শিক্ষাঙ্গনে মব সন্ত্রাসের রাজনৈতিক তাৎপর্য || খুশী কবির

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ওপর জোরপূর্বক পদত্যাগ, মব সহিংসতা, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ও সামাজিক টানাপোড়েন থাকলেও এখনকার মতো এমন মব সহিংসতা কিংবা সার্বিক আইনশৃঙ্খলাহীনতার বিস্তার ছিল কিনা, সন্দেহ। ১৯৯১ সাল কিংবা পরবর্তী বিভিন্ন শাসনকালে রাষ্ট্রীয় নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বহাল ছিল।

আমাদের জাতীয় ও সামাজিক জীবনে সাম্প্রতিক সময়ে অনাকাক্সিক্ষত ও উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আর সেটি হলো ‘মব’ বা সংঘবদ্ধ সহিংসতা। দেশের নানা প্রান্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ রাজপথ— সর্বত্র এক শ্রেণির উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠী আইন হাতে তুলে নেওয়ার অশুভ চর্চায় মেতে উঠেছে। সাধারণ নাগরিকরা তো বটেই, এমনকি দেশের সম্মানিত শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষার্থীরাও আজ এই অনভিপ্রেত উচ্ছৃঙ্খলতার শিকার হচ্ছেন। একের পর এক ঘটে যাওয়া মবের ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বর্তমানে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর ও নাজুক। 

শিক্ষক, গুরুজন ও গুণীজনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদন করা আমাদের হাজার বছরের আবহমান সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো মানুষের আদর্শ, রাজনৈতিক চিন্তাধারা কিংবা পাঠদানের কৌশল নিয়ে কারও দ্বিমত বা ভিন্নমত থাকতেই পারে। তাই বলে আদর্শগত ভিন্নতার অজুহাতে শিক্ষক বা যে কোনো নাগরিকের ওপর চড়াও হওয়া, জনসমক্ষে শারীরিক বা মানসিকভাবে লাঞ্ছনা কিংবা মব তৈরির মাধ্যমে প্রকাশ্য সহিংসতা চালানো আমাদের মানবিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় নির্দেশ করে।

অথচ বর্তমান সময়ে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সামান্য অজুহাতে সংঘবদ্ধ হয়ে মব তৈরি হচ্ছে। তারা মানুষকে হেনস্তা করছে। এমনকি নির্মমভাবে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। তাদের মধ্যে দেশের প্রচলিত আইন, রাষ্ট্রীয় বিধিবিধান কিংবা ন্যূনতম নৈতিকতার কোনো তোয়াক্কা দেখা যাচ্ছে না। সবচেয়ে গভীর চিন্তার বিষয়, এই উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর অপকর্মের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রশাসনের এ ধরনের অকার্যকারিতা ও নীরব ভূমিকা আদতে অপরাধীদের আরও বেশি সাহসী করে তুলছে এবং তাদের পরোক্ষ প্রশ্রয় জোগাচ্ছে। ধর্ষকরা খুব সহজে দায়মুক্তি পাচ্ছে। ফলে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। যখন অপরাধীরা বুঝতে পারে— সংঘবদ্ধ হয়ে যে কোনো অপরাধ করলেও সহজে পার পাওয়া সম্ভব, তখন সমাজে বিচারহীনতার বিষাক্ত সংস্কৃতি স্থায়ী রূপ নেয়। এই সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারা। 

যে কোনো একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রথম ও প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিধান এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। সরকারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের চরম শিথিলতা সাধারণ নাগরিকদের মনে গভীর অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে। বিচারব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় যদি দৃশ্যমান তদারকি না থাকে এবং জঘন্য অপরাধের আসামিরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়, তবে অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক।

দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই মব সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। অবিলম্বে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দলীয় ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। অপরাধের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রেখে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি। শিক্ষাঙ্গনসহ সমাজের সর্বস্তরে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই বিশৃঙ্খলা পুরো জাতিকে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেবে।

মবের সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে আমাদের তরুণ সমাজ ও নতুন প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে। তবে এটাও বলে রাখা দরকার, বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরাও এখন এ পথে হাঁটছে; বিশেষত রাজনৈতিক পদ—পদবির সুযোগ নিয়ে। চোখের সামনে অপরাধ সংঘটিত হতে দেখেও যখন বিচার হয় না, তখন তরুণদের মনে আইন ভাঙার প্রবণতা তৈরি হয়। তাদের কাছে এই ধারণা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে— ভিড় বা জনসমাবেশ তৈরি করতে পারলে যে কোনো অন্যায় বা সহিংসতাকেই উগ্রতা দিয়ে যৌক্তিক রূপ দেওয়া সম্ভব। এভাবে একটি দেশ বা সমাজ থেকে যুক্তি, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বিলুপ্ত হয়ে যায়। 

একই সঙ্গে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে যেভাবে উস্কানি ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তা মব তৈরির ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। অনেক সময়ই কোনো একটি অসত্য বা অসম্পূর্ণ তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করে মুহূর্তের মধ্যে জনমানসে হিংসার দাবানল জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব অপপ্রচার প্রতিরোধে সরকারের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের যে তৎপরতা ও মনিটরিং থাকা উচিত ছিল, তার অভাবও স্পষ্ট। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে তাই শুধু রাজপথে নয়, বরং গুজব মোকাবিলায় ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতেও কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপের ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো অসৎ চক্র বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে। তবে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কোনো পদক্ষেপ যেন গণবিরোধী হয়ে না ওঠে। সর্বোপরি এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক সচেতনতাও সমানভাবে জরুরি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে রাজপথে নামতে হবে। অপরাধী যে পরিচয় বা মতাদর্শেরই হোক না কেন, তাকে একজন সাধারণ অপরাধী হিসেবে গণ্য করতে হবে। মব তৈরির নেপথ্যে যারা এবং এতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সরকারকেই এ বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো মানবিক মর্যাদা ও আইনের সার্বভৌমত্ব। সেই ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমাদের সব অর্থনৈতিক অর্জন ও সামাজিক অগ্রগতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।

খুশী কবির: মানবাধিকারকর্মী; 

সমন্বয়ক, নিজেরা করি


দারিদে্র্যর ফাঁদে নতুন মানুষ?

এম এম মুসা

মাসের বাজার করতে গিয়ে একজন নিম্ন আয়ের পরিবারের গৃহকর্ত্রী তালিকা থেকে মাছ বাদ দেন, ডিমের সংখ্যা কমান, সন্তানের জন্য দুধ কেনা পিছিয়ে দেন। ঘরভাড়া, যাতায়াত ও ওষুধের খরচ কমানো যায় না বলে খাবারেই কাটছাঁট করতে হয়। পরিবারের আয় হয়তো আগের মতোই আছে; কিন্তু ওই আয় দিয়ে আগের জীবন আর চলে না। দারিদ্র্য অনেক সময় এভাবেই ফিরে আসে; একবারে নয়, প্রতিদিনের ছোট ছোট বঞ্চনার মধ্য দিয়ে।

৬ অক্টোবর ২০২৬—এ প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ এই অভিজ্ঞতাকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫—২৬ অর্থবছরে জাতীয় দারিদে্র্যর হার বেড়ে ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭ শতাংশ। একই অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০২৬—২৭ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২২.৮ শতাংশে উঠতে পারে বলে বিশ্ব ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন; মূল্যবৃদ্ধি, অসুস্থতা, দুর্যোগ বা কাজ হারানোর মতো একটি ধাক্কাই তাদের আবার দারিদে্র্য ঠেলে দিতে পারে।

এই তথ্যের তাৎপর্য শুধু দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, এতটুকু নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যদি মানুষের আয়, চাকরি ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে না পারে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থাকে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে, ২০২৫—২৬ ও ২০২৬—২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশ হতে পারে; একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়েছে এবং নারীরা চাকরি হারিয়েছেন। অর্থাৎ, অর্থনীতির মন্থরতা শুধু জাতীয় আয়ের হিসাব নয়; এটি পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সরাসরি আঘাত করছে।

সরকারের জন্য এটি নীতির অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনার সময়। উন্নয়নকে শুধু বড় প্রকল্প, অবকাঠামো বা সামষ্টিক সূচকে বিচার করলে মানুষের বাস্তব সংকট আড়ালে থেকে যায়। দরিদ্র পরিবারের জন্য মূল্যস্ফীতি এক ধরনের অদৃশ্য কর; যাদের আয় কম, তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় হয়। দাম বাড়লে তারা সঞ্চয় করতে পারে না; বরং খাবারের মান কমায়, ঋণ নেয়, সম্পদ বিক্রি করে কিংবা শিশুর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যয় কমিয়ে দেয়। এই ক্ষতি পরে সহজে পুষিয়ে নেওয়া যায় না।

মূল্যস্ফীতি কমলেই মানুষের কষ্ট কমে না

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫—২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭ শতাংশ হয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ১০ শতাংশ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; দাম আগের চেয়ে ধীরে বাড়ছে মাত্র। নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধিও নেতিবাচক থাকায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

এই পার্থক্য নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে। শুধু গড় মূল্যস্ফীতি দেখলে হবে না; খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন ও ওষুধের দাম নিম্ন আয়ের পরিবারকে কতটা চাপে ফেলছে, তা নিয়মিত পরিমাপ করতে হবে। আয় ও ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন শ্রেণির পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা প্রকাশ করা দরকার। একই সঙ্গে বাজারে পণ্যের সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

মূল্যস্ফীতির দায় শুধু ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দিলেও সমাধান হবে না। কোথাও বাজারে কারসাজি থাকলে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে; আবার সরবরাহের ঘাটতি, আমদানি নীতির অনিশ্চয়তা, পরিবহন ব্যয় বা প্রতিযোগিতার অভাব থাকলে ওইসব কারণও দূর করতে হবে। কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান এবং ভোক্তা যেন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির শিকার না হন, সে জন্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ জরুরি।

কর্মসংস্থান ছাড়া দারিদ্র্য কমবে কীভাবে?

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির। একই সময়ে বিনিয়োগের গতি কমেছে, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক সহায়তা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমানোর প্রধান উপায় হলো স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান।

সরকারকে তাই কর্মসংস্থানকে প্রতিটি অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রীয় সূচক করতে হবে। নতুন শিল্পপ্রকল্পের মূল্যায়নে শুধু বিনিয়োগের পরিমাণ নয়, কত স্থায়ী চাকরি তৈরি হবে, নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়বে, স্থানীয় সরবরাহকারী কতটা যুক্ত হবে, তা প্রকাশ করা দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য অর্থায়ন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, সহজ ব্যবসায়িক অনুমোদন এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে; কিন্তু উচ্চ ঋণব্যয় ও অনিশ্চিত নীতির কারণে তারা সম্প্রসারণ করতে না পারলে নতুন চাকরিও তৈরি হবে না।

নারী কর্মসংস্থানের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। বিশ্ব ব্যাংক নারীদের চাকরি হারানোর কথা উল্লেখ করেছে। অর্থনৈতিক সংকটে নারীরা অনেক সময় প্রথমে কাজ হারান, আবার পরিচর্যার দায়িত্ব, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব ও কর্মক্ষেত্রের সীমাবদ্ধতার কারণে কাজে ফিরতেও পারেন না। তৈরি পোশাকের বাইরেও স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা অর্থনীতি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডিজিটাল সেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নারীর জন্য কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হবে, যখন তার সঙ্গে বাজারের চাহিদা, চাকরির সংযোগ, শিশুযত্নের সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবহন যুক্ত থাকবে।

তরুণদের ক্ষেত্রেও শুধু প্রশিক্ষণ প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপা উচিত নয়। প্রশিক্ষণের ছয় মাস বা এক বছর পর কতজন চাকরি পেয়েছেন, কতজনের আয় বেড়েছে, কতজন ব্যবসা শুরু করেছেন, এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি করা দরকার, যাতে প্রশিক্ষণ বাস্তব শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে মেলে।

সামাজিক সুরক্ষার ফাঁক কোথায়?

বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাগুলোর একটি হলো, দেশের দরিদ্রতম পরিবারের প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। অর্থাৎ, যাদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের বড় অংশই সহায়তা পাচ্ছে না। একই সময়ে জ্বালানি, সার ও সামাজিক সুরক্ষায় সম্মিলিত সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ হলেও ভর্তুকির উল্লেখযোগ্য অংশ যথাযথভাবে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের সবচেয়ে সচ্ছল ২০ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় অর্ধেক পায়।

এটি নীতির মৌলিক অসংগতি। জনসম্পদ ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সচ্ছল মানুষের কাছে বেশি যাচ্ছে। সরকারের উচিত ভর্তুকি কমানোকে একমাত্র লক্ষ্য না করে ভর্তুকির ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দরিদ্র পরিবারকে আরও চাপে ফেলা সমাধান নয়। বরং উচ্চ আয়ের ভোক্তা ও বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ভিন্ন মূল্যকাঠামো, দরিদ্র পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং অপচয় কমানোর উদ্যোগ একসঙ্গে নিতে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি সমন্বয় করে এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিকে ভালোভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করা সম্ভব হতে পারে। সরকারের উচিত এই হিসাবের পদ্ধতি, বাস্তবায়নের শর্ত এবং সম্ভাব্য ব্যয় প্রকাশ করে পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালু করা। লক্ষ্য হবে শুধু সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারকে নিয়মিত ও সময়মতো সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।


Related Posts