বিশ^জিৎ চৌধুরীর একক চিত্রপ্রদর্শনী || মাটির গায়ে মিশে যাওয়া স্মৃতি
ড. জীবন বিশ্বাসঃ শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরীর একক শিল্প প্রদর্শনী ‘বন্ডিং উইথ আর্থ’ চলছে গভর্নর্স আইল্যান্ডের ঐতিহাসিক নোলান পার্কে, যেখানে উনিশ শতকের স্থাপত্য এখন নিউইয়র্কের বহুমাত্রিক সমকালীন সংস্কৃতির নানা উৎসকে আশ্রয় দিচ্ছে। মাটি, মৃত্তিকা, রং, বুনট, জল ও বিমূর্ততার সমন্বয়ে নির্মিত এই প্রদর্শনী মূলত সভ্যতার সঙ্গে মানুষের প্রাচীনতম সম্পর্কগুলোর একটিকে অনুসন্ধান করেÑপৃথিবী নামের এই ভূমি ও তার উপাদানের ওপর মানবজীবনের চিরন্তন নির্ভরতা।
বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের ২০২৬ সালের শিল্পী—রেসিডেন্সির অংশ হিসেবে নোলান পার্কের বিল্ডিং ১৬—এ প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয় ২৯ আগস্ট এবং তা চলবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। শনি ও রবিবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই প্রদর্শনী। অন্যদিকে গভর্নর্স আইল্যান্ডের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটেও বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বন্ডিং উইথ আর্থ প্রদর্শনীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশী আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের জন্যও এই প্রদর্শনী একটি তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত নিউইয়র্কভিত্তিক এই শিল্পী—সংগঠন ২০২৬ সালের গভর্নর্স আইল্যান্ড আর্টস’র রেসিডেন্স কর্মসূচিতে নির্বাচিত দুই ডজনেরও বেশি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের একটি। এই কর্মসূচিতে গভর্নর্স আইল্যান্ডের রেসিডেন্সিতে ৪৩ জন শিল্পী অভিবাসন, স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নানা মাত্রা অনুসন্ধান করছেন।
এই সংগঠনটির প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসে বিশ্বজিৎ চৌধুরী শুধু একজন শিল্পীই নন, তিনি সংগঠনটির অন্যতম নির্মাতাও। আর্টিস্ট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরী। তার নিপুণ ব্যবস্থাপনায় সংগঠনটি আজ বাংলাদেশের কমিউনিটির গন্ডি ছাড়িয়ে মূলধারায় প্রবেশ করেছে। গভর্নর্স আইল্যান্ডের বর্তমান উদ্যোগের বহু আগেই নিউইয়র্কে শিল্পীদের নিজস্ব সৃজন—পরিসর গড়ে তোলার কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন। ২০১৪ সালে বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কায়সার কামাল এবং আলম টিপু লং আইল্যান্ড সিটিতে আর্টিস্টরান গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যাতে শিল্পীরা বাণিজ্যিক গ্যালারির সীমাবদ্ধতার বাইরে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।
বিশ্বজিৎ চৌধুরীর শিল্পচর্চা বহুমাধ্যমনির্ভরÑসিরামিক, ভাস্কর্য, ড্রয়িং, পেইন্টিং, ইনস্টলেশন ও মিক্সড মিডিয়া তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অধ্যয়ন করেন এবং পরে নিউইয়র্কেও লিম্যান কলেজে শিল্পবিষয়ক উচ্চতর কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সিরামিক প্রদর্শনীতে তিনি পুরস্কৃত হন। ২০০৬ সালে লিম্যান কলেজ স্টুডেন্ট আর্ট এক্সিবিশনে পান অনারেবল মেনশন। ১৯৮৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে প্রায় ৩৫টি গ্রুপ প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ স্থান পেয়েছে। ২০১২ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর একক প্রদর্শনী ‘টাচ দ্য আর্থ’।
‘বন্ডিং উইথ আর্থ’ শিল্পদর্শন বিশ্বজিৎ চৌধুরীর নিজের বক্তব্যেই সুস্পষ্ট, মাটি স্মৃতি ও সভ্যতার দলিল। তাঁর কাছে পৃথিবী বা মাটি শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য নয়, এটি সভ্যতার বস্তুগত ভিত্তি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ মাটির উপাদানকে রূপান্তর করে তৈরি করেছে পাত্র, সরঞ্জাম, বসতি, স্থাপত্য এবং শিল্পকর্ম। বিশেষত মৃত্তিকা বা ক্লে তাঁর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে মানুষের স্পর্শের চিহ্ন থেকে যায়; পাশাপাশি তা মাটি, নদী, বন্দর, অভিবাসন, বাণিজ্য ও মানববসতির ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের যুক্ত করে। তাঁর মতে, মৃৎশিল্প ও সিরামিকের মধ্যে সংরক্ষিত থাকে মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করেছে এবং কোন মূল্যবোধকে ধারণ করেছে তার নীরব দলিল।
এই কারণেই তাঁর বিমূর্ততা কখনোই বস্তুজগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হয় না। নীল রং বারবার জলের স্মৃতি জাগায়। আঁচড় ও রেখাগুলো কখনো নদীর গতিপথ, কখনো ক্ষয়, শিকড়, মানচিত্র কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক চিহ্নের কথা মনে করিয়ে দেয়। সিরামিকের অসমতল পৃষ্ঠ যেন খনন করে পাওয়া কোনো প্রাচীন ভূখন্ড। শিল্পী সভ্যতার সরাসরি ছবি আঁকেন না বরং দেখান—সভ্যতার চিহ্ন কীভাবে উপাদানের ভেতর জমা থাকে। প্রদর্শনীর ক্যাটালগে শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ১৩টি স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম দেখা যায়; ১৬ বাই ১৬ ইঞ্চির একটি ক্লে রিলিফ দুইবার—একবার বড় আকারে এবং একবার ছোট পুনরুৎপাদনে—মুদ্রিত হয়েছে। পাঠক ও দর্শকের সুবিধার্থে নিচে ব্যবহৃত বর্ণনামূলক নামগুলো এই নিবন্ধে শনাক্তকরণের জন্য দেওয়া হয়েছে।
বিশাল ১০৮ বাই ১০৮ ইঞ্চির মিক্সড—মিডিয়া কাজটিকে এখানে ‘ওশেনিক মেমোরি’ বা ‘সমুদ্রের স্মৃতি’ নামে শনাক্ত করা যেতে পারে। গাঢ় নীল, ফিরোজা ও অন্ধকার স্তরের ওঠানামায় এটি নিছক সমুদ্র কিংবা আকাশের দৃশ্য হয়ে থাকে না; বরং জলের মধ্যে যেন সঞ্চিত ইতিহাসের বিশাল এক ক্ষেত্র তৈরি হয়। নয় ফুট বর্গাকার এই চিত্রের আয়তন দর্শককে শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবেও তার উপস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
নীল রঙের আরও দুটি কাজ এই ভাষাকে বিস্তার করেছে। ৩০ বাই ৩০ ইঞ্চির ‘ব্লু ডেপথস’ বা ‘নীল অতল’—এ দৃশ্যমান অবয়বগুলো ধীরে ধীরে আবছা বায়ুমণ্ডলীয় স্তরে বিলীন হয়েছে, যেন স্মৃতি জলের নিচে ডুবে আছে। ২০ বাই ১৬ ইঞ্চির ‘ব্লু ভরটেক্স’ বা ‘নীল ঘূর্ণি’—তে একটি গাঢ় কেন্দ্রীয় অবয়বকে ঘিরে প্রবল গতির অনুভূতি তৈরি হয়েছে—কিছু একটা যেন একই সঙ্গে আবির্ভূত হচ্ছে এবং পরিবেশের মধ্যে হারিয়েও যাচ্ছে।
প্রথম ক্যাটালগ—প্যানেলের আরও তিনটি কাজে পৃষ্ঠ ও বুনটের ভিন্নতর ভাষা দেখা যায়। ২০ বাই ২৪ ইঞ্চির ‘গ্রিন স্ট্রাটা’ বা ‘সবুজ স্তর’—এ উল্লম্ব সবুজ ও ফিরোজা রং কখনো খনিজ স্তর, কখনো উদ্ভিদ, ধ্বংসাবশেষ বা স্থাপত্যের স্মৃতি জাগায়। ১৬ বাই ২০ ইঞ্চির ‘ফল্ট লাইন’ বা ‘ভাঙনের রেখা’—য় ফিকে গোলাপি, মৃত্তিকাময় অন্ধকার ও অস্থির বুনট ভূতাত্ত্বিক বিভাজনকে ইতিহাসের ছিন্নতার রূপক করে তোলে। একই মাপের ‘রিভার ভেইন্স’ বা ‘নদীর শিরা’—য় গাঢ় নীলের ওপর ছড়িয়ে থাকা সাদা শাখা—প্রশাখা কখনো নদীনালা, কখনো শিকড়, রক্তনালি কিংবা মানচিত্রের মতো মনে হয়—পারস্পরিক সংযোগের এক শক্তিশালী দৃশ্যরূপ।
সিরামিকের কাজে প্রদর্শনীর মূল বক্তব্য সরাসরি পৃথিবীর উপাদানে এসে পৌঁছায়। ১৬ বাই ১৬ ইঞ্চির ক্লে রিলিফ ‘আর্থ ইমপ্রেশন্স’ বা ‘মাটির ছাপ’ যেন প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো পৃষ্ঠ; সেখানে গর্ত, ভাঁজ, চাপের দাগ ও জীবাশ্মসদৃশ চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। মানুষের হস্তক্ষেপ এখানে রঙের ওপর আরোপিত নয়—মৃত্তিকার শরীরেই যেন স্থায়ী হয়ে গেছে। ৯ বাই ১৩.৫ ইঞ্চির সিরামিক ‘ক্রসড কারেন্টস’ বা —‘ছেদ করা প্রবাহ’ তুলনামূলকভাবে রেখাময়; মাটির রং, কালচে ছায়া ও ওখারের ওপর বক্র ও তির্যক রেখাগুলো অভিবাসনপথ, নদী, বাণিজ্যপথ অথবা দীর্ঘ মানববসতির স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
সব কাজ একসঙ্গে দেখলে বন্ডিং উইথ আর্থ নামটির গভীরতা স্পষ্ট হয়। শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রকৃতিকে সভ্যতার বিপরীত কোনো রোমান্টিক জগৎ হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে পৃথিবী একই সঙ্গে উপাদান, আর্কাইভ, সাক্ষী ও উত্তরাধিকার। মাটি স্পর্শ মনে রাখে, জল যাত্রাপথ মনে রাখে, আর পৃষ্ঠের ভাঁজ ও ক্ষত চাপের ইতিহাস ধরে রাখে। ফলে তাঁর বিমূর্ত শিল্পও ঐতিহাসিক ভার বহন করে।
গভর্নর্স আইল্যান্ডের মতো একটি বাস্তব দ্বীপটি আরও গভীর তাৎপর্য বহন করে। দ্বীপটিই যেন প্রদর্শনীর বক্তব্যের অংশ হয়ে ওঠে। সভ্যতা মাটির ওপর নির্মিত হয়; আবার সভ্যতা চলে গেলেও মাটি তার রেখে যাওয়া চিহ্ন ধারণ করে। বিশ্বজিৎ চৌধুরী সেই চিহ্নগুলো পড়তে আহ্বান জানান—বিলুপ্ত অতীতের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে নয়, বরং পদার্থ ও স্মৃতির মধ্যে এখনো চলতে থাকা এক অসমাপ্ত কথোপকথন হিসেবে।
