যা দেখেছি যা বুঝেছি—২৯ || মনিরুল ইসলাম
সুখ—দুঃখ
আমি কি নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যই বলছি যে, পৃথিবীর সুখ আর দুঃখ আধেক আধেক? কই, আমার মতো ক’জন আছে এমন সোনার সন্তানহারা অভাগা পিতা? আছে কিন্তু অর্ধেক নয়, বেশির ভাগ তো নয়ই। দুনিয়ার প্রায় সবাই সুখী যার যার অবস্থান থেকে, ভিক্ষুকও যেদিন ভাল ভিক্ষা পায়, সুখবোধ করে। দুঃখী শুধু হাজারে লক্ষে হাতেগোনা এক—দুইজন। এই মনে করে বসে আছি যে সবাই যে কোনোদিন দুঃখে পড়বেÑকই, সবাই তো সুখের উপভোগে জীবন শেষ করে দিচ্ছে। সুখীই বেশি, দুঃখীই কম। সুখীদের যেটুকু দুঃখ, তা দুই থেকে চার আনাÑসেটাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখায় সুখের আমেজ উপভোগের জন্য। কারণ নির্ভেজাল সুখ পুরোপুরি উপভোগ্য হয় নাÑতরকারিতে যেমন ঝাল দেয়, সোনায় দেয় সোহাগা। মানুষের মন কখনোই কিছুতেই ষোলআনা সুখে পূর্ণ হয় না। সুখেও মানুষ কাঁদে, কারণ দুঃখবোধ ছাড়া সুখবোধ পূর্ণ হয় না। সুখবিলাসীদের কেউ কেউ আবার দুঃখ—বিলাসও করে। শখের দুঃখবিলাসীরা উপচেপড়া সুখোপকরণের মধ্যে সুখানুভূতি তীব্রভাবে হজম করার জন্য দুঃখকে ‘হজমি’ হিসাবে খায়। মনটাকে ষোল আনায়/১০০% পূর্ণ করার জন্যই কিছু দুঃখ ঢুকায়, আহ্লাদে বলে, ‘দেখো তো কী যন্ত্রণা!’
সেজন্যই জীবন একটা কনফিউশন। কোলাহল বিতৃষ্ণা বৈপরীত্য স্বপ্নভঙ্গ বিস্ময় বিশ^াসঘাতকতার মধ্যেও পৃথিবীটা আসলেই সত্য সুন্দর শোভন এবং মোহনীয়। সুতরাং সুযোগ পেলেই একটা আনন্দের চিৎকার দিনÑ আহ্ কী উপভোগ্য জীবন, কী সুন্দর পৃথিবী! ঈশ^র হয়ত আমাকে ত্যাগ করেননি, সেজন্যই বার বার এত দুঃখ দেন যেন সুপথে ফিরে আসি। পৃথিবীর সমস্ত দুঃখভার আমাকে দাও, দুঃখের পর্বতচূড়ায় বসে আমি সুখের স্বরূপ দেখব।
অনেকে মনে করে পৃথিবীর সবাই তাকে ভালোবাসবে, সুন্দর বলবে, প্রশংসা করবে। তাই উন্মুখ হয়ে সাধু সাজে, সাজগোজ করে। স্বেচ্ছায় ঘৃণার পাত্র হওয়ার দরকার নেই, আবার সকল মানুষের ভালোবাসারও দরকার নেই। আপনি যা—ই করেন, তা—ই ভালভাবে আন্তরিকভাবে করার চেষ্টা করুন, এতেই সুখ ও শান্তি। সবকিছু সহজভাবে দেখুন, সূক্ষ্মভাবে নয়। জীবনটাকে এত কঠিন করে নয়, নরম আলতো হাতে ধরুন।
আর পৃথিবীতে আসলেই কি কোনো কষ্ট আছে? যা—কিছু ঘটে কষ্টের, অন্যের বেলায় সবই যেন স্বাভাবিক, নিজের বেলা অস্বাভাবিক। সুখ—দুঃখের ধরনও বিচিত্র। প্রত্যেক মানুষ তথা প্রাণী অল্প বিস্তর প্রভুত্ব দেখাতে চায়। কারো না কারো ওপর তা প্রয়োগ করে সে স্বস্তি—সুখ পায়। অনেকে আবার বিভিন্ন ধরনের বিকৃত সুখ উপভোগ করে, যেমন কাউকে পিটিয়ে কাঁদিয়ে সে মজা পায়।
সুখী বা দুঃখী জীবনের মাপকাঠি কি? অন্যের প্রতি আপনার ক্ষোভ দিয়েও নিজ জীবনের সুখ—দুঃখ পরিমাপ করা যায়। জীবন সায়াহ্নে যদি বলা হয়: সুযোগ অভয় নিরাপত্তা দেয়া হলে আপনি
(১) কয়জনকে মারতে যেতে চান?
(২) কয়জনকে প্রকাশ্য অপমানে জারি/ধমক দিতে চান? আর
(৩) কয়জনকে তার তিক্তসত্য শুনিয়ে দিতে চান?
যদি উত্তর হয়: কাউকে না বা এতজনকে... এই দিয়ে বোঝা যাবে কতটুকু সুখ—দুঃখে জীবন যাপন করেছেন।
প্রত্যেকের জীবনেই একটা ‘হিট লিস্ট’ থাকে, সুযোগ পেলে যাদেরকে শায়েস্তা করতে চায় সে। অন্যায়ভাবে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতি করেছে যারা, মৃত্যুর সময় সেটাই হয়ত মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট। আমি কি এমন কারো তেমন ক্ষতি করেছি, যার জন্য আমাকে শাস্তি দিতে না পেরে সে কষ্ট পাচ্ছে? এসো, বেঁচে থাকতে আমাকে শাস্তি দিয়ে যাও, শান্তিতে মৃত্যুবরণ করো। অপরাধ অন্যায় পাপ করে থাকলে মনের ভিতরে যন্ত্রণাবোধ কঁুড়ে কঁুড়ে খাবে। ঈশ্বরের প্রতি কৃত অন্যায় তিনি মাফ করতে পারেন, কিন্তু মানুষের প্রতি কৃত অন্যায় মাফের জন্য মানুষের কাছেই যেতে হবে। এই করলে সেই করলে সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়Ñএকথা সত্য নয়। আপনার দেয়া সুখ মানুষ ভুলে যাবে কিন্তু দুঃখটা মনে পুষে রাখবে।
দুঃখ সৃষ্টি হয় অন্যের কারণে, আনন্দ হয় নিজের দ্বারা। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ অসুখী হয় অন্যের কারণে, প্রায়ই নিরর্থক কারণে। পৃথিবীর মানুষ যদি আরেকটু সভ্য সংবেদনশীল হত, দুঃখের ভার কমে যেত। আমরা বলি মানুষ বড় নিষ্ঠুর, কখনো আবার দয়ালু—সাধু। প্রকৃতি তারচেয়েও এক্সট্রিম, কখনো করে অবাধ মুক্ত দান, কখনো আবার বড় নির্দয়, ভীষণ কদর্য। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ দুঃখদানকারী, অর্ধেক দুঃখগ্রহণকারীÑআপনি কোন দলে ভুক্ত হবেন, সেটার অর্ধেক নিয়ামক নিয়তি, অর্ধেক ঠিক করবেন আপনি।
আজকাল আবার বলে কিছু কাজে ‘হ্যাপি হরমোন নিঃসরণ’ হয়, তাতে সুখের মাত্রা বাড়ে। যেমন: ব্যায়াম, যৌনমিলন, হাসি, নৃত্য, সঙ্গীত, সৃজনকর্ম, সুখাদ্য, সুচিন্তা, লক্ষ্যপূরণ, ধর্ম/ধ্যান, ভ্রমণ, প্রকৃতিসঙ্গ, ভালোবাসা, সুহৃদসঙ্গ, সুনিদ্রা, বইপড়া, সুসম্পর্ক ইত্যাদি। তাহলে দুঃখহরণের দাওয়াই কি, বিজ্ঞান যদি বলতে পারত।
ক্রমবর্ধমান দুঃখের ভারে কি পৃথিবী একদিন ভেঙে পড়বে? আমার অসুখী হবার কোনো কারণ ছিল না, যদি না দুই বালক এরকম করত। এত আনন্দ উৎসব পৃথিবীতে, তার পাশাপাশি কেন এত দুঃখ যন্ত্রণা শোক? ইচ্ছা করে সকল বেদনারাশি একসাথে করে পুড়িয়ে ফেলি। এতকিছু পোড়াই আগুনে, দুঃখ কেন পোড়াতে পারি না? পৃথিবীতে অন্তত অর্ধেক দুঃখ পরিহারযোগ্য, অনর্থক সৃষ্ট। সেই পরিহারযোগ্য দুঃখ কিভাবে কমানো যায়, তার একটা আন্দোলন যদি গড়ে তোলা যেত। দিনে মাসে না হোক, বছরে একদিন দুঃখের বহ্নোৎসব করতে চাই জনসমক্ষে।
আমার মন, যার কোনো সুখ নাই তার সঙ্গ পেতে চায়। মন শুধু দুঃখের কথা শুনতে চায়, দুঃখের সাথে থাকতে চায়। সুখকে যেন ‘ভাসুর’ মনে হয়।
সুখ—দুঃখের কি কোনো রঙ আছেÑলাল নীল হলুদ? অনেকে বলে সুখের রঙ নাকি সাদা লাল, দুঃখের কালো নীল। প্রকৃতির ছয় ঋতুর মতো জীবনও নানাকালে নানা রঙে পরিবর্তিত হয়। নৌকা যেমন চলে নদীতে কখনো শান্ত জলে, কখনো উত্তাল তরঙ্গে, তেমন বয়ে যায় জীবনও। নৌকা যেমন সর্বাবস্থায় ভাসিয়ে রাখতে হয়, জীবনকেও তাই বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
এরকমই হয়, আধাআধিÑএকপিঠ কালা হলে অপর পিঠ ধলা। মানববৃক্ষের মূল—কান্ড হল দুঃখ, ডাল—পাতা—ফুল হল সুখ। জীবনের অন্ধকার দেখে যেন ভড়কে না—যাই, আলো দেখে যেন নাচতে না—যাই। ঘুমাতে গেলে একটার পর একটা অশান্তির ঢেউ এসে আমাকে সচল সবল চঞ্চল করে রাখে। জগতে নানা ধরনের দুঃখ থাকেÑকারো না—পাওয়ার দুঃখ, কারো কম—পাওয়ার, কারো অপূর্ণতা/অসম্পূর্ণতার দুঃখ। আমি নিশ্চিত বিল গেটস, বেজোস, শাহরুখ খানেরও দুঃখ আছে, কেবলারও সুখ আছে। মানুষ আনন্দ উপভোগ করে, হাসিতে তা প্রকাশ পায়। দুঃখও কি উপভোগ করে? করে, যখন সে কাঁদে। হাসি যেমন আনন্দের, কান্না তেমনি দুঃখ উপভোগের প্রকাশ। কান্নার অবসানে তাই প্রাণে স্বস্তি আসে। বঞ্চনাকে সয়ে যেতে পারলে সে হয় মুক্ত।
যত বড় সুখীই হোক, কোনো না কোনো একটা দুঃখ তার সঙ্গে বসবাস করে। কারণ দুঃখ মানুষের সার্বক্ষণিক সঙ্গী, সুখ তার সাময়িক লীলার সঙ্গী। দুঃখ মনে লেপটে থাকে, সুখ গায়ে ফঁু দিয়ে উড়ে বেড়ায়। এক দুঃখ চলে গেলে মানুষ আরেক দুঃখ খঁুজে বেড়ায়। যেমন, ছেলেবেলায় আমার ছিল বঞ্চনার দুঃখ, যৌবনে প্রেমের দুঃখ, পরে ভাল পোস্টিং—এর দুঃখ, এখন ছেলে ও জননীর দুঃখ। তবে দুঃখ থাকা ভাল, দুঃখ থাকা দরকার। দুঃখ মানুষকে খেঁাচায়, সজাগ রাখে, উদ্দীপ্ত করে, আগামীর জন্য বাঁচিয়ে রাখে। সুখ তাকে দুর্বল করে রাখে। যার দুঃখবোধ নাই, তার তো জীবনবোধই নাই। দুঃখই জীবনের সার। তবে সারকে হজম করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই সারকে ক্ষারজ্ঞানে পান করলে বিষ হয়ে যায়, তখন মানুষ আত্মহনন করে। রয়ে যাওয়া দুঃখকে সয়ে নেয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
