কূপমণ্ডূকতার দিন শেষ

আগে অনেকবার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, আবার লিখতে হচ্ছেÑ যে দেশটি হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মত স্বাধীনতা অর্জন করে ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ প্রাণের এবং অজ¯্র ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে, সেই স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে নেয়ার যে কোনো অপচেষ্টা কোনোদিন সফল হবে না। হতে পারে না। ইতিহাসের একটি ব্যাকরণ আছে। ইতিহাস পিছনে যায় না। হয়ত গতি কখনো শ্লথ হয়। সেই সময় যারা সেই শ্লথ করার কারিগর তারা মনে করে তারা বিজয়ী হয়েছে। কিন্তু সময় বলে দেয় তাদের অপচেষ্টাঅপছিল। অপচেষ্টা ষড়যন্ত্রের অপর নাম। ষড়যন্ত্র যড়যন্ত্রই। সাময়িক হয়ত হয়, কিন্তু ষড়যন্ত্র কখনো জয়ী হয় না। আর যারা ষড়যন্ত্র করে তারামিরজাফরহিসাবে চিহ্নিত হয়। ২০২৪ সালে যে ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে, সে কথা সেই সময়ের অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রধান নিজেই স্বেচ্ছায় নিউইয়র্কে দাঁড়িয়ে গোপনে উচ্চারণ করতে গিয়ে (মিটিকিউলাস প্লান) ধরা পড়ে যান। একইভাবে এই প্রধান নিউইয়র্কে বসে উচ্চারণ করেন ইতিহাসেররিসেট বাটনঅন করার কথা। অতএব কেউ মনগড়া কোনো কথা বলছে না। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যাকারীরা যেমন স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছিল তারাই হত্যা করেছে। এবারও ২০২৪ এর এই ব্যক্তিও স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছেন।

বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবের সম্পদ, এবং অর্জন ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা। এত প্রাণ হারানো সত্ত্বেও কখনো শহীদের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যদের অনুতাপ করতে দেখা যায়নি, বরং প্রতিটি পরিবার নিজেদেরকেশহীদ পরিবারউল্লেখ করে গর্বিত বোধ করে। শুধু সরাসরি স্বজনরা নয়, দূরসম্পর্কের আত্মীয়রাও এই গৌরবের অংশীদার হয়।

এর জন্য কেউ জোর করেনি, কারো ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়নি, ভয় দেখানো হয়নি। স্বাধীনতার মাহাত্ম্য অনুভবই তাদের গৌরবের উৎস। এর জন্য একজন অবিসংবাদি ব্যক্তি ছিলেন। যাঁর ডাকে কোটি মানুষ যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে তার নামে একটা যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে কতিপয় দেশ ছাড়া পৃথিবী সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারের সমাবেশে হাজার হাজার বৃটিশের সমবেত হওয়া, নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে হাজার হাজার মার্কিনীর ঝাঁপিয়ে পড়া, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলকালাম হয়ে যাওয়ার মত ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর ঘটেছে? এটাই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ক্যারিশমা।

তাঁর বিশালত্ব অমরত্বকে ভয় পেয়েই যেমন তার ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে, তেমনই ভাস্কর্য ভেঙে সন্তুষ্ট হতে না পেরে তার বাড়ি ভাঙা হয়েছে। মানুষ যখন সবরকম কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে তখন কারো স্মৃতি নিশ্চিহ্ন করতে এমন কাজ করে। ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেই সময় বাঙালি জাতির সবচেয়ে গৌরবের স্মারক কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ধ্বংস করে কামানের গোলায়। এই উদাহরণও ভুলে যায় যারা, তাদের কোনো সম্মানের চোখে দেখার এক বিন্দু ফাঁকও কি বাকি থাকে? আর সেই সময়ের সরকার জন বীরশ্রেষ্ঠর ভাস্কর্যসহ মুজিবনগর সরকারের স্কাল্পচার গার্ডেন ধ্বংস ৭১এর চিহ্নমুছে দেয়ার নামে যে ধ্বংসলীলা তা থামানোর কোনো চেষ্টা তো করেইনি বরং তাদের সহায়তা করেছে। অতএব তারা যে একাত্তরের শত্রু এটা প্রমাণের কোনো দরকার নেই।

২০২৪এর পর থেকে যারা মনে করেছিলএকাত্তরশেষ, তারা ১৯৪৭ থেকে ২০২৪এ চলে এসেছে। শেরেবাংলা, সোহরাওয়াদীর্, জিন্নাহ, ভাসানী আছে, কিন্তু তাদের তালিকায় বঙ্গবন্ধু নেই। আর সে জন্যই যখন ডাকসু ভবনে জিন্নাহ ছবি সসম্মানে স্থান পায় সেখানে বঙ্গবন্ধুকে এককভাবে না দিয়ে দলে ভিড়িয়ে দেয়। ওরা মনে করেছিল আগুনকে বুঝি ছাই চাপা দিয়ে রাখা যাবে।

স্বীকার করতে হবে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যে তিনটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে, তাদের একাত্তর নিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। হঠাৎ করে সোশাল মিডিয়ার যাত্রা শুরু হওয়ায় এই মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি পদচারণা তরুণদের। এক শ্রেণীর একাত্তর বিরোধী অপশক্তি নতুন প্রজন্মের তরুণদের ভুল শিক্ষা দিয়ে প্রচন্ডভাবে বিভ্রান্ত করে আসছে। তাদের বলা হয়েছে পিছনের দিকে তাকানোর দরকার নেই, সামনে যেতে হবে। এই কূপমণ্ডূকরা জানেই না গ্রীস, রোম, ব্যাবিলন, ইজিপ্ট, মেক্সিকোর মানুষ তাদের সভ্যতা নিয়ে কতটা গর্বিত। আমেরিকা নতুন দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের অতীতকে স্মরণ করার জন্য ইতিহাসের হিরোদের মূর্তি তৈরি করে রেখেছে। আগলে রেখেছে মিউজিয়মে। পথে পথে। পার্কে পার্কে।

বাংলাদেশের বিভ্রান্ত প্রজন্ম এতটাই অল্পশিক্ষিত যে জানেই না অতীতই বর্তমানের ভিত্তি, বর্তমান ভবিষ্যতের ভিত্তি। আমাদের তরুণ সমাজ হয়ত সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হয়েনিজেদের রাজাকারবলে পরিচয় দিয়েছে। তারা যদি জানত যে রাজাকাররা শুধু স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল তাই নয়, তারা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের সেইসব বাড়ি চিনিয়ে দেয়ার পথ প্রদর্শক, যেসব বাড়িতে আমাদের মাবোনচাচিখালাফুফুরা থাকতেন। ওরা ছিল ধর্ষকদের দোসর।

আজ ডাকসু ভবনে যারা জিন্নাহকে তথাকথিতমহাননেতা বানানোর চেষ্টা করেছে, একজনের প্রতিবাদেই তাদের সব ষড়যন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে উঠেছে, মাত্র একজনের প্রতিবাদে। আর এই একজনের সাহসী প্রতিবাদের ঝড় পৃথিবী জুড়ে বাস করা বাঙালিদের উদ্বেলিত করেছে। এক সময় সোশাল মিডিয়া অনেক বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। তাতে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। ভুল তথ্যে উস্কানিতে অনেক মন্দিরমসজিদপ্যাডোগার ক্ষতি হয়েছে। ভুল বারবার হয় না। ভুল থেকে যারা শিক্ষা নেয়, তাদেরই উন্নতি হয়। এখন সোশাল মিডিয়ার বিভ্রান্তি অনেকেই ধরে ফেলে। কিন্তু গুগলের সার্চ ইঞ্জিন বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সার্চ ইঞ্জিন মুহূর্তে সঠিক তথ্য বের করে এনে মানুষদের জানিয়ে দেয়, সত্যমিথ্যার তফাৎও খুব সহজে নির্ণয় করা যাচ্ছে।

অতএব সত্যের জয় হবেই। স্বাধীনতার জন্য রক্তদান বৃথা যাবে না। খুব দ্রুতই অতীত আর অতীত থাকবে না, একেবারে চোখের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাবে। যার যা এবং যতটুকু অবদান তা বানিয়ে বলার দিন শেষ। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসের সব কিছু লিপিবদ্ধ আছে সেই সময়ের সংবাদপত্রের পাতায় এবং বিভিন্ন গবেষকদের গ্রন্থে। শুধু বাংলাদেশের সংবাদপত্রে নয়, পৃথিবীর বিখ্যাত স্বনামধন্য পত্রপত্রিকার পাতায়ও। কোনো বা একাধিক কূপমণ্ডূকের বানানো গল্পে ইতিহাস পাল্টে যাবে এমন ভাবাটাও এক ধরনের কূপমণ্ডূকতা।

Related Posts