উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—৫ || ড. আনিস রহমান

৩। মহাকাশ থেকে কৃষি: স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিং এনডিভিআই

স্যাটেলাইট প্রযুক্তি আধুনিক কৃষিকে মাটির সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশে নিয়ে গেছে। স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করার সময় বিভিন্ন বর্ণালী ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করে, যা মানুষের চোখ দেখতে পায় না। সুস্থ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের জন্য লাল আলো শোষণ করে এবং নিয়ারইনফ্রারেড (ঘওজ) আলো প্রতিফলিত করে। এই প্রতিফলনের মাত্রা পরিমাপ করেভেজিটেশন ইনডেক্সতৈরি করা হয়।

ক। এনডিভিআই এনডিডাব্লিউআইএর গাণিতিক ভিত্তি

সবচেয়ে জনপ্রিয় সূচক হলো এনডিভিআই (ঘড়ৎসধষরুবফ উরভভবৎবহপব ঠবমবঃধঃরড়হ ওহফবী) এটি নিয়ারইনফ্রারেড এবং লাল আলোর পার্থক্যের অনুপাত। যখন কোনো ফসল স্বাস্থ্যকর থাকে, তখন এর এনডিভিআই মান ০।৩ থেকে ০।৮এর মধ্যে থাকে। অন্যদিকে, উদ্ভিদের পানির অভাব বাওয়াটার স্ট্রেসবোঝার জন্য এনডিডাব্লিউআই (ঘড়ৎসধষরুবফ উরভভবৎবহপব ডধঃবৎ ওহফবী) ব্যবহার করা হয়। এটি শর্টওয়েভ ইনফ্রারেড ব্যবহার করে পাতার কোষের পানির পরিমাণ নির্ণয় করে। এই গাণিতিক মডেলগুলো ব্যবহার করে কৃষকরা মাঠের কোনো অংশ শুকিয়ে যাচ্ছে বা কোথায় পুষ্টির অভাব রয়েছে, তা ফসল নষ্ট হওয়ার আগেই বুঝতে পারেন।

এনডিভিআই উদ্ভিদের ক্লোরোফিল বাসবুজায়নপরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদ প্রচুর পরিমাণে ঘবধৎওহভৎধৎবফ (ঘওজ) আলো প্রতিফলিত করে এবং দৃশ্যমান জবফ আলো শোষণ করে। এর মান নির্ণয়ের গাণিতিক সূত্রটি হলো একটি অনুপাত:

ঘউঠও=(ঘওজজবফ)/(ঘওজ+জবফ)

একটি ফসলের স্বাস্থ্যের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই মানের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনো জমিতে শুধু মাটি বা মৃত উদ্ভিদ থাকে, তখন লাল আলোর প্রতিফলন প্রায় ০।২৫ এবং এনআইআর প্রতিফলন ০।৩০ এর কাছাকাছি থাকে, যার ফলে এনডিভিআই মান দাঁড়ায় মাত্র ০।০৯। ফসল যখন পুষ্টির অভাবে বা চাপে (ঝঃৎবংংবফ) থাকে, তখন লাল আলোর প্রতিফলন কমে ০।১৫ হয় এবং এনআইআর প্রতিফলন বেড়ে ০।৪০ পৌঁছায়, যা এনডিভিআই মানকে ০।৪৫ উন্নীত করে। সবশেষে, একটি অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর ফসলের ক্ষেত্রে লাল আলোর প্রতিফলন মাত্র ০।০৫ নেমে আসে এবং এনআইআর প্রতিফলন বেড়ে ০।৭০ হয়, ফলে এনডিভিআই মান দাঁড়ায় ০।৮৭। অর্থাৎ, মান যত এর কাছাকাছি, ফসল তত বেশি পুষ্ট।

এনডিডাব্লিউআই (ঘউডওঘড়ৎসধষরুবফ উরভভবৎবহপব ডধঃবৎ ওহফবী) এনডিডাব্লিউআই বা নরমালাইজড ডিফারেন্স ওয়াটার ইনডেক্স বিশেষভাবে উদ্ভিদের পাতার ভেতরের পানির পরিমাণ বা আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এটি লাল আলোর পরিবর্তে শর্টওয়েভ ইনফ্রারেড (ঝডওজ) ব্যবহার করে, কারণ পানি এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে শোষণ করে। এর গাণিতিক রূপটি হলো:

ঘউডও=(ঘওজঝডও)/(ঘওজ+ঝডওজ)

পানির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এই সূচকের মান পরিবর্তিত হয়। একটি সতেজ বা পর্যাপ্ত পানিযুক্ত (ঐুফৎধঃবফ) পাতার ক্ষেত্রে এনআইআর প্রতিফলন ০।৬০ এবং এসডাব্লিউআইআর প্রতিফলন মাত্র ০।২০ থাকে, যার ফলে এনডিডাব্লিউআই মান পাওয়া যায় ০।৫০। যখন গাছ মাঝারি পরিমাণ পানির অভাবে ভোগে, তখন এনআইআর প্রতিফলন কমে ০।৫০ হয় এবং এসডাব্লিউআইআর প্রতিফলন বেড়ে ০।৪০ দাঁড়ায়, যা সূচকের মানকে ০।১১ নামিয়ে আনে। তবে তীব্র খরা বা সেচ সংকটের (ঝবাবৎব উৎড়ঁমযঃ) সময় এনআইআর প্রতিফলন আরও কমে ০।৪০ হয় এবং এসডাব্লিউআইআর প্রতিফলন অনেক বেড়ে ০।৬০ পৌঁছায়। এর ফলে এনডিডাব্লিউআই মান ঋণাত্মক হয়ে০।২০ চলে যায়, যা ফসল নষ্ট হওয়ার চূড়ান্ত সংকেত দেয়।

সূচক দুটির তুলনামূলক সারসংক্ষেপ: এনডিভিআই এবং এনডিডাব্লিউআই উভয়ই রিমোট সেন্সিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও এদের কাজের ক্ষেত্র ভিন্ন। এনডিভিআই মূলত ক্লোরোফিল এবং উদ্ভিদের পুষ্টির ওপর ভিত্তি করে ফসলের রোগবালাই বা বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করে, যেখানে এনআইআর এবং লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, এনডিডাব্লিউআই মূলত কোষের পানির পরিমাণ বাওয়াটার স্ট্রেসনির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়, যা সেচ সংকট বা খরা পরিস্থিতি বুঝতে সাহায্য করে। এখানে লাল আলোর পরিবর্তে শর্টওয়েভ ইনফ্রারেড (ঝডওজ) ব্যবহার করা হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এনডিভিআই মাপলে গাছেরসবুজায়ন’, এবং এনডিডাব্লিউআই মাপলে গাছেরতৃষ্ণা’—এর পরিমাপ পাওয়া যায়।

খ। মেঘমুক্ত পর্যবেক্ষণে রাডার (ঝঅজ) প্রযুক্তির ভূমিকা

বাংলাদেশের মতো ক্রান্তীয় দেশে বর্ষাকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে, ফলে অপটিক্যাল স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা সমাধানেসিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডারবা এসএআর (ঝঅজ) প্রযুক্তি বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখছে। রাডার সেন্সরগুলো মেঘ ভেদ করে মাটিতে পৌঁছাতে পারে এবং মাটির আর্দ্রতা ফসলের কাঠামো পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এটি বন্যা বা অতিবৃষ্টির সময়ও কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন তথ্য প্রদান করে।


Related Posts