সংবাদপত্র এখন কি কেবল দুঃসংবাদপত্র! || আনিস আহমেদ
পুরনো ও প্রচলিত একটি ইংরেজি কথা আছে যে ‘নো নিউজ ইজ গুড নিউজ’, অর্থাৎ কোনো খবর না থাকাটার মানেই হচ্ছে সবকিছু ভালো আছে, যে কোনো ঘটনা সংবাদ তখনই হয় যখন তা দুঃসংবাদ হয়। তবে সুসংবাদ যে সংবাদ হতে পারেনা সেই কথাটাও ঠিক নয়। আবার এটাও ঠিক যে সংকট ও সংশয় বিষয়ক সংবাদগুলি পাঠকদের দৃষ্টি কাড়ে সহজেই। সে জন্যেই সম্ভবত সম্পাদকরা এমন অনেক সংবাদের দিকে নজর দেন যে ধরনের সংবাদ পাঠে তাঁদের পাঠকদের প্রচুর আগ্রহ থাকে। তবে এ কথাও ঠিক যে সুসংবাদ যে কোনো সংবাদ নয়, তাতো ঠিক নয়। আবার এটাও ঠিক যে নানবিধ কারণে সুসংবাদ ও দুঃসংবাদ এক ধরনের আপেক্ষিক রূপ ধারণ করে অর্থাৎ একজনের কাছে যেটি সুসংবাদ অন্যজনের কাছে সেটি দুঃসংবাদ হতে পারে। আবার সময়ের পরিবর্তনে সুসংবাদ ও দুঃসংবাদের সংজ্ঞাও পাল্টে যেতে পারে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা সরকারের অবসান তখনকার আন্দোলনরত জেন—জি’র সদস্যদের কাছে একটি সুসংবাদ ছিল। কারণ তারা মনে করেছিল এর ফলে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটলো, যে শাসন ব্যবস্থাকে তারা তাদের কথায় কেবল স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা বলে মনে করতো। ক্রমশই এই আন্দোলকারীরা উপলব্ধি করলো যে শেখ হাসিনা সরকারের পতন কোনো সুসংবাদ ছিল না আদৌ। বরঞ্চ এই পতন ঘটানোর জন্য পেছন থেকে, একেবারে গোপনে যারা কলকাঠি নেড়েছিল তারা মূলত ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিরোধী। তারা অপপ্রচার চালিয়েছিল যে শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করে খাচ্ছেন। এটা ঠিক যে তিনি বার বার তাঁর জনগণকে সেই সত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে সত্য একেবারে অপ্রিয় তাদের কাছে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। আজ ২৪—এর সেই ভ্রান্ত ও বিভ্রান্ত উত্থানের দুই বছরেরও বেশি সময় পর অনেকেই মনে করছেন যে সেই চেতনার উদ্রেক ঘটানোটাই স্বাভাবিক ছিল। সেই পরিমাপে ’২৪এর সেই ঘটনা ছিল দুঃসংবাদ কেবল আওয়ামী লীগের সমর্থকদের কাছে নয়, তাদের কাছেও যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে মনেপ্রাণে ধারণ করেছেন।
দুর্ভাগ্যবশত সেই দুঃসংবাদের ধারাবাহিকতায় বয়ে চলেছে আমাদের পদ্মা—মেঘনা—যমুনা। সেই সব নদীর ঢেউ’এ মাছ কতটা উঠে আসছে, তার চেয়েও বড় কথা হলো, কতটা অমানবিক আবর্জনা আমরা পাচ্ছি। এই যেমন ধরুন ৭ অক্টোবর প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত এই খবরটি: ‘এইচএসসি পরীক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে এক মাস আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় আসে রাকিবুল ইসলাম (১৭)। ওঠে শেওড়াপাড়ার একটি মেসে। পূর্বপরিচিত আবদুল্লাহ আল মামুন (২৫) নামের একজন ফোন করে ডেকে নেওয়ার পর আর বাসায় ফেরেনি এই কিশোর। পরে পুলিশের তদন্তে জানা যায়, রাজধানীর শুক্রাবাদের একটি বাসায় নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে গুম করতে কার্টনে ভরে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারীতে। সেখানে একটি সুপারিবাগানের ভেতরে লাশটি মাটিচাপা দেওয়া হয়।’ কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ওই দিন প্রকাশিত আরেকটি খবর, ‘ব্যথায় বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলাম। পিপাসায় দম বের হয়ে যাচ্ছিল, বারবার পানি চেয়েছি কিন্তু কেউ একফোঁটা পানিও দেয়নি। পরে অচেতন অবস্থায় ফেলে রেখে গেল, রাতে জ্ঞান ফেরার পর হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তায় আসি। পথচারীদের সহায়তায় উদ্ধার হয়ে মোবাইল নাম্বার জেনে ফোন দিলে বোন এসে হাসপাতালে ভর্তি করায়।’ বুধবার (৭ অক্টোবর) ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে অপহরণ ও নৃশংস নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন ভুক্তভোগী আনিসুজ্জামান জামান (৩৫)। তিনি জানান, মেসেঞ্জারে পরিচয়ের পর চাকরির প্রলোভনে ডেকে নিয়ে লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে তার ডান পা ভেঙে দেয় দুর্বৃত্তরা। ৮ অক্টোবরের সমকাল পত্রিকা লিখছে, ‘ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ১৩ মাস বয়সী এক শিশুকে দুই লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বাবা ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ঢাকার দোহার থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে শিশুটির দাদা—দাদিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার ভোররাতে দোহার উপজেলার চর মাহমুদপুর ইউনিয়নের হরিচণ্ডী এলাকায় অভিযান চালিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার ও তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।’
এ রকম অসংখ্য দুঃসংবাদে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের পাতা ভরে গেছে। এ খবরগুলি কোনো ক্রমেই আমাদের কারও জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। আমরা যে বর্তমানে এক ধরনের অস্বাভাবিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সে কথা বোঝা যায়। অনেকেই হয়ত বলবেন যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা তো কেবল নয়, ব্যক্তিগত আক্রোশও আমরা লক্ষ্য করছি এ সব সংবাদে। অতএব এই দুঃসংবাদগুলি মূলত সামাজিক অবক্ষয় ও অধঃপতনের স্পষ্ট চিহ্ন বহন করে। তবে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে সামাজিক এই অবক্ষয়ের পেছনে থাকে রাজনৈতিক অবক্ষয়। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সমান্তরালে সমাজে পরিবর্তন এসেছে অনেকখানি। পরিবর্তন কিংবা বিবর্তন খুব স্বাভাবিক ব্যাপার তবে তা কতখানি সদর্থক বা ইতিবাচক সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। জেন—জিদের আনা এই পরিবর্তনকে এক সময়ে অনেকেই ভেবেছিলেন, এ বোধ হয় সামনে এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত পথ, নতুন প্রজন্ম সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এমনটিই ভেবেছিলেন কেউ কেউ। তাঁদের এই ভাবনায় হয়ত তেমন ভুল ছিল না। কিন্তু কার্যতঃ তেমনটি ঘটেনি আদৌ। বরঞ্চ ঘটেছে ঠিক তার উল্টোটা। কারণ বাংলাদেশের এই কথিত জেন—জি’র কিছু সদস্য বাংলাদেশকে পশ্চাৎমুখী করার প্রয়াস চালিয়েছে। তারা বাংলাদেশের প্রগতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ইতিহাসকে নির্মূল করে সাম্প্রদায়িক সেই ১৯৪৭ সালের ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। এই সব ঘটনা সমাজের বন্ধনকে শিথিল করে এবং কিছু মানুষ ভুলেই যায় যে তারা সামাজিক জীব। সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থা সৃষ্টি হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে যখন বিগত সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনী আক্রান্ত হয়, তাদেরকে হত্যা করে এই কথিত আন্দোলকারীরা। এ ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য সব চেয়ে বড় দুঃসংবাদ। পুলিশ বাহিনীর অনুপস্থিতি সমাজে অপরাধীদের একচ্ছত্র আধিপত্য সৃষ্টি করে এবং অসামাজিক কর্মকান্ডগুলো যেন সহজ, স্বাভাবিক ও ‘সামাজিক’ হয়ে ওঠে।
দুর্ভাগ্যবশত সেই ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। এক সময়ে ইউনুস সরকারের প্রথম দিকে মব—ভায়োলেন্সকে মব জাস্টিস বলে মান্যতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল যা মূলত সত্যিকারের বিচার ব্যবস্থাকে খর্ব করে। পরে অবশ্য এটা উপলব্ধি করে মব জাস্টিস শব্দটা আর ব্যবহার করা বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু মব ভায়োলেন্স কমেনি। কারণ গোলোযোগকারীরা এখন আর পুলিশকে ভয় পায় না, পুলিশই ভয় পায় তাদের। আর তাদের অনেকের পেছনে রাজনৈতিক সমর্থন থাকলে তো সেটা সম্ভবই হয় না পুলিশের পক্ষেও। আর তাই সংবাদপত্র ও সামাজিক সংবাদ মাধ্যম এখন দুঃসংবাদে ছেয়ে গেছে। তাই বলি এখন আর সংবাদপত্র নেই, হয়ে গেছে, দুঃসংবাদপত্র।
