জামায়াতের কর্মকান্ডই ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’কে ফিরিয়ে আনবে!

ঢাকার কাগজ থেকেঃ দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলছে। যেখানে জনপ্রত্যাশা নিয়ে যে আলোচনা হওয়ার কথা, সেটি হচ্ছে না। ফ্রান্স থেকে উড়ে এসে . ইউনূস যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদপদবিতে বিদেশি নাগরিকদের হায়ারে এনে বসিয়েছিলেন; বিএনপিও দলীয় মনোনয়ন থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তেমনি হায়ারি প্লেয়ারদের আধিক্য। নির্বাচনের পর রাজনীতিকে স্থিতিশীল রূপ দিতে বিরোধী দল জামায়াত নারাজ। সংসদে বিরোধী দল জামায়াত নির্বাচিত নতুন সরকারকে ১০০ দিনেরহানিমুন পিরিয়ড ছাড় দিচ্ছে না। অর্থনীতির বেহাল দশা, জ্বালানি, গ্যাসবিদ্যুৎ সংকট, কৃষকদের দুরবস্থা, মিলকারখানা স্বাভাবিকভাবে চলছে না, দ্রব্যমূলের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি: এসব নিয়ে বিরোধী দলের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা নিজেরা ক্ষমতা ভোগে বেশি ভাগ বসাতে সংবিধান সংশোধন, গণভোট, সংস্কার: ইত্যাদি নিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমেছে। দীর্ঘ দুই যুগ বিএনপির অনুকম্পায় রাজনীতি করে জামায়াত এখন বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার হুঙ্কার দিচ্ছে। জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত হওয়ায় দেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক আওয়ামী লীগ নিয়ে ফিসফাস চলছে। রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ ফিরছে: এমন শব্দ দরজায় কড়া নাড়ছে। আর প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের রাজনীতি, আর পর্দার আড়ালে দেখা যাচ্ছে উল্টে।

এপ্রিল হঠাৎ বোমা ফাটানো খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ধানমন্ডি থেকে গ্রেফতার। তার বিরুদ্ধে হত্যামামলাসহ একাধিক মামলা। আদালত তাকে রিমান্ডে না দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। ১২ এপ্রিল তাকে জামিন দেয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এমনি একজন আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকে এক দিনে ছয়টি মামলায় জামিন নিয়ে মুক্তি দেয়া হয়। অথচ একই মামলায় আওয়ামী লীগের শত শত সাবেক মন্ত্রীএমপি, নেতা দীর্ঘদিন থেকে কারাগারে। রহস্য কি? রহস্য আর কিছু নয়: হয়ত শিরীন শারমিন চৌধুরী সাবের হোসেন চৌধুরীদের নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ সক্রিয় করা।

সূত্রের দাবি, ভারতে থেকেই কম বিতর্কিত নেতাদের দিয়ে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ পরিচালনার চেষ্টা হচ্ছে। এতে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে নামানো হয়েছে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠনে। নামেবেনামে যারা আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় নেতাদের সক্রিয় করে তুলবেন, তাদের বিপুলভাবে অর্থায়ন করা হবে। দেশের আওয়ামী লীগ অনুগত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগকে আর্থিক সহায়তা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যেই এস আলমের প্রতিষ্ঠান ফাস্ট কমিউনিকেশন লি: থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে ব্যাংক রেজ্যুলেশনের মাধ্যমে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিতসম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকআবারো এস আলমের হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলা কার্যালয়ের তালা খোলা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পরের দিন পঞ্চগড় ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের অফিসের তালা খুলে দিয়েছে বিএনপির স্থানীয় নেতার উপস্থিতিতে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ জেলার বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অফিস খুলেছে। গত মার্চ শেখ মুজিবের ভাষণ বাজানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ফুল দিতে গিয়ে গ্রেফতার পরে মুচলেকা দিয়ে জামিন পেয়েছেন। ২৬ মার্চেও শেখ মুজিবের প্রতিকৃতিতে ফুল দেয়া হয়েছে।

সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সংগঠনের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে ২০২৫ সালের ১১ মে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। ওই অধ্যাদেশের বলে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিয়ে এপ্রিল জাতীয় সংসদে বিল পাসের ফলে আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল। আইন পাসের পর দিল্লিতে পলাতক শেখ হাসিনা দলের নেতাকর্মীদের বার্তা দিয়েছেন: আওয়ামী লীগের ব্যানারে না হলেও যেখানে সেভাবে হোক, পেশাজীবী, সংস্কৃতিক সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে হলেও মুজিববাদী নেতাকর্মীদের সক্রিয় করে তুলতে হবে। যেখানে যারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের আগামীতে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে বসানো হবে। হাসিনার ঘোষণার পর বিভিন্ন পেশাজীবী সক্রিয় হয়ে উঠছেন। আইনজীবীরা তাদের আসন্ন নির্বাচনে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় মুজিববাদীদের উপস্থিতি ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের ভেরিফায়েড পেজগুলো সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাংবাদিক মাহবুব কামাল বলেছেন, ‘দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন কেউ ঠেকাতে পরবে না। শেখ হাসিনা যখন বিএনপিকে খন্ডবিখন্ড করার চেষ্টা করেছেন, তখনো বলেছি: বিএনপিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। শেখ মুজিবের নামে আওয়ামী লীগ জিয়াউর রহমানের নামে বিএনপি আগামী শত বছর টিকে থাকবে। . ইউনূসের একের পর এক ব্যর্থতার কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের তিন মাসের মধ্যে যদি নির্বাচন দেয়া হতো: জনগণ আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করত। নিষিদ্ধের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি। আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে এক সময় দলটি দাঁড়িয়ে যাবে।

রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন ক্ষেত্র প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিনিয়র সাংবাদিক এম আজিজ বলেছেন, ‘হাসিনা তার মন্ত্রীএমপিরা পালালেও দলটির কোটি কোটি কর্মীসমর্থক দেশে রয়ে গেছেন। তারা মনে করছেন, বিগত ২০ মাস ধরে নির্যাতিত হচ্ছেন। রাজনৈতিকভাবে কিছুটা পরিচিত এবং ক্লিন ইমেজের কোনো নেতানেত্রী নেতৃত্বে এলে তাদের পেছনে আওয়ামী লীগের সারা দেশের নেতাকর্মী দাঁড়িয়ে যাবে। বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কখনো আওয়ামী লীগকে সক্রিয় হতে বাধা দেননি। তেমিন তারেক রহমানও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকান্ডে বাধার সৃষ্টি করবেন না; বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল হওয়ার পরও জামায়াত অতি বাড়াবাড়ি করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল। তাই মানুষ আত্মরক্ষার্থে জামায়াতকে ঠেকাতে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাকে রুমাল দিয়ে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। মানুষ যাই করুক, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতের আস্ফালন সহ্য করবে না। মধ্যপন্থি জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে বিএনপিকে রাজনীতি করতে হবে। এখনো বিএনপিতে ২০ শতাংশ গুপ্ত জামায়াত রয়ে গেছে। জামায়াতের কর্মকান্ডই দেশে বিরোধী দলের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে অপরিহার্য করে তুলছে।

Related Posts