ওবায়দুল কাদেরসহ সাত জনের বিরুদ্ধে মৃত্যু দন্ডাদেশ
বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম—নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাত নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের মৃত্যদন্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সাত আসামির প্রত্যেকের বিরুদ্ধে চারটি করে অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। একেকজনের বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে কোনোটিতে মৃত্যুদন্ড, কোনোটিতে আমৃত্যু কারাদন্ডের রায় ঘোষণা করেছে ট্রাইব্যুনাল।
এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান।
এছাড়াও এই মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
এই সাত আসামিই পলাতক রয়েছে বিধায় আইনানুযায়ী তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রায়ের পর এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগ নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে।
‘প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডের আদেশ হয়েছে, আমৃত্যু সাজা ভোগ করার আদেশও হয়েছে,” বলেন মি.ইসলাম।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘এর মধ্যে মামলার প্রথম আসামি ওবায়দুল কাদেরের তিনটি কাউন্টে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে, একটি কাউন্টে আমৃত্যু সাজা দেওয়া হয়েছে। দুই নম্বর আসামি আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে দুই নম্বর কাউন্ট থেকে খালাস, এক নম্বর চার্জে আমৃত্যু সাজা দেওয়া হয়েছে এবং তিন ও চার নম্বর চার্জে মৃত্যদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।’
‘মোহাম্মদ আলী আরাফাতকে তিন নম্বর কাউন্ট থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে, এক ও চার নম্বর চার্জে মৃত্যদন্ডাদেশ এবং দুই নম্বর কাউন্টে তাকে আমৃত্যু সাজা দেওয়া হয়েছে। শেখ ফজলে শামস পরশকে এক নম্বর কাউন্ট থেকে খালাস, দুই নম্বর কাউন্টে তাকে আমৃত্যু সাজা দেওয়া হয়েছে এবং তিন ও চার নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে,’ বলেন মি. ইসলাম।
আসামিদের বিরুদ্ধে যে চার অভিযোগ
জুলাইয়ের গণঅ্যভুত্থানের সময়ের ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি, আন্দোলন দমনের নির্দেশ, অপহরণ ও হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
এই মামলার শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে ওবায়দুল কাদেরের বেশ কয়েকটি অডিও শোনানো হয়েছে। এসব অডিওতে মি. কাদেরকে তার নেতা—কর্মীদের জুলাই অভ্যুত্থান দমনের নির্দেশ দিতে শোনা গেছে।
মি. কাদেরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো, ২০২৪ সালের ১১ই জুলাই বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে তার সঙ্গে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মুঠোফোনে কথোপকথনে আন্দোলন দমনের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।
মি. কাদের তখন বলেছিলেন, ‘মারো না কেন ওদের, প্রশ্রয় দাও কেন?’
পরে ১৪ই জুলাই গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ‘রাজাকারের বাচ্চা ও নাতিপুতি” উচ্চারণ করে যে বক্তব্য দেন সেই সংবাদ সম্মেলনে মি. কাদের উপস্থিত ছিলেন। তিনি অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
একইসঙ্গে, পরদিন ‘আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব দেবে ছাত্রলীগ” এমন বক্তব্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের দমন করতে মি. কাদের নিজ দলের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা—কর্মীদের নির্দেশ দেন। ১৫ই জুলাই শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রতিহত করার জন্য নির্দেশ দেন।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম সেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটনে সমর্থন ও প্ররোচনা দেন।
এরই প্রেক্ষিতে বাহাউদ্দিন নাছিমের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ই জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর নৃশংসভাবে হামলা চালায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
একইসঙ্গে, মি. কাদেরের ওই নির্দেশসহ অন্যান্য বক্তব্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়।
এমন হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং সারাদেশে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন।
আন্দোলন দমন করতে মি. কাদের তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে ফোন করে ইন্টারনেটের গতি ধীর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
একইসঙ্গে, চব্বিশের ১৬ই জুলাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে ফোন করে ওবায়দুল কাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম মহানগরের সব এলাকা দখলে রাখার নির্দেশ দেন।
তার নির্দেশের পর আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করে চট্টগ্রামে চাঁন্দগাঁও থানাধীন মুরাদপুর এলাকায় মোহাম্মদ ওয়াসিম, ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যা করে।
একই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ছয়জন নিরীহ—নিরস্ত্র আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২০২৪ সালের ১৭ই জুলাই দলীয় নেতাদের তাদের নিজ নিজ এলাকায় আন্দোলন দমনের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দেন।
পরদিন ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চলমান বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে সরকারবিরোধী ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে আখ্যা দেন তিনি।
মি. কাদের ১৯শে জুলাই গণভবনে নিজ দল ও ১৪ দলের প্রধানদের বৈঠক শেষে কারফিউ জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘এটা অবশ্যই কারফিউ, সেটা শ্যুট অ্যাট সাইট হবে,’ এর অর্থ দেখামাত্রই গুলির নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের।
সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা—কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাহাউদ্দিন নাছিম অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।
তাদের বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনের জন্য শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনে কথোপকথনে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র করেন ওবায়দুল কাদের।
