বঙ্গবন্ধুকে এখনও অবহেলা: ঈর্ষা নাকি কেবলই ভয়! || আনিস আহমেদ
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর কবর জিয়ারত করেছেন এ সংবাদ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বর্ষীয়ান প্রয়াত নেতাদের প্রতি অপেক্ষাকৃত এই নবীন প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধা জানাবেন এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আবেগে আপ্লুত হয়ে তারেক রহমান এটাও বললেন, ‘যখন ১৯৭৯ সালে নির্বাচনের সময় আসলো, সেই সময় মওলানা ভাসানী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বললেন, তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম। প্রিয় ভাই—বোনেরা, সেদিন থেকে মওলানা ভাসানীর সেই ধানের শীষ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল তথা বিএনপি, শহীদ জিয়া, শহীদ জিয়ার পরে খালেদা জিয়া, খালেদা জিয়ার পরে আপনারা যারা বিএনপির নেতাকর্মী, সেই ধানের শীষকে জনগণের মাঝে নিয়ে গিয়েছেন।’ ইতিহাসের যে বোতাম নতুন করে টিপেছিলেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস, তারই ধারাবাহিকতায় এখন ইতিহাসের সন তারিখ সম্পর্কে এই অপতথ্য চলছে সম্ভবত। নইলে তারেক রহমান কী করে এই কথাগুলো বললেন! মওলানা ভাসানী মারা যান ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর এবং ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের সময়ে কি তাহলে তাঁর আত্মা এসে জিয়াউর রহমানকে এই পরামর্শ দিয়ে গিয়েছিলেন? এতটা অলৌকিকতায় তারেক রহমান বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না। আসলে এ সব কিছুই ইতিহাসে সেই ‘রিসেট বাটন’ টিপে দেয়ার ফল যেখানে রাজনৈতিক সুবিধা ও স্বার্থের জন্য নতুন করে ইতিহাস তৈরি করার কিংবা ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানোর অপচেষ্টা চালানো হয়। সত্য ইতিহাসের টুঁটি চেপে ধরার এই প্রবণতাই আমাদের অনেককেই অসত্যের দিকেই ধাবিত করেছে।
মওলানা ভাসানীর প্রতি তারেক রহমানের এই শ্রদ্ধা নিবেদন প্রশংসনীয়। বহু বছর আগে সেই ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে টা্ঙ্গাইলের কাগমারি সম্মেলনে মওলানা ভাসানী তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘সালাম’ জানিয়ে যে প্রতীকী বিদায়ের কথা বলেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। মওলানা ভাসানীর সেই ঘোষণাটি ছিল প্রতীকী, ছিল তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে কোন প্রায়োগিক পদক্ষেপ নিতে পারেননি। সত্তরের নির্বাচনের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতা বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেননি তাঁর পিতৃতূল্য মওলানা ভাসানী। তিনি বরঞ্চ তখন বিশ্বাস করতেন এবং বলতেন, ‘ভোটের আগে ভাত চাই’। মওলানা ভাসানীর এই চাওয়ায় অবশ্যই কোন ভুল ছিল না, বাংলাদেশের মানুষের একেবারে মৌলিক চাহিদাই হচ্ছে অন্ন—বস্ত্র—বাসস্থান। সে কথা বঙ্গবন্ধুও জানতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রধান লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তিনি জানতেন এই ভোটে বাঙালি জয়লাভ করলে স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে কারণ তাঁরই প্রণীত ৬—দফা প্রস্তাব যে পাকিস্তানিরা মানবে না এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া সম্ভব হবে সে কথা বঙ্গবন্ধু জানতেন। তবে ভাসানী সেই কৌশলটা বোঝেননি বলেই নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন। জনসাধারণ সে ডাকে সাড়া দেয়নি, তারা বঙ্গবন্ধুর ডাকেই সাড়া দিয়েছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মওলানা ভাসানীর এই মতপার্থক্য ছিল নিতান্তই সাময়িক। উভয়ে উভয়কে চিনতেন বহু দিন আগে থেকে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে পিতৃতুল্য সম্মান করতেন। মওলানা ভাসানীও বঙ্গবন্ধুকে সন্তানতুল্য স্নেহ করতেন। ১৯৫৭ সালে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করলেও সত্তরের নির্বাচন বর্জন ও পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু পর্যন্ত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ১১ মার্চ টাঙ্গাইলে বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করে বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান সাত কোটি বাঙালির নেতা। নেতার নির্দেশ পালন করুন। স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে মওলানা ভাসানী গুরুর মতো পরম শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। একবার বঙ্গবন্ধুকে তিনি চিঠি লিখলেন, তাঁর ওষুধের দরকার। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধি যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বঙ্গবন্ধু অনুরোধ জানালে তাঁরা ওষুধটি পাঠান। মওলানা ভাসানীকে সন্তোষে সেই ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তখন মওলানা ভাসানী খুবই কেঁদেছেন। তিনি ওইদিন বারবার বলেছেন, ‘সব শেষ হয়ে গেল!’ তিনি এত দুঃখ পেয়েছিলেন যে, ওইদিন কোনোকিছুই খাননি; কারও সঙ্গে সাক্ষাৎও করেননি। শেখ হাসিনা নিজেও মওলানা ভাসানীর মৃত্যু দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বলেন, মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের মধ্যে ছিল ‘প্রগাঢ় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’।
বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানীর সম্পর্কের মধ্যে বিরোধকে অনেকেই মূখ্য করে তোলেন রাজনৈতিক মতবিরোধিতার কারণে, আর তাকে পূঁজি করেই তারা ফায়দা লুটতে চান। তারেক রহমান তেমনটি করতে চেয়েছিলেন সেকথা বলছি না। কিন্তু জাতির জনক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারতে তাঁর অনীহা কেন? তিনি তো জাতির জনক না বললেও কয়েকবার বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর মা’কে অনুসরণ করেই মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান বলে উল্লেখ করেছেন। তাহলে সেই নেতার মাজার জিয়ারত করতে তাঁর এত কুন্ঠা কেন? বঙ্গবন্ধু তো আর ইহলোকে নেই, পরলোকবাসী বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান না জানানোটা কি ঈর্ষা প্রণীত, নাকি এখনও তাঁর মনে কোনো রকম ভয় বা শংকা বিরাজ করছে যে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করলে কিংবা তাঁর কবর জিয়ারত করলে তারেক রহমানের দলীয় জনপ্রিয়তা হ্রাস পাবে? ইউনুস যে বঙ্গবন্ধুকে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছেন তার কারণ অন্য। কারও সুনাম সম্পর্কে তাঁর মনে একধরনের ছুঁৎমার্গ ছিল। আর এই এলার্জির কারণেই বোধ হয় তিনি বঙ্গবন্ধুকে স্বীকৃতি দেননি। কিন্তু তারেক রহমান তো এখনও কোনো নোবেল পুরস্কার পাননি। কাজেই তাঁর মনে কোনো ধরনের সুপারিওরিটি কমপ্লেক্স থাকার কথা নয়। সুতরাং তিনি বঙ্গবন্ধুকে সম্মান প্রদর্শন করতেই পারেন। তাতে তাঁর পূর্ব পুরুষদের কারও সম্মান ক্ষুন্ন হবে না। সে কথা কি তিনি ভেবে দেখবেন একবার?
ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এক অভাবিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের চাবিকাঠি পুলিশ, প্রশাসন, বিচার— সবই তার হাতে। তারপরও মনে হয়, দেশে কোথায় যেন একটা অলিখিত দ্বৈত শাসন চলছে। প্রশাসন বিএনপির হাতে থাকলেও সমাজ—সংস্কৃতির চাবি ধর্মবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং তার মিত্রদের হাতে। কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সাম্প্রতিক ঘটনাটি অন্তত তারই ইঙ্গিত দেয়। খবরে প্রকাশ, সম্প্রতি কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের এক গ্রামে সাউন্ড বক্স, মাইক সেট ইত্যাদি সহযোগে গানবাজনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওই গ্রামের মসজিদ কমিটি। তারা এই মর্মে সতর্ক করে দিয়েছে— এই ঘোষণা জানার পরও কেউ গান—বাজনা করলে তাদের সামাজিকভাবে বর্জন করা হবে। এমনকি তাদের কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না। লালন—রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়াতে এমন ঘটনার পরও প্রশাসন অনেকটুকু নির্বিকার।
এর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। পত্রিকার খবরমতে, জেলার সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেররশিয়া পোড়াগ্রামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে এই মর্মে ঘোষণা করা হয়— বিয়ের অনুষ্ঠানে গানবাজনা হলে আলেমদের পক্ষ থেকে বিয়ে পড়ানো হবে না। এর আগে গ্রামটিতে প্রকাশ্যে বাদ্যযন্ত্র বা গান বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি নোটিশও দেওয়া হয়। এর পর থেকে গ্রামটিতে সামাজিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গানবাজনা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবশ্য বিষয়টি জানাজানি হলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন (প্রথম আলো, ৭ মার্চ, ২০২৬)।
উল্লিখিত দুটো ঘটনা থেকেই বোঝা যায়, রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা বিএনপির হাতে থাকলেও সমাজের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নেই। এ শুধু বর্তমান সময়ের কথা নয়; অনেক আগে থেকেই এমনটি ঘটে আসছে। আওয়ামী লীগ বেশ দাপটের সঙ্গেই তার শাসনের সাড়ে ১৫ বছর কাটিয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ, সবই ছিল তার হাতে। কিন্তু সমাজকে বর্গা দিয়ে রেখেছিল সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে এবং এ কাজটি করেছিল সচেতনভাবেই। এখন বিএনপিও তা—ই করছে। তবে পার্থক্য আছে। আওয়ামী লীগের কাছে এটি ছিল কৌশলগত কম্প্রোমাইজ বা সমঝোতা। প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ঠেকানোর জন্য ধর্মীয় মৌলবাদীদের তারা কাছে টেনেছিল। ক্ষেত্রবিশেষ সমাজ—সংস্কৃতির দখলও ছেড়ে দিয়েছিল তাদের হাতে। বিএনপির ব্যাপারটা কিছুটা হলেও আলাদা। জন্মলগ্ন থেকেই সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে দলটির এক ধরনের মিথজীবী বা পরস্পর নির্ভরশীল সম্পর্ক। তারা আসলে অনেকটা এক বৃন্তে দুটি ফুলের মতো। ফলে সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে বিএনপির বোঝাপড়া আওয়ামী লীগের মতো কৌশলগত নয়; সরাসরি অংশীদারিত্বের। তবে যেভাবেই দেখা হোক না কেন; রাষ্ট্র আর সমাজের ভরকেন্দ্র যে ক্রমেই গণতান্ত্রিক শক্তির কাছ থেকে চরম দক্ষিণপন্থি সাম্প্রদায়িক শক্তির দিকে হেলে পড়ছে— এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
গানবাজনা তথা বাঙালির লোকায়ত সংস্কৃতিকে ধর্মবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়াস নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তা চলমান এবং ক্রমেই এর প্রসার ঘটছে। এর ফলে দেশে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সরকার ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মাঝে চালু হয়েছে একটা অলিখিত দ্বৈত শাসন। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে অনেকবার সরকার পরিবর্তন হলেও এই দ্বৈত শাসনের কোনো পরিবর্তন হয়নি, যা এখনও চলছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসনের নাকের ডগায় সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর হামলা, সংগীতযন্ত্র ভাঙচুর তো গত কয়েক দশক ধরেই ঘটে আসছে।
মনে পড়ে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০২৩ সালের মে মাসে নরসিংদীর বেলাবতে লালনসংগীতের আখড়া ধাম স্থানীয় কিছু লোক হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। বাধা দিতে গেলে তারা শিল্পীদের ওপর চড়াও হয়। সিরাজগঞ্জে প্রায় একই রূপ ঘটনা ঘটে। এক দল স্থানীয় সন্ত্রাসী সিরাজগঞ্জ শহরে বাউল শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। সে সময় এসব খবর প্রায় সব দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে এসব নিবৃত্তির জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কারণ সেই একই— সরকার ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মাঝে সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দ্বৈত শাসন।
যে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের সাংস্কৃতিক চেতনাকে ধারণ করে, সেখানে তো এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। তাহলে কেন এমন হলো বা হচ্ছে? এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আমাদের চলে যেতে হবে স্বাধীনতার সেই ঊষালগ্নে। স্বাধীনতার পর একে সংহত করার জন্য যে সামাজিক—সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল, তা হয়ে ওঠেনি। ফলে একটা স্বাধীন দেশের উপযোগী কোনো সাংস্কৃতিক মানসও আর গড়ে উঠল না। অন্যদিকে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি ধীরে ধীরে এগোতে থাকল তাদের এজেন্ডা নিয়ে। স্বাধীনতার পক্ষের অনেকেই তা না বুঝে পা দিলেন তাদের ফাঁদে। ফলে দেশে তৈরি হলো একটা পশ্চাৎমুখী সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পটভূমি— সবার সামনেই, অথচ সবার অলক্ষ্যে। রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে প্রশাসন, সাংস্কৃতিক সংগঠন সবাই এটা দেখল। কিন্তু প্রতিকারের কথা কেউই চিন্তা করল না; চেষ্টা করল না আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে যাওয়ার। ফলে যা ঘটার তা—ই ঘটছে।
বাঙালি সংস্কৃতি এখন বন্দি হয়ে আছে রাজধানী বা জেলা শহরকেন্দ্রিক উচ্চবিত্ত বা উচ্চ—মধ্যবিত্তদের বৈঠক ঘরে অথবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলরুমে, যেখানে সাধারণ মানুষের যাওয়ার কোনো সুযোগ বা অধিকারই নেই। সংস্কৃতিচর্চা এখন হয়ে উঠেছে একটা ফ্যাশন; জীবনাচরণ নয়। যেটুকু আছে, তাও শহরকেন্দ্রিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ যে গ্রামে বাস করে, সেই গ্রামের মানুষের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। অবকাঠামোর দিক থেকে গ্রাম আর শহরের ব্যবধান অনেকটুকু ঘুচে এলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থারই সুযোগ নিচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, সাংস্কৃতিক চেতনার পথ ধরেই আসে রাজনৈতিক পরিবর্তন। আজ দেশের আনাচে—কানাচে আমাদের লোকায়ত সংস্কৃতির বিপরীতে যে প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির উন্মেষ ঘটছে, তাকে এখনই যদি প্রতিহত করা না যায়; সময় আসবে যখন এই শক্তি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে দখল করে নেবে। সেই ক্ষণ আসার আগেই সবাইকে সচেতন হতে হবে; কাজ করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। তা না হলে কোনোদিন যদি এক মধ্যযুগীয় অন্ধকার গ্রাস করে বসে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে, সেদিন অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। মনে রাখতে হবে, দ্বৈত শাসনের ফল সবসময় ভালো হয় না; যেমন হয়নি শেখ হাসিনার আমলেও। শেখ হাসিনা সমাজকে মৌলবাদীদের কাছে বন্ধক দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন। আখেরে তা সম্ভব হয়নি। বিএনপি কি শেখ হাসিনার পতন থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি তার পথেই হাঁটবে— সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ
কর্মকর্তা ও কলাম লেখক
