৫০ রাজ্যের ৫০ ভালোবাসার গল্পঃ মন্টানা হোয়্যার দ্য সি ইউজড টু বিঃ রিক ব্যাস || আবদুল্লাহ জাহিদ
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর—পশ্চিমাঞ্চলের স্টেট মন্টানা। এখানকার বিস্তীর্ণ প্রান্তর, দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতমালা আর বরফে ঢাকা উপত্যকা যেন এক রহস্যময় আদিমতার সাক্ষী। এমন এক বন্য পরিবেশে রিক ব্যাস তাঁর অনবদ্য উপন্যাস ‘হোয়্যার দ্য সি ইউজড টু বি’—তে রচনা করেছেন এক অন্য রকম আখ্যান। এই উপন্যাস নিছক একটি কাহিনী নয়; এটি প্রকৃতি, মানুষের অন্তহীন লোভ এবং আদিম বন্যতার মাঝে এক গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান। পাঠক, আপনি যদি বইটি নাও পড়েন, তবুও এর পৃষ্ঠায় কান পাতলে শুনতে পাবেন মন্টানার বরফ জমাট উপত্যকায় বাতাসের গর্জন, আর অনুধাবন করতে পারবেন মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক চিরন্তন রূপ।
উপন্যাসের প্রেক্ষাপট মন্টানার সোয়ান উপত্যকা। স্থানটি যেন পৃথিবীর শেষ প্রান্ত, যেখানে শীতের তীব্রতা আর নির্জনতা মিলেমিশে একাকার। এই উপত্যকার মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের তেলÑসেই প্রাচীন কালের স্মৃতি, যখন এই বিস্তীর্ণ ভূমি ছিল সমুদ্রের তলদেশে। আর এই সম্পদের সন্ধানেই শুরু হয় উপন্যাসের মূল সংঘাত।
কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি বিপরীতমুখী চরিত্র। একদিকে মেলকিয়র (গবষপযরড়ৎ), একজন প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও একগুঁয়ে ভূতাত্ত্বিক। সে তেলের সন্ধানে এতটাই উন্মত্ত যে, প্রকৃতি তার কাছে নিছকই শোষণের উপাদান। মেলকিয়রের বিশ্বাস, এই উপত্যকার গভীরে যে বিশাল তেলের খনি লুকিয়ে আছে, তা সে—ই আবিষ্কার করবে। তার কাছে এই অভিযান এক প্রকার আধ্যাত্মিক সাধনার সমতুল্য, যেখানে সে নিজেকে প্রকৃতির চেয়েও শক্তিশালী বলে মনে করে। সে মনে করে, প্রকৃতিকে জয় করে তার সম্পদ আহরণ করাই মানুষের চূড়ান্ত সার্থকতা।
অন্যদিকে রয়েছে ওয়ালিস (ডধষষরং), এক তরুণ ভূতাত্ত্বিক, যাকে মেলকিয়র তার নিজস্ব সম্পদ হিসেবেই নিয়োগ করেছে। ওয়ালিস মেলকিয়রের অধীনে কাজ শুরু করলেও, ধীরে ধীরে সে উপলব্ধি করে এই সোয়ান উপত্যকার এক ভিন্ন রূপ। সে মাটির গভীরে তেলের সন্ধান করতে গিয়ে আবিষ্কার করে প্রকৃতির এক আদিম শক্তিকে, যা মানুষকে গ্রাস করতে পারে, আবার মুগ্ধও করতে পারে। ওয়ালিসের চোখে মন্টানার এই প্রান্তর শুধু সম্পদ আহরণের জায়গা নয়; এটি এমন এক স্থান, যেখানে মানুষ প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এক নতুন উপলব্ধির স্বাদ পেতে পারে।
এই দুজনের মধ্যে যখন তেল আবিষ্কার নিয়ে এক মনোস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে, তখন কাহিনীতে প্রবেশ করে তৃতীয় একটি চরিত্র—মেলকিয়রের মেয়ে, মার্গারিট (গধৎমঁবৎরঃব)। সে একজন বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, যে নেকড়েদের নিয়ে গবেষণা করে। মার্গারিট যেন এই উপত্যকারই এক প্রতিভূÑবন্য, স্বাধীন এবং রহস্যময়। সে তার বাবার প্রকৃতি—বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ বিপরীত। মার্গারিটের কাছে এই উপত্যকা হলো নেকড়েদের বিচরণক্ষেত্র, এক পবিত্র ভূমি, যাকে কোনোভাবেই ধ্বংস করা উচিত নয়।
উপন্যাসের এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ওয়ালিস এবং মার্গারিটের মধ্যে এক গভীর প্রেম গড়ে ওঠে। এই প্রেম যেন প্রকৃতিরই এক অংশ, যা ওয়ালিসকে মেলকিয়রের প্রভাব থেকে মুক্ত করে নতুন এক দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখতে শেখায়। ওয়ালিস ক্রমশ বুঝতে পারে যে, মেলকিয়র যেভাবে প্রকৃতিকে জয় করতে চায়, তা আসলে এক ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ। সে মার্গারিটের জীবনদর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে প্রকৃতিকে জয় করার চেয়ে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়াই বেশি জরুরি।
রিক ব্যাস এই উপন্যাসে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষের লোভ বনাম প্রকৃতির আদিমতার দ্বন্দ্ব। মেলকিয়র হলো সেই লোভের প্রতীক, যে আধুনিক সভ্যতার নামে প্রকৃতির বুক চিরে সম্পদ আহরণ করতে চায়। তার কাছে মাটির গভীরে থাকা তেল যেন এক অশুভ শক্তি, যা তাকে ক্রমাগত অন্ধ করে তুলছে। মেলকিয়র বুঝতে পারে না যে, সে যে সমুদ্রের তলদেশের প্রাচীন সম্পদ খুঁজছে, সেই সমুদ্র একসময় এই উপত্যকাকে গ্রাস করেছিল। আর আজ সে নিজেই সেই প্রাচীন শক্তির কাছে গ্রাস হতে চলেছে।
অন্যদিকে, ওয়ালিস এবং মার্গারিট হলো সেই শক্তির প্রতীক, যারা প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে বাঁচতে চায়। তারা বোঝে যে, প্রকৃতির এক নিজস্ব ছন্দ আছে, আর সেই ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে চলাই মানুষের ধর্ম। রিক ব্যাস তাঁর লেখনীতে মন্টানার এই বন্য প্রকৃতিকে এত জীবন্তভাবে চিত্রিত করেছেন যে, পাঠকের মনে হবে তিনি নিজেই যেন সেই তুষারাবৃত উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছেন। হাড় কাঁপানো শীত, বরফে ঢাকা পাইন বন, নেকড়ের ডাক আর মাটির গন্ধÑসব মিলিয়ে এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিবেশ তৈরি করেছেন লেখক।
‘হোয়্যার দ্য সি ইউজড টু বি’ উপন্যাসটি শুধু একটি ত্রিকোণ প্রেমের গল্প বা তেল আবিষ্কারের কাহিনী নয়। এটি এক গভীর দার্শনিক জিজ্ঞাসা। রিক ব্যাস প্রশ্ন তুলেছেন আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি নিয়ে। আমরা কি প্রকৃতির সাথে লড়াই করে, তাকে জয় করে বেঁচে থাকতে পারব? নাকি প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করেই আমাদের প্রকৃত মুক্তি?
উপন্যাসের শেষে কোনো সহজ সমাধান নেই। মেলকিয়রের জেদ, ওয়ালিসের রূপান্তর আর মার্গারিটের বন্য স্বাধীনতাÑসব মিলে এক জটিল মনোস্তাত্ত্বিক আবর্ত তৈরি করে। কিন্তু এই আবর্তের মাঝেও একটি জিনিস খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑপ্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই চলবে, আর মানুষকে শেষ পর্যন্ত সেই নিয়মের কাছেই মাথা নত করতে হবে।
যারা গভীর দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি, প্রকৃতির বন্য সৌন্দর্য এবং মানুষের মনোস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা উপন্যাস ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘হোয়্যার দ্য সি ইউজড টু বি’ একটি অবশ্য পাঠ্য গ্রন্থ। রিক ব্যাসের কাব্যিক গদ্য আর সূক্ষ¥ বর্ণনা পাঠকের মনে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে যায়। বইটি শেষ করার পরও সোয়ান উপত্যকার বরফ শীতল বাতাস আর নেকড়ের ডাক যেন মনের ভেতর অনুরণিত হতে থাকে।
লেখকের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি: রিক ব্যাস (জরপশ ইধংং)
রিক ব্যাস (জন্ম: ১৯৫৮) একজন মার্কিন লেখক এবং পরিবেশকর্মী, যিনি মূলত প্রকৃতি বিষয়ক তাঁর অনবদ্য লেখনীর জন্য পরিচিত। তাঁর জন্ম টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে। লেখালেখিতে আসার আগে তিনি একজন ভূতাত্ত্বিক হিসেবে তেলের সন্ধানে কাজ করেছেন, যা তাঁর ‘হোয়্যার দ্য সি ইউজড টু বি’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট তৈরিতে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।
১৯৮০—এর দশকের শেষের দিকে তিনি মন্টানার এক প্রত্যন্ত এবং বন্য অঞ্চল ইয়াক উপত্যকায় চলে যান। সেখানকার আদিম প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম তাঁর লেখনীর মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়, বরং এক জীবন্ত চরিত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
