বাংলাদেশে দুর্গাপূজা: উৎসব নাকি উৎকন্ঠা! || আনিস আহমেদ

বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা পালন করা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। এখানে এই যুক্তরাষ্ট্রেরও প্রায় সব বড় বড় শহরে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে, ভারতে এবং বাংলাদেশেও। আনন্দময়ীর আগমন, এক আনন্দের সময়। পূজা যে কেবল অর্চনার বিষয় তা নয়, এই অর্চনা এবং প্রসাদ পাওয়ার পাশাপাশি এখানে থাকে সাংস্কৃতিক আয়োজন। থাকে সিঁদুর খেলা এবং আরও অনেক কিছু। আর এই আনন্দ—উৎসবের মধ্যেই থাকে মানুষের কল্যাণ কামনা। বস্তুত হিন্দু শাস্ত্র মতে দেবী দুর্গা হলেন হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান ও সর্বোচ্চ দেবী, যিনি আদিশক্তি বা পরম শক্তির প্রতীক। সংস্কৃত ‘দুর্গা’ শব্দের অর্থ হলো ‘যিনি দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করেন’। তাই দুর্গাকে দুর্গতিনাশিনী বলেও অভিষিক্ত করা হয়। তিনি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, পালনকর্তা বিষ্ণু এবং ধ্বংসকর্তা শিবসহ সকল দেব—দেবীর সম্মিলিত তেজ বা শক্তির উৎস থেকে আবির্ভূত হয়েছেন। দুর্গা পূজার দশম দিনকে বিজয়া দশমী বলা হয়। কারণ হিন্দু শাস্ত্রমতে এই দিনেই দেবী দুর্গা অসুরকে বধ করে শুভ শক্তির জয় নিশ্চিত করেছিলেন। হিন্দু শাস্ত্রের বাইরেও এই দশভূজা দেবী মূর্তিকে প্রতীকী অর্থে সেই শক্তির প্রতিভূ হিসেবে দেখা যেতেই পারে যে শক্তি দশ হাত দিয়ে সমস্ত অপশক্তির অপকর্মকে দমন করতে পারেন। যে অসুর শক্তি বিশ্বব্যাপী বিরাজ করছে সেই শক্তিকে পরাস্ত করতে, ধর্ম—বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্রিত হতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত যে বাংলাদেশে অন্যতম একটি প্রধান উৎসব হচ্ছে দুর্গাপূজা সেই অনুষ্ঠানটি শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে দেয়া হবে কিনা, সে নিয়ে কেবল হিন্দু ধর্মের লোকজন নন, সকল ধর্মের শান্তিপ্রিয় অসাম্প্রদায়িক লোক এখন উদ্বিগ্ন। 

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৩,৮৫১টি পূজামন্ডপে উৎসব আয়োজিত হলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, এমনকি সাম্প্রতিক সময়েও, কিছু মন্দিরে ভাঙচুর ও প্রতিমা নষ্টের ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেড়েছে। বিভিন্ন উগ্রবাদী বা রাজনৈতিক দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক সম্প্রতি বলেছেন ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন ঘিরে পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। প্রাক—পূজা, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা—পরবর্তী তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। ইতোমধ্যে পুলিশের পূজাকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের সাথে বৈঠক করে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে এই সব বক্তব্য শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তো বাংলাদেশের নাগরিক। নিরাপদ ও নির্বিঘ্নভাবে তাঁদের উৎসব উদযাপনের অধিকার জন্মগত। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে পুলিশ কিংবা বিজেবি নিয়োগ করাটাই লজ্জাজনক বিষয়। তার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠান পালনের অধিকারও এক ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই চ্যালেঞ্জ অব্যাহতভাবে চলছে। ২০২৫ সালে হিন্দু বিরোধী সহিংসতার ব্যাপ্তি সংক্রান্ত তথ্য একাধিক দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন সংকলন করেছে। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই, দেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানায় যে, বছরের প্রথমার্ধে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ২৫৮টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি ধর্ষণের ঘটনা এবং উপাসনালয়ে ৫৯টি হামলার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। পরিষদ এই পরিসংখ্যানকে একটি বৃহত্তর সহিংস পরিস্থিতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করে জানায় যে, ৪ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫—এর মধ্যবর্তী সময়ে মোট ২,২৪৪টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এ রকম তথ্য—উপাত্তে ভরে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন। 

তবে তথ্য উপাত্তটাই বড় কথা নয়, সংখ্যায় যাই হোক না কেন দেশের যে কোনো নাগরিকের ওপর কোনোক্রমেই নিপীড়ন—নির্যাতন সমর্থনযোগ্য নয়। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কেবল মাত্র একটি দলের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনা নয়, এটি হচ্ছে এমন একটি ঘটনা যেখানে বাংলাদেশ সৃষ্টির আদর্শকে ভূলুন্ঠিত করা হচ্ছে। বাঙালি সংস্কৃতিকে সার্বিকভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে। কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠান নয়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক উৎসব আয়োজনও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সেই যে এক সময়ে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে উগ্রবাদীরা হামলা চালিয়েছিল, সেই ধরনের ঘটনা এখনও অব্যাহত রয়েছে; খোদ ছায়নটের নিজস্ব ভবন আক্রান্ত হয়েছে এবং সঙ্গীতের সাজসরঞ্জামকে তছনছ করা হয়েছে। এইতো কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালিলেপন করা হয়েছে এই শ্লোগান দিয়ে যে তারা নাকি ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। রবীন্দ্রনাথকে বাংলাদেশ বিরোধী বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যে নোবেল পুরস্কারে প্রাপ্ত তাঁর অর্থের একটি অংশ শান্তিনিকেতন ছাড়াও বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার গ্রামোন্নয়নের জন্য ব্যয় করেছিলেন। সেখানে তিনি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং হতদরিদ্র প্রজাদের গাভী পালনে প্রশিক্ষণ ও ধানচাষের বাইরে অন্য পেশায় আয় বাড়াতে তাঁতব্যবস্থা, অন্য ফসলের দিকে যেন মানুষ আকৃষ্ট হয় সে ব্যবস্থাও করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সে সব কথাও এই জেন—জি’দের অনেকেই জানে না। জেন—জি’কে তাহলে কি জেনারেশান জিরোও বলা যায়! মেধা, মনন ও প্রজ্ঞার অভাবে মগজ ধোলাই হওয়া এক শ্রেণীর মানুষ রবীন্দ্রনাথের অবমূল্যায়ন করে চলেছে। রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় বিশ্বাস, তাঁর ঈশ্বর প্রেম, লালন ও সুফিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা জানেন না অনেকই। ব্রাহ্ম সমাজ ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে পার্থক্যও তারা বোঝেনি।

এখানে আরও একটি কথা উল্লেখযোগ্য, ভারতে মুসলমানদের প্রতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবিচারের প্রতিশোধ হিসেবে তারা বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন চালাতে চায়। কিন্তু এদের জানা প্রয়োজন যে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে, যেখানে হিন্দু ও মুসলমানকে জাতি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কাজেই তর্কের খাতিরে যদি বলি যে ভারত হিন্দু রাষ্ট্রই হোক, তাতে তো কোন অসুবিধা নেই, কারণ সেটা ভারত বিভক্তির আদি তত্ত্ব। তবু মনে রাখা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন ভারত উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। দুর্ভাগ্যবশত রাজিব গান্ধীর পর কংগ্রেসের নেতৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ায় সেখানকার হিন্দু মৌলবাদী দলগুলো ক্ষমতায় চলে আসে। এর ফলে মুসলমানরা খানিকটা কোণঠাসা হয়ে পড়লেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বড় রকমের কোন নিপীড়ন—নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি গুজরাট রায়ট ছাড়া। এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মৌলবাদী মুসলিমদের উত্থানের কারণে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বিজেপি ক্ষমতায় আসে। এটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালির জন্য দুঃসংবাদ। 

তবে ভারতের কোনো ঘটনা দিয়েই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান ঘটানো যুক্তিসঙ্গত নয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কোন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয়নি; বাংলাদেশের মূল মন্ত্র ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই ধর্মনিরপেক্ষতার মানে অসাম্প্রদায়িকতা। মনে রাখতে হবে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। 


Related Posts