৬০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশে হচ্ছে ড্রোন কারখানা

স্ট্রিম প্রতিবেদনঃ দেশে সামরিক ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা স্থাপনে চীনের প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশনের (সিইটিসি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। প্রকল্পটির ব্যয় ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এতে শুধু কারখানা স্থাপন নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশে ড্রোন তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার কথাও রয়েছে। কিন্তু এত বড় একটি প্রতিরক্ষা প্রকল্পে ঠিক কত টাকা কীভাবে খরচ হবে, প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত কী, আর চুক্তি বাস্তবায়নের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নের কতটা উত্তর জনগণের সামনে আছে?

প্রকল্পে কী হচ্ছে, কত টাকা খরচ হবে

২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও চীনের সিইটিসির মধ্যে সরকারি পর্যায়ের (জি—টু—জি) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ৬ জানুয়ারি প্রকল্প প্রস্তাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের তথ্য প্রকাশিত হয় গণমাধ্যমে।

১২ জানুয়ারি প্রকাশিত পত্রিকাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয় ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় করার কথা কারখানা ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি আমদানি এবং স্থাপনের জন্য। বাকি অর্থ স্থানীয় খরচ, ঋণপত্র খোলা, মূল্য সংযোজন কর ও সুইফট চার্জের মতো খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনা প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে ৬৪৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা প্রস্তাব করেছিল। পরে আলোচনার মাধ্যমে মূল্য কমিয়ে প্রায় ৬০৮ কোটি টাকায় আনা হয়।

আইএসপিআরের ২৭ জানুয়ারির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজনের কারখানা স্থাপন করা হবে। প্রাথমিকভাবে মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘসময় উড়তে সক্ষম ড্রোন (এমএএলই) এবং উল্লম্বভাবে ওঠানামা করতে সক্ষম ড্রোন (ভিটিওএল) তৈরি ও সংযোজনের সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও যৌথ কারিগরি সহযোগিতা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের শর্ত

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাবে পাঁচটি শর্তের উল্লেখ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, চলতি অর্থবছরের ব্যয় বিদ্যমান বরাদ্দের মধ্য থেকেই মেটাতে হবে। পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে বিমানবাহিনীর অনুমোদিত বাজেটসীমার মধ্যে অর্থের সংস্থান করতে হবে। অর্থ পরিশোধ প্রচলিত আর্থিক বিধি মেনে ঋণপত্রের মাধ্যমে করতে হবে এবং অনুমোদিত অর্থ নির্ধারিত প্রকল্প ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যয় করা যাবে না।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা চার অর্থবছরে পরিশোধের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে ১০৬ কোটি, পরবর্তী দুই অর্থবছরে ১৫৫ কোটি করে এবং ২০২৭—২৮ অর্থবছরে প্রায় ১৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়।

চুক্তির কোন তথ্যগুলো এখনো স্পষ্ট নয়

আইএসপিআরের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির উদ্দেশ্য ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার কথা থাকলেও পূর্ণ চুক্তিপত্র প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিতভাবে দেওয়া যাচ্ছে না।

প্রথমত, প্রযুক্তি হস্তান্তর বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে? বাংলাদেশ কি শুধু যন্ত্রাংশ সংযোজন করতে পারবে, নাকি ধাপে ধাপে নিজস্বভাবে ড্রোনের নকশা, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন করার সক্ষমতাও অর্জন করবে? প্রযুক্তি হস্তান্তরের পর কোন কোন ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানের অনুমতি বা সহায়তা প্রয়োজন হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় নিরাপত্তা কি সব তথ্য গোপন রাখার কারণ

সামরিক সরঞ্জাম কেনা বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে কিছু তথ্য গোপন রাখা যৌক্তিক হতে পারে। ড্রোনের নির্দিষ্ট সক্ষমতা, অপারেশনাল সীমাবদ্ধতা, যোগাযোগব্যবস্থা বা সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ করলে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিন্তু একটি প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সব তথ্য একই ধরনের সংবেদনশীল নয়।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯—এর ৭ ধারায় এমন কিছু তথ্য প্রকাশ না করার সুযোগ রয়েছে, যেগুলো প্রকাশ করলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অখন্ডতা বা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম রয়েছে।

তবে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দিয়ে প্রকল্পের প্রতিটি আর্থিক তথ্য গোপন রাখতেই হবে—আইনটি এমন কথা বলে না। নির্দিষ্ট সামরিক প্রযুক্তির তথ্য প্রকাশ না করেও প্রকল্পের মোট ব্যয়, অর্থ পরিশোধের অগ্রগতি, নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে জনসাধারণকে জানানো সম্ভব কি না, সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করা দরকার।

Related Posts