ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আদালতের রায় || আয়করের ৬৬৬ কোটি টাকা দিতে হবে
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর দাবি করে আসছে, সেটির পক্ষে রায় দিয়েছে আদালত।
এনবিআরের দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের দায়ের করা রিটের রুল খারিজ করে বৃহস্পতিবার নতুন এই আদেশ দিয়েছেন বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ। ফলে আয়কর বাবদ গ্রামীণ কল্যাণকে এখন ৬৬৬ কোটি টাকার পুরোটা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
‘এখন যথাযথভাবে ডিমান্ড নোটিস ইস্যু করে সরকার তার রাজস্ব আদায় করতে পারবে, যে রাজস্বটা গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ থেকে ফাঁকি দিয়ে আসছে। ডিমান্ড নোটিসটা ইস্যু করবে ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস। সাধারণত ৩০ দিন সময় দেওয়া হয় ডিমান্ড নোটিসে,’ রায়ের পর সাংবাদিকদের বলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদ।
অন্যদিকে, গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন যে, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পাওয়ার পর তারা আপিল আবেদন করবেন।
‘পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। রায়ের কপি পেলে আমরা আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল ফাইল করবো,’ বৃহস্পতিবার বিকেলে সাংবাদিকদের বলেন মি. মামুন।
আয়কর বাবদ এক দশক আগে গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা দাবি করেছিল এনবিআর। সেটির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে আলাদা দু’টি রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ।
এরপর দফায় দফায় শুনানি শেষে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আমলের একেবারে শেষদিকে উভয় রিট খারিজ করে রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূস শপথ নেওয়ার পর রিট খারিজ করে দেওয়া আগের রায় প্রত্যাহার করে নেয় হাইকোর্ট।
এরপর মামলাটি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হলে হাইকোর্টের নতুন বেঞ্চের সামনে ফের শুনানি শুরু হয়। সেই শুনানির পরিপ্রেক্ষিতেই ১০ সেপ্টেম্বর নতুন রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
গ্রামীণ কল্যাণ কী?
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে প্রতিষ্ঠিত সাতটি প্রতিষ্ঠানের মধ্য গ্রামীণ কল্যাণ অন্যতম। এটি অলাভজনক একটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ছয়ই নভেম্বর।
প্রতিষ্ঠানটি মূলত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের মাধ্যমে দারিদ্র নিরসনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বলে এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।
অধ্যাপক ইউনূসের প্রায় পাঁচ দশকের সহকর্মী ও সাবেক অন্তর্বতীর্ সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ১৯৯১ সালের একটি গবেষণায় তারা দেখতে পান, বাংলাদেশে যত মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছেন, সেটার মূলে রয়েছে তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যা।
‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস তখনই এ সমস্যা সমাধানে ১৯৯৩ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে আটটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র চালু করেন। সেটি সফল হওয়ার পর গ্রামীণ কল্যাণ সৃষ্টি করা হয়,’ বলেন মিস বেগম।
বর্তমানে সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় দেড়শ’র মতো স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। শুরুর দিকে মূলত গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের জন্য ওইসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গড়ে তোলা হলেও এখন সাধারণ মানুষও সেবা নিতে পারেন বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ কল্যাণের কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা ও বৃত্তির ব্যবস্থা করে থাকে গ্রামীণ কল্যাণ।
কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রথমদিকে দাতাদের অর্থে গঠিত ‘সোশ্যাল অ্যাডভান্সমেন্ট ফান্ডে’র টাকায় কার্যক্রম শুরু করলেও বর্তমানে নিজস্ব আয়েই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর বাইরে, গ্রামীণ টেলিকম থেকেও প্রতিষ্ঠানটি অর্থ পেয়ে থাকে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আগে গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন। তবে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি আর ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নেই বলে জানিয়েছেন গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।
বিরোধের সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত এখন থেকে বছর দশেক আগে। এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ২০১২—১৩ থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ অর্থবছরের আয়কর বাবদ তারা গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা পাবেন।
মূলত তহবিলের একটি অংশ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে গ্রামীণ কল্যাণ অধ্যাপক ইউনূসের হাতে গড়া আরেক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। সেই চুক্তির আওতায়, গ্রামীণ কল্যাণ প্রায় ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেয় গ্রামীণ টেলিকমকে। সেই অর্থের লভ্যাংশ হিসেবে গ্রামীণ কল্যাণের তহবিলে যে অর্থ জমা হয়ে থাকে, যা আয়কর যোগ্য বলে দাবি করেন এনবিআর কর্মকর্তারা। কিন্তু গ্রামীণ কল্যাণ সেটি মানতে নারাজ।
‘গ্রামীণফোন থেকে লভ্যাংশ দেওয়ার সময় উৎসে ১৫ শতাংশ কর কেটে রাখা হয়। সেই কর পরিশোধের পর আবার কেন অতিরিক্ত কর ধার্য করা হবে— এই প্রশ্নেই আমরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছি,’ মামলার বিষয়ে এর আগে সাংবাদিকদের বলেন প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবী মি. মামুন।
এনবিআরের দাবির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে আলাদা দু’টি রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণসহ রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেয়। সেই রায়ে এনবিআর কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করা হয়।
পরে রায়ের বিরুদ্ধে এনবিআর আপিল আবেদন করলে বিষয়টি নিয়ে ফের শুনানি করার নির্দেশ দেয় আদালত। শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গ্রামীণ কল্যাণের দুটি রিটই খারিজ হয়ে যায়।
