বাংলাদেশে যাচ্ছে না নতুন অর্ডার || পোশাকখাতে বাজার হারানোর শংকা

বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃদিনে দশ ঘণ্টা কারখানা চালু থাকে। এর মধ্যে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না, লোডশেডিং এতটাই বেড়েছে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন সাভারের আশুলিয়া এলাকার একটি পোশাক কারখানার পরিচালক সঞ্জয় কুমার।

মি. কুমার প্রায় এক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি করে আসছেন। তিনি বলছিলেন, রপ্তানির বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করাটা যেমন জরুরি, তেমনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যগুলো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

সেজন্যই বিদ্যুৎ না থাকলেও আমরা কাজ বন্ধ রাখতে পারি না। জেনারেটর দিয়ে হলেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়,’ বলেন মি. কুমার।

কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে জেনারেটর চালানোর জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেটি জোগাড় করা মোটেও সহজ কোনো ব্যাপার নয়।

ডিজেলের জন্য ছুটতে হচ্ছে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

তারপরও জেনারেটর চালানোর জন্য অনেক সময় যথেষ্ঠ পরিমাণ ডিজেলও পাচ্ছি না। ফলে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে,’ বলেন আরেক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাঈদ হাসান।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিদ্যুৎ জ্বালানি সংকটের কারণে এভাবে কাজ বন্ধ রাখায় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

এনার্জি ক্রাইসিসের কারণ সার্বিকভাবে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে আমরা ধারণা করছি,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মালিকদের সংগঠনবাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর গত টানা আট মাস ধরে পোশাকখাতে রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত মার্চে বাংলাদেশ প্রায় ২৮১ কোটি মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের মার্চের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম।

সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দুই হাজার ৮৫৮ কোটি মার্কিন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে পাঁচ দশমিক ৫১ শতাংশ কম।

এর মধ্যে জ্বালানি সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামনের মাসগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানির হার আরও কমে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিজিএমইএ।

বেড়েছে অন্য খরচও

জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি পোশাকখাতে কাঁচামাল, পরিবহন ব্যয় সহ আরও অনেক খরচ বেড়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

এর মধ্যে বিদেশ থেকে যে কটন বা তুলা আমদানি করা হয়, সেটার দাম প্রতিকেজিতে ৬০ সেন্টস বা প্রায় আড়াইশ টাকা বেড়েছে। এছাড়া পলিস্টার নাইলনের মতো পেট্রোলিয়াম বাইপ্রোডাক্টসের দাম তো হু হু করে বাড়ছে,’ বলেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মি. কুমার।

অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়ে গেছে।

বিশেষ করে, বিদ্যুৎ, গ্যাস জ্বালানি তেলের সংকটে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটায় অনেক সময় শিপমেন্ট ডিলে করতে হচ্ছে। এতে বায়াররা অসন্তুষ্ট হচ্ছে। অনেকে আবার এয়ার ফ্লিটে মাল পাঠাতে বলছে, যাতে সেগুলো তারা দ্রুত হাতে পায়,’ বলছিলেন ব্যবসায়ী সাঈদ হাসান।

কিন্তু খরচ বাড়লেও বেশিরভাগ বিদেশি ক্রেতা সেগুলো দিতে রাজি হচ্ছেন না।

তারা দিতে রাজি হচ্ছে না, কারণ খরচগুলো বেড়েছে অর্ডার নেওয়ার পরে। নতুন দামে অর্ডার কোট করার পর দেখা যাচ্ছে, বায়াররা অর্ডারটা কনফার্ম করছে না। দাম কমানোর জন্য অপেক্ষা করছে,’ বলেন মি. কুমার।

বাজার হারানোর শঙ্কা

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে যে বাড়তি খরচ হচ্ছে, সেটার পুরোটাই যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের নিজেদের পকেট থেকে।

যা আয় হয়, এগুলো করতে গিয়ে সব খরচ হয়ে গেছে শ্রমিকদের বেতন দিবো কীভাবে, আর আমরাইবা কী খেয়ে বাঁচবো?,’ বলেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মি. কুমার।

তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে তো বেশিদিন চলা সম্ভব হবে না। এভাবে চলতে থাকলে তো কারখানা চালু রাখাই কঠিন হয়ে যাবে।

এদিকে, নতুন করে অর্ডার না পাওয়া নিয়েও আছে দুশ্চিন্তা।

এই যে নতুন করে অর্ডার আসছে না, একটা গ্যাপ তৈরি হচ্ছেএটার প্রভাব টের পাওয়া যাবে আগামী এক থেকে দেড় মাস পর। দেখা যাবে আগামী ঈদের সময় মালিকরা অনেকই শ্রমিকদের বেতন দিতে পারছেন না,’ বলছিলেন পোশাক কারখানার মালিক মি. হাসান।

বর্তমানে পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তু এই শিল্পের বাজার ক্রমেই আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে।

ফলে বাড়তি মূল্যের কারণে ক্রেতা হারানোর শঙ্কাও লক্ষ্য করা ব্যবসায়ীদের মাঝে।

বিদ্যুৎ জ্বালানির যে সংকট দেখা যাচ্ছে, সেটি যদি সহসাই সমাধান করা না যায়, তেলের সরবরাহ যদি স্বাভাবিক না থাকে, তাহলে টাইমলি মাল শিপমেন্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে, আবারও খরচও বেড়ে যাবেবলেন পোশাক ব্যবসায়ী সঞ্জয় কুমার।

তখন বায়াররা নিজেদের স্বার্থেই বিকল্প মার্কেটের সন্ধান শুরু করবে। যেখানে কম খরচে মাল ডেলিভারি পাবে, সেখানে চলে যাবে,’ যোগ করেন মি. কুমার।

Related Posts