জিন্দাবাদ ও জিন্নাহবাদের প্রাপ্তি কেবল নিন্দাবাদ || আনিস আহমেদ
বড়ই এক অদ্ভুত সময় অতিক্রম করছি আমরা। যে জিন্দাবাদকে বাঙালি প্রত্যাখান করেছিল সেই ১৯৬৯—৭০ সালেই এবং যে জিন্নাবাদকে ১৯৪৮ সালেই বাদ দিয়েছিল বাঙালিরা সেই কলুষিত অধ্যায়কে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে একটি মহল যারা সুযোগের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসেছিল। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান, যিনি জয় বাংলাকে শিরোধার্য করে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই তিনি যখন বাংলাদেশের প্রথম মিলিটারি হয়ে উঠলেন তখন মুশতাককে অনুসরণ করে তিনিও জয় বাংলাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে জিন্দাবাদের ছত্রতলে চলে গেলেন। তাঁকেই অনুসরণ করলেন তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া আর বংশানুক্রমে তারেক রহমানও সেই পথই ধরলেন। তারেক তাঁর বাবার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব করেন, এমন কী তাঁর বাবাকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেও আখ্যায়িত করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’কে অবমূল্যায়িত করেন। যাঁরা বলেন যে জয় বাংলা, জয় হিন্দের সমতুল্য, তাঁরা কি ভুলে যান যে দু’টি বিষয় এক নয়, এখানে ভিন্ন দু’টি দেশের কথা বলা হচ্ছে। আর জয় শব্দটির উৎপত্তি যেহেতু প্রাচীন সংস্কৃত থেকে, সেহেতু বাংলা ও হিন্দিতে তা অভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তারপরও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বেশ অনেক দিন থেকে জয় বাংলা বলার পাশাপাশি এ কথাও বলতেন, বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক। এত সব সত্ত্বেও জিন্দাবাদ শব্দটি প্রতিষ্ঠিত করতে যারা বদ্ধপরিকর তাদের উদ্দেশ্য ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের সখ্যতার প্রমাণ স্বরূপ এই জিন্দাবাদ শব্দটির ওপর জোর দিয়ে চলেছে। পারলে তারা পাকিস্তান জিন্দাবাদও বলে ফেলে এমন অবস্থা এখন। সৌভাগ্যবশত তেমন কিছু বলার দুঃসাহস এখনও তারা দেখায়নি। তবে বিছু লোক ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলছে, তারা কি বোঝে যে ইনকিলাব (বিপ্লব) চিরজীবী হলে বাংলাদেশে কোনো দিনও মানুষের মনে শান্তি ও স্বস্তি আসবে না! আসলে নিজের সংস্কৃতি এবং নিজের ভাষাকে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে যারা পরের ভাষার ওপর নির্ভর করে, তারা পরজীবী প্রাণীর চেয়ে বেশি কিছু নয়।
জিন্দাবাদের পাশাপাশি এখন জিন্নাহবাদও (অর্থাৎ জিন্নাহতন্ত্র) স্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর ভাষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁর সভা বর্জন করেছিলেন, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষার্থী ছাত্র সংসদের সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরিয়ে জিন্নাহর ছবি টাঙিয়ে দিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগেরই এক ছাত্র আবু তৈয়ব হাবিলদার জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে জিন্নাহ আমাদের মাতৃভাষার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, যে জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্র—ছাত্রীদের গ্রেপ্তার করেছিল, সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।’ অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছেন এই তরুণ যিনি অবশিষ্ট তারুণ্যশক্তির দৃষ্টি ফিরিয়েছেন সেই ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চের দিকে, জিন্নাহ যখন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হিসেবে ঢাকায় এসে তাঁর ইংরেজি ভাষণে বলেন ‘উর্দু, এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষার্থীরা, ‘নো নো’ বলে তাঁর এই ভাষণ প্রত্যাখান করেন। জিন্নাহ নিজে যে কখনও ভালো উর্দু জানতেন তা নয় কিন্তু, তিনি নামাজ পড়তেন বলেও জানা যায় না অথচ ইসলামকে ব্যবহার করেছিলেন ভারত বিভক্তির জন্য, সেই ভ্রান্ত দ্বি—জাতিতত্ত্ব ব্যবহার করে যা মূলত সাম্প্রদায়িক তত্ত্বই ছিলো বটে। জিন্নাহর এই তত্ত্ব যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থি সে কথা বলাই বাহুল্য। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় জনৈক মোঃ আব্বাস যথার্থই লিখেছেন, ‘ইতিহাসের দলিল ঘাঁটলেই দেখা যায়, জিন্নাহর ‘পাকিস্তান’এ আসলে শুরু থেকেই একটা স্পষ্ট, সৎ রাষ্ট্র—পরিকল্পনা ছিল না; এটা ছিল রাজনৈতিক দর—কষাকষির একটা কৌশল, যেটা শেষ পর্যন্ত এমন একটা বাস্তবতায় রূপ নেয় যার বলি হতে হয়েছিল বাঙালিকে’। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একাধিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেছিলেন তাতে যেমন মুসলমানদের পৃথক অস্তিত্ব রক্ষা করা যেতো, তেমনি প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষা করা যেতো কিন্তু পরবর্তীতে জিন্নাহ দিল্লির সম্মেলনে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে যে অখন্ড (প্রকৃতপক্ষে খন্ডিত) পাকিস্তান গঠনের প্রস্তাব পাশ করিয়ে নিলেন তা ছিল পূর্বাঞ্চলকে, পশ্চিমাঞ্চলের অধীনস্থ করার এক কূট—চাল।
বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি জিন্নাহর কাছে কোনো গ্রহণযোগ্য বিষয়ই ছিল না। তিনি বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তিনি মনে করতেন পূর্ববঙ্গের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আলাদা কোনো গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য নয়। জিন্নাহ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের কাছে তৎকালীন পূর্ব বাংলা ছিলো কেবল জনসংখ্যা ও ভোটের উৎস। বাঙালিদের স্বকীয় জাতীয় পরিচয় ও ভাষাভিত্তিক অধিকারকে তারা উপেক্ষা করেছিলেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তিনি হিন্দুয়ানি বলে মনে করতেন যেমনটি এখনও মনে করেন মুসলমানদের উগ্রবাদি ও সাম্প্রদয়িক একটি গোষ্ঠী। ২০০২ সালে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমি ভয়েস অব আমেরিকা থেকে ‘বাহান্ন এখন পঞ্চাশে’ শীর্ষক একুশ পর্বের একটি ধারাবাহিক অনুষ্ঠান করি। সেই অনুষ্ঠানে আমি বিভিন্ন বিশ্লেষকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। এক সাক্ষাৎকারে প্রথিতযশা অধ্যাপক (বর্তমানে প্রয়াত) আনিসুজ্জামান বলেন, ‘বাংলা ভাষার দাবি সম্পর্কে বুঝিয়ে বলার জন্য ছাত্ররা যখন তাঁর সঙ্গে বৈঠক করতে চান, তখন তিনি শর্ত জুড়ে দেন যে সেই বৈঠকে যেন কোনো হিন্দু ছাত্র যোগ না দেন’। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানেও জিন্নাহ হিন্দুদের সহ্য করতে পারেননি, ভেবেছিলেন হিন্দুরাই কেবল বাংলা ভাষার দাবি করছে। বড় লাট জিন্নাহর কথা মেনেই কতিপয় মুসলমান তরুণ গিয়েছিলেন জিন্নাহর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু জিন্নাহর প্রত্যাশা পূর্ণ হয়নি। এই মুসলমান তরুণরাও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে তাদের দাবিতে অনড় ছিলেন। জিন্নাহ তাও বুঝতে চাননি যে বাংলা ভাষা, হিন্দু—মুসলমান সকলের ভাষা। সেই জিন্নাহ যিনি একমাত্র উর্দুকেই তদানীন্তন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলেন। কারণ পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র, সেই জিন্নাহকে যদি এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী আদর্শ হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে সেটি হবে বাংলাদেশের জাতীয়তাবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ইসলামি ছাত্র শিবিরকে জয়ী করা হলো সেদিন থেকেই বোঝা গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের হাতে চলে গেছে। জিন্দাবাদের মতো তারা জিন্নাহবাদকেও প্রতিষ্ঠিত করতে চায় বাংলাদেশে। তবে তাদের সেই আশার গুড়ে বালি, সেটাও বোঝা গেল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক ছাত্র, জিন্নাহর সেই ছবি ছিঁড়ে ফেললো। এখন আবার প্রয়োজন ডাকসুর প্রদর্শন কক্ষে বাংলাদেশের জাতির পিতার ছবি টাঙানো, যাঁর প্রেরণায় শিক্ষার্থীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই যুদ্ধে, যা আমাদের জন্যে এনেছিল একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
