কদম ফুল || দিলারা বেগম
আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহে পরীর বিয়ে হয়েছিল। সাতাশে আষাঢ়। আজ সাতাশে আষাঢ় পঞ্চান্ন বছর হল। পরী এখন আশি বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মহিলা। কিন্তু সবাই বলে, তাকে দেখলে বড়জোর সত্তর বছর মনে হয়। এসব ইতিবাচক মন্তব্যে পরী কখনোই আনন্দিত বা আপ্লুত বোধ কেও না। এখন শুধু মনে হয়, সামনে তার আর কোনো ভবিষ্যত নেই। অতীত রোমন্থন, আর অপেক্ষা শুধু মৃত্যুর হাতছানির জন্য।
ইকনোমিক্সে এম.এ অনার্স প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় শিক্ষক পরী, এই আশি বছর বয়সেও সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুঠাম দেহের অধিকারী। অত্যন্ত সুন্দরী একজন মহিলা। সমাজসেবায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে। বৈশ্বিক পরিবেশ নীতি বিষয়ক সংস্থার সাথে কাজ করছে। এক মেয়ে থাকে লন্ডনে। পরী একাই থাকে তার স্বামীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া শহরতলির সেই দোতলা ফ্লাটটিতে। চৌধুরী বাড়ির দুই ছেলের জন্য একই বিল্ডিংএ দুটি ফ্ল্যাট। আধুনিক পদ্ধতিতে বানানো। উত্তর দিকে বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার ফুয়াদ, আর দক্ষিণ দিকে ছোট ভাই আর্মি অফিসার রিয়াদ। বিয়ের আগে এই আর্মি অফিসারের সাথে পরীর দেখা হয়েছিল দুবার, একবার অহনাদের বাসায়, ভদ্রলোক রবীন্দ্র সংগীত গাইছিলেন। রিয়াদ পরীর বান্ধবী অহনার বড় ভাইয়ের বন্ধু। আর একবার একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে। যদিও একই শহরে থাকে আর কোনোদিন দেখা হয়নি। তবে এই চৌধুরী বাড়ির অনেকের সাথে চেনা—জানা আছে, আর সেই সুবাদেই বিয়ের প্রস্তাব। পরী বেঁকে বসল। কিছুতেই আই.এসসি পাশ করা যত বড় আর্মি অফিসার হোক না কেন, সে বিয়ে করবে না। এম.এ ফাইনাল ইয়ার। কয়েক মাস বাদেই তার পরীক্ষা। বিয়ের উটকো ঝামেলা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই তার। অনেকেই বোঝালো উচ্চপদস্থ পি.এস.সি অফিসার, হেলা—ফেলা করার মত নয়। অসুস্থ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়েতে রাজি হল পরী। কিন্তু আই.এসসি পাশ এই অবজ্ঞাটি বুকের মধ্যে একটি হুলের মত বিঁধে রইল।
খুব তড়িঘড়ি করে বিয়ে হল। ছেলে বিদেশে এক বছরের কোর্সে যাবে। পরীকে সে হাতছাড়া করতে চায় না।
আষাঢ় মাস। বিয়ের দিন সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি নেই। বিয়ের আচার—অনুষ্ঠান শেষ হল রাতের প্রথম প্রহরে। বিদায় বেলা বর—বধূ গাড়িতে বসার সাথে সাথে শুরু হল তুমুল বৃষ্টি । চৌধুরী বাড়ির প্রশস্ত ড্রাইভওয়েতে বধূ বরণের জন্য আত্মীয়—স্বজনরা ছুটে এল। মিষ্টিমুখের পালা শেষ হলে, বধূকে নিয়ে আসা হল রিয়াদের ফ্ল্যাটে। এল প্যাটার্নের প্রশস্ত ব্যালকনি পেরিয়ে, পরীকে নিয়ে আসা হল বেডরুমে। রিয়াদের ভাবী বললেন, ‘বিছানার মাঝখানে বস’।”
ঘরের এক পাশে দেয়াল জুড়ে বুক সেলফ। আর এক পাশে সোফা। পরী লজ্জাজড়িত কণ্ঠে বলল, এখানেই বসি, বলে সোফাতেই বসে পড়ল। পরীকে ঘিরে সবাই গোল হয়ে বসে নানান প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করতে লাগল। পরী নাম কে রখেছে এই উত্তর শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে রইল। এ প্রশ্নের উত্তর কত শতবার যে পরীকে দিতে হয়েছে তার হিসেব নেই।
পরী শান্ত স্বরে বলল, ‘আমার নানাী।’
ছোট ননদ বলল, ‘তোমার নানী বুঝতে পেরেছিল তুমি পরীর মত সুন্দর।’
একথাটাও পরী বহুবার শুনেছে, আরও কতবার শুনতে হবে কে জানে। রিয়াদের এক দাদী বললেন, ‘আমার নাতির ওপর পরী ভর করেছে।’ এ কথা শুনে সবাই এক সাথে হেসে উঠল।
আজ চৌধুরী বাড়ির অঙ্গন নানান ধরনের কথা—বার্তায়, হাসি—খুশি, আনন্দ—উল্লাসে ভরপুর। এই আনন্দ ধ্বনি মেঘ গুড় গুড় আর বজ্রপাতের শব্দ ভেদ করে সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল।
রিয়াদ ঘরে প্রবেশ করার সাথে সাথে সবাই চলে গেল। রিয়াদ চলে গেল পাশের ঘরে। ফিরে এল হাতে এক গুচ্ছ কদম ফুল নিয়ে। ঝলমলে আলো নিভিয়ে হালকা নীল রংয়ের আলো জ্বালিয়ে পরীর সামনে এসে দাঁড়াল। পরী উঠে দাঁড়ালে কদম ফুল গুচ্ছ তার হাতে দিয়ে, পরীর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে জলদ গম্ভীর গলায় গাইল,
বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে এসেছি, তোমারি এ দ্বারে,
পথিকেরে লহ ডাকি তব মন্দিরের এক ধারে।
পরী মনে মনে ভাবল, রুচি কি আর্মি অফিসার সাহেবের। বাসর রাতে গোলাপ, রজনী গন্ধা না এনে, এনেছে কদম ফুল। আবার গাইছে একটা ফুল ছাড়া গান।
পরী সুমধুর কণ্ঠে, পান্ডিত্যের ভঙ্গিতে বলল, ‘এ বর্ষণ রাতে, কদম ফুল হাতে দিয়ে গাইতে হয়Ñবাদল দিনের প্রথম কদম ফুল।’
রিয়াদ এক লাইন গাইল। তারপর ব্যাখ্যা করল, ‘ওই দক্ষিণের জানালা খুললে বিশাল একটা কদম গাছ দেখতে পাবে। আমার বাবার হাতের গাছ। বাবা ফুল দেখতে পাননি। ফুল দেখার জন্য অপেক্ষার পর অপেক্ষা করে বাবা নিজেই একদিন ঝরে গেলেন।’
খুব বিষাদ ভরা কন্ঠে বলল, ‘এই গাছের প্রথম ফোটা কদম ফুল আমি বাবার কবরে দিয়েছিলাম। যেখানেই থাকিনা কেন, প্রতি বছর বর্ষায় এসে আমি বাবার কবরে কদম ফুল দেই। আমার খুব প্রিয় ফুল।’
কদম ফুল সম্পর্কে কিছু তথ্যও দিল। পৌরাণিক কাহিনী হিন্দু পুরাণের সাথে এর গভীর সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে রাধা—কৃষ্ণের সাথে। মনে করা হয়, এ গাছের নীচে রাধা—কৃষ্ণ খেলা করত ও বিশ্রাম নিত। বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে নিওলামারকিয়া কাদাম্বা।
গভীর আবেগের সাথে বলল, ‘এখন বষার্ কাল। আজ আমাদের প্রথম মিলন। বর্ষার বার্তাবাহক হিসাবে, এ ফুল দিয়ে তোমায় বরণ করলাম। প্রার্থনা, আমাকেও তুমি বরণ করবে। দূরে ঠেলে দেবে না। গানটা এজন্যই গাইলাম।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল রিয়াদ।
তুখোড় বুদ্ধিদীপ্ত মানবী পরী, হতভম্ব হয়ে অপলক দৃষ্টিতে রিয়াদের মুখের দিকে চেয়ে রইল। এত স্মার্ট আর এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে এই মানুষটি!
পরী রিয়াদের হাত দুখানা ধরে বিনীতভাবে বলল, ‘সরি টু হিয়ার এ্যাবাউট বাবা। এখন থেকে আমি বাবার কবরে কদম ফুল দেব।’
আই.এসসি পাশের অবজ্ঞার কথা ভুলে পরী এই সুদর্শন, সুভাষী, ও বিনয়ী আর্মি অফিসারের প্রেমে পড়ে গেল।
খুব ভোরে পরী ঘুম থেকে উঠে যখন সেই দক্ষিণের জানালা খুলে বাগান বাড়িটি দেখল, তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। শহরের মধ্যেই এতবড় বাগান বাড়ি। কত রকমারি ফলের গাছের মধ্যে, একটি মাত্র কদম ফুলের গাছ। আর এই কদম ফুলের গাছটিই পুরো বাগান বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, রাণীর মত মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
পরীর বিয়ের কিছুদিন পরই বাড়ির পিছন দিকের অনেক পরিবর্তন হল। শুধু কদম গাছটি রেখে পুরো বাগান বাড়িটি গুড়িয়ে ফেলে, এপাটমেন্ট বিল্ডিং তৈরি করে ভাড়া দেয়া হল। একবার বৈশাখী ঝড়ে কদম গাছটি গোড়া সহ উপড়ে পড়ল। রিয়াদের কষ্টের সীমা রইল না। রিয়াদ সেই কদম গাছের ডালের কলম চারা বানিয়ে, ঠিক সেই জায়গাতেই নতুন কদম গাছের চারা অতি যত্নে রোপন করল।
স্মৃতি পটে ভেসে ওঠে কত স্মৃতি। কত বছর হয়ে গেল, কিন্তু মনে হয় এই তো সেদিন। রিয়াদ নেই দশ বছর হল। এই দশ বছর ধরেই প্রতিটি বিবাহ বার্ষিকীতে পরী বাসর রাতের সেই ফুলদানিটিতে একগুচ্ছ কদম ফুল রাখে। রাতে হালকা নীলাভ আলো জ্বালিয়ে অতীত স্মৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যায়।
সেই বাসর রাতের ভোরের মতই, পরী আজ দক্ষিণের জানালা খুলে কদম গাছের দিকে তাকাল। রিয়াদ কদম গাছের গোড়ায় গোল করে শান বাঁধানো বেদি বানিয়ে ছিল। এপার্টমেন্টের বাসিন্দারা সেখানে বসে গল্প—গুজব করে।
লন্ডন থেকে ফোন এসেছে। পরী হ্যালো বলায় ও—পাশ থেকে বড় নাতনী রিমুর গলা ভেসে এল, ‘হ্যাপি এ্যানিভার্সারি নিনিমা।’
নবীন ডাক্তার এই নাতনীর সুরেলা কন্ঠ শুনে সারাজীবনের টুকরো টুকরো সুখ—স্মৃতিগুলো উধাও হয়ে গেল। বিষাদময় এক বেদনার স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। আজ ছেলের নাতি—নাতনীও ফোন করতে পারত। কথা শেষ হলে ধীমানের মুখখানা ভেসে উঠল চোখের সামনে। বুকের ভেতর যেন এক খাঁ খাঁ মরুভূমি বাসা বেঁধে আছে, বড় ছেলে ধীমানের মৃত্যুর পর থেকেই। সে যে রকম অকস্মাৎ পরীর পেটে এসেছিল, বিয়ের মাত্র তিন দিনের মধ্যে। জন্মে ছিল ত্রয়োদশী তিথিতে। ছয় বছর বয়সে, তেমনি এক পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় অকস্মাৎ চলে গেল। সে বেড়ে উঠেছিল এক সন্দেহের সন্তান হিসাবে। রিয়াদের মা বিশ্বাস করতে চায়নিÑ ধীমান রিয়াদের ছেলে। অন্যদেরও হয়তো বা সন্দেহ ছিল, কিন্তু সেভাবে প্রকাশ পায়নি।
পরীর শ্বাশুড়ি এক কুৎসিত সন্দেহের জাল বিস্তার করল তার বিয়ের তিন মাস পর। যখন প্রেগনেন্সি টেস্ট পজেটিভ হল। বিয়ের তিন দিন পর এক বছরের জন্য রিয়াদ চলে গেল ট্রেনিংএ। পরী হোস্টেলে ফিরে গিয়ে, এম.এ ফাইনাল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। বমি আর মাথা ঘোরা শুরু হলে ডাক্তার প্রেগনেন্সি টেস্ট করল। এবং চমৎকার একটি সুসংবাদ দিল, নবীন প্রজন্মের আগমন। পরীর মা রিয়াদের মাকে ফোন করে সুখবরটি দিলে, মেয়ের শিক্ষক—শ্বাশুড়ির উত্তরে তিনি অপমানিত বোধ করলেন। খুশি তো দূরের কথা তিনি চিৎকার করে প্রশ্ন রাখলেন,
‘এ কি করে সম্ভব? ছেলে আমার বিয়ের তিনদিন পর চলে গেল, আর বৌমা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেল? আপনার পন্ডিত মেয়ে তো আমার ছেলেকে পছন্দই করেনি। আমরা তো আর খেঁাজখবর নেইনি, আপনার মেয়ের কারো সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না। আমার ছেলের তর সইল না, তাই খেঁাজ নেবার সময় পাইনি।’ বলেই তিনি ফোন রেখে দিলেন।
শ্বশুড় বাড়িতে, আশে—পাশে শুরু হল নানা ধরনের কানা—ঘুষা। পরী রিয়াদকে জানানোর আগেই রিয়াদ ফোন করে বলল, ‘আমাকে বলোনি কেন? মার কাছ থেকে শুনতে হল।’
পরী দৃঢ়তার সাথে বলল, ‘থ্যাংক ইউ, যে তুমি সুখবর হিসাবে নিয়েছ। মা তো নেয়নি।’
রিয়াদ ওই প্রসঙ্গে না ফিরে, কংগ্রাচুলেশন জানাল বহুবার। বলল, মেয়ে হলে নাম রাখব অবনী, আর ছেলে হলে ধীমান।’ পরীর দু’চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রম্ন ঝরতে লাগল।
ধীমান দেখতে হয়েছে হুবহু পরীর মত। দেখতে যদি রিয়াদের মত হত, হয়ত ওর দাদীর মনও নরম হত, আর সন্দেহও দূর হত। বড় বড় চোখ আর মাথাভর্তি কালো ঝাকরা চুল ধীমানকে পরী যখন ওর দাদীর কোলে তুলে দিল, উনি কোলে নিলেন কিন্তু ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকালেন পরীর দিকে।
রিয়াদ যখন ট্রেনিং শেষ করে ফিরল, ধীমান তখন দু মাসের। ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, ‘দেখতে অবিকল তোমার মত হয়েছে ।’
বেশ কয়েকদিন পর শ্বাশুড়িমা রিয়াদকে ঘরে ডেকে পাঠালেন। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক পরে, রিয়াদ বের হয়েই বাইরে চলে গেল। ফিরল বেশ রাত করে। ঘুমন্ত ছেলেকে আদর করে শুয়ে পড়ল। বেশ চুপচাপ।
পরী জিজ্ঞেস করল, ‘কি হয়েছে তোমার? মার সাথে কি কথা হল?’
রিয়াদ খুব শান্ত স্বরে অকপটে বলে ফেলল, ‘ছেলেকে নিয়ে কথা বলল। বুঝেছ তো কি বলতে পারেন তিনি।’
বলেই পরীকে জড়িয়ে ধরে বোঝাল, মা শিক্ষিত হলেও টিপিক্যাল সেকেলে মহিলাই রয়ে গেলেন।
পরী জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি বললে?’
“বললাম আমারটা আমি বুঝব। তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। খুবই মন খারাপ করলেন তিনি। আমাকে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। আমি বুঝতে চাইলাম না। তার মাথা থেকে এ কুচিন্তা দূর করতে অনুরোধ করলাম।’ বেশ বিশ্বস্ততার সাথে বলল রিয়াদ।
পকেট থেকে টিকিট বের করে বলল, ‘টিকিট নিয়ে এসেছি, আমরা পরশুই যশোরে চলে যাচ্ছি। ওখানেই পোস্টিং হয়েছে আমার।’
পরী বলল, ‘ডি.এন.এ টেস্ট করে মাকে দেখাও।’
ভীষন রেগে গেল রিয়াদ। বলল, ‘প্রমিজ করো একথাটি আর কোনোদিন উচ্চারণ করবে না।’ কিন্তু সাথে যোগ করল, ‘একটা আফসোস রয়ে গেল আমার, বিয়ের পর তোমার প্রথম পিরিয়ডটা আমি দেখতে পাইনি।’
বাসর রাতের সেই বিনয়ী ভদ্রলোকটির কাছ থেকে, আজ আবারও বিনয়ীভাবে বলা এ কথাটি শুনে বিস্মিত ও নীরব হয়ে, স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রিয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকল পরী। মনে হল ভালোবাসার মধ্যে কি একটা ফাটল ধরল।
ছেলের যত্নের পাশাপাশি বি.সি.এস শেষ করে চাকুরির চেষ্টা করতে লাগল পরী। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হল, রিয়াদের পোস্টিং ঢাকায় হলে সে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করল। পাঁচ বছর পর মেয়ে হল, হুবহু রিয়াদের মত দেখতে। রিয়াদ মেয়ের নাম রাখল অবনী।
এর মধ্যে ছয় বছর হয়ে গেল বাড়িতে আর যাওয়া হয়নি। অসুস্থ শ্বাশুড়ির খুব ইচ্ছা ছেলে—মেয়েরা নাতি—নাতনী নিয়ে একবার গ্রামের বাড়িতে আসুক। রিয়াদেরও ইচ্ছা মায়ের সাথে সম্পর্কটা ঠিকঠাক করে নেবে। তাদের বংশধরকে নিয়ে শ্বাশুড়ির কুৎসিত চিন্তার ব্যাপার নিয়ে কোনোদিন মাথা ঘামায়নি পরী। তার দুই সন্তানকে নিয়ে মাথা উঁচু করে রিয়াদের সাথে সুখে—শান্তিতে সংসার করছে সে। ছয় বছর পর রিয়াদ মায়ের সাথে কথা বলল। ঠিক হল পরী আগে যাবে। রিয়াদ কয়েক দিন পরে আসবে।
পরী প্রথম রিয়াদদের গ্রামের বাড়িতে এল। প্রায় চল্লিশ ফুট লম্বা টিনের দোতলা। আর এই দোতলার চল্লিশ ফুট বারান্দা জুড়েই কিছুদূর পরপর নানান জাতের অর্কিড ঝোলানো। বাড়ির সামনের বাগানেও বিভিন্ন জাতের ফুলের গাছ, এক অনন্য প্রাকৃতিক শোভা বর্ধন করে আছে এ বিশাল বাড়িটি ঘিরে। বাড়ির পিছনের দরজা খুললেই প্রশস্ত একটি ইট বাঁধানো রাস্তা, ঘাট বাঁধানো পুকুর পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়েছে। রাস্তার একপাশে সুপারি বাগান, আর একপাশে ফলের। এই দুই বাগানেই মাঝে মাঝে বাঁশের মাচা আর শ্বেত পাথরের চেয়ার। পাশাপাশি দুটো দোলনা। একটা বড়দের আর একটা ছোটদের। ছোটদের খেলার জন্য আলাদা একটি ছোট্ট মাঠও রয়েছে। এগার বিঘার ওপরে এই বাড়ি। ঘাট বাঁধানো পুকুরে পরিষ্কার টলটলে পানি। চারপাশে গাছপালা বেষ্টিত এ বাড়িটি খুবই পছন্দ হল পরীর। সে মনস্থির করল প্রতি বছর একবার করে সে এখানে আসবে।
এবার বাড়িভর্তি মানুষ। বড় ভাবি তার দুই কলেজ পড়–য়া ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। বড় ননদ, ছোট ননদ তাদের পুরো পরিবার নিয়ে এসেছে। রিয়াদের কাজিনরাও এসেছে। ছোট ছোট ছেলে—মেয়েদের হৈ—হুল্লোড়ে এক আনন্দমুখর পরিবেশ। অবনীকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত। রিয়াদের মা এবার ধীমানকে বুকে টেনে নিলেন। সবাই লক্ষ্য করল, এতদিন পর শ্বাশুড়ির আচরণের এ পরিবর্তনে, পরীর কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
আত্মসচেতন পরী, মনে মনে শ্বাশুড়ি মায়ের এ শুভ আচরণের কারণ খুঁজতে লাগল। গতরাতে রিয়াদ ফোন করেছিল। মায়ের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলার পর পরীর সাথে কথা বলল। রিয়াদকে খুব খশি মনে হল। জানালো কালকে এসে পরশুই চলে যাবে। পরের সপ্তাহে এসে পরীকে নিয়ে যাবে।
রিয়াদ এলে শ্বাশুড়ি মা রিয়াদকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলেন।
রিয়াদ বহুদিন পর সবাইকে এক সাথে পেয়ে কলকলিয়ে কথা বলা শুরু করল। এ যেন এক অন্য রকম রিয়াদ, গুরু গম্ভীর আর্মি অফিসার নয়। সেদিন ছিল চাঁদনী রাত। রিয়াদ পরীকে নিয়ে পুকুর ঘাটে বসে, ছোট বেলার, বড় বেলার অনেক রকম মজার মজার গল্প করল। ফিরে এসে সব ভাই—বোন মিলে তাস খেলতে বসল। পরী ঘরে এসে রিয়াদের এ্যাটাচি কেসটা টেবিল থেকে সরিয়ে আলমারিতে রাখার জন্য হাতে নিতেই খুলে গেল। লক খোলা ছিল পরী বুঝতে পারেনি। এলোমেলো হলে গুছাতে গিয়ে পরী একটা হাসপাতলের খাম পেল। খুলে দেখে প্যাটারন্যাল ডি.এন.এ টেস্ট রিপোর্ট। যেটি প্রমাণ করেছে রিয়াদ ধীমানের বাবা। পরীর সাথে কোনোরকম আলোচনা না করেই রিয়াদ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছয় বছর আগে পরীই বলেছিল ডি.এন.এ টেস্ট করাতে। শ্বাশুড়ির সন্দেহটা যেন দূর হয়। তখন পরীর ওপর ভীষণ রাগ করেছিল রিয়াদ। এত বছর পর এ বিষয়টি এত জরুরী হল কেন! পরী বুঝতে চেষ্টা করল। ভাবল, কি জানি মা একটা মিথ্যা ধারণা নিয়ে থাকবে, সেটি হয়ত চায়নি রিয়াদ। পরী এ্যাটাচি কেসটা টেবিল থেকে আর সরাল না।
তার বুকের ভিতরে জমে থাকা একটা অস্বস্তি থেকে সেও যেন মুক্তি পেল। এক কাপ চা নিয়ে পরী ব্যালকনিতে বসে, মধ্য রাতের জোৎস্না উপভোগ করায় মনোনিবেশ করল। খুশির বন্যা বয়ে যাচ্ছে পরীর মনে। ডি.এন.এ টেস্ট করার মাধ্যমে রিয়াদ নিজেকে এবং তার পুরো পরিবারকে অপমানিত করল। সাথে পরীর কাছেও অপমানিত হল। এ জন্য মনে মনে রিয়াদকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাল পরী, আর অপেক্ষায় থাকল, রিয়াদ কখন এ বিষয়ে মুখ খুলবে।
পরদিন দুপুরে মাকে আর দুই ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করে এ্যাটাচি কেসটি হাতে নিয়ে, মহাশান্তিতে কর্মস্থলে চলে গেল রিয়াদ। নিজের ঘরে এসে ধীমানকে বুকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁাদতে লাগল পরী। ধীমান বিস্মিত হয়ে, মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘কাঁদছো কেন মা?’ সেদিন বিকেল না গড়াতেই ধীমান যে এত বড় শাস্তি দিয়ে চৌধুরী বাড়ির সবাইকে নিস্তব্ধ করে দেবে কেউ টের পায়নি।
বিকেলে চায়ের আড্ডা বসেছে পিছনের বাগানে। বাচ্চারা বল খেলছে। এত জোরে কিক করেছে যে বল খুঁজে পাচ্ছে না। সবাই খঁুজছে। বিকেলের আলো নিভে সন্ধ্যে হয়ে এল। পূির্র্ণমার চাঁদের আলোয়, পুকুরে বলের সাথে পাওয়া গেল ধীমানের লাশ। প্রতিদিন এ বিষাদময় স্মৃতি নিয়েই পরীর একাকীত্ব জীবন বয়ে যাচ্ছে।
প্রতি বছরের মত এবারও বিবাহ বার্ষিকীতে পারিবারিক কবরস্থানে যাবার জন্য তৈরি হয়ে কদম ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে পরী। ড্রাইভার এলেই রওনা হবে। ধীমানের মুখের আদলখানা চোখের সামনে ভেসে উঠল। বিয়ের দশ মাসের কয়েকদিন আগে ধীমান জন্মেছিল। বেঁচে থাকলে আজ ওর বয়স হত চুয়ান্ন বছর। পরী যেন রিয়াদ আর ধীমানকে একসঙ্গে দেখতে পেল। পরী এখনও কারণ খুঁজে বেড়ায়, রিয়াদ ডি.এন.এ টেস্টের বিষয়টি গোপন রেখেছিল কেন পরীর কাছে? রিয়াদের ওপর এ অভিমানটি প্রতিটি মুহূর্তে পরীকে কাঁদায়। বুক ফাটা এই চাপা কান্নাকে চেপে রেখে, কদম ফুল হাতে নিয়ে কবরস্থানের দিকে রওনা দিল পরী। কানের কাছে যেন স্পষ্ট শুনতে পেল, ধীমানের শেষ কথাটি ‘কাঁদছো কেন মা’।
