ডায়াসপোরা ইউএসএ’র আয়োজনে হয়ে গেল || একটি মন জুড়ানো বর্ষবরণ অনুষ্ঠান
বাঙালী প্রতিবেদনঃ ডায়াসপোরা ইউএসএ’র এ বছরের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানি তে ছিল নানামাত্রিক চমক। সেই চমক কেবল নতুনত্বে বা নতুন নতুন আয়োজন দিয়ে মন ভরিয়ে দেয়ার কারণে নয়, অনুষ্ঠানের মানও ছিল শীলিত। বোঝা গেল প্রায় পাঁচ মাসের অনুশীলন ও প্র্যাকটিস এবং তার যথাযথ পরিবেশনার কারণেই এই মান তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
‘ও আমার দেশের মাটি’ নামের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটিতে যেমন পাওয়া গেছে ফেলে আসা দেশের মাটির গন্ধ, তেমনই সেই মাটি দিয়ে তৈরি ও এদেশে বড় হয়ে ওঠা (টিনএজার বা তার চেয়ে কিছুট বেশি) নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রায় অসাধারণ পরিবেশনার উৎকর্ষতা।
নতুন প্রজন্মের এই ঝলমলে পর্বের শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের ‘আহা আজি এ বসন্তে’র ইংরেজি ভার্সন গেয়ে। ইংরেজিতে মুখ ধরে শৌর্য সরকার, তারপরপর রাই সরকার ধরে বাংলায়। এর পরে কী অপেক্ষা করছিল শ্রোতা—দর্শকদের বুঝতে দেয়ার আগেই সদ্য প্রয়াত ক্ষণজন্মা শিল্পী আশা ভোসলেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে অনুশ্রী চক্রবতীর্ গেয় ওঠেন ‘ময়না বলো তুমি কৃষ্ণ রাধে’। সেই সুরের রেশ ধরে এরপর সরগম চৌধুরী কৃষ্টি ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে’ গেয়ে পুরো মিলনায়তনে জ্যোৎস্নার মত রোমান্টিক সুরের আলো ছড়িয়ে দেন। সরগম চৌধুরীর পরে প্রযুক্তা রায় গান লতার সেই চির নতুন ভুবনমোহিনী গান ‘বাঁশি কেন গায়..’। সুরে সুরে যখন জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের থিয়েটারে মধুর অনুরণন শ্রবণেন্দ্রিয়ে মায়াজাল বিস্তার করে চলেছে তখন অরুন্ধতি ভট্টাচার্য আরো এক সুরের মোমবাতি জ্বেলে দিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘তুমি না হয় রহিতে কাছে ..’ গেয়ে। এরপরের গানটি ছিল লতা মুঙ্গেশকরের ‘না মন লাগে না’, গাইলেন শ্রেয়া চৌধুরী। পাঁচ কিশোরীর সুরের অঞ্জলির মাঝে নতুন প্রজন্মের রুদ্রনীল দাস রুপাই অজয় চক্রবতীর্র ‘ঘুম আসে না’র মত রাগাশ্রয়ী গান গেয়ে সুরের রংধনু বিস্তৃত করলেন ইথারে। রুপাই গাইলেন আরো একটি গান, নজরুল সংগীত ‘গুল বাগিচায় বুলবুলি তুই’। রাগভিত্তিক এই গানটি গেয়ে তিনি যেন প্রস্তুত করলেন শ্রোতাদের পরবতীর্ এপিসোডের জন্য।
এই পর্বটির জন্য ডায়াসপোরা আবার প্রশংসিত হলো। এই ৬ নবীন শিল্পীদের তেমন মঞ্চে দেখা যায়নি আগে। এবার মঞ্চে এলেন দুই আমন্ত্রিত শিল্পী সানটুর এবং তবলা নিয়ে। তবলা এবং সানটুরের যুগলবন্দি বাজালেন ভিনে দেশাই ও অনুব্রত চ্যাটার্জি। ভিনে দেশাইএর সানটুরের সাথে অনুব্রত চ্যাটার্জির ৩৯ মিনিটের রাগ পুরিয়া পুরো থিয়েটারকে শ্বাসরুদ্ধকর আবহে মুগ্ধ করে রাখে। বিশেষ করে অনুব্রত চ্যাটার্জির তবলা মানুষ যতটা কানে শুনেছে, তার চেয়ে বেশি চাক্ষুষ করেছে তার হাতের দশ আঙুলের অসাধারণ ক্ষিপ্রতা। যারা জাকির হোসেনের তবলা বাদন দেখেছেন তারা অনুব্রতকে অবশ্যই কৃতিত্ব দেবেন। মারওয়া ঠাটে বাঁধা এই সান্ধ্য রাগ পুরিয়া কল্যাণের বিস্তার ৩৯ মিনিটব্যাপি হলেও মোহাবিষ্ট দর্শক—শ্রোতার কাছে তা দ্রুত শেষ হয়ে গেল বলে মনে হয়েছে।
ডায়াসপোরা ইউএসএ ব্যাপক আয়োজনের এই পর্যায়ে অনুষ্ঠান তখন ক্লাইমেক্সে। বাংলায় বললে তুঙ্গে। শিল্পীরা তখন তিন স্তরে মঞ্চে তৈরি গ্যালারিতে আসন গ্রহণ করছেন। এই সময় পাঁচ গুণীজনকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানালেন ডায়াসপোরার প্রাণপুরুষ ডা. প্রতাপ দাস। এঁরা হলেন মুক্তিযোদ্ধা—শিল্পী তাজুল ইমাম, প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোহাম্মদউল্লাহ, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ—অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আজিজুর রহমান খান, টরন্টো থেকে আসা বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভির স্বনামধন্য সংবাদ পাঠক আসমা আহমেদ ও ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আগত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও লেখক ড. দীপেন ভট্টাচার্য। তাদের উত্তরীয় পরিয়ে দেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। এই পর্বটি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সম্পন্ন না করলেও চলত। তবে এই পর্বে অধ্যাপক আজিজুর রহমান খান উপস্থিত থাকতে পারেননি।
এর পরের পর্বটিই এই বর্ষবরণের মূল অংশ। ২৫ জন শিল্পীর সমবেত কণ্ঠে গাওয়া বাছাই সঙ্গীত দিয়ে এই পর্বটি সাজানো হয় সুপ্রিয়া চৌধুরী, বিদিশা দেওয়ানজী ও দেবদাস চৌধুরীর ভাবনায় ও প্রশিক্ষণে এবং সংগীত পরিচালনায়। এই পর্বের সূচনা হয় ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ সমবেত কণ্ঠে গেয়ে। এরপর একে একে বাংলাদেশের ৫ অঞ্চলের পাঁচটি গান পরিবেশিত হয়, যথাক্রমে চট্টগ্রামের ‘বাঁশখালি মহিষখালি’, রংপুরের ‘ও কি ও বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে’, সিলেটের ‘আমার বন্ধু দয়াময়’, ময়মনসিংহের ‘সাঁঝের বেলা আইসা ঘাটে গো’, কুষ্টিয়ার (লালনগীতি) ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’। এর পর বাংলার লোকসংগীতের দুই প্রবাদ পুরুষ আবদুল আলীম ও আব্বাসউদ্দিনের চারটি গান ছোট করে গেয়ে পরিবেশ পাল্টাতে থাকে। আসে প্রতিজ্ঞা (মোরা সত্যের পরে মন আজি করিব সমর্পন), মাটিতে ফেরা (ফিরে চল মাটির টানে), প্রতিবাদ (সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে), আহবান (ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি এখানে থেমো না), সাহস জোগানো (নাই নাই ভয় হবে হবে জয়) এবং পথে নামার ডাক (পথে এবার নামো সাথী পথেই হবে পথ চলা)।
এই আলেখ্যের মাঝে মাঝে ছিল নাচ এবং আবৃত্তি। ছিল ধারা বর্ণনা। কিন্তু বাংলাদেশের আঞ্চলিক লোকসংগীতও যে গণসংগীতের মত কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সম্মেলক কণ্ঠে তালে লয়ে উজাড় করে, শ্রোতাদের মর্মস্পশীর্ করে গাওয়া যায় তা প্রমাণ করলেন শিল্পীরা।
এর পরের পর্বে ছিল হিমাদ্রি রায়ের আবৃত্তি এবং মহীতোষ তালুকদার তাপসের পরিচালনায় অনানুষ্ঠানিক গান। শুরুতে দুপুরে ছিল শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা। এতে প্রায় ৬০টি শিশু অংশ নেয়। বিকেলে জেপ্যাক প্রাংগনে ছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে বর্ণাঢ্য এই মঙ্গল শোভাযাত্রায় উপস্থিত বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি নিবেদিত সকলে অংশ নেন। প্রাংগনে ছিল বেশ কিছু স্টল।
ডায়াসপোরা ইউএসএ আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগীতে অংশ নেন অনুপ দাশ, অনুশ্রী চক্রবতীর্, অপরাজিতা কর, অরুণদ্যুতি ভট্টাচার্য, বিদিশা দেওয়ানজী, সুপ্রিয়া চৌধুরী, ছন্দা নন্দী, ডি. চৌধুরী অসিত, দেবদাস চৌধুরী, দেবযানী দাশগুপ্তা, দীপায়ন চৌধুরী, ইরামনি দেবী, জয়দীপ বড়–য়া, মিলাদুন এ্যানি, পিংকি চৌধুরী, প্রযুক্তা রায়, প্রবাল চৌধুরী, রাই সরকার, শুভাশিষ বড়–য়া, তুলিকা চৌধুরী। নৃত্য পরিবেশন করেন অনিন্দিতা ভট্টাচার্য, অনুসূয়া নাথ, দেবারতী চৌধুরী, মিম দে শ্রাবণী, অন্তরা দে চৌধুরী ও রিমঝিম দাশ। আবৃত্তি ও ধারাভাষ্যে ছিলেন গোলাম সারওয়ার হারুন, গাগীর্ মুখার্জি ও সাবিনা শারমিন।
তবলায় সংংগত করেন দেবু চৌধুরী, গিটারে ছিলেন অভিজিত চক্রবতীর্ জিতু, অক্টোপ্যাডে তুষার রঞ্জন দত্ত। মন্দিরায় শহীদ উদ্দিন। এই অনুষ্ঠানে কোনো কীবোর্ড ছিল না। হারমোনিয়াম এবং গিটরের অপূর্ব বাদন সংগীত মূর্ছনায় মাধুর্য ছড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে কখনোই যন্ত্র সংগীত কণ্ঠ ছাপিয়ে যায়নি।
থিয়েটারের ভেতর অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সৌগত সরকারের বাজানো বাঁশিতে ধুন দিয়ে। তিনিই বাঁশির মোহন সুরে দর্শক েশ্রোতাদের মন ও মেজাজ উষ্ণ করে তোলেন।
পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সাবিনা শারমিন। তবে শুরুতে তার সাথে ছিলেন এজাজ আলম।
