উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—২৯ || ড. আনিস রহমান  পেনসিলভেনিয়া

জনস্বাস্থ্য ও রিমোট ডায়াগনস্টিকস: চিকিৎসকের অভাব পূরণে এআই ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে একটি উচ্চতর বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা, অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রকট অভাব এবং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রান্তিক মানুষের সেবাবঞ্চনাÑএই দুইয়ের মাঝে একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এআই এখন কেবল একটি প্রযুক্তিগত টুল নয়, বরং এটি একটি ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ বা সক্ষমতা বৃদ্ধিকারক শক্তি হিসেবে কাজ করছে যা একজন চিকিৎসকের কর্মদক্ষতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে রিমোট ডায়াগনস্টিকস বা দূরবর্তী রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে কেবল শহরের বড় হাসপাতালগুলোর গন্ডি থেকে বের করে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

চিকিৎসকের অভাব পূরণে এআই ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে কার্যকর ভূমিকা

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে চিকিৎসকের স্বল্পতা একটি পদ্ধতিগত সংকট। গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য গড়ে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। এই বিশাল শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে এআই চিকিৎসকদের ওপর থেকে প্রশাসনিক এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের বোঝা কমিয়ে তাদের মূল চিকিৎসায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

এআই—এর ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে কাজ করার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হলো ক্লিনিক্যাল নোট তৈরি এবং নথিপত্র ব্যবস্থাপনা। ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (ঘখচ) এবং অ্যাম্বিয়েন্ট লিসেনিং প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগীর সাথে আলাপচারিতার সময় এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লিনিক্যাল নোট তৈরি করতে পারে, যা একজন চিকিৎসকের চার্টিং বা রিপোর্ট তৈরির সময়কাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। এর ফলে চিকিৎসকদের বার্নআউট বা ক্লান্তি হ্রাস পায় এবং তারা রোগীর সাথে মানবিক সংযোগ স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ করতে পারেন।   

এছাড়া, এআই—চালিত ট্রায়াজ বা অগ্রাধিকার নির্ধারণ পদ্ধতি স্বাস্থ্যসেবার প্রথম স্তরে একটি শক্তিশালী ছাঁকনি হিসেবে কাজ করছে। যখন হাজার হাজার রোগী প্রাথমিক লক্ষণ নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসেন, তখন এআই অ্যালগরিদমগুলো তাদের লক্ষণ, ভাইটাল সাইন এবং ঝুঁকির ধরন বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নির্ধারণ করতে পারে কাকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া প্রয়োজন এবং কার অবস্থা স্থিতিশীল। এটি কেবল হাসপাতালের ভিড় নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে। বিশেষ করে গ্রামীণ কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন এআই—ভিত্তিক সিদ্ধান্ত সমর্থন ব্যবস্থা ব্যবহার করেন, তখন তাদের সক্ষমতা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছাকাছি স্তরে উন্নীত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এআই ব্যবহারের ফলে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর কর্মক্ষমতা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।   

রিমোট ডায়াগনস্টিকস: ডিজিটাল ইমেজিং ও পোর্টেবল প্রযুক্তির বিপ্লব

টেলিমেডিসিনের প্রচলিত ধারণা এখন এআই—এর প্রভাবে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আগে যেখানে টেলিমেডিসিন বলতে কেবল ভিডিও কলের মাধ্যমে পরামর্শ নেওয়া বোঝাত, এখন সেখানে রিমোট ডায়াগনস্টিকসের মাধ্যমে জটিল সব শারীরিক পরীক্ষা—নিরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক্স—রে, আল্ট্রাসাউন্ড এবং স্কিন স্ক্যানের মতো ইমেজ—ভিত্তিক রোগ নির্ণয়ে এআই—এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান এবং কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

যক্ষ¥া ও বক্ষব্যাধি শনাক্তকরণে এআই এক্স—রে (ঈঅউ৪ঞই)

বাংলাদেশে যক্ষ¥া (ঞই) জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী হুমকি। এই রোগ শনাক্ত করার জন্য অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্টের প্রয়োজন হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এই শূন্যতা পূরণে আল্ট্রা—পোর্টেবল বা সহজে বহনযোগ্য এক্স—রে মেশিনের সাথে এআই সফটওয়্যার ঈঅউ৪ঞই—এর সংমিশ্রণ এক যুগান্তকারী সমাধান হিসেবে কাজ করছে। এই পোর্টেবল ইউনিটগুলো ব্যাগের মধ্যে বহন করে দুর্গম চরাঞ্চল বা পাহাড়ি গ্রামে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।   

রাজশাহী বিভাগে ২০২৩ সালে পরিচালিত একটি বৃহৎ প্রকল্পে দেখা গেছে যে, জাতীয় যক্ষ¥া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (ঘঞচ) যখন এই এআই—চালিত পোর্টেবল এক্স—রে ব্যবহার শুরু করে, তখন রোগ শনাক্তকরণের গতি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই এআই সফটওয়্যারটি একজন রোগীর বুকের এক্স—রে ইমেজ বিশ্লেষণ করে মাত্র ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে যক্ষ¥ার সম্ভাব্যতার একটি স্কোর প্রদান করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি নির্দিষ্ট কাট—অফ স্কোর ব্যবহার করে স্ক্রিনিং করার ফলে ব্যয়বহুল মলিকুলার টেস্টের প্রয়োজনীয়তা প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে, যা সরাসরি স্বাস্থ্য খাতের খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে এ পর্যন্ত প্রায় ৩২,৬৮৯ জনকে স্ক্রিন করা হয়েছে এবং ১,৪৫২ জন যক্ষ¥া রোগী শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এটি কেবল রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতাই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি একটি বৈষম্যহীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরির পথে বড় পদক্ষেপ।   

Related Posts