ভালোবাসার হাত || আদনান সৈয়দ
ম্যানহ্যাটানে সেন্ট্রাল পার্কের পূর্ব পাশে, ফিফথ এভিনিউর ধারে একটা বেঞ্চে বসে আইসক্রিম খাচ্ছি। সামনে মানুষের মিছিল। মানুষ আর মানুষ। যেন পৃথিবীর সমস্ত শহর, সমস্ত দেশ, সমস্ত ভাষা এসে এই একটি রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পাশে বসে আছে রূপা। রূপা থাকে নিউজার্সিতে। লেবার ডের লম্বা ছুটির শেষ দিনে সে আজ নিউইয়র্ক এসেছে। সেন্ট্রাল পার্ক আমাদের দুজনেরই খুব প্রিয়। এই বিপুল বাণিজ্যিক শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে এমন ছিমছাম, সবুজে ঘেরা একটা পৃথিবী আর কোথায় পাবেন?
ফিফথ এভিনিউতে কত রকমের মানুষ! যেমন তাদের গায়ের রং, তেমন তাদের পোশাক। কারও গায়ে দামি স্যুট, কারও শরীরে রঙিন টি—শার্ট; কেউ হাতে ক্যামেরা, কেউ ফোনে মুখ গুঁজে হাঁটছে। কেউ ছুটছে, কেউ হাঁটছে, কেউ যেন কোনো গন্তব্য ছাড়াই হাঁটছে। এর মধ্যে টুরিস্টও আছে। টুরিস্ট দেখলেই বোঝা যায়। শহরে তারা নতুনÑএই খবর তাদের চোখের ইতিউতি চাহনি, হাঁটাচলা, থেমে থেমে ছবি তোলা, রাস্তার নাম পড়া, কথাবার্তাÑসবকিছুই বলে দেয়।
আমি আইসক্রিমে চামচ ডুবিয়ে হঠাৎ একটা দৃশ্যে আটকে গেলাম। দেখলাম, এক জোড়া পুরুষ হাত ধরাধরি করে পার্কের দিকে ঢুকছে। দুজনের হাঁটার ভঙ্গিতে অদ্ভুত এক ছন্দ। মনে হলো, রাজহাঁসের জোড়াÑএকজন আরেকজনের খুব কাছে, কাঁধ প্রায় ছুঁয়ে আছে। হাত দুটো শক্ত করে ধরা। দেখে মনে হলো টুরিস্ট। একজনের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। অন্যজন ক্লিন—শেভ। দুজনই শ্বেতাঙ্গ। বয়স ত্রিশের বেশি হবে না। একেবারে ঠিক আমারই বয়সী। আমার বয়স ২৮ আর রূপার ২৬।
আমি অপলক চোখে তাদের দেখছিলাম। তারা ধীরে ধীরে আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেল। তারপর সবুজের ভেতর সরু রাস্তা ধরে পার্কের ভেতরে রাস্তায় পা রাখলো।
হঠাৎ রূপার ডাকে চমকে উঠলাম।
কী?
রূপা আমার দিকে কেমন জানি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে আছে।
কিছু বলবে? আমি রূপার দিকে অবাক চোখে চেয়ে বললাম।
না। রূপার চোখেমুখে কেমন জানি বিরক্তির ছাপ।
আমি একটু থেমে আবার সেই দুজনের দিকে তাকালাম। তারপর আঙুল দিয়ে ইশারা করলাম, ওদের দেখেছ?
কাদের?
ওই যে দুজন। সমকামি সম্ভবত। হেঁটে যাচ্ছে।
রূপা আমার আঙুলের নির্দেশনার দিকে তাকাল তারপর বললো, হ্যাঁ। দেখেছি।
কী সুন্দর একটা দৃশ্য, তাই না? আমি অতি উৎসাহে বললাম।
রূপা এবার ভ্রম্ন কুঁচকে আমার দিকে তাকাল।
কোন দৃশ্যটার কথা বলছো তুমি?
এই যে দুজন মানুষ একজন আরেকজনের হাত ধরে হাঁটছে। দেখো, কী শক্ত করে হাতটা ধরে আছে। এই কথা বলে আমি রূপার মুখের দিকে তাকালাম।
না। ওর মুখে কোন অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো না।
আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,
দুজনই পুরুষ। অথচ দেখো, কী গভীর ভালোবাসা! প্রকৃতির প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে গিয়েও একজন আরেকজনকে এভাবে ভালোবাসতে পারেÑভাবতেই কেমন যেন লাগে।
রূপার মুখটা এবার হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে খুব নিচু গলায় বলল, এই ফ্যাগেটগুলোর হাত ধরাধরি করা দেখলেই আমার গা গুলিয়ে আসে।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
শব্দটা কানে লেগে রইল। ‘গা গুলিয়ে আসে?’
আমি বললাম, তাই?
হ্যাঁ।
কেন?
জানি না। খারাপ লাগে।
তাহলে ওটা কি প্রেম নয়?
রূপা এবার সরাসরি আমার দিকে তাকাল। তারপর দৃঢ় কন্ঠে বললো, না।
তাহলে কী? আমার পাল্টা প্রশ্ন।
স্রেফ নোংরামি।
আমি হাসলাম না। বিস্মিত হলাম। রূপা নিউজার্সির বিখ্যাত রাটগার্স ইউনিভার্সিটি থেকে ফিজিক্সে মাস্টার্স করা একটি মেয়ে। আর সে কিনা বলছে ‘নোংরামি’? বিষয়টা আমাকে খুব অবাক করে দিল। ভাবলাম বিষয়টা নিয়ে আর আলাপ করা ঠিক হবে না। কিন্তু জেদ চেপে গেল।
আমি ওকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, এই যে তুমি বললে নোংরামি? এখানে নোংরামির কী দেখলে তুমি রূপা? আমি তো এখানে দেখছি প্রেম।
তুমি দেখছ প্রেম। কিন্তু আমি দেখছি অস্বাভাবিক কিছু। রূপার ভাবলেশহীন উত্তর।
কিন্তু প্রেম তো প্রেমই। দুজন মানুষ যদি একজন আরেকজনকে ভালোবাসে, তাহলে সেটা নোংরামি হবে? এই যে আমরা একজন আরেকজনকে ভালোবাসি।
রূপা আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিল। তারপর বললো, আমাদেরটা ন্যাচারাল। ওদেরটা আনন্যাচারাল।
ন্যাচারাল বলতে কী বোঝো?
যেটা প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতি যেভাবে সবকিছু সেট আপ করে দিয়েছে সেটাই ন্যাচারাল।
কিন্তু প্রকৃতির এই নিয়ম কে লিখেছে রূপা?
এবার রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
আমি আবার বললাম, তুমি আর আমি হাত ধরি, চুমু খাইÑসেটা ন্যাচারাল। ওরা হাত ধরলে আনন্যাচারাল। পার্থক্যটা কোথায়?
আমি নারী আর তুমি পুরুষ। এটাই প্রকৃতির উদ্দেশ্য।
কিন্তু তাতে কী?
তাতেই সব। আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে পারি না।
পারি না?
না, পারি না। রূপার দৃঢ় গলায় উত্তর।
আমি আইসক্রিমের কাপটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম। আইসক্রিম তখন প্রায় গলে গেছে।
আমার মনে হলো, আমরা আসলে দুজন মানুষকে নিয়ে কথা বলছি না। আমরা কথা বলছি আমাদের নিজেদের ভেতরে বসে থাকা হাজার বছরের কোনো অদৃশ্য বিচারকের সঙ্গে।
আমি বললাম, রূপা, একটা কথা বলো তো। পৃথিবীতে পুরুষ আর নারী কেন একে অপরকে ভালোবাসে?
কারণ, সেটাই স্বাভাবিক। প্রকৃতিই আমাদের সেই ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছে।
বুঝলাম। সমকামিদের ভালোবাসা বুঝি প্রকৃতি তৈরি করে দেয় না?
রূপ এবার চুপ হয়ে গেল। তারপর শুষ্ক গলায় বললো, দেখো প্রকৃতি চায় একজন পুরুষ একজন নারীকে ভালোবাসুক, পরিবার হোক, সন্তান জন্ম নিক। এভাবেই প্রকৃতি হাজার বছর ধরে সামনে এগিয়ে যাবে। কিন্তু সমকামিরা কি এই ধারায় এগিয়ে যেতে পারবে?
তাহলে যে নারী বা পুরুষ সন্তান চায় না? তারা কি প্রকৃতির বাইরের কোনো জগতের মানুষ?
সেটা আলাদা। এক্সেপশনাল বিষয়।
আবার অনেক নারী আছেন যিনি সন্তান জন্ম দিতে পারেন না? অনেক পুরুষ আছেন সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম। তাহলে তাদেরকে নিয়ে প্রকৃতির সমাধান কী?
রূপা এবার একটু চুপ হয়ে গেল।
আমি এবার একটু ঝুঁকে বললাম, তাহলে তুমি বলছো, ভালোবাসার মূল্য কি তার জৈবিক ফলাফলে?
আমার এমন কথায় রূপা বিরক্ত হলো। তারপর বললো, তুমি সবকিছু এত জটিল করছ কেন?
কারণ ভালোবাসা সহজ নয়।
না, ভালোবাসা খুব সহজ।
কীভাবে?
একজন পুরুষ একজন নারীকে ভালোবাসবে। একজন নারী একজন পুরুষকে।
আমি হেসে বললাম, তাহলে রোমিও—জুলিয়েটের প্রেমই একমাত্র প্রেম? রাধা—কৃষ্ণের প্রেম? লাইলী—মজনু? দেবদাস—পার্বতী?
রূপা চুপ।
আমি একটু থামলাম। তারপর আবার বললাম। শুধু জানতে চাই, মানুষ কাকে ভালোবাসবে, সেটা কি প্রকৃতি নিজে ঠিক করে দেয়?
রূপা উত্তর দিল না।
ফিফথ এভিনিউ দিয়ে তখন একটা হলুদ ট্যাক্সি ছুটে গেল। তার পেছনে সাইকেল, তারপর বাস। রাস্তার ওপারে একটা ছোট মেয়ে বাবার হাত ধরে হাঁটছে। বাবা মেয়েটার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
আমি হঠাৎ বললাম, দেখো।
রূপা তাকাল।
ওই বাবা আর মেয়েটার হাতটা দেখো।
কী হয়েছে? এটাই তো স্বাভাবিক এবং দেখতেও সুন্দর।
আমি বললাম, অবশ্যই। তবে, হাত ধরারও তো কত রকম অর্থ আছে। সেই দেখার চোখও আছে। তাই না?
রূপা এবার একটু নরম হলো। তারপর একটু কাছে ঘেষে বসে বললো, তুমি আজ খুব দার্শনিক হয়ে গেছ। মানুষ নিয়ে গবেষণা করছো বুঝি?
আমি বললাম,
না। আজ শুধু মানুষ দেখছি আর তাদেরকে বোঝার চেষ্টা করছি।
ঠিক তখনই দূরে সেই দুই পুরুষকে আবার দেখা গেল।
তারা একটি বেঞ্চের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। দাড়িওয়ালা লোকটি ব্যাগ থেকে একটা ছোট ট্রায়পড বের করে ওদের সামনে রেখে একটা ক্যামেরা রাখলো। অন্যজন হাসতে হাসতে তার চুল ঠিক করে দিল। তারপর দুজন একসঙ্গে ছবির জন্য দাঁড়াল। ক্যামেরার টাইমার সেট করে দাড়িওয়ালা লোকটি দৌড়ে এসে তার সঙ্গীর পাশে দাঁড়াল।
ছবিটা তোলার মুহূর্তে তারা একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিলো ভালোবাসা ছিলো একে অপরের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
আমি জানি না কেন, সেই দৃষ্টিটা আমাকে আরও ভাবিয়ে তুললো।
না, ওটা কামনার দৃষ্টি ছিল না। ছিল না লোক দেখানো কোনো সস্তা প্রদর্শনও। ছিল এমন এক নিশ্চিন্ততা, যেন সেখানে পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
আমি রূপার দিকে তাকালাম। তারপর বললাম, দেখলে?
রূপা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো, দেখেছি।
সত্যি করে বলতো, এই দৃশ্য দেখে তোমার কি এখনও গা গুলাচ্ছে?
রূপা এবার কোনো উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ পর সে খুব আস্তে কর বলল, আমার মা—ও একসময় বলেছিল, ভালোবাসারও একটা নিয়ম আছে।
আমি চমকে উঠলাম।
মানে?
রূপা দূরের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলতে শুরু করলো, আমার কলেজে একজন মেয়ে বন্ধু ছিলো। খুব কাছের বন্ধু।
তারপর?
আমরা সারাদিন একসঙ্গে থাকতাম। একসঙ্গে খেতাম। একসঙ্গে পড়তাম। ও অসুস্থ হলে আমার ঘুম হতো না। আমি বাড়ি ফিরলে ওকে ফোন না করে থাকতে পারতাম না।
রূপা থামল। তারপর আবার বলতে শুরু করলো। একদিন ও আমার হাত ধরেছিল।
আমি নিঃশব্দে বসে রইলাম। তারপর রূপাকে বললাম, ঠিক ওই দুজনের মতো?
রূপা মাথা নেড়ে বলল,
হ্যাঁ। তারপর খুব ধীরে বলল, আমি হাতটা সরিয়ে নিয়েছিলাম।
আমি বললাম সরিয়ে নিলে কেন? ওতো তোমার বান্ধবী! হাত ধরতেই পারে।
রূপা এবার আমার দিকে তাকাল। তার চোখে আমি এমন একটা ভয় দেখলাম, যেটা এতক্ষণ তার কণ্ঠের আড়ালে লুকিয়ে ছিল।
কারণ আমার ভয় হয়েছিল, আমি যদি হাতটা না সরাই, তাহলে হয়তো আমি বুঝে ফেলব যে ওকে আমি ভালোবাসি। আমার মনে হচ্ছিল আমি ওকে সম্ভবত ভালোবাসি। কিন্তু আমি তো জানি এটা পাপ!
আমি ওর কথা শুনে আর কিছু বলতে পারলাম না।
রূপা নিচু গলায় বলল, পরদিন থেকে আমি ওর সঙ্গে আর কথা বলিনি।
দূরে গীর্জা থেকে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজল। সেন্ট্রাল পার্কের ভেতর দিয়ে সুরুত করে একটা সাইকেল চলে গেল।
আমাদের সামনে ফিফথ এভিনিউ দিয়ে মানুষ তখনও হেঁটে যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ। কেউ কাউকে চেনে না। তবু সবাই পাশাপাশি হাঁটছে।
আমি রূপার দিকে তাকিয়ে বললাম,
তুমি জানো, আজকে ওই দুজনকে দেখে আমার একটা কথা মনে হয়েছিল?
কী?
প্রকৃতিকে হয়তো আমাদের যতটা কঠোর বলে মনে করি, আসলে সে ততটা কঠোর নয়।
রূপা কোনো উত্তর দিল না।
আমি তার হাতের দিকে তাকালাম।
তারপর আমার নিজের হাতের দিকে।
দুটো হাতের মাঝখানে তখন কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব। আমি হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরতে চাইলাম। কিন্তু থেমে গেলাম।
রূপা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর সে নিজেই ধীরে ধীরে আমার হাতটা ধরল। কিছুক্ষণ শক্ত করে ধরে রাখল। আমি অবাক হয়ে বললাম,
কী হলো?
রূপা হাসল না। শুধু বলল, কিছু না। তারপর একটু থেমে যোগ করল,
আজ বুঝলাম, নোংরামি হাত ধরায় নয়।
তাহলে কিসে?
রূপা দূরে মিলিয়ে যাওয়া সেই দুই পুরুষের দিকে তাকিয়ে বলল,
নোংরামি হলো ভালোবাসাকে ভয় পাওয়া।
আমি আর কিছু বললাম না।
সেন্ট্রাল পার্কের গাছগুলোর ওপর দিয়ে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
ফিফথ এভিনিউ দিয়ে মানুষের মিছিল চলছেই।
আর আমাদের দুজনের হাতের মধ্যে, সেই মুহূর্তে, কোনো প্রকৃতির নিয়ম ছিল না।
ছিল শুধু উষ্ণতা। ছিলো ভালোবাসার ছোঁয়া। আর কিছু ছিলো না তখন।
