বিশ্বকাপ ফুটবল যেভাবে আবর বিশে^র জাগরণ
স্পোর্টস প্রতিবেদনঃ আফ্রিকার একমাত্র ফিফা সদস্য হিসেবে মিসর যোগ দিতে চেয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল মার্সেইতে যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে একই জাহাজে চেপে উরুগুয়ে পৌঁছানো। কিন্তু ভূমধ্যসাগরে হঠাৎ ঝড়। আফ্রিকা থেকে মিসরের জাহাজ পিছিয়ে পড়ল। মার্সেইয়ে পৌঁছার আগেই ‘দ্য ফ্লোরিডা’ ছেড়ে চলে যায়। ফলে বিশ্বকাপে যোগ দেয়া হয়নি ‘ফারাও’দের। আরব ফুটবলের স্বপ্ন থেমে যায় সমুদ্রের মাঝপথে, ঝড়ের কাছে।
কিছু বর্ণনায় অবশ্য দূরত্ব আর বাস্তবতার কথাই বেশি গুরুত্ব পায়। আটলান্টিক পেরিয়ে উরুগুয়ে পৌঁছানো তখন ছিল প্রায় অসম্ভব এক অভিযান। আজকের দিনে যেখানে কায়রো থেকে মন্টেভিডিও যেতে লাগে ঘণ্টা আঠারো, সেখানে এক শতাব্দী আগে সমুদ্রপথে সেই যাত্রা মানে ছিল সপ্তাহের পর সপ্তাহ অজানা ঝুঁকি, বিপুল ব্যয় আর অনিশ্চয়তা। শেষ পর্যন্ত সেই কারণেই মিসর সরে দাঁড়ায়। আরব ফুটবলের প্রথম বিশ্বকাপ—স্বপ্ন তাই পূর্ণতা পায়নি। থেমে গেছে যাত্রার দোরগোড়াতেই বা সমুদ্র পাড়ি দেয়ার আগেই। সেই অপ্রাপ্তি, সেই অপূর্ণ যাত্রা বহু বছর ধরে আরব ফুটবলের ইতিহাসে এক দীর্ঘ ছায়া হয়ে রয়ে গেছে।
চার বছর পর, ১৯৩৪। ইতালিতে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। এবার মিসর আর পিছিয়ে গেল না। ‘হেলওয়ান’ নামের জাহাজে চেপে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিল ‘ফারাও’দের দল। চারদিন, চারটি রাত, ঢেউয়ের বুকে দুলতে দুলতে নেপলসের মাটিতে পা রাখলেন আরব ফুটবলের প্রথম পথিকৃৎরা। একটাই ম্যাচ খেললেন। হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৪—২ গোলে হেরে ফিরে এলেন। কিন্তু সেই হারও ছিল ইতিহাস। আবদুলরহমান ফাওজি সেদিন যে দুটো গোল করেছিলেন, তিনি হয়ে গেলেন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম আরব ও আফ্রিকান।
তারপর দীর্ঘ অপেক্ষা। দশটা বিশ্বকাপ কেটে গেল। মিসর আবার বিশ্বকাপে ফিরল ১৯৯০ সালে, ৫৬ বছর পর। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুই অংশগ্রহণের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ বিরতির রেকর্ড তখন তাদের নামেই লেখা হয়েছিল। পরে ২০২২ সালে ওয়েলস ৬৪ বছর পর ফিরে এসে সেই রেকর্ড ভেঙে দেয়।
এ হলো আরব ফুটবলের শুরুর গল্প। সমুদ্রের ভয়ে পিছু হটা, তারপর ঢেউ পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়া, তারপর দীর্ঘ নীরবতা। যে যাত্রা ১৯৩০ সালে শুরুই হতে পারেনি, সে যাত্রাই এখন পৌঁছে গেছে এক নতুন উচ্চতায়। তখন একটি দলও পৌঁছতে পারেনি মাঠে, আজ আটটি দল দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের গল্প লেখার জন্য। ২০২৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপে আটটি আরব দেশ একসঙ্গে বিশ্বকাপে—আলজেরিয়া, মিসর, ইরাক, জর্ডান, মরক্কো, কাতার, সৌদি আরব ও তিউনিসিয়া।
ওএ মহাজাগরণের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে সংখ্যাগুলো একটু মিলিয়ে দেখতে হবে। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গোটা আরব বিশ্বের হয়ে মাঠে নেমেছিল মাত্র একটি দেশ—আলজেরিয়া। ২০১৪—তেও সেই একই চিত্র। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে চারটি করে আরব দল খেলেছিল। সেটাকেই তখন বলা হচ্ছিল ঐতিহাসিক অর্জন। আর এবার আটটি দেশ। যেন মরুভূমিতে একসঙ্গে আটটি সূর্য উদয় হয়েছে।
এ স্বপ্নের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল মরক্কো। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ‘অ্যাটলাস লায়ন’রা যখন সেমিফাইনালে উঠেছিল, সেদিন দামেস্কের চায়ের দোকান থেকে দুবাইয়ের আকাশচুম্বী অট্টালিকা—সবখানে একটাই নাম মরক্কো। স্পেন—পর্তুগালকে হারানো যেন রূপকথার বই থেকে উঠে আসা গল্প। মরক্কো জানান দিয়েছিল অমোঘ বার্তা ‘আমরাও পারি’। সে আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে মাগরেব থেকে মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত।
এবার বিশ্বকাপেও মরক্কো আসছে সর্বোচ্চ স্বপ্ন বুকে বেঁধে। কোচ পরিবর্তনের ঝাঁকুনি সামলে মোহামেদ ওয়াহবির নেতৃত্বে দলটি তাকিয়ে আছে আরো উঁচুতে। নিশ্চিতভাবেই আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ আর ইয়াসিন বোনোর মতো তারকারা প্রমাণ করতে চাইবেন যে কাতারের রূপকথা ছিল সত্যিকারের সামর্থ্যের প্রতিফলন, কোনো ‘দৈব ঘটনা’ নয়।
এবার আলজেরিয়াও ফিরছে ‘ক্ষুধার্ত বাঘের’ মতো। ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপ মিস করার যন্ত্রণা বুকে পাথরের মতো চেপে ছিল এতদিন। অথচ এ দলটিই ২০১৪ সালে ব্রাজিলে নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় লিখেছিল। গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে শেষ ষোলোতে উঠে গিয়ে তারা বিশ্বকে দেখিয়েছিল, সাহারা পেরিয়েও ফুটবলের শিরায় রক্ত বইতে পারে সমান গতিতে। সেই যাত্রায় জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে লড়াই করে হারলেও, মাথা নত করেনি বরং সম্মান কুড়িয়েছিল। এবার রিয়াদ মাহরেজ, গুইরি, আউয়ারদের নিয়ে আলজেরিয়া শুধু অংশ নিতে আসছে না, কোচ পেটকোভিচের নেতৃত্বে ‘ফেনেক্স’রা ফিরছে ২০১৪ সালের সাফল্যকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষুধা নিয়ে।
মিসরের গল্পটা বেদনার, শতবর্ষের অপেক্ষার। ১৯৩৪ সালে যে দেশটি আরব ফুটবলের প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিল, সেই দেশটি আজও বিশ্বকাপে একটা জয়ের অপেক্ষায়। নব্বই বছরের হিসাবে জয়ের ঘরে শূন্য। আফ্রিকার সবচেয়ে সম্মানিত ফুটবল জাতি হয়েও এ শূন্যতা যেন পিরামিডের বুকে অদৃশ্য ফাটল। আর এ শূন্যতার সবচেয়ে বড় সাক্ষী ফুটবল বিশ্বের অন্যতম বড় তারকা মোহাম্মদ সালাহ। লিভারপুলের হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগসহ ডজনখানেক ট্রফি জিতেছেন অথচ মিসরের জার্সিতে দুটো আফকান ফাইনালে হেরে খালি হাতে ফিরেছেন। দেশীয় কোচ হোসাম হাসানের অধীনে এবার সে গল্পের শেষটা লেখার সুযোগ সালাহ—ওমর মারমুশদের সামনে।
ইরাকের প্রত্যাবর্তন যেন মেসোপটেমিয়ার দুই নদীর পুনর্মিলন। টাইগ্রিস আর ইউফ্রেটিসের মাঝে যে সভ্যতার জন্ম হাজার বছর আগে, সেই মাটির ছেলেরা ৪০ বছর পর আবার বিশ্বমঞ্চে হাঁটবে। অস্ট্রেলীয় কোচ গ্রাহাম আরনল্ডের অধীনে দলটি পেয়েছে নতুন ছন্দ। আয়মেন হুসেইন, আলি আল—হামাদি ও আমির আল—আম্মারির নেতৃত্বে ‘লায়নস অব মেসোপটেমিয়া’ এবার শুধু অংশ নিতে নয়, নিজেদের গর্জন আবার শোনাতে নামছে।
জর্ডান এ বিশ্বকাপে সম্পূর্ণ নতুন মুখ। ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখবে ‘নাশামা’রা। সদ্যসমাপ্ত এএফসি এশিয়ান কাপের ফাইনালিস্ট এ দলটি নিয়ে অনেকের মনেই আশার আলো জ্বলছে। দলের হাল ধরেছেন মরক্কোর কোচ জামাল সেলামি। মুসা আল—তামারি আর ইয়াজান আল—নাইমাতের মতো খেলোয়াড়রা ডার্ক হর্সের তকমা নিয়েই টুর্নামেন্টে ঢুকবেন।
কাতার এবার আর স্বাগতিক নয়, এবার তারা যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে এসেছে। এশিয়ান কাপের ধারাবাহিক সাফল্য তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ২০২২—এর ব্যর্থতা যেন তাদের জন্য এক শিক্ষা। এবার তারা মাঠে নামবে সেই ভুলগুলো শুধরে দিতে। ঘরের মাঠে ২০২২—এর হতাশা ভুলিয়ে দিতে আকরাম আফিফ ও আলমোয়েজ আলির ওপর ভরসা রাখছেন কোচ হুলেন লোপেতেগি।
সৌদি আরব ১৯৯৪—এর সোনালি সকালের খোঁজে তিন দশক ধরে। সেবার ওয়াশিংটনের মাঠে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে সাঈদ আল—ওয়াইরান নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একে একে পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে প্রায় ৭০ গজ দৌড়ে যে গোল করেছিলেন, সেটি ফিফার ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ র্যাংকিংয়ে ষষ্ঠ স্থান পেয়েছিল। সে গোলই সৌদি আরবকে শেষ ষোলোয় নিয়ে গিয়েছিল। সৌদি আরবের ফুটবল এখন এগিয়েছে অনেক দূর। দেশীয় লিগের উন্নয়ন, বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে নিয়মিত খেলা—এসব তাদের পরিণত করেছে পরিপক্ব দলে। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যে সালেম আল—দাওসারি গোল দিয়ে পৃথিবীকে থামিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এবার নেতৃত্ব দেবেন ইতিহাস ফেরানোর অভিযানে। বিশ্বকাপের মাত্র দুই মাস আগে গতকালই ফরাসি কোচ হার্ভে রেনার্দকে বরখাস্ত করা হয়েছে, নতুন কোচের নাম এখনো চূড়ান্ত নয়।
তিউনিসিয়ার একটাই স্বপ্ন গ্রুপ পর্বের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসা। ১৯৭৮ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপে একই ছবি—দারুণ লড়াই, তারপর বিদায়। সেইফেদ্দিন জাজিরি, নায়িম স্লিটি আর মোহামেদ বেন আলির মতো খেলোয়াড়দের নিয়ে কার্থেজের ঈগলরা এবার কোচ সাবরি লামুচির নেতৃত্বে শপথ নিয়েছে এ ‘অভিশাপ’ ভাঙবেই।
আটটি দল, আটটি গল্প কিন্তু স্বপ্ন এক। আরব্য রজনীর গল্পে সিন্দবাদ সাতবার সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিলেন। সেই একই রক্ত বইছে আরব ফুটবলারদের শিরায়। ১৯৩৪ সালে একটি জাহাজ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছিল একটি স্বপ্ন নিয়ে। ২০২৬ সালে আট দেশ পাড়ি দেবে আটলান্টিক। একই সাহস, একই অজানার টান, শুধু স্বপ্নটা আরো বড় হয়েছে। শেহেরাজাদ প্রতি রাতে গল্প বলতেন যাতে ভোর না হয়। আরব ফুটবল এখন গল্প বলছে—এবার ভোর হবেই।
