তাহাদের কথা পর্ব ২৭ তবুও ভালোবাসিঃ শ্যাডো চাইল্ড (দ্বিতীয় পর্ব) || পরাগ সঞ্চিতা, কানেকটিকাট
সৃষ্টিকর্তার কি লীলা খেলাÑ লেসলির মা লেসলির চোখের সামনে হাসপাতালের বেডে শুয়ে যখন মারা যাচ্ছিলেন লেসলি ঘুণাক্ষরেও তখন বুঝতে পারেনি, চেনেনি কে এই মহিলা! লেসলির ছোট বোন লিন্ডা জলপ্রপাতের মতো গড়গড় করে বলতেই থাকলো ঘটনা কোন দিকে মোড় নিলো, এর পরে কি ঘটলো। লিন্ডার বর্ণনা থেকে জানলাম যে ওদের বাবা যখন কোমরের হাড় ভেঙে ম্যানচেস্টার হসপিটালে ভর্তি ছিলেন তখন সেই একই কেবিনে ওর বাবার পাশের বেডে লেসলির জন্মদাত্রী আপন মা সিনথিয়া ক্যান্সারে ভুগে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলেন। এর আগে লেসলি কখনো ওর আপন মাকে দেখেনি। এই প্রথম লেসলি ওর আপন মায়ের মুখোমুখি দাঁড়ালো, দেখলো, কিন্তু মা—মেয়ে দুজনে কেউ কাউকে চিনলো না, জানলো না ওদের নাড়ির সম্পর্কের কথা। শুধু সৌজন্যতার খাতিরে একজন আরেক জনকে হাই হ্যালো বলেছে, লেসলি সমবেদনা জানিয়েছে, ব্যস এইটুকুই।
লিন্ডা এ পর্যন্ত বলে দম নিলো। আমি আর কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তাহলে কিভাবে ঘটনা প্রকাশ পেল যে উনিই লেসলির জন্মদাত্রী মা?’ লিন্ডা আবার শুরু করলো, ‘সেই ঘটনাই তো তোমাকে বলছি যে কিভাবে সত্য প্রকাশ পেল।’ লিন্ডার কথা থেকে জানলাম যে লেসলির মা সিনথিয়া খুব ছোট বয়সে, মানে যখন পনেরো বছর বয়সের টিনএজার ছিলেন তখন অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন। লেসলির নানা—নানি পনেরো বছরের মেয়ের দুর্নাম ঢাকতে লেসলির জন্মের সাথে সাথে সরকারি এডাপশন এজেন্সিতে ওকে দিয়ে দেন। এদিকে লেসলির পালিত বাবা—মা নিজেদের বাচ্চা হচ্ছিলো না বলে অনেকদিন ধরে একটি নবজাতক শিশু এডাপশন বা দত্তক নেবার জন্য সেই এজেন্সিতে ওয়েটিং লিস্টে অপেক্ষা করছিলেন। উনারা সেই এজেন্সি থেকেই লেসলিকে দত্তক নেন বা এডপ্ট করেন। লেসলির নানা—নানী ওর জন্ম—মা টিন এজার সিনথিয়াকে এডাপশনের কোনো তথ্য জানতে দেননি। লেসলির নানা—নানিও লেসলির সাথে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখতে চাননি, যোগাযোগ রাখেননি। যদিও উনারা জানতেন কে বা কারা শিশুটিকে এডপ্ট করেছিল।
তো যা বলছিলাম, সেই হাসপাতাল কেবিনে লেসলির আপন মা সিনথিয়া যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন একই কেবিনের আরেকটি বেডে লেসলির পালিত বাবা অসুস্থ হয়ে চিকৎসার জন্য ভর্তি ছিলেন। সেই সময় লেসলি ওর পালিত মা আর বোনের সাথে অসুস্থ বাবাকে দেখতে গিয়েছিল। এই মৃত্যুর খবর হাসপাতালের গন্ডি থেকে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়লো। খোঁজ পড়লো কে এই মহিলা? লেসলির নানা—নানির খুব ঘনিষ্ট দু—চার জন বয়স্ক প্রতিবেশী বন্ধুরা ঠিকই জানতো লেসলিকে কে বা কারা এডপ্ট করেছিল। সেই হতভাগী মায়ের মৃত্যুর পরে ম্যানচেস্টারের মতো ছোট্ট মফস্বল শহরে এক কান দু কান করে জানাজানি হয়ে যায় লেসলির আপন মায়ের জীবন বৃত্তান্ত, আর লেসলির সাথে সম্পর্ক, নাম—ঠিকানা—পরিচয়। কয়েক দিন পরে লেসলির বোন বাউন্ডুলে উড়নচন্ডী লিন্ডা পাড়া—প্রতিবেশী আর বন্ধু—বান্ধবের কাছ থেকে খবর নিয়ে এলো যে হসপিটালে সিনথিয়া নামের মধ্য—বয়সী যে মহিলাটি ক্যান্সারে মারা গেছে—— সে আর কেউ না, সেই ছিল লেসলির জন্মদাত্রী মা, যে মা এতদিন আড়ালে ছিল। ধীরে ধীরে রহস্য উন্মোচন হয়ে পরিচয় বেরিয়ে পড়লো! আরো জানা গেল যে লেসলির জন্ম—মা সিনথিয়ার বিয়ের পর একটি ছেলে আর একটি মেয়ে হয়েছিল, হাসপাতালে লেসলির সাথে ওদেরও দেখা হয়েছে, কিন্তু তখন কেউ পরিচয় জানতো না। মেয়েটির নাম রেচেল, ছেলেটির নাম রেমন্ড। রেচেল আর রেমন্ডের অর্থাৎ লেসলির বোন আর ভাই লেসলির খোঁজ পেয়ে ওর সাথে যোগাযোগ শুরু করে। লেসলি আমাকে রেচেলের কথা কয়েকবার বলেছে, কিন্তু ও কখনো বলেনি কিভাবে ওর বোনের সন্ধান পেয়েছিলো, যা আমি আজ লিন্ডার গল্প থেকে জানলাম।
যে লেসলিকে আমি চিনি তার সাথে এই লেসলির তেমন কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছিনা। আজকে হার্টফোর্ড কোর্টে লিন্ডার সাথে দেখা না হলে আমি জানতেও পারতাম না লেসলির ছোট বোন লিন্ডার কথা। গত তিন বছরে লেসলি আমাকে কখনো লিন্ডার কথা বলেনি। আমি ধরেই নিয়েছিলাম লেসলির পালিত বাবা—মায়ের লেসলি ছাড়া আর কোনো ছেলেমেয়ে ছিলনা। মনে মনে ভাবলাম কি কারণে লেসলি ওর ছোট বোনের কথা আমার কাছে গোপন করেছে? লিন্ডা বোন হিসেবে লেসলিকে যতটা ভালোবেসেছে লেসলি হয়তো লিন্ডাকে ততটা ভালোবাসতে পারেনি। অথবা হয়তো লেসলি জানতো ওর মানসিক ব্যাধি কিভাবে ওর পালিত বাবা—মাকে বিধস্ত করে তুলেছিল, আর ওদের শক্তি এতটাই নিঃসরণ করেছিল যে ওর ছোট বোনটি বাবা—মায়ের মনোযোগ আর আদর থেকে বঞ্চিত হয়েছে। হয়তো এজন্যই লেসলির মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ লুকিয়ে আছে। তাই ছোট বোনের কথা প্রকাশ করেনি। আজকে আমার সাথে কথা বলতে বলতে বেচারা লিন্ডা বার বার বলেছে ‘আমি ছিলাম ছায়া—সন্তান, আমি আমার বোনের ছায়ায় বাবা মায়ের অবহেলায় বেড়ে ওঠা এক হতভাগা সন্তান’। লিন্ডা মাত্র সতেরো বছর বয়সে ওর বাবা মায়ের অবহেলাতে অভিমান করে বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যায়। এর পরে আর কখনো বাড়ি ফেরা হয়নি লিন্ডার। লিন্ডা ইউএস নেভিতে যোগ দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, বিয়ে করে স্বামী সন্তান নিয়ে ফ্লোরিডাতে স্থায়ী হয়েছে। এদিকে কানেকটিকাটে লেসলি আর লিন্ডার বাবা পক্ষাগাতে মারা যান, আর ওদের বৃদ্ধা মা কানাডাতে চলে যান। কানাডার নিউ ব্রান্সউইক উনার জন্মভূমি, এখনো উনার ভাই বোন, আত্মীয় স্বজনরা ওখানে রয়ে গেছে। পরিবার পরিজনের কাছাকাছি থাকার জন্য তিনি বিরাশি বছর বয়সে কানেকটিকাটের পাট চুকিয়ে শেষ ঠিকানা হিসেবে নিউ ব্রান্সউইকের একটি নার্সিং হোমে মুভ করেছেন। এই পালিত মা লেসলিকে অতি আদরে পেলে—পুষে বড় করেছেন। সারা জীবন লেসলিকে নিজের মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। এমনকি কানাডাতে যাবার সময় বাড়ি বিক্রি করে যে মোটা অংকের অর্থ পেয়েছেন তার প্রায় পুরোটাই লেসলির জন্য ব্যাংকে রেখে গেছেন। যেন মানসিক অসুস্থতার কারণে জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে পড়া লেসলির কোনো অর্থ কষ্ট না থাকে। প্রকৃত পক্ষে এই পালিত মা’ই লেসলির আসল মা।
হয়তো শৈশব থেকেই জন্ম—দাত্রী মায়ের অনুপস্থিতি আর পালিত পরিবারের পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা করতে গিয়ে লেসলির শিশু মনে যে উদ্বেগ আর চাপা রাগ সৃষ্টি হয়েছিল তার কারণেই পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ওর মধ্যে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার উপসর্গগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। আর যে কারণে লেসলি ছোট বোনের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। অন্যদিকে এতো কিছুর পরেও সুদূর ফ্লোরিডার মায়ামি থেকে ফ্লাই করে বোনের জন্য সাক্ষী হয়ে কোর্টে হাজিরা দিতে চলে এসেছে লিন্ডা। সেই বোনের জন্য যে কিনা বাবা—মায়ের সবটা আদর ভালোবাসা দখল করে নিয়েছিল। বাবা মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত লিন্ডা মিষ্টি হেসে বলেছে ‘আমি আমার বোনকে তবুও ভালোবাসি, অনেক ভালোবাসি। যদি আমার সাক্ষীতে ওর ডিসএবিলটি বেনিফিট কেস জোরালো হয় তবে আমার বোনটার উপকার হবে, তাই না এসে পারিনি’। এভাবেই আমরা সব ভুলে গিয়ে তবুও ভালোবাসি, আর এই ভালোবাসাই আমাদের বেঁধে রাখে সম্পর্কের সুতোতে, সে সুতো ধরে আমরা পথ চলি, বেঁচে থাকি। দীর্ঘ সতেরো বছর পরে দুই বোনের সাক্ষাৎ নিজের চোখে দেখার জন্য আমি কোর্ট রুমে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
কানেকটিকাট
