রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল কেন জরুরি || বুলবুল সিদ্দিকী
গণ—অভ্যুত্থান—পরবর্তী বাস্তবতায় রাজনৈতিকভাবে একটি স্থিতিশীল ব্যবস্থায় ফিরে আসা অনেক সময়ই কঠিন হতে পারে। আবার সেই প্রেক্ষাপট নিয়ে আসতে পারে ইতিবাচক বদলের হাতছানি। বিগত দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, দেখেছি অনেক কমিশনের সুপারিশ এবং শেষে জুলাই সনদ। কিন্তু এত আয়োজনের পরও আমরা আসলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটা বদল দেখছি বা প্রত্যাশা করছি, সেটি একটি বড় প্রশ্ন।
আবার এ প্রশ্নটাও সামনে আসছে, কাগুজে সংস্কার হলেই কি সব রাতারাতি পাল্টে যাবে, যদি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল না ঘটে? কেননা বাংলাদেশের মতো একটি দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে নেতা—কর্মী ও অংশীজনদের প্রবল আধিপত্যের মাধ্যমে যেখানে দলীয় সুবিধা, আনুগত্য, ভয়ের সংস্কৃতি, দলীয় নেতাকে রক্ষক বা ত্রাতা হিসেবে দেখার প্রবণতা, বিরোধীদের প্রতি প্রতিহিংসার রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। মূলত বিজয়ী দলের বয়ানই হয়ে ওঠে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মুখ্য বিষয়।
এখানে প্রশ্ন আসতে পারে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদলের জন্য কি সংস্কার জরুরি? সংস্কার জরুরি এ কারণে যে এর মাধ্যমে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়, যে কাঠামো নির্ধারণ করবে আমাদের আচরণ।
এখানে উদাহরণ হিসেবে রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে আসা যায়, যার মাধ্যমে আমরা দেখেছি কী করে বিগত সময়ে গড়ে উঠেছে দুর্বৃত্তায়ন, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের সংস্কৃতি। এটি এমনভাবে আমাদের সমাজের খুব গভীরে প্রোথিত একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে যে চাকরি কিংবা সরকারি কোনো সেবা নেওয়ার আগেই মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালী লোক ধরার একটি প্রবণতা কাজ করে, যেখানে দলীয় পরিচয় মুখ্য হয়ে পড়ে।
নাগরিক সেবা কিংবা কাজ যেকোনো ধরনের দলীয় প্রভাব ছাড়াই হয়ে যেতে পারে, সেই বিশ্বাস সাধারণের মধ্যে এখন খুব কম কাজ করে। যে কারণে বলছি, এটি এখন আমাদের সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়ছে। এর অন্য একটি অর্থ দাঁড়ায়, সেটি হলো যাদের সেই যোগাযোগ নেই, রাষ্ট্র তার কাছে হয়ে ওঠে একটি নিপীড়নের পরিক্ষেত্র, যার বদল না হলে রাষ্ট্রের প্রত্যেক মানুষের আস্থা ও ভরসা আরও কমতে থাকবে। আমাদের রাষ্ট্রের এই সংকট জাতীয় রাজনীতির সংকট থেকে নাগরিকের অভ্যাসের সংকটেও পরিণত হয়ে পড়ে।
এ যেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এক দুষ্টচক্র, যার ঘৃণ্য বলয়ে আমরা প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছি, যেখানে মেধার মূল্যায়ন হয় ব্যক্তির রাজনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তিতে। এই সংস্কৃতি বিগত কয়েক দশকে যেন আমাদের সামাজিক ব্যবস্থাকে একটা ভঙ্গুর কাঠামোয় নিয়ে এসেছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার সাংস্কৃতিক রূপান্তর ছাড়া সম্ভব নয়। আমরা চাইলেই আইন বদলে ফেলতে পারি, কিন্তু সেই আইন মানার অভ্যাস, বিরোধী চিন্তাভাবনা সহ্য করার মানসিকতা ও নৈতিক অবস্থান, সত্য বলার সাহস এবং রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা ছাড়ার সংস্কৃতি তৈরি করা কঠিন।
একটি গণ—আন্দোলন পুরোনো কর্তৃত্ববাদী সরকারকে সরাতে পারে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ও তাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জবাবদিহির চর্চা নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে জাতিকে মুক্ত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা। কেবল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই হতে পারে নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায়।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা নিজ স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতার যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে সংস্কার কিংবা কোনো বদলই কাজ করবে না, যা আমরা বিগত সময়ে দেখেছি এবং তার কিছু কিছু উদাহরণ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। যেমন সম্প্রতি একজন প্রতিমন্ত্রী ও তাঁর এলাকার বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণের মতো স্থূল বিষয়েও আমরা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব দেখতে পাই, যেখানে আবার প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করতে হয়। এ ধরনের বিষয়গুলো আমাদের দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়।
আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে সংস্কার একটি ধীর ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের দিকে তাকালেও এ চিত্র দেখা যায়। কিন্তু সমস্যা হয় যখন আমরা সেই সংস্কারপ্রক্রিয়ায় এই বদলের ইতিবাচক দিকনির্দেশনা বা সরকারের সদিচ্ছার অভাব দেখি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মানুষের অতি দ্রুত সংস্কার ও তার বাস্তবায়নের প্রভাব দেখতে চাওয়া। যদিও জনগণকে এই দোষ দেওয়া যায় না, কেননা তারা একটা লম্বা সময় কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থায় বসবাস করতে করতে হতাশ ও ক্লান্ত। তাই পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও বিস্তর।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে এমন একটি গঠনমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন না করে তাকে শোধরানোর সুযোগ করে দেওয়া, যাকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রিকনসিলিয়েশন বলা হয়। যে আলোচনা জনপরিসরে ইতিমধ্যে চলমান।
বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক উত্তরণের অগ্রযাত্রায় সেসব দেশই সাফল্যের দেখা পেয়েছে, যারা তাদের প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা না করে এমন প্রতিবেশ গড়ে তুলেছে, যেখানে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করতে পারে। কেননা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা আসে বিজয়ীদের উদারতা ও পরাজিতদের নিরাপত্তাবোধ থেকে।
রাজনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে তাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয়টিও প্রোথিত যে বিষয়গুলো আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য তাই আমাদের একটি ইতিবাচক গণমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
● বুলবুল সিদ্দিকী নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন
মনজুরুল ইসলাম
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে বা কারাগারে মৃত্যু নতুন কিছু নয়। কিন্তু অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানে এ রকম কিছু মৃত্যু নানা আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর কারণ হলো এসব ঘটনার ভুক্তভোগীর উল্লেখযোগ্য অংশের রাজনৈতিক পরিচয়; তাঁরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
২.
ঘটনাস্থল ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলা। গত ২০ জুন বিকেল পাঁচটার দিকে ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্তকে (২৭) আটক করে ডিবি। তাঁকে তাঁর মায়ের সামনেই পেটানো হয় বলে স্বজনদের অভিযোগ। ইশতিয়াকের মা খাদিজা আক্তার অভিযোগ করেন, রাতে ৬৫ হাজার টাকা দিলে ইশতিয়াককে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে তাঁদের এক আত্মীয়ের সঙ্গে ডিবি পুলিশের কথা হয়েছিল। পরে ডিবি জানায়, এ ছেলে ছাত্রলীগ করে, আজ তাকে ছাড়া হবে না। পরদিন সকালে এক লাখ টাকা নিয়ে ফরিদপুরে যেতে বলা হয়। পরদিন সকাল আটটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদের পিটুনিতে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
ইশতিয়াককে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সঙ্গে ডিবি পুলিশ অত্যন্ত সুন্দর ও অমায়িক ব্যবহার করেছে। তাঁকে নাশতা খাইয়েছে। (ডিবি হেফাজতে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু, পরিবার বলছে ‘নির্যাতনে’, পুলিশের দাবি ‘অসুস্থ হয়ে’, প্রথম আলো অনলাইন, ২১ জুন ২০২৬)
পুলিশ ‘সুন্দর’ ও ‘অমায়িক’ ব্যবহার করার দাবি করলেও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া আটকের সময়ের একটি ভিডিও ফুটেজে এক ব্যক্তিকে গালি দিয়ে ইশতিয়াককে থাপ্পড় দিতে দেখা যায়। একই ফুটেজে আরেক ব্যক্তিকে মুঠোফোনে বলতে শোনা যায়, ‘লাঠি নিয়ে মরিচবাজার এলাকায় আসেন, দ্রুত আসেন।’ (‘ডিবির হেফাজতে’ ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর আগে আটকের সময় কী ঘটেছিল, এমন ভিডিও ফেসবুকে, প্রথম আলো অনলাইন, ২৬ জুন ২০২৬)
যে পুলিশ সদস্যরা ইশতিয়াককে আটকের সময় জনসমক্ষে থাপ্পড় দিতে পারেন এবং লাঠি নিয়ে আসার কথা বলেন, আটকের পর তাঁকে থানায় নিয়ে নির্যাতন করাটাও তাঁদের জন্য অস্বাভাবিক নয় বলেই প্রতীয়মান হয়। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুসারে এটা ফৌজদারি অপরাধ।
তবে আইন থাকলেও এ রকম ঘটনায় যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত খুবই কম। এ ছাড়া এ ধরনের ঘটনায় পুলিশ নিজেই তদন্ত করে বলে সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। এর ফলে এক—দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাগুলো বছরের পর বছর ধরে একপ্রকার ‘দায়মুক্তি’ পেয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও কি তেমনটাই হবে?
৩.
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে গত ২৪ জুন এক হাজতির মৃত্যু হয়। তাঁর নাম নুরুল আলম। তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সাতকানিয়া উপজেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, সেদিন সকালে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। নুরুল আলম ২৩ জুন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানায় হওয়া বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নুরুল আলমের ভাই নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় জমি নিয়ে বিএনপি—জামায়াতের কয়েকজন স্থানীয় নেতার সঙ্গে তাঁদের বিরোধ রয়েছে। সাতকানিয়া ভূমি অফিসে ওই জমি নিয়ে শুনানি ছিল। শুনানিতে অংশ নিতে গিয়েছিলেন তাঁর ভাই। সেখান থেকে তাঁকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে সাতকানিয়া থানায় হস্তান্তর করেছে। নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের নামে কোনো মামলা ছিল না। জায়গা—জমির বিরোধে তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।’ (চট্টগ্রাম কারাগারে যুবলীগ নেতার মৃত্যু, গ্রেপ্তার হন এক দিন আগে, প্রথম আলো অনলাইন, ২৪ জুন ২০২৬)।
এ ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ‘এখতিয়ার—বহির্ভূত’ ও ‘ স্বেচ্ছাচারী’ ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। জায়গাজমির বিরোধ হলে সেটা মীমাংসা করার দায়িত্ব ভূমি অফিস কিংবা আদালতের; পুলিশের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। এখানে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো, পুলিশ নুরুল আলমকে ২০২৪ সালে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থানায় হওয়া বিস্ফোরক আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়; কিন্তু ওই মামলার এজাহারে তাঁর নাম ছিল না। ( গ্রেপ্তারের পরদিন কারাগারে যুবলীগ নেতার মৃত্যু, সমকাল, ২৫ জুন ২০২৬)।
এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, ২০২৪ সালে মামলা হয়ে থাকলে প্রায় দুই বছর পর ২০২৬ সালে তাঁকে কেন গ্রেপ্তার দেখাতে হলো? তাঁর ‘পরিবারের অভিযোগ—ডিবিকে দিয়ে একটি ভূমিদস্যু চক্র তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করিয়েছে।’ (চট্টগ্রামে যুবলীগ নেতা নুরুলের মৃত্যুর ‘রহস্য’ কাটেনি, মামলা হয়নি, যুগান্তর, ২৬ জুন ২০২৬)
নুরুল আলমকে গ্রেপ্তার এবং কারাগারে তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি কিছু বিতর্কিত বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে একটি হলো কোনো মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে পুলিশের ‘অবাধ’ ক্ষমতা। পুলিশের বিরুদ্ধে প্রায়ই স্বেচ্ছাচারীভাবে এই ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগ ওঠে।
আরেকটি বিষয় হলো, কারা হেফাজতে বা কারাগারে বন্দীর মৃত্যু। বাংলাদেশে কারাগারগুলোর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা বোঝা যায় বন্দীদের মৃত্যুর সংখ্যা থেকে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, এ বছরে মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৫২ জন। অর্থাৎ প্রতি মাসে ১০ জনের বেশি বন্দী মারা গেছেন। কারাগারে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো কতটা স্বাভাবিক?
৪.
গত ২১ জানুয়ারি বেলা সোয়া তিনটার দিকে বরিশাল নগরের পশ্চিম কাউনিয়ায় খান বাড়িতে পুলিশের অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে রাশেদ খান মেনন (৪২) নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এক আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়। তাঁর বড় ছেলে ইমতিয়াজ খান প্রথম আলোকে বলেন, কাউনিয়া থানার ৯ থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্য তাঁর বাবাকে গ্রেপ্তার করতে তাঁদের বাড়িতে আসেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তাঁর বাবা বাসার পেছনের দেয়াল টপকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। দেয়াল টপকে অপর প্রান্তে একটি ড্রেনের স্ল্যাবের ওপর পড়ার পর সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে যান। পরে স্বজনেরা গিয়ে দেখেন তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে।
ইমতিয়াজ বলেন, ‘আমার বাবা হৃদরোগী ছিলেন। কয়েক মাস আগে তাঁর হৃদযন্ত্রে রিং বসানো হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তিনি বাড়িতেই ছিলেন। আমার জানামতে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না।’ পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাশেদ খানের এক নিকটাত্মীয় বলেন, বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াইয়ে গেলে পুলিশি হয়রানি আরও বাড়বে, এ আশঙ্কায় স্বজনেরা লাশের ময়নাতদন্ত করতে দেননি। (বাড়িতে পুলিশ আসার খবর পেয়ে পালাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু, প্রথম আলো অনলাইন, ২১ জুন ২০২৬)
এ ঘটনায় যে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা না থাকলে কিংবা সেই ব্যক্তি কোনো অপরাধ না করে থাকলে বাড়িতে পুলিশ আসার খবরে তিনি পালানোর চেষ্টা করবেন কেন? প্রশ্নটা যতটা সরল মনে হয়, বাংলাদেশের বাস্তবতা ঠিক ততটা সরল নয়। কারণ, মামলা না থাকলেও পুলিশ যে কাউকে আটক করতে পারে এবং সুবিধামতো কোনো মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখাতে পারে; এর ফলে গ্রেপ্তার এড়াতে পালানোর চেষ্টা করা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়।
বরিশালে পালাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনা জনমনে পুলিশি হয়রানির আশঙ্কা এবং পুলিশ নিয়ে যে ভীতি রয়েছে, সেটিরই ইঙ্গিত দেয়; কিন্তু নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ তোলা হয়নি। এর পরও এ ঘটনার পরোক্ষ দায় পুলিশ কি এড়িয়ে যেতে পারে?
৫.
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টি বাংলাদেশে খুবই ধারাবাহিক একটি ঘটনা। সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের একটি প্রতিবেদনে ২০০১ সালের ২২ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুনের মধ্যে ৪৮৬টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। লক্ষণীয় হলো ২০০১ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সব সরকারের আমলেই এসব মৃত্যু হয়েছে। ( নো—গভর্নমেন্ট ফ্রি অব কাস্টডিয়াল ডেথস সিন্স ২০০১, ডেইলি স্টার, ২৬ জুন ২০২৬)
ওই প্রতিবেদন অনুসারে ১০ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ১৮৪টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এরপর ২৯ অক্টোবর ২০০৬ থেকে ১০ জানুয়ারি ২০০৭ পর্যন্ত একটি স্বল্পকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল, যে সময়ে ৬টি মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়েছে। এরপর ১১ জানুয়ারি ২০০৭ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত সেনা—সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪২টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৬ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে জুন ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে; এ সময়ে ২১৩টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থাৎ ৯ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের মধ্যে ২৯টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এ বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দুটি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
আইনশৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর পাশাপাশি কারাগারে মৃত্যুর বিষয়টিও বাংলাদেশ খুব নিয়মিত একটি ঘটনা। কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে ২৯০ জন, ২০২৪ সালে ২৬১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৭০ জন বন্দী মারা যান। (রিফর্ম কি টু কার্বিং কাস্টডিয়াল ডেথস, ডেইলি স্টার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
লক্ষণীয় বিষয় হলো, গণ—অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। এরপর অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল, দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে; কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো। (এক্সট্রাজুডিশিয়াল কিলিংস, কাস্টডিয়াল ডেথস অন রাইজ, নিউ এজ, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫)
৬.
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো যেমন আশঙ্কাজনক, তেমনি কারাগারে মৃত্যুর বিভিন্ন খবর ও তথ্য—উপাত্ত বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ রকম কিছু খবরের উদাহরণ হলো: ‘বগুড়ায় কারা হেফাজতে ১ মাসে ৪ আ.লীগ নেতার মৃত্যু’ ( ডেইলি স্টার বাংলা, ৯ ডিসেম্বর ২০২৪); ‘১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ১২ মাসে কারাগারে ১৮ জন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৮ দিনে কারা হেফাজতে মোট ৬ জন আওয়ামী লীগ নেতা মারা গেছেন।’ (কারা হেফাজতে ‘রাজনৈতিক মৃত্যুর’ তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে মানবিক প্রশ্ন, আরটিভি অনলাইন ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬); ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে কারা হেফাজতে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা—কর্মী এবং বাকি ২৭ জন সাধারণ কারাবন্দী। (৩৯ ডাই ইন কাস্টডি ইন ফার্স্ট ৩ মান্থস অব ২০২৬: এইচআরএসএস রিপোর্ট, ডেইলি স্টার, ১২ এপ্রিল ২০২৬)
এসব খবর—তথ্য—উপাত্ত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, গত প্রায় দুই বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় যাঁরা ভুক্তভোগী, তাঁদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়, এসব ঘটনার সঙ্গে রাজনীতি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক আছে কি? কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা—কর্মী হলেই তাঁর ওপর নিপীড়ন—নির্যাতন কি বৈধ হয়ে যায়? অভিযুক্ত কিংবা অপরাধী ব্যক্তিরও যে মানবাধিকার রয়েছে, বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে, এ বিষয়ে আমরা কি যথেষ্ট সচেতন?
● মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
