তেলের বাইরেও হরমুজের তান্ডব || ড. জীবন বিশ্বাস
মানচিত্রের দিকে তাকালে হরমুজ প্রণালীকে মনে হয় প্রকৃতির আঁকা এক সরু তুলির টান। পারস্য উপসাগর আর ওমান উপসাগরের মাঝখানে এই যে সামান্য একটু জলপথ, একে সচরাচর বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অয়েল চোক—পয়েন্ট’ বা তেলের শ্বাসরূদ্ধকর কেন্দ্রবিন্দু বলা হয়। বর্ণনাটি নির্ভুল সন্দেহ নেই, কিন্তু বর্তমানের রুক্ষ বাস্তবতায় তা বড্ড সেকেলে আর অপূর্ণ। সংকট এখন আর কেবল তেলের পিপেতে সীমাবদ্ধ নেই; তা ডালপালা মেলে এক বিশাল কাঁচামাল—সংকটের মহীরুহে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই সংঘাত বৈশ্বিক তেলবাজারের ইতিহাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় সরবরাহ—বিঘ্ন ঘটিয়েছে। আর আইএমএফ, আইইএ এবং বিশ্বব্যাংক সমস্বরে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেÑএর অভিঘাত বৈশ্বিক, বৈষম্যমূলক এবং যা ইতিমধ্যেই সার, খাদ্যনিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর আছড়ে পড়ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই প্রণালী দিয়ে দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের এক—পঞ্চমাংশ চলাচল করে। কিন্তু সংকটের এই অবেলায় জ্বালানি—প্রবাহের সেই ছন্দের সঙ্গে সঙ্গে এক সুবিশাল বিশ্ব—শিল্পব্যবস্থাও আজ মরণকামড়ে বিপর্যস্ত। এই সরু জলপথের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গভীরতর অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ বিশ্লেষণ করাই আজকের উপসম্পাদকীয়র মূল অন্বেষণ।
নীতিনির্ধারকেরা হরমুজকে যদি কেবল তেল—নিরাপত্তার চশমা দিয়ে দেখেন, তবে তাঁরা রোগ নির্ণয়ে মস্ত ভুল করবেন। এটি এখন আর কেবল খনিজ সম্পদের প্রশ্ন নয়, বরং এটি বিশ্বজনীন সরবরাহ—শৃঙ্খল ও শিল্পনীতির এক জটিল গোলকধাঁধা। সত্তরের দশকের সেই ধ্রুপদী তেল—সংকটের সঙ্গে বর্তমানের তফাত আকাশ—পাতাল। রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, বর্তমান ধাক্কা একযোগে অপরিশোধিত তেল, গ্যাস, পরিশোধিত জ্বালানি এবং কৃষির প্রাণভোমরা ‘সার’—সবকিছুকেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। ফলে এর বিষক্রিয়া কেবল গাড়িচালক বা বিদ্যুৎবিলে আটকে থাকে না; তা অলক্ষ্যে পৌঁছে যায় কৃষকের লাঙলের ডগায়, ধাতু গলানোর চুল্লিতে, সূক্ষ¥ সেমিকন্ডাক্টর চিপ—উৎপাদনে, প্লাস্টিক, বস্ত্র এবং আধুনিক ব্যাটারি—শিল্পের অন্দরমহলে। বর্তমান সংকটটি আসলে বিশ্বায়নের সেই ভঙ্গুরতাকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করেছে, যেখানে এক সরু সমুদ্রপথের ওপর অতিনির্ভরশীলতা পুরো পৃথিবীকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তেল—বহির্ভূত ঝুঁকির মানচিত্রটি এখন আয়নার মতো পরিষ্কার। সাম্প্রতিক এক পণ্য—বিশ্লেষণে নয়টি ‘প্রেশার পয়েন্ট’ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা আধুনিক সভ্যতার অন্তর্লীন স্থাপত্য। ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়া সার, সালফার, মিথানল, গ্রাফাইট, অ্যালুমিনিয়াম, হিলিয়াম, মনোইথিলিন গ্লাইকোল, লৌহ আকরিক এবং উদীয়মান সবুজ হাইড্রোজেন অবকাঠামোÑএগুলো কোনো শৌখিন পণ্য নয়। আমাদের অন্ন সংস্থান থেকে শুরু করে হাতের স্মার্টফোন, পরনের কাপড় কিংবা ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব এনার্জিÑসবকিছুর চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই নামগুলোর আড়ালে। হরমুজ যখন সংকুচিত হয়, বিশ্ব তখন কেবল ব্যারেল ভর্তি তেল হারায় না, হারায় তার চিরায়ত শিল্প—ছন্দ।
সারের উদাহরণটি এখানে সবচেয়ে করুণ ও স্পষ্ট। কারণ, জাহাজ চলাচলের এই বিঘ্ন সরাসরি আগামী দিনের ফসলের সঙ্গে এক অশুভ গাঁটছড়া বাঁধে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে সার রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। আর ইউরিয়ার ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা তো রীতিমতো ভীতির উদ্রেক করেÑবিশ্ববাণিজ্যের প্রায় ৪৬ শতাংশের উৎস এই অঞ্চল। রয়টার্স জানাচ্ছে, বৈশ্বিক সার—বাণিজ্যের এক—তৃতীয়াংশ হরমুজ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এপ্রিলের শুরুতেই পশ্চিম ইউরোপে ইউরিয়ার দাম যুদ্ধের আগের তুলনায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য সংস্থার প্রধানের সেই সতর্কবাণী মনে রাখা জরুরিÑএই ঘাটতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক জীবন—মরণ সমস্যা। অর্থাৎ, আজকের এই পণ্য—সংকট কয়েকমাস পরেই থালার ভাতের অভাব হয়ে ফিরে আসবে।
আবার সালফার ও গ্রাফাইটের দিকে তাকালে দেখা যায়, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির রঙিন স্বপ্নগুলোও আজ ফিকে হতে বসেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেক সালফার এই প্রণালী দিয়ে যায়, যা সালফিউরিক অ্যাসিডের মূল ভিত্তি। এটি একদিকে যেমন সার তৈরিতে লাগে, অন্যদিকে ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য প্রয়োজনীয় নিকেল—কোবাল্ট প্রক্রিয়াজাতকরণে অপরিহার্য। গ্রাফাইটের সংকটটি আরও বিচিত্র। সিন্থেটিক গ্রাফাইট তৈরি হয় পেট্রোলিয়াম কোক থেকে, যা তেল শোধনের এক উপজাত মাত্র। জ্বালানির দাম বাড়লে শোধনাগারগুলো অধিক মুনাফার পণ্যে মনোযোগ দেয়, ফলে এই গ্রাফাইট তৈরির কাঁচামাল অমিল হয়ে পড়ে। ফলাফল? বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারির দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়া।
মিথানল ও মনোইথিলিন গ্লাইকোল (এমইজি) আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা রসায়ন। বৈশ্বিক মিথানল বাণিজ্যের এক—তৃতীয়াংশ হরমুজের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন টন এমইজি রপ্তানি হয়েছে, যা বস্ত্র ও প্যাকেজিং শিল্পের মেরুদন্ড। এর প্রভাব কোনো তাত্ত্বিক কথা নয়; সরবরাহ কমলে রেজিন, প্লাস্টিক আর সিন্থেটিক তন্তুর দাম বাড়ে। ফলে চীন, ভারত, পাকিস্তান কিংবা ভিয়েতনামের মতো উৎপাদনমুখী দেশগুলোর জন্য এটি আর কোনো দূরবর্তী ভূ—রাজনৈতিক দাঙ্গা নয়, বরং তাদের খোদ উৎপাদন—ব্যবস্থার ওপর এক মরণাঘাত।
ধাতুশিল্পের দিকে তাকালে অ্যালুমিনিয়ামকে এক গভীর ট্র্যাজেডি বলে মনে হয়। রয়টার্সের ভাষ্যমতে, বৈশ্বিক প্রাথমিক অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহের প্রায় ৯ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ১৬ এপ্রিল এর দাম টনপ্রতি ৩,৬৭২ ডলারে পৌঁছে চার বছরের রেকর্ড ভেঙেছে। মারকুরিয়া অনুমান করছে, বছরের শেষে প্রায় ২০ লক্ষ টনের এক বিরাট ঘাটতি দেখা দেবে, যেখানে মজুত আছে মাত্র ১৫ লক্ষ টন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের এক বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্যের এই ধাতুর ওপর নির্ভরশীল। এর সঙ্গে যদি ইস্পাতশিল্পের কাঁচামাল লৌহ আকরিকের ওপর চাপ যোগ করা হয়, তবে বোঝা যায়Ñএটি কেবল তেলের দাম বাড়ার মামলা নয়, বরং গোটা উৎপাদন—ব্যবস্থার ওপর আরোপিত এক অলিখিত দন্ড।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো হিলিয়ামের উদাহরণটি। এটি একাধারে আধুনিক প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্পর্শকাতর বন্ধু। ২০২৫ সালে কাতার বৈশ্বিক হিলিয়াম সরবরাহের প্রায় এক—তৃতীয়াংশ উৎপাদন করেছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সরবরাহ বিঘ্নিত হলে প্রতি মাসে বাজার থেকে ৫.২ মিলিয়ন ঘনমিটার হিলিয়াম উবে যাবে। অথচ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে কিংবা এমআরআই যন্ত্রের সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক ঠান্ডা রাখতে তরল হিলিয়ামের বিকল্প নেই। ট্যাঙ্কার আর তেলের দামে শুরু হওয়া এক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চিপ উৎপাদন আর মুমূর্ষু রোগীর রোগনির্ণয়কেও অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
নবম ও চূড়ান্ত ‘প্রেশার পয়েন্ট’টি হলো গ্রিন হাইড্রোজেন অবকাঠামো। এটি আগামী দিনের এনার্জির উৎস। উপসাগরীয় অঞ্চল নিজেকে এক সবুজ হাইড্রোজেন কেন্দ্র হিসেবে গড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল। কিন্তু অস্থিরতার এই বিষবাষ্প যদি জাহাজ চলাচল ও বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্যতা নষ্ট করে দেয়, তবে জ্বালানি—রূপান্তরের গতিও মন্থর হয়ে পড়বে। আইএমএফ সতর্ক করেছে যে, এই সংকটে আরও কয়েক কোটি মানুষ ক্ষুধা বা মন্বন্তরে আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্ব আজ বাধ্য হচ্ছে স্থিতিস্থাপকতা আর বহুমুখীকরণের নতুন পথ খুঁজতে। হরমুজ আর কেবল তেলের ব্যারেল গোনার জায়গা নয়; এটি এখন এমন এক সংকীর্ণ জলপথ, যেখানে পৃথিবীর খাদ্যনিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতা আর কার্বনমুক্ত ভবিষ্যতের ভাগ্যলিপি বাস্তব সময়ে প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে।
ধ্বংসের নেশায় মত্ত ওই রক্তপিপাসু রণ—দানবদের পাশবিক দম্ভ চূর্ণ হোক। তাদের কামানের নলে মরচে ধরুক আর হৃদয়ে জন্ম নিক অনুশোচনার সেই বিরল বোধ, যা মৃত্যুকে জয় করে প্রাণের জয়গান গায়।
