৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ নিউ মেক্সিকো এলমানাক অব ডেডঃ লেসলি মারমন সিলকো || আবদুল্লাহ জাহিদ
পৃথিবীর সব ইতিহাস বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না। কিছু ইতিহাস চাপা পড়ে থাকে মাটির নিচে, কিছু বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে, লোককথায় কিংবা প্রজন্মান্তরে বহমান কোনো প্রাচীন ভবিষ্যদ্বাণীতে। বিজয়ীরা যখন নিজেদের গৌরবগাথা রচনা করে, পরাজিত মানুষেরা তখন বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখে তাদের হারানো পৃথিবীর মানচিত্র।
মার্কিন কথাসাহিত্যিক লেসলি মারমন সিলকো’র এলমানাক অব ডেড (১৯৯১) সেই বিস্মৃত ইতিহাসের এক অসাধারণ সাহিত্যিক পুনরাবিষ্কার।
উপন্যাসটির প্রধান পটভূমি অ্যারিজোনার টুসন শহর, তবে এর কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে নিউ মেক্সিকো, মেক্সিকো এবং মধ্য আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূখন্ডে। নিউ মেক্সিকোর আদিবাসী ঐতিহ্য ও ইতিহাস এই উপন্যাসের ভাবজগতের অন্যতম ভিত্তি।
এখানে প্রেম আছে, কিন্তু প্রচলিত প্রেমের গল্প নেই; মৃত্যু আছে, কিন্তু নিছক হত্যারহস্য নয়। বরং ইতিহাস, রাজনীতি, মানুষের লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা এবং হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারের আকাক্সক্ষা মিলিয়ে সিলকো নির্মাণ করেছেন এক বিশাল সাহিত্যিক মহাকাব্য।
মরুভূমির শহরে অন্ধকারের বসতি
অ্যারিজোনার টুসন শহর। চারদিকে মরুভূমি। দূরে পাহাড়ের সারি, মাথার ওপর তীব্র সূর্য, বাতাসে ধুলোর গন্ধ। কোথাও ক্যাকটাসের সারি, কোথাও আধুনিক শহরের উজ্জ্বল অট্টালিকা। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও এই শহরের অন্তরালে চলছে অন্য এক জীবন।
এখানে মাদক ব্যবসা, অস্ত্র পাচার, যৌন শোষণ, অর্থের লোভ এবং ক্ষমতাবান মানুষের গোপন অপরাধ এক অদৃশ্য জাল বিস্তার করেছে।
এই অন্ধকার জগতের কেন্দ্রে রয়েছে দুই যমজ বোনÑলিয়েচা ও জেটা।
লিয়েচা একসময় টেলিভিশনের পরিচিত মুখ। মৃত কিংবা নিখোঁজ মানুষের সন্ধান দেওয়ার অলৌকিক ক্ষমতার জন্য তার খ্যাতি রয়েছে। অন্যদিকে জেটা বাস্তববাদী, কঠোর এবং সীমান্তবর্তী চোরাচালান ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
দুই বোনের জীবন আলাদা হলেও তাদের ভাগ্য জড়িয়ে আছে এক প্রাচীন পান্ডুলিপির সঙ্গেÑমৃতদের পঞ্জিকা।
এটি সাধারণ কোনো পঞ্জিকা নয়। এর পাতায় সংরক্ষিত রয়েছে আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি, ভূমি হারানোর বেদনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক বিস্ময়কর ভবিষ্যদ্বাণী।
যে মানুষদের ইতিহাস বিজয়ীরা মুছে ফেলতে চেয়েছে, তাদের কণ্ঠস্বর যেন এই পান্ডুলিপির পাতায় পাতায় ফিরে আসে।
হারানো সন্তানের খোঁজে এক মা
উপন্যাসের অন্যতম হৃদয়স্পর্শী চরিত্র সিসে। তার জীবন বিপর্যস্ত মাদকাসক্তি, প্রতারণা ও শোষণের মধ্যে। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি শিশুপুত্র মন্টের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া।
একজন মা তার সন্তানকে হারিয়েছে। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ, সমস্ত আনন্দ তার কাছে অর্থহীন। সে শুধু জানতে চায়, তার সন্তান কোথায়? বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সিসে লিয়েচার কাছে আসে। কারণ লিয়েচা নাকি মৃত মানুষের সন্ধান দিতে পারে।
কিন্তু সেখানে এসে সিসে প্রবেশ করে আরও বৃহত্তর এক রহস্যের জগতে। লিয়েচার সহকারী হিসেবে সে মৃতদের পঞ্জিকার প্রতিলিপি তৈরির কাজে যুক্ত হয়। নিজের হারানো সন্তানের বেদনার মধ্য দিয়ে সে যেন অনুভব করতে শুরু করে শত শত বছর ধরে সন্তান, পরিবার ও জন্মভূমি হারানো অসংখ্য মানুষের কান্না।
সিসের ব্যক্তিগত শোক এখানে ইতিহাসের সম্মিলিত শোকের প্রতীকে পরিণত হয়।
সিলকো যেন বোঝাতে চান, মানুষের অশ্রুরও একটি দীর্ঘ বংশপরম্পরা রয়েছে।
নির্বাসিত স্টার্লিং: নিজের ভূমিতেই পরবাসী
নিউ মেক্সিকোর সঙ্গে উপন্যাসটির গভীর সংযোগ তৈরি হয়েছে স্টার্লিং নামের এক প্রবীণ আদিবাসী চরিত্রের মাধ্যমে।
স্টার্লিং লাগুনা পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর মানুষ। নিজের সমাজের পবিত্র ভূমির মর্যাদা রক্ষায় ব্যর্থতার অভিযোগে তাকে নির্বাসিত হতে হয়। এরপর সে আশ্রয় নেয় টুসনে এবং লিয়েচা ও জেটার বাড়িতে বাগানের কাজ শুরু করে।
বাগান পরিচর্যা তার জীবনের এক আশ্চর্য প্রতীক। যে মানুষ নিজের জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন, সে অন্যের জমিতে গাছ লাগায়। যে মানুষ নিজের সমাজ থেকে নির্বাসিত, সে ফুলের পরিচর্যায় খুঁজে বেড়ায় শান্তি।
তার কাছে মাটি কেবল সম্পত্তি নয়। মাটি হলো পূর্বপুরুষের স্মৃতি, শৈশবের পরিচয় এবং অস্তিত্বের ভিত্তি।
স্টার্লিংয়ের মাধ্যমে সিলকো একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেনÑমানুষ কি শুধু কোনো রাষ্ট্রের নাগরিক, নাকি তার প্রকৃত পরিচয় আরও গভীরে, জন্মভূমির মাটি ও পূর্বপুরুষের ইতিহাসে নিহিত?
সম্পদের অহংকার ও মেনার্দোর পতন
উপন্যাসের কাহিনী মেক্সিকোয় পৌঁছালে পাঠক পরিচিত হন বিত্তবান ব্যবসায়ী মেনার্দোর সঙ্গে।
মেনার্দো মনে করে, অর্থই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি। সম্পদ, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং ক্ষমতাবান মানুষের সান্নিধ্য তাকে নিরাপত্তা দিতে পারে।
কিন্তু তার ভেতরে রয়েছে গভীর ভয় ও আত্মপরিচয়ের সংকট। নিজের আদিবাসী বংশপরিচয় থেকে দূরে সরে গিয়ে সে ক্ষমতাশালী সমাজের অংশ হতে চায়।
অথচ যতই সে নিজের অতীত অস্বীকার করে, ততই তার জীবন অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যায়।
তার গাড়িচালক তাচো বাহ্যিকভাবে একজন সাধারণ কর্মচারী। কিন্তু তাচোর সম্পর্ক রয়েছে আদিবাসী প্রতিরোধের বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে।
এখানে সিলকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতার বাহ্যিক চাকচিক্য সব সময় প্রকৃত শক্তির পরিচয় দেয় না। যে মানুষ নিজেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রক মনে করে, ইতিহাসের বৃহত্তর পরিবর্তনের সামনে সে—ও অসহায় হয়ে পড়তে পারে।
ইতিহাসের ভেতর আরেক ইতিহাস
এলমানাক অব ডেড প্রচলিত ধারার উপন্যাস নয়। এখানে একজন কেন্দ্রীয় নায়ক নেই। রয়েছে অসংখ্য চরিত্র, বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহ এবং বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস।
কখনো পাঠক টুসনের মরুভূমিতে, কখনো মেক্সিকোর বিলাসবহুল বাড়িতে, কখনো সীমান্তবর্তী অপরাধজগতে, আবার কখনো বহু শতাব্দী আগের আদিবাসী স্মৃতির মধ্যে প্রবেশ করেন।
প্রথমদিকে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন মনে হলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়।
সিলকোর সাহিত্যরীতির সঙ্গে আদিবাসী মৌখিক গল্প বলার ঐতিহ্যের মিল রয়েছে। সেখানে একটি গল্পের মধ্যে আরেকটি গল্প প্রবেশ করে, অতীত বর্তমানের সঙ্গে মিশে যায়, মৃত পূর্বপুরুষেরাও জীবিত মানুষের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে থাকেন।
তবে উপন্যাসটির বিপুল বিস্তার, অসংখ্য চরিত্র এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক বক্তব্য পাঠকের কাছে কখনো দুরূহ মনে হতে পারে। তা সত্ত্বেও এর সাহিত্যিক গুরুত্ব অনস্বীকার্যÑএটি ইতিহাসকে বিজয়ীর চোখে নয়, দীর্ঘকাল উপেক্ষিত মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখার এক উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টা।
শেষকথা: মৃতেরা কি সত্যিই মৃত?
এলমানাক অব ডেড পড়ার পর সবচেয়ে গভীর যে অনুভূতিটি মনে থেকে যায়, তা হলো—মানুষের মৃত্যু ঘটলেও তার ইতিহাসের মৃত্যু ঘটে না।
একটি জনগোষ্ঠীকে জন্মভূমি থেকে উচ্ছেদ করা যায়, তার ভাষাকে বিপন্ন করা যায়, তার সংস্কৃতিকে অবদমিত করা যায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করা যায় না।
মরুভূমির শুষ্ক মাটির নিচে যেমন অদৃশ্য বীজ অপেক্ষা করে বৃষ্টির জন্য, তেমনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ইতিহাসও অপেক্ষা করে নতুন প্রজন্মের জন্য।
সিলকোর উপন্যাসে সেই স্মৃতিই একদিন প্রতিরোধের শক্তি হয়ে ওঠে।
বইটির শেষ পৃষ্ঠা বন্ধ করার পরও পাঠকের মনে হয়, কোথাও যেন একটি পুরনো পঞ্জিকার পাতা উল্টে যাচ্ছে। সেই পাতায় লেখা হচ্ছে নতুন দিনের ইতিহাস।
আর ইতিহাসের গভীর থেকে ভেসে আসছে একটি প্রশ্নÑযে পৃথিবী আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি, তার প্রকৃত ইতিহাস কতটুকু আমরা জানি?
লেখক পরিচিতি: লেসলি মারমন সিলকো
লেসলি মারমন সিলকো ১৯৪৮ সালের ৫ মার্চ নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্কিতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে লাগুনা পুয়েবলো আদিবাসী, মেক্সিকান ও ইউরোপীয় বংশধারা রয়েছে। তিনি নিউ মেক্সিকো ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন।
তাঁর প্রথম উপন্যাস ঈবৎবসড়হু (১৯৭৭) তাঁকে মার্কিন সাহিত্যে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ঝঃড়ৎুঃবষষবৎ (১৯৮১), অষসধহধপ ড়ভ ঃযব উবধফ (১৯৯১) এবং এধৎফবহং রহ ঃযব উঁহবং (১৯৯৯)। আদিবাসী ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয়, প্রকৃতি ও ঔপনিবেশিক শোষণ তাঁর সাহিত্যের প্রধান বিষয়। সাহিত্যিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ম্যাকআর্থার ফেলোশিপসহ একাধিক সম্মাননা লাভ করেছেন।
