বাঁধনের বন্ধন কাদের সঙ্গে! আনিস আহমেদ
সম্প্রতি ইটালিতে বাংলাদেশের অভিনেত্রী বাঁধন মব আক্রমণে হেনস্থা হয়েছেন। তাঁর গায়ে কোমল পানীয় ছিঁটানো হয়েছে, তাঁর হাত থেকে মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে জয় বাংলা বলতে বলা হয়েছে, এ রকম অভিযোগ করেছেন তিনি নিজেই সামাজিক মাধ্যমে। হামলার পর তিনি স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছেন। তিনি ২০২৪’এর আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে এই হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। তাঁরই পাঠানো ভিডিওতে দেখা গেছে যে বাঁধনকে এই হয়রানি করা ছাড়া আর কিছু্ই করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাঁর ওপর এই আক্রমণ চালিয়েছিলেন। আক্রমণ যেই চালাক, আক্রমণ যার ওপরেই হোক না কেন, সেটি অন্যায় এবং কোনোক্রমেই সমর্থনযোগ্য নয়। ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ থাকতেই পারে, কিন্তু কাউকে হেনস্থা বা হয়রানি করাকে কোন বিবেকবান মানুষই সমর্থন করে না।
তবে যখন আমরা যে কোনো আক্রমণের প্রতিবাদ জানাই তখন সেই প্রতিবাদের ক্ষেত্রে কোনোরকম পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করা উচিত নয়। বাঁধনের চেয়ে অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছেন, ভিন্নমত পোষণের জন্য শত শত আওয়ামী লীগ কর্মী ও নেতা এবং সংস্কৃতিকমীর্রাও। ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ি, যা ছিল বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, সেখানে যাওয়ার অপরাধে বিশিষ্ট অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর ওপর আঘাত হানা হয়েছিল। সে সময়ে সরকার কোনোরকম প্রতিবাদ জানায়নি কিংবা গণমাধ্যমে সেটি তেমন কোনো প্রাধান্য পায়নি। কেবল সেই সময় নয়, এই সাম্প্রতিক কালেও, এমন কী বঙ্গবন্ধুর হত্যা দিবস ১৫ আগস্টেও, সেখানে যাঁরাই শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন, তাঁরা সকলেই মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। তাছাড়া অভিনেত্রী শাওন কিংবা গায়িকা মমতাজও সেই হেনস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ এঁদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে সরকার কোনোরকম ব্যবস্থা তো গ্রহণ করেইনি বরঞ্চ পুলিশ আক্রান্তদেরই গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে এবং আক্রমণকারীরা সানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখনও। ইউনুস সরকার যেমন এ নিয়ে টু শব্দটি পর্যন্ত করেনি, তারেক সরকারও কোনোরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘আমি আজমেরী হক বাঁধনের উদ্দেশে বলব, এটা এক ধরনের অর্জন, সম্মান প্রাপ্তি যে আওয়ামী লীগের হেনস্তার শিকার হওয়া, একটা মাফিয়া গ্যাংয়ের শিকার হওয়া প্রমাণ করে আপনি সঠিক পথে ছিলেন।’ সরকার কোনোভাবেই বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা ছেড়ে দেবে না বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। সরকার এ বিষয়ে প্রস্তুত আছে বলে জানান তিনি। এই উপদেষ্টা কি আদৌ কোনোরকম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন যখন আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষ মাফিয়ার শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে এখনও! সম্প্রতি সনাতনধর্মী একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও তাঁর পরিবারের আরও তিনজন সদস্যকে হত্যা করা হয়, এ নিয়ে কিছু তদন্ত কাজ চলছে বটে কিন্তু সেই তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কেবল আওয়ামী সমর্থক বলে কথা নয়, যারা উদারপন্থি ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি তাঁরাও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, হচ্ছেন এখনও। শিক্ষকদের গলায় জুতার মালা পরানো হয়েছে, তাদের জোর জবরদস্তি করে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে এবং এ নিয়ে সরকারের তরফ থেকে বিন্দুমাত্রও কোনো উদ্বেগ—উৎকন্ঠাও নেই। তাদের ঢালাওভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে চিহ্নিত করে তাদের হয়রানিকে ‘জায়েজ’ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তাঁরা আওয়ামী লীগের সমর্থক এমন কী সদস্য হলেও তাঁরা কি এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হতে পারেন? যাঁরা গণতন্ত্রের কথা জোরে—শোরে বলেন, যাঁরা পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারকে গণতন্ত্র বিরোধী স্বৈরাচারী সরকার বলেন, তাঁরা কী ধরনের গণতান্ত্রিক নীতি মেনে চলছেন যে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সম্পৃক্ত যে কোনো ব্যক্তি তাঁদের উষ্মা ও ক্ষোভের শিকার হচ্ছেন? যে আন্দোলনের ঘোষিত নীতি ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, সেই আন্দোলনের পরে আমরা লক্ষ্য করছি আগেকার যে কোনো সময়ের চাইতে এখন বৈষম্য বেড়ে গেছে বহুগুণ। এ কেবল আর্থিক বৈষম্য নয়, আচরণগত বৈষম্য। এই বাঁধন, যিনি ২০২৪’এর আগে পর্যন্ত নিজেকে শেখ হাসিনার অনুরাগী ব্যক্তি হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেছেন, শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, সেই বাঁধন ২০২৪ সালের ‘জুলাই—যোদ্ধা’ হিসেবে দ্রুতই পাল্টে গেলেন। তাঁর এই পাল্টে যাওয়াকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। সম্ভবত ইটালিতে তারাই তাকে হেনস্থা করেছে। কিন্তু তিনি শারীরিকভাবে সামান্যতম আহত হননি। যারা হতাহত হয়েছে গত প্রায় আড়াই বছর ধরে, তাদের পক্ষে সরকার বা সরকার দলীয় সমর্থকরা উচ্চবাচ্য করেননি। বরঞ্চ তাদেরকে আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ স্বৈরাচারীর দোসর হিসেবে দোষী করেছেন।
প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবাদের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য কেন? বাঁধন ক্ষমতাসীন দল ও তাদের সমর্থকদের কাছে বাঁধা পড়েছেন বলেই কি আমরা হয়রানির প্রতিবাদে এই তারতম্য লক্ষ্য করছি। এখানে অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে জামায়েতে ইসলামি ও এনসিপি দল। তারা বাহ্যত বিএনপি সরকারের বিরোধী পক্ষ হলেও, এক ধরনের গোপন আঁতাত রক্ষা করে চলছে। আর সেই কারণে কথিত জুলাই যোদ্ধাদের রক্ষার জন্য বিএনপি সরকার এক ধরনের দোটানায় পড়েছে। একদিকে তারা জামায়াত—এনসিপিকে বিরোধী দল হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অন্যায় আবদার মেনে নিয়ে তাদের তোয়াজ করতে হচ্ছে। জুলাই যোদ্ধা শব্দটির মধ্যে একটি আভিধানিক ও ঐতিহাসিক ত্রুটি রয়েছে। জুলাই মাসে কোনো যুদ্ধ হয়নি; বাহ্যত আন্দোলন হয়েছে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষকে বিশেষত বাংলাদেশের তারুণ্য শক্তিকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশে জেন—জি জনগণের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসেনি। বরঞ্চ নিয়ে গেছে অনেক পেছনের দিকে, সেই সময়ে, সেই আদর্শের দিকে যাকে বাঙালি পরিত্যাগ করেছিল বহু আগেই। জুলাইয়ের ঘটনাকে যদি আন্দোলন বলে মেনেও নেয়া হয় তবে সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন কোনোক্রমেই যুদ্ধ হতে পারে না। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরাও যোদ্ধা হতে পারে না। সে জন্যেই আজকাল অনেকেই এই জুলাই—যোদ্ধাদের তাদের কর্মকান্ডের কারণেই জুলাই—জঙ্গিও বলেন। কারণ তারা সন্ত্রাস চালিয়েছে সাধারণ মানুষের ওপর, হত্যা করেছে পুলিশদের, পুড়িয়েছে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাঁধনকে জুলাই—যোদ্ধা বললে তাঁর সম্মান কতটুকু বৃদ্ধি পাবে সেটি ভেবে দেখার বিষয়।
আসলে এক সময়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক ও অনুরাগী জুলাই—যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে জাহির করে, আমাদের খানিকটা ধাঁধাঁয় ফেলে দিলেন তিনি। বাঁধনের বন্ধন আসলে কোন দিকে!
