রাশিয়া ছেড়ে এসেছিল, অথবা আসতে বাধ্য হয়েছিল।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি ইভান বুনিন।
১৯৩৩ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
তিনি বলশেভিকদের ঘৃণা করতেন।
স্ট্যালিনকেও।
অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই বলশেভিক—শাসিত রাশিয়ার জন্যই তাঁর প্রাণ কেঁদেছে।
আশ্চর্য, তাই না?
মাতৃভূমি কি আদর্শের ঊর্ধ্বে?
সহজ ও সামান্য এই প্রশ্নটি আগে কোনোদিন আমাকে জব্দ করত না।
এখন করে।
যে “সাদা” পাপিষ্ঠ মানুষগুলোকে আমরা এককালে এক কথায় প্রতিক্রিয়াশীল বলে ফেলে দিতে পারতাম, তাদের অনেকেই সারাজীবন স্বপ্ন দেখেছে রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার।
ফিরতে পারেনি।
বিদেশের মাটিতে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আর যেখানে তারা ঘুমিয়ে আছে, তার নাম—
ঈরসবঃরèৎব ৎঁংংব ফব ঝধরহঃব—এবহবারèাব—ফবং—ইড়রং.
সকালে ঘুম থেকে উঠে ট্রেনে চড়ে বসি।
প্যারিস থেকে প্রায় চল্লিশ মিনিটের পথ।
নির্জন সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছাই।
এত নির্জন যে মনে হয় একটা পাখিও ডাকে না, বাতাস চুপ করে আছে, গাছেরা মৌন, ঋজু সমাধিফলকগুলো যেন মাথা নত করে আছে।
কবরস্থানের গেটে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে অভিবাদন জানায়—
ইড়হলড়ঁৎ!
ইংরেজিতে উত্তর দিই।
কী কাজে এসেছি জিজ্ঞেস করে।
বললাম, ইভান বুনিনসহ বিখ্যাত রুশ অভিবাসীদের সমাধি দেখতে এসেছি।
সে আমাকে শ্বেতার সঙ্গে রুশ ভাষায় কথা বলতে শুনেছে।
তোমরা রুশ জানো, রুশ ভাষাতেই কথা বলি?
সায় দিই।
কোথা থেকে এসেছ?
বাংলাদেশ।
এখানে অনেক দেশ থেকে লোক আসে। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কার লোকও দেখেছি। বাংলাদেশের তোমাকেই প্রথম দেখলাম।
নাম ইগর।
মস্কো ছেড়েছে তিরানব্বই সালে।
আমি ছিয়ানব্বইতে।
সে থাকে প্যারিসে। প্রায় প্রতিদিন সকালে এখানে চলে আসে। অল্প যে কজন দর্শনার্থী আসে, কিছু অর্থের বিনিময়ে তাদের গাইড হিসেবে কাজ করে।
একটা ছোট্ট অর্থডক্স চার্চ।
এত ছোট যে বসার বেঞ্চও প্রায় নেই। সামনে দাঁড়িয়ে বা হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করতে হয়।
একটা ছোট অফিস।
সেখানে অকসানা—মাঝবয়সী কসাক মহিলা, রস্তভ—অন—দন থেকে এসেছে।
এই রস্তভ অঞ্চলই মিখাইল শলোখভের দেশ—শান্ত দন উপন্যাসের দন কসাকদের ভূমি।
তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাই। এই কবরস্থান ও এখানে সমাহিতদের নিয়ে একটি ছোট বই কিনে নিই।
তারপর ইগরকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
কবরস্থান শ্বেতার প্রিয় জায়গা নয়।
কিন্তু আমাকে টানে।
সেখানে মৃতেরা মৃত, কিন্তু তাদের ইতিহাস জাগ্রত।
আমি সেই ইতিহাসের সন্ধান করি।
“তুমি নন—স্ট্যান্ডার্ড একজন মানুষ।”
গত চল্লিশ বছরে তার মুখে কথাটা কতবার শুনেছি!
মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে আধঘণ্টা হাঁটার পর সে বলে, আমি গিয়ে রোদে বসি। তুমি ঘুরে দেখ।
বেশিরভাগ কবর পুরনো। অনেকগুলো যত্নহীন। শ্যাওলা—ছত্রাকে ঢাকা কবরফলকগুলোর গায়ে নামগুলো এখনও পড়া যায়।
রুশ সাম্রাজ্যের শেষ যুগ, বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ, নির্বাসনÑএকটার পর একটা জীবন যেন মাটির নিচে শুয়ে আছে।
প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুপভের পরিবার এখানে। সেই ইউসুপভ, যার সেন্ট পিটার্সবুর্গের প্রাসাদে রাসপুতিনকে হত্যা করা হয়েছিল।
রুশ ব্যালের বিস্ময় রুডলফ নুরিয়েভও এখানে।
১৯৬১ সালে কিরভ ব্যালে দলের সরকারি বিদেশ সফরের অংশ হিসেবে প্যারিসে এসেছিলেন তিনি।
প্যারিসে তাঁর স্বাধীন চলাফেরা ও বিদেশিদের সঙ্গে মেলামেশায় সোভিয়েত কর্মকর্তারা সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। সফরের মাঝপথে তাঁকে মস্কোয় ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
লে বুর্জে বিমানবন্দরে তিনি বুঝতে পারেন, ফিরে গেলে আর বের হতে পারবেন না।
সেখানেই ফরাসি পুলিশের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চান।
তখন পৃথিবীজোড়া কেলেঙ্কারি।
পরে এইডস—সংক্রান্ত অসুস্থতায় মারা যান।
তাঁর কবরটি অসাধারণ সুন্দর। এখনও সারা পৃথিবী থেকে ভক্তরা আসে।
