উন্নয়নশীল বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—১৪ || ড. আনিস রহমান
১. ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও আধুনিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিবর্তন
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব অর্থনীতিতে ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই (উরমরঃধষ চঁনষরপ ওহভৎধংঃৎঁপঃঁৎব) এক নতুন বৈপ্লবিক ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ডিপিআই মূলত এমন এক সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা যা সরকার, ব্যবসা এবং জনগণের মধ্যে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ডেটা আদান—প্রদান এবং আর্থিক লেনদেনের পরিবেশ তৈরি করে। এটি কেবল তথ্যের ডিজিটাইজেশন নয়, বরং একটি ‘প্লাটফর্ম—থিঙ্কিং’ বা প্ল্যাটফর্ম—ভিত্তিক চিন্তাচেতনার প্রতিফলন যেখানে সরকার ডিজিটাল ‘রেল’ বা পথ তৈরি করে দেয় এবং বেসরকারি ফিনটেক কোম্পানিগুলো সেই পথের ওপর দাঁড়িয়ে উদ্ভাবনী সেবা প্রদান করে। ডিপিআই—এর তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো ডিজিটাল পরিচয় (উরমরঃধষ ওউ), পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডেটা এক্সচেঞ্জ ফ্রেমওয়ার্ক। এই অবকাঠামোটি আজ সারা বিশ্বের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে একটি সঠিক পরিকাঠামো কীভাবে কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিতে পারে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে ডিপিআই—এর অবদান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিশ্বের প্রায় ১.৪ বিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনও প্রথাগত ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে রয়েছেন, যাদের একটি বিশাল অংশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর গ্রামীণ নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। প্রথাগত ব্যাংকিং মডেলের উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং কঠোর শর্তাবলীর কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠী সবসময়ই আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি থেকে অবহেলিত থেকেছে। ডিপিআই এই চিত্রটি বদলে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের আধার এবং ইউপিআই—এর সমন্বয়ে গঠিত ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’ মাত্র ছয় বছরে দেশটিতে ৮০ শতাংশ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার নিশ্চিত করেছে, যা প্রথাগত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে অন্তত ৪৭ বছর সময় লাগত। একইভাবে ব্রাজিলের 'পিক্স' (চরী) ব্যবস্থাটি বিশ্বজুড়ে রিয়েল—টাইম লেনদেনের এক অনন্য মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল অর্থনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। ফিলিপাইনে কোভিড—১৯ মহামারির সময় ডিপিআই ব্যবহারের ফলে প্রায় ৪ মিলিয়ন নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা সম্ভব হয়েছে যা প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
ডিপিআই—এর মাধ্যমে লেনদেনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় ক্ষুদ্র লেনদেন বা ‘মাইক্রো—পেমেন্ট’ এখন লাভজনক হয়ে উঠেছে। এটি কেবল অর্থের আদান—প্রদান নয়, বরং একটি ডিজিটাল পরিচয় নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানুষের অর্থনৈতিক অধিকারকেও প্রতিষ্ঠা করছে। এর ফলে প্রান্তিক মানুষ কেবল সেবা গ্রহীতাই নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতির এক একজন সক্রিয় অংশীদার হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ডিপিআই—কে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ) অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী ত্বরক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কারণ এটি দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য দূর করতে সরাসরি কাজ করে।
২. বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং: তথ্যভিত্তিক নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি
প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ক্রেডিট ইতিহাস বা জামানত চাওয়া। কিন্তু যারা কখনো ব্যাংকিং সেবার আওতায় আসেননি, তাদের কোনো ক্রেডিট রেকর্ড থাকে না, যার ফলে তারা সবসময়ই মহাজন বা অনানুষ্ঠানিক ঋণের খপ্পরে পড়ে। এই শূন্যতা পূরণে বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং (অষঃবৎহধঃরাব ঈৎবফরঃ ঝপড়ৎরহম) এক যুগান্তকারী সমাধান নিয়ে এসেছে। এটি এমন এক পদ্ধতি যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে প্রথাগত ক্রেডিট হিস্ট্রি ছাড়াই একজন মানুষের ঋণযোগ্যতা (ঈৎবফরঃড়িৎঃযরহবংং) নির্ধারণ করে। এই পদ্ধতির মূল শক্তি হলো বিপুল পরিমাণ অসংগঠিত ডেটা বা ‘বিগ ডেটা’ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা।
ক. স্মার্টফোন মেটাডেটা ও আচরণগত উপাত্তের বিশ্লেষণ
স্মার্টফোন বর্তমানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একজন মানুষের ডিজিটাল জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। এআই—ভিত্তিক স্কোরিং মডেলগুলো স্মার্টফোনের মেটাডেটা থেকে প্রায় ৮০,০০০—এর বেশি ডেটা পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পারে। এই ডেটা পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাপ ব্যবহারের ধরন, জেসচার প্যাটার্ন বা মোবাইল স্ক্রল করার গতি, টাইপিং স্পিড এবং ডিভাইসের বিভিন্ন সেটিংস। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পদ্ধতিতে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য যেমন ছবি বা মেসেজ পড়া হয় না, বরং বেনামী আচরণগত উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয় যা গ্রাহকের গোপনীয়তা নিশ্চিত করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি দেখা যায় একজন ব্যবহারকারী নিয়মিতভাবে তার ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করছেন বা তার ই—কমার্স কেনাকাটার একটি সুশৃঙ্খল প্যাটার্ন রয়েছে, তবে এআই মডেল তাকে উচ্চ ক্রেডিট স্কোরের অধিকারী হিসেবে গণ্য করতে পারে।
সাইকোমেট্রিক অ্যাসেসমেন্টও এই পদ্ধতির একটি বড় অংশ। অনেক ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ছোট ছোট কুইজ বা গেমের মাধ্যমে একজন মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, সততা এবং আর্থিক শৃঙ্খলার মূল্যায়ন করে। এই তথ্যগুলো যখন মেশিন লার্নিং মডেলে দেওয়া হয়, তখন তা প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁত ফলাফল দিতে পারে। 'ক্রেডো ল্যাব' (ঈৎবফড়ষধন) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই মডেলের মাধ্যমে লেন্ডারদের ঝুঁকির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে একজন কৃষক বা ক্ষুদ্র বিক্রেতা যার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই, তিনিও তার মোবাইল লেনদেনের ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত ঋণ পেতে পারেন।
