থিয়েটার ৭১’র নতুন নাটক নেমেসিস || দুর্নীতির ছায়া ঢাকা থেকে নিউইয়র্কে

কৌশিক আহমেদঃ গত সেপ্টেম্বর কুইন্সের জেক্যাল মঞ্চে একটি রিয়েলিস্টিক বাংলা নাটক দেখার সুযোগ পাওয়া গেল। নাটকটি রিয়েলিস্টিক হলেও এর নাম, স্টেজ ক্রাফটিংএর একটি অনুষঙ্গ এবং শেষটি ছিল প্রতীকী। প্রতীকী হলেও এর অর্থ বুঝতে দর্শকদের সমস্যা হয়নি। ফলে দর্শকরা উপভোগ করেছেন। উপভোগ করার আরো একটি কারণ সম্প্রতিকালের বাংলাদেশের দুনীর্তিগ্রস্ত একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নিউইয়র্কে এসেও দুনীর্তির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। একজন অর্থগৃধ্নু ব্যক্তি যে অর্থের জন্য নিজের পরিবারের মাতৃহীন একমাত্র কন্যার জীবনকে সংকটে ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করে না এই রকম একটি জটিল চরিত্রকে চমৎকারভাবে এঁকেছেন লেখক মাসুম রেজা। গ্রীক প্রতিশোধের দেবী নেমেসিস। তার নামেই নাটকের নাম। আর এই নাটকে নেমেসিস চরিত্রের নাম নূপুর। শেষ পর্যন্ত নেমেসিস কি প্রতিশোধ নেয়? নেমেসিস নাটকটি সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের বিশাল প্রেক্ষাপটকে যেমন ধারণ করেছে, তেমনই এর স্বাভাবিক শক্তিশালী সংলাপ একে প্রাণ দিয়েছে। দর্শকরা ঘন্টা ১৫ মিনিট অন্ধকারে বসে আলোআঁধারিতে তৈরি করা মঞ্চের যে অভিনয়, তার ইল্যুশনে অবগাহন করেন। প্রসেনিয়াম থিয়েটারের এই বিভাজন যেন এই সময়কালে ঘুচে যায়। তৈরি হয় ফোর্থ ওয়ালের স্বপ্নিল জগত।

আখ্যানটি এই রকম, একজন ষাটোর্ধ উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা সাবিউল্লাহ এমন নীতি নৈতিকতাহীন, বিবেকবর্জিত, অর্থ লোভী ব্যক্তি যে অর্থের জন্য তিনি এমন কিছু নেই করতে পারেন না। কিন্তু জীবনের বা কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ধরা পড়েন। তার সহায় সম্পদ ক্রোক করা হয়। তিনি নিউইয়র্কে মেয়ের কাছে চলে আসেন। মেয়ে নূপুর সিঙ্গেল মাদার, টিনএজার মেয়েকে নিয়ে বাস করেন। মেয়ে পুরোটা বাবার মত নয়, বরং থিয়েটারের সাথে জড়িত। দেশেও তিনি নাটক করতেন। সাবিউল্লাহ সব হারিয়ে নিউইয়র্কে এসে অসুস্থ না হয়েও হোমকেয়ার সার্ভিস গ্রহণ করেন। তার কেয়ার গিভার তার মেয়ে। ফলে এই সার্ভিস থেকে পাওয়া অর্থ মেয়ের একাউন্টেই জমা হয়। তিনি সিকিউরিটির কাজও করেন। হোমকেয়ার থেকে পাওয়া অর্থ তিনি মেয়ের কাছ থেকে চাইলে মেয়ে নূপুর জানিয়ে দেয় এটা তারই প্রাপ্য, বাবার নয়। এদিকে নূপুরকে না জানিয়ে তার আগের স্বামীকে তিনি ৩০ হাজার ডলার ধার হিসেবে দিয়েছিলেন বাড়ি কেনার জন্য। সেই ডলার ফেরত পাওয়ার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু নূপুরের এক্স সেই ডলার ফেরত দিতে চায় না। কারণ নূপুর একটি নাটক লিখে নিউইয়র্কে মঞ্চস্থ করে তার এক্স স্বামী মুহিতকে অপদস্থ করার উদ্দেশে। এটা ছিল নূপুরের প্রথম প্রতিশোধ। নূপুর জানায় সে ঢাকায় নেমেসিস নামে একটি নাটকে অভিনয় করেছিল। অতএব নেমেসিসের অর্থ সে বোঝে।

নূপুরের নাটকের মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিবাদে মুহিত নূপুরকে অপদস্থ করতে চায়। এর জন্য সে তার সাবেক শ্বশুর সাবিউল্লাহর সাহায্য চায়। সে জানায় ৩০ হাজার ডলার ফেরত দেবে যদি তিনি তাকে একটি কাজে সাহায্য করেন। সাবিউল্লাহর ফেসবুকের পাসকোড নিয়ে সেখানে সাবিউল্লাহকে দিয়ে তার মেয়ের পিতার প্রতি অসদাচারণ, অসম্মান, অপদস্থ করার এমন একটি কাহিনী বয়ান করার ভিডিও রিলে দেয়, যা নূপুরকে প্রকাশ্যে অসম্মানজনক অবস্থায় নিপতিত করে। এই ঘটনায় নূপুর ভেঙে পড়ে, ক্ষুব্ধ ক্ষিপ্ত হয়, নূপুরের মেয়ে অধরা মায়ের পাশে দাঁড়ায়। বাবামেয়েনাতনীর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় নাটকটিকে ক্লাইমেক্সে নিয়ে যায়। নূপুর প্রতিজ্ঞা করে সে নেমেসিসের মত পিতার এই অপকর্মের প্রতিশোধ নেবে। এই সময় সাবিউল্লাহ জানায়, বিয়ের আগে নূপুরের প্রেমিক শোভন দরিদ্র হওয়ায় মেয়ের সাথে বিয়ে দিতে চাননি বলে তাকে গোপনে হত্যা করেন তিনি। একথা জেনে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয় নূপুর। যদিও সাবিউল্লাহ জানান, তিনি এই কাজ করেন নূপুরের মঙ্গলের কথা ভেবে। কিন্তু নূপুর এই কথা শোনার পর আরো বেশি প্রতিশোধপরায়ন হয়ে ওঠে। নূপুরের আরেকটি অভিযোগ তার বাবা তাকে জোর করে দেশের বাইরে পাঠিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত সাবিউল্লাহ সব বুঝতে পারে, বলে, আমাকে যে সাজা দিতে চাও দাও। আমি পরাস্ত। সাবিউল্লাহ মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তিনি মাতৃজঠরে যেভাবে শিশু অবস্থান করে সেভাবে হাঁটু ভেঙে, পাশ ফিরে হাত দুটি বুকের কাছে ভাঁজ করে রেখে পড়ে থাকেন মেঝেতে।

নূপুর কীভাবে প্রতিশোধ নেবে বাবার? দর্শকরা যখন জানার জন্য উদগ্রীব, তখন কিশোরী কন্যা অধরা তার নানুর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। তাকে ফ্লোর থেকে তোলে এবং প্রতিশ্রম্নতি আদায় করে নেয় যে তিনি আর খারাপ কাজ করবেন না। 

না, নেমেসিস প্রতিশোধ নেয় না। এই নাটকে প্রতিশোধ এসেছে ক্ষমার রূপ ধরে।

মাসুম রেজা মিথোলজি থেকে চরিত্র তুলে এনে তার চরিত্র পাল্টে দেন। যেমন তার অপর নাটক নিত্যপুরাণে একলব্যকে মহাভারতীয় চরিত্র থেকে তুলে এনে প্রোটাগনিস্ট করে তুলেছিলেন। এই নাটকেও গ্রীক দেবী নেমেসিসকে চূড়ান্ত প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমাশীলের আসনে বসিয়েছেন। সেটা হয়ত লেখক করতেই পারেন। কিন্তু এই নাটকের সবচেয়ে বড় খুঁত হলো, একজন স্বঘোষিত খুনি পরিবারের কাছে ক্ষমা পেলেও আইনের চোখ কীভাবে এড়িয়ে যায়? এত বড় দুনীর্তিবাজ পাপীর বিরুদ্ধে কোনো আইনি উদ্যোগের কথা নাটকে থাকবে না? তিনি নিউইয়র্কে আত্মগোপনে নেই। দর্শকরা এই নাটক বিষয়ে অজ¯্র ভাললাগা নিয়ে থিয়েটার থেকে বের হলেও এই প্রশ্নও তাদের অনেকের মনে জেগেছে।

নাটকে দুটি প্রতীক সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন নির্দেশক খাইরুল ইসলাম পাখী। একটি ঘরের এক কোণে বড় আকৃতির মাকড়সার জাল, যার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্র জটিলতা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। শেষে ক্ষুব্ধ অধরা সেই মাকড়সার জাল ছিঁড়ে ফেলে। আর অপরটি ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মাতৃজঠরে শিশুর অবস্থান তৈরি করে সাবিউল্লাহর নবজন্মের জানান দেয়া। সত্যিই কি ষাটোর্ধ মানুষের যে মাইন্ডসেট তা থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে পারে? কি কেবলই অপত্য স্নেহের আবেগ?

এই নাটকের যে দর্শকপ্রিয়তা তার মূলে রয়েছে ৪টি বিষয়ঃ শক্তিশালী, তীব্র তীক্ষè কথ্য সংলাপ, অভিনেতাদের অবলীলায় সংলাপ থ্রো করার পারদর্শিতা, সাবিউল্লাহ, নূপুর অধরার স্বাভাবিক অভিনয়। এই তিনজনের মধ্যে অধরা আমেরিকানবাঙালি টিনএজারের যে জীবনাচরণ, কথা বলার ভঙ্গি শারীরী ভাষা তা দর্শকদের হৃদয়ে অভিঘাতের সৃষ্টি করেছে। আর মূল হলো নিজে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করা সত্ত্বেও চমৎকার নির্দেশনা দিয়ে অভিনয়কে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে পেরেছেন খাইরুল ইসলাম পাখী। কিন্তু নাটকটি যেভাবে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে গেছে, শেষেক্ষমা পর কেন দর্শকদের আইল দিয়ে একদল ছেলেমেয়ে মঞ্চে গিয়ে সকলে মিলে উল্লাসে নাচল তা শুধু বোধগম্য হয়নি, তা নয়, বরং তা একটি ভাল নাটকের থিয়েট্রিকেল রিয়েলিজমের ইমেজ ম্লান করেছে। নাটকের দর্শকরা তো শেষ অনুভব হৃদয়ে ধারণ করেই ফিরতে চান।

মাসুম রেজা নেমেসিস নাটকের ষড়যন্ত্রের জাল উন্মোচন করার জন্য কোনো কসরত করেননি। খুব স্বাভাবিকভাবে তার জাল খুলে গেছে। এই নাটকে রিয়েলিটির সাথে ইমাজিনেশনের সংঘাতের পরিবর্তে রিয়েলিস্টিক অতীতের সাথে রিয়েলিস্টিক বর্তমানের দ্বন্দ্ব তৈরি করেছেন। নৈতিকতা অনৈতিকতার সীমারেখা তিনি তৈরি না করলেও মাসুম রেজা মানুষকে ক্ষমার অবতার হিসাবে তৈরি করে, নৈতিকতার নতুন মাত্রা নির্ধারণ করেছেন।

রিয়েলিস্টিক থিয়েটারে বিশেষ করে কম্যুনিটি থিয়েটারে নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতিফলন অনিবার্যÑ অভিনয় থেকে মঞ্চ ব্যবস্থা, মঞ্চের স্পেস ব্যবহার উপস্থাপনায়। এই নাটক তাই বাঙালি দর্শকদের, নিউইয়র্কে বসে দেখলেও, তাদের আপ্লুত করেছে, আনন্দ দিয়েছে।

নেমেসিস নাটকে বাবা সাবিউল্লাহর চরিত্রে অভিনয় করেন নির্দেশক খাইরুল ইসলাম পাখী, মেয়ে নূপুরের চরিত্রে বন্যা মির্জা, নাতনী অধরার চরিত্রে তামান্না শান্তি আহমেদ। মুহিত চরিত্রে রানা মাসুদ। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন উর্মি রোজারিও, শায়লা আফতাব, সুলতান বোখারী।

আলোক নিয়ন্ত্রণে ছিলেন বাবর খাদেমী, সুন্দও তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টার সেট ডিজাইন প্রপসে মিথুন আহমেদ। নেপথ্য কণ্ঠে সাদিয়া খন্দকার জেকে রাজো। এই নাটকের কোনো কোনো পর্যায়ে অরিজিনাল স্কোরের অতিরিক্ত ড্রামাটাইজেশন নিয়েও আরেকটু চিন্তা করা যেতে পারে।

Related Posts