ভ্রমণ গদ্য—২ পাঠকের সাথে লেখকের সাক্ষাৎ || শাহাব আহমেদ

শেক্সপিয়র ১৫৯৭ সালে তখনকার স্ট্র্যাটফোর্ডের অন্যতম বৃহৎ বাড়িনিউ প্লেসকিনে নেন। তিনি তখন সেই শহরের অন্যতম ধনাঢ্য ব্যক্তি।

সেখানে ওঠার এক বছর আগে তাঁদের জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ আঘাত।

তাঁদের একমাত্র ছেলে হ্যামনেটজুডিথের যমজ ভাইÑমাত্র এগারো বছর বয়সে মারা যায়।

স্ট্র্যাটফোর্ডের রেজিস্টারে তার সমাধির তারিখ লেখা আছেÑ১১ আগস্ট, ১৫৯৬।

সে সময় শেক্সপিয়র করহম ঔড়যহ লিখছিলেন অথবা পুরনো লেখা নতুন করে গড়ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

সেখানে সন্তানহারা মা কনস্ট্যান্সের মুখে শোকের যে ভাষা তিনি দিয়েছেন, তা পড়লে হ্যামনেটের কথা মনে না পড়ে উপায় নেই

এৎরবভ ভরষষং ঃযব ৎড়ড়স ঁঢ় ড়ভ সু ধনংবহঃ পযরষফ.”

অনুপস্থিত সন্তানটির জায়গা যেন শোক নিজেই দখল করে নেয়। তার বিছানায় শোয়, তার মুখ মনে করিয়ে দেয়, তার কথাগুলো ফিরিয়ে আনে, শূন্য পোশাকের ভেতর তার অবয়ব ভরে দেয়।

বড় বাড়ি।

বাগান।

প্রশস্ত সংসার।

কিন্তু এক সন্তানের অনুপস্থিতি নিয়ে।

জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি এখানেই কাটিয়েছেন। বাড়িটি অনেক আগেই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন শুধু বাগানটুকু টিকে আছে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। কত ভাস্কর্য সেখানে তাঁর চরিত্রদের নিয়ে, কত গাছপালা, ঔষধি বৃক্ষ। তিনি যেখানে বসে লিখতেন বলে ধারণা করা হয়, সেই চেয়ারটিরও একটি নকল রাখা আছে, পাশে ডেস্ক।

চাইলে বসতে পারো, গাইড বলে।

পাশেই মধ্যযুগীয় পেইন্টিংসমৃদ্ধ গিল্ড চ্যাপেল টিউডর স্কুল, যেখানে তিনি লেখাপড়া শুরু করেন এবং ল্যাটিন সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হন। এই শহর এখনও ধারণ করে আছে তাঁর সময়ের আরও কিছু স্থাপনা।

ইংল্যান্ড পৃথিবীর জন্য বহু অভিশাপ, বহু নিপীড়ন যন্ত্রণার জন্ম দিয়েছে।

কিন্তু দিয়েছে শেক্সপিয়রকেও।

ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্রের আদি চিন্তকদের অন্যতম টমাস মোরকে জন্ম দিয়ে কতলও করেছে এই দেশ।

কত মহান চিন্তা মহামানবের মাতৃভূমি এখানে!

তাঁকে বাপ্তাইজ করা হয়েছিল যে হোলি ট্রিনিটি চার্চে, সেখানেই তিনি সমাহিত। এভন নদীর তীরে বহু শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে চার্চটি; বর্তমান স্থাপনাটির বড় অংশ মধ্যযুগের। শেক্সপিয়র নিজে এই চার্চেরই একজন প্যারিশনার ছিলেন।

আমরা পৌঁছালাম পাঁচটা তিন মিনিটে।

দরজা বন্ধ।

কখনও এক মিনিট অনেক দীর্ঘ সময়।

তিন মিনিটের দৈর্ঘ্য অমার্জনীয়।

তাঁর কবর দেখা হলো না।

নির্জন প্রাচীন গোরস্থান ঘুরে ফিরে এলাম।

ইংল্যান্ডে অতি সুন্দর একটি অঞ্চল আছেÑকটসওল্ডস।

আগে নাম শুনিনি। আমার বিশ্বাস, আমিই একা নই।

মধ্যযুগে ভেড়ার পশমের ব্যবসার জন্য অঞ্চলটি খুবই বিখ্যাত ছিল। এই মেষপালকদের সমৃদ্ধিতেই গড়ে উঠেছিল সোনালি চুনাপাথরে তৈরি গ্রামগুলো, যাদের অনেকগুলো আজও প্রায় সাতআটশো বছর আগের রূপ ধরে রেখেছে।

এমনই একটি গ্রাম দেখি।

আসলেই অপূর্ব।

ছোট্ট একটি নদী বয়ে গেছে, তাকে ঘিরে লোকালয়, দোকানপাট, পার্ক।

একটি সারাদিন, এমনকি দিনের পর দিনও বসে থাকা যায় এখানে।

কিন্তু আমাদের সময় কই?

পরের দিনটি ছিল আরও দীর্ঘ।

উইন্ডসর ক্যাসেল, স্টোনহেঞ্জ এবং বাথ শহরের ট্যুর কিনেছিলাম।

খুব ভোরে সাবওয়ে ধরে ট্যুর বাসে চড়ি। সাড়ে আটটার দিকে উইন্ডসর ক্যাসেলে পৌঁছে লাইনে দাঁড়াই। আমরাই প্রথম গ্রুপ।

নয়টায় ফটক খোলার কথা, কিন্তু খোলে পৌনে দশটায়।

পৃথিবীর প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকৃত রাজপ্রাসাদগুলোর একটি এটি। উইলিয়াম দ্য কনকরার ১০৭০এর দশকে এর গোড়াপত্তন করেন। প্রথমে ছিল লন্ডনের পশ্চিম দিক রক্ষার দুর্গ। পরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ইংল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি রাজারানি কোনো না কোনোভাবে এটিকে রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এখনও এটি রাজপরিবারের একটি সরকারি বাসভবন।

বিশাল এলাকা।

মূলত তিনটি ভাগলোয়ার ওয়ার্ড, মিডল ওয়ার্ড এবং আপার ওয়ার্ড।

লোয়ার ওয়ার্ডে সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল। মধ্যযুগীয় এই গির্জাতেই রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথসহ রাজপরিবারের বহু সদস্য সমাহিত।

মিডল ওয়ার্ডের কেন্দ্র সেই বিখ্যাত রাউন্ড টাওয়ার। পুরনো নরম্যান দুর্গের উঁচু মাটির ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, দূর থেকেই চোখে পড়ে।

আর আপার ওয়ার্ডে স্টেট অ্যাপার্টমেন্টস রাজপরিবারের আবাসিক অংশÑরাজকীয় অনুষ্ঠান, অতিথি গ্রহণ, রাষ্ট্রীয় আড়ম্বরের মূল মঞ্চ।

একটি সারাদিনও যথেষ্ট নয় সব দেখতে।

আমাদের বলা হয়েছে এগারোটায় বাস ছেড়ে যাবে।

সময় কোথায়?

শুধু সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল দেখার সুযোগ হয়। কিন্তু সমাধিগুলোর কাছে যাওয়ার দরজা উন্মুক্ত ছিল না।

করিডোর ধরে হেঁটে বেরিয়ে আসি।

মিডল ওয়ার্ডের ওখানে লাইন বেশ বড়। তারপরেও ভেতরে ঢুকে দুতিনটি কক্ষে বড় পেইন্টিং দেখে বেরিয়ে আসি।

হাজার বছরের রাজপ্রাসাদ এক ঘণ্টায় দেখার তেলেসমাতি আমার নেই।

ট্যুর বাসের সময়সূচি রাজাদের ইতিহাসের চেয়েও কঠোর।

তারপর স্টোনহেঞ্জ।

বিস্ময়কর!

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে এর প্রথম নির্মাণ শুরু। একদিনে নয়, কয়েকশ বছর ধরে বদলেছে এর রূপ। বিশাল সারসেন পাথরগুলো আনা হয়েছিল বহু দূর থেকে, আর ছোট ব্লুস্টোনগুলোর কিছু এসেছিল ওয়েলসের প্রেসেলি পাহাড় থেকে, প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার দূরে।

চাকা ছিল না।

আধুনিক যন্ত্র ছিল না।

তারপরও মানুষ এই বিশাল পাথর টেনে এনেছে, দাঁড় করিয়েছে, একটির ওপরে আরেকটি বসিয়েছে।

কেন?

কেউ নিশ্চিত জানে না।

ধর্মীয় স্থান?

মৃতদের স্মৃতি?

সূর্যের গতির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো আচার?

থিওরি আছে অনেক।

উত্তরটি অজানা।

পৃথিবীব্যাপি প্রাচীন মানুষ এমন বহু কিছু করেছে যার কার্যকারণের সঠিক ব্যাখ্যা এখনও আমাদের হাতে নেই। মিশর আমেরিকা মহাদেশের পিরামিড, নাস্কা লাইন, মাচু পিচু, ইস্টার দ্বীপের নরমূর্তিÑকত দীর্ঘ সেই তালিকা।

হাজার হাজার বছর পরে দাঁড়িয়ে আমরা তাদের দিকে তাকিয়ে ভাবিÑওরা কী ভাবত?

আমাদের আজকের সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের সামনে দাঁড়িয়ে কী ভাববে অনাগত মানুষ?

নাকি আমরা নিজেরাই আমাদের সভ্যতার ইতি টেনে যাব?



Related Posts