গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— সাত সুরের নিঃসঙ্গ সম্রাট কমল দাশগুপ্ত

গ্রামোফোন রেকর্ডের সেই অদ্ভুত ঘড়ঘড়ে আওয়াজের ভেতর দিয়ে যখন কোনো সুর হঠাৎ তীরের মতো এসে বুকে বেঁধে, তখন বুঝতে হবে সেখানে কোনো এক সুরের জাদুকরের আত্মার ছোঁয়া আছে। তিনি কমল দাশগুপ্ত। তাঁকে সুরের জাদুকর না বলে সুরের সম্রাট বলাই যথাযথ। বাংলা গানের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ আর নজরুলের পরবর্তী সিংহাসনটি যদি কারো জন্য শূন্য থাকে, তবে সেখানে অতি সন্তর্পণে বসিয়ে দেওয়া যায় এই মানুষটিকে। তিনি সুরের কারিগর ছিলেন না, ছিলেন সুরের স্থপতি। নিভৃতচারী এই সুরসম্রাটের সুরারোপিত গান করেননি বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগ, ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৬০ সালের শেষপ্রান্তের এমন কোন শিল্পী বোধহয় নেই। তাঁর সেই গাণিতিক বিশুদ্ধতায় ভরা সুরের জগতে প্রবেশ করেনি এমন বোদ্ধা শ্রোতাও বোধ হয় নেই। অত্যন্ত মেধাবী এই সুরসম্রাট বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৩ সালে ডক্টরেট অব মিউজিক ডিগ্রী লাভ করেন। নড়াইল জেলার কালিয়া জনপদের বেন্দা গ্রামে ১৯১২ সালের ২৮ জুলাই তাঁর জন্ম হয় এবং ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় মাত্র ৬২ বছর বয়সে তিনি প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় পরলোকগমন করেন।

সুরের গাণিতিক আভিজাত্য

কমল দাশগুপ্তের গায়কির চেয়েও তাঁর সুরারোপিত গানগুলো বাঙালির মজ্জায় বেশি মিশে আছে। তাঁর সুর ছিল অনেকটা জটিল জ্যামিতিক নকশার মতোÑএকদিকে নিখুঁত ভারসাম্য, অন্যদিকে এক অভাবনীয় মায়াবী বিস্তার। তিনি যখন কোনো গানের কাঠামো তৈরি করতেন, তখন সেখানে আবেগের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেত সুরের বিশুদ্ধতা। তাঁর গায়কী এবং সুরের চলন সমকালীন অন্য যে কারো চেয়ে তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। তিনি জানতেন সুরকে কীভাবে রাজকীয় গাম্ভীর্য দিতে হয়, আবার কীভাবে তাকে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাসে পরিণত করতে হয়।

নজরুলের অবিনাশী সুরসারথি

কমল দাশগুপ্তের কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে চলে আসে কাজী নজরুল ইসলামের নাম। নজরুলের অজস্র কালজয়ী গানে সুরের যে কাঠামো আমরা আজ শুনি, তার পেছনে এই মানুষটির অবদান অসামান্য। নজরুলের বিদ্রোহ আর কমল দাশগুপ্তের সুরের আভিজাত্যএই দুইয়ের মিলনে বাংলা গান এক নতুন দিগন্ত খুঁজে পেয়েছিল। নজরুলের সব ধারার গানগুলোতেই তিনি যে সুরের আবহ তৈরি করেছিলেন, তা আজও বাঙালির কাছে এক আত্মিক সম্পদ। তিনি ছিলেন সেই শিল্পীসুরকার, যিনি নজরুলের গীতিকবিতাগুলোকে সুরের আকাশে অনন্ত মুক্তি দিয়েছিলেন। তিনি নজরুলের প্রায় পাঁচশত গানে সুরারোপ করেন। এর বাইরে তিনি আট হাজারেরও অধিক গানে সুরারোপ করেন।

যূথিকা রায় এক রোমান্টিক মহাকাব্য

কমল দাশগুপ্তের সুর মানেই যেন যূথিকা রায়ের কণ্ঠ।আমি ভোরের যূথিকা’—প্রণব রায়ের কথায় কমল দাশগুপের সুরে শিল্পী যুথিকা রায়ের গাওয়া এই গানটির সেই ম্লান অথচ গভীর বিষাদ আজও আমাদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। কমল দাশগুপ্ত জানতেন কণ্ঠের সীমা কোথায় এবং সুরকে কোথায় নিয়ে গেলে তা অমরত্ব পায়। তাঁর সুরে এক ধরনের নাগরিক আভিজাত্য ছিল, যা তৎকালীন শিক্ষিত সমাজের ড্রয়িংরুমে এক নতুন রুচির জন্ম দিয়েছিল। তিনি কেবল গান তৈরি করেননি, তিনি এক বিশেষ ঘরানার শ্রোতাও তৈরি করেছিলেন। তাঁর সুরে ভজন, গজল আর আধুনিক গানের যে অপূর্ব সংমিশ্রণ ছিল, তা আজকের এই ডিজিটাল যুগেও এক বিস্ময়।

জীবনবোধ এক নিঃসঙ্গ অভিমান

কমল দাশগুপ্তের ব্যক্তিজীবন ছিল অনেকটা তাঁর সুরের মতোই গভীর এবং বেদনাবিধুর। ১৯৫৫ সালে তৎকালিন সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি শিল্পী ফিরোজা বেগমকে বিয়ে করেন। কিংবদন্তী সুরকার কমল দাশগুপ্ত স্ত্রীপুত্র সহ ১৯৬৭ সালে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জীবনের শেষ ভাগে তিনি যে নীরবতা আর নিঃসঙ্গতাকে বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল এক অভিমানী শিল্পীর নীরব প্রতিবাদ। তিনি ছিলেন এমন এক সুরসাধক, যিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতেই ভালোবাসতেন। তাঁর গানে যে বিষাদ দেখা যায়, তা কোনো সস্তা বিরহ নয়তা ছিল এক দার্শনিক শূন্যতা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সুর কেবল আনন্দের খোরাক নয়, সুর হলো আত্মার মুক্তির পথ। তিনি যখন ঢাকা আর কলকাতার মাঝখানে নিজের অস্তিত্বকে ভাগ করে নিলেন, তখন তাঁর সেই বিচ্ছেদবেদনাও সুর হয়ে ঝরে পড়েছে তাঁর কাজে। তাঁর গানের সুরে এখনও অন্তত কিছুক্ষণের জন্য হলেও শ্রোতারা ফিরে যাবেন সেই দিনগুলোতে, যেখানে জীবনের মানে খোঁজা হতো গানের ভেতর দিয়ে।

কমল দাশগুপ্তের বিখ্যাত কয়েকটি গান

১। তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন, ২। ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে, ৩। যেথা গান থেমে যায়, ৪। আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, ৫। মেনেছি গো হার মেনেছি, ৬। কতদিন দেখিনি তোমায়, ৭। এমনি বরষা ছিল সেদিন, ৮। সেদিন নিশীথে বরিষণ শেষে, ৯। জানি জানি গো মোর শূন্য হৃদয় দেবে ভরে, ১০। গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙে যায়, ১১। তুমি হাতখানি যবে রাখ মোর হাতের পরে, ১২। এই কি গো শেষ দান, ১৩। পৃথিবী আমারে চায়, ১৪। আমি বনফুল গো, ১৫। আমি চাঁদ নহি অভিশাপ, ১৬। আমি ভুলে গেছি তব পরিচয়, ১৭। শাওন রাতে যদি, ১৮। বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে, ১৯। প্রভাত বীণা তব বাজে, ২০। তোমারি তরে মোরা বাউল সেজেছি, ২১। যদি আপনার মনে মাধুরী মিশায়ে, ২২। তুমি এসেছিলে জীবনে আমার, ২৩। দুটি পাখী দুটি তীরে, ২৪। ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখে, ২৫। চরণ ফেলিও ধীরে ধীরে।

পরিশেষ

কমল দাশগুপ্তের নাম হয়তো আজকের প্রজন্মের কাছে কিছুটা আবছা হয়ে এসেছে, কিন্তু তাঁর সুর আজও আমাদের বাঙালির মনের গভীরে পরশ বুলিয়ে যায়। তিনি ছিলেন সেই প্রদীপ, যা নিজে নিঃশব্দে জ্বলেছে কিন্তু চারপাশকে সুরের আলোয় ভাসিয়ে দিয়েছে। সুরের এই স্থপতি আমাদের শিখিয়েছেন যে, সস্তায় মানুষের মন জয় করা সহজ, কিন্তু মানুষের আত্মার গভীরে স্থায়ী আসন করে নিতে গেলে সাধনা আর মেধার কোনো বিকল্প নেই। সুরের এই নিঃসঙ্গ সম্রাট আমাদের মাঝে বেঁচে থাকুন তাঁর সেই গাণিতিক বিশুদ্ধতা আর মখমলি সুর নিয়ে। যতদিন বাংলা গান থাকবে, যতদিন নজরুলের গানের রেশ আমাদের কানে বাজবেততদিন কমল দাশগুপ্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন। কমল মানে কেবল একটি নাম নয়, কমল মানে এক অবিনাশী সুরের সাম্রজ্য, যা সময়ের ধুলোয় ঢাকা পড়েও তার উজ্জ্বলতা হারায় না।

Related Posts