রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের বিকল্প নয়, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা || সেলিম জাহান

বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে—সহযাত্রী, সহচর ও সহযোদ্ধার ভূমিকা। সহযাত্রী হিসেবে তারা উন্নয়নের সহায়ক বা অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। সরকারের পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বহু রাষ্ট্র—বহির্ভূত প্রতিষ্ঠানও যুক্ত। যেমন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং বিদেশী উন্নয়ন সহযোগীরা। বিভিন্ন উন্নয়ন ক্ষেত্রে কাজ করা এবং ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে তারা কখনই রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিকল্প নয়। উন্নয়ন কার্যক্রমে রাষ্ট্রের ভূমিকা, পরিধি ও বিস্তৃতির কাছাকাছি কোনো উন্নয়ন সংস্থাই পৌঁছতে পারে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষেও এককভাবে সম্পূর্ণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা সম্ভব নয়, কারণ উন্নয়ন একটি অত্যন্ত ব্যাপ্ত জটিল প্রক্রিয়া। তাই বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো উন্নয়নের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের সহচর হিসেবেও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। রাষ্ট্র সাধারণত সামষ্টিক এবং মধ্যবর্তী পর্যায়ে কাজ করে, কিন্তু সবসময় রাষ্ট্র একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। স্থানীয় পর্যায়ে রাষ্ট্রের যোগাযোগ পরিধি যতই বিস্তৃত হোক না কেন, রাষ্ট্র কখনই সেই গভীর তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না, যেখানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো পৌঁছতে পারে। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে করতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা, আকাক্সক্ষা, প্রয়োজন এবং বিদ্যমান উন্নয়ন প্রতিবন্ধকতাগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে ও বুঝতে পারে। এ কারণে তারা স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে পারে এবং সহচরের ভূমিকা পালন করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো কৃষক, তাঁতি ও কুমোরদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করে, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থার একটি পরিসর তৈরি করে। রাষ্ট্র অনেক সময় এ আস্থা অর্জন করতে পারে না।

তৃতীয়ত, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটি সহযোদ্ধার ভূমিকা আছে। রাষ্ট্রের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে মানুষ সবসময় সন্তুষ্ট থাকে না। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ থাকে এবং রাষ্ট্রের কাছে তাদের বিভিন্ন দাবিও থাকে। এসব প্রত্যাশা পূরণের জন্য নাগরিকরা নানা ধরনের সংগ্রাম ও আন্দোলনে লিপ্ত থাকেন। তাদের সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নিজেদের পাশে পায়। প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো মানুষের কণ্ঠস্বরকে আরো শক্তিশালী করে তোলে। এর মাধ্যমে মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিজেদের অধিকার আদায় করতে পারে এবং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দাবি করতে পারে।

বাংলাদেশে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো দেশের উন্নয়নে একটি সক্রিয় শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে ‘অগ্রগতি’ ও ‘উন্নয়ন’ এ দুটো ধারণার মধ্যে একটি পার্থক্য করা জরুরি। আমি মনে করি, অগ্রগতি হচ্ছে কোনো ইতিবাচক বিষয়ের পরিমাণগত বৃদ্ধি অথবা কোনো নেতিবাচক বিষয়ের পরিমাণগত হ্রাস। যেমন জাতীয় আয় বাড়লে আমরা বলি যে অগ্রগতি হয়েছে। একইভাবে শিশুমৃত্যুর হার কমে গেলেও সেটিকে অগ্রগতি বলা যায়।

অন্যদিকে উন্নয়ন বলতে বোঝায় গুণগত পরিবর্তন। তাই জাতীয় আয় বৃদ্ধি অগ্রগতির উদাহরণ হলেও সেই আয়ের ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক বণ্টন উন্নয়নের নির্দেশক। একইভাবে শিশুমৃত্যুর হার কমার পাশাপাশি যদি শিশুদের পুষ্টির মানও উন্নত হয়, তাহলে সেটিকে উন্নয়ন বলা যায়। অর্থাৎ অগ্রগতিকে উন্নয়নে রূপ দিতে হলে পরিমাণগত সম্প্রসারণের সঙ্গে গুণগত পরিবর্তনও ঘটতে হবে।

বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো অগ্রগতি ও উন্নয়ন—উভয় ক্ষেত্রেই ভূমিকা পালন করেছে। তবে ঐতিহ্যগতভাবে দেখা গেছে, রাষ্ট্র অগ্রগতির ওপর তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ফলে দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৬ নাকি ৭ শতাংশ, বিভিন্ন স্থানে স্কুল ও হাসপাতালের সংখ্যা বেড়েছে কিনা—এ ধরনের বিতর্কেই রাষ্ট্র বেশি ব্যস্ত থেকেছে। কিন্তু এতে আরো মৌলিক কিছু প্রশ্ন অনেক সময় উপেক্ষিত থেকেছে। যেমন হাসপাতালের সংখ্যা যে বেড়েছে, সেই হাসপাতালগুলোর সেবার মান কেমন? শিক্ষার গুণগত মান কি উন্নত হয়েছে? অথবা জাতীয় আয় বৃদ্ধির সুফল কি ন্যায্যভাবে বণ্টিত হয়েছে?

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো পরিবার এবং তৃণমূল জনগোষ্ঠীর পর্যায়ে এসব বিষয় গভীরভাবে যাচাই করে। তারা দেখে, মানুষের জন্য যে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে তা পান করার জন্য নিরাপদ কিনা, কিংবা যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে সেখানে শিক্ষার প্রকৃত মান কেমন। এ থেকে স্পষ্ট যে রাষ্ট্র যেখানে অগ্রগতিকে অগ্রাধিকার দেয়, সেখানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো উন্নয়নের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো সমাজকে মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ বিকাশেও সহায়তা করতে পারে। আজ আমরা একজন মানুষকে তার অর্থ ও ক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করি। কিন্তু সেই ব্যক্তির মানবিক মূল্যবোধের কী হবে? আমরা মানুষকে তাদের অর্থ ও ক্ষমতা দিয়ে বিচার করি, কিন্তু তারা কতটা মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করে, দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজের জন্য কিছু করছে কিনা, কিংবা পরিবার ও প্রতিবেশীর প্রতি তাদের দায়িত্ব পালন করছে কিনা—এসব বিষয় প্রায়ই মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হই।

মানবিক মর্যাদা, পারস্পরিক সম্মান, অন্যের প্রতি সহনশীলতা এবং ভিন্ন মত ও বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা—এসবই এমন মূল্যবোধ, যা একটি সমাজকে আত্মস্থ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজে মানুষের জীবনের এসব ক্ষেত্রে নানা ধরনের বঞ্চনা রয়েছে। দুঃখজনকভাবে মানবিক বঞ্চনাকে আমরা অনেক সময় খণ্ডিত দৃষ্টিতে দেখি। অর্থনীতিবিদরা মূলত আয়ের বঞ্চনার দিকে তাকান, রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভাবকে গুরুত্ব দেন, আর মানব উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বঞ্চনা আছে কিনা তা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। আমার বিশ্বাস, আমাদের এর চেয়েও আরো এগিয়ে যেতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা মানব উন্নয়ন যতই হোক না কেন, যদি মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে, তাহলে বৃহত্তর মানবিক দারিদ্র্য থেকে কাক্সিক্ষত উত্তরণ সম্ভব হবে না।

এসব ক্ষেত্রে সামাজিক বঞ্চনা দূর করতে সব রাষ্ট্র—বহির্ভূত পক্ষকেই অবদান রাখতে হবে। কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সামাজিক অবক্ষয়ের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু আরো অনেক কাজ করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে সব সামাজিক আন্দোলনই সম্ভব হয়েছে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে। মানুষকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা এ সম্মিলিত ঐক্যের জন্য একটি পরিসর বা বলয় তৈরি করতে পারে। এর কারণ হলো তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর একটি শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি তাদের কার্যক্রমে ব্যবহার করে বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো তাদের কাজের পরিমাণ ও গুণগত মান উভয়ই বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে তারা মানুষকে সংগঠিত করা, সেবা প্রদান এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার কাজও আরো কার্যকরভাবে করতে পারে। অতীতে কোনো সেবা পৌঁছে দিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কর্মীদের হাতে খাতা—খতিয়ান নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো। এখন এসব সেবায় ক্রমবর্ধমানভাবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হওয়ায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং তাদের সেবার কার্যকারিতাও বেড়েছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সেবা গ্রহণকারীরাও এর সুফল পাওয়ার পাশাপাশি নিজেদের আরো ক্ষমতায়িত বোধ করছেন। উদাহরণস্বরূপ, এসব সেবা গ্রহণকারীকে যদি মুঠোফোন দেয়া হয়, তাহলে তারা শুধু হিসাবনিকাশ পরিচালনা করতে পারবেন না; বরং তাদের সামগ্রিক চাহিদা কোথায় রয়েছে এবং কত দ্রুত তারা পণ্য সরবরাহ করতে পারবেন, সে সম্পর্কেও দক্ষ হয়ে উঠবেন। তাই বাংলাদেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা খাতকে তাদের কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আরো বাড়ানোর জন্য সচেষ্ট হতে হবে।

বাংলাদেশে সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর আন্তঃসম্পর্ক কখনই পুরোপুরি মসৃণ ছিল না; বরং বছরের পর বছর এ সম্পর্ক নানা উত্থান—পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। এখানে যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার তা হলো উন্নয়ন নিজেই একটি গভীর ও অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। আর এ প্রক্রিয়া কোনো একক পক্ষের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব নয়—এমনকি সেই পক্ষটি যদি শক্তিশালী রাষ্ট্রও হয়। বিভিন্ন পক্ষের তুলনামূলক সক্ষমতা ও সুবিধা অনুযায়ী কাজগুলো তাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সবার জন্যই জায়গা রয়েছে এবং প্রত্যেকেরই একটি ভূমিকা রয়েছে।

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

Related Posts