আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ জাহীদ রেজা নূর

গণতন্ত্র নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের ভালো নয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া একটি দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে তাদের শক্তিমত্তার জানান দেয়, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা গণতান্ত্রিক কোনো দল অতি দ্রুত স্বৈরাচারী দলে পরিণত হওয়ার মতো দৃষ্টান্তইবা আর কোন দেশে রকম প্রকটভাবে আছে?

আমরা এমন একটা দেশে বাস করি, যেখানে পরমতসহিষ্ণুতা একেবারেই নেই। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া আমরা একে অন্যকে নিকৃষ্ট কোনো অভিধায় অভিসিক্ত করতে পারি।যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণপ্রবাদবাক্যটি আমাদের দেশের রাজনীতির সঙ্গে একেবারে গলাগলি করে হাঁটে। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে পছন্দ না হলেই যে কাউকেস্বাধীনতাবিরোধীতকমা লাগিয়ে দেওয়া হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখনফ্যাসিবাদের দোসরতকমাটি তার জায়গা নিয়েছে। গুণগতভাবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। দুটো অভিধাই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এক মোক্ষম অস্ত্র। সাধারণ মানুষ দুই বাড়াবাড়িতেই বিরক্ত হয়। কিন্তু আমজনতার কথা রাজনীতির মানুষেরা শুধু নির্বাচনের আগের সময়টাতেই গুরুত্ব দেয়। ছাড়া বাকি সময় নিজেদের মতোই চলে।

এত বড় একটা গণঅভ্যুত্থান হয়ে গেল, কিন্তু চলনবলনে রাজনীতিতে কি কোনো উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? কারও কারও মনে পড়ে যাবে, বিএনপি বা জামায়াতকে ঘায়েল করার জন্য আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী পক্ষের আহূত জনসভার একই স্থানে সরকারপক্ষের জনসভার আয়োজন করে ১৪৪ ধারা জারি করিয়ে জনসভা পণ্ড করে দিত? আর এখন? এখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসা ঠেকাতে বিএনপিজামায়াত যে কাণ্ডগুলো করছে, তাকেও তো একই অভিধা দেওয়া যায়। ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নিয়ে যা যা ঘটেছে, তা কি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না? ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগ বোঝেনি তারা গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করছে, ক্ষমতায় থেকে বিএনপি, বিরোধী দলে থেকে জামায়াতএনসিপিও বুঝতে পারছে না, তারা গণতন্ত্রকেই বাধাগ্রস্ত করছে। এর মাঝে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে সাংবাদিক পেটানোয় হাত মকশো করেছে জামায়াত। এখানেও সেই অমোঘ শব্দ যুগলের প্রতি তারা বিশ্বস্ত থেকেছে—‘ফ্যাসিবাদের দোসর ফ্যাসিবাদের কথা বলার সময় এরা চোখে ঠুলি পরে থাকে। নইলে কীভাবে তাদের চোখ এড়িয়ে যায়, এই তো কিছুদিন আগে যে ইউনূস সরকার দেশ শাসন করে গেল, তাদের কোন কাজগুলো সরাসরি ফ্যাসিবাদী ছিল? রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যাবলি তুলনা করলে কিছুক্ষণ আগে বলা কথাটারই পুনরাবৃত্তি করতে হবেযে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ।

এখন পর্যন্ত তার কোনো ব্যতিক্রম চোখে পড়েছে কি?

. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন রাজনৈতিক দলগুলোও সক্রিয়। সাংবাদিকদের প্রহার করার যে ঘটনা জামায়াত ঘটিয়েছে, তা যে ন্যক্কারজনক, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।গরু মেরে জুতা দানপ্রবাদটিকে সার্থক করার জন্য জামায়াত সাংবাদিক পেটানো চারজনকে বহিষ্কার করেছে। এই বহিষ্কারের কোনো অর্থ কি আছে? তাতে কি অপমানিত, নির্যাতিত সাংবাদিকদের সঙ্গে সুবিচার করা হলো? থেকে আরও একটি প্রসঙ্গ কি উঠে আসে না? যখন ইচ্ছে রুটিন করে সাংবাদিক পিটিয়ে বহিষ্কারের মাধ্যমে সবকিছু ঠিকঠাক আছে, রকম দেখানোর ইচ্ছা কি রাজনৈতিক দলগুলোর মনে বারবার জাগবে না? এই মারপিট কতটা নিষ্ঠুরতার সঙ্গে করা হয়েছে, সেটা ভিডিওতেই দেখা গেছে। সুতরাং, মারা এবং বহিষ্কার হওয়াটাও রাজনৈতিক কূটনীতির অঙ্গ হয়ে যাবে কি না, সেটাও সময় বলে দেবে। কিন্তু এই প্রশ্ন তো উঠছেই, সুযোগ পেলেই রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতির বদলে মবনীতির দ্বারস্থ হচ্ছে। ইউনূস সরকারের আমলে মবকে রাজনীতির অবশ্যপালনীয় কর্তব্যের মতো করে ফেলার পর এই অভিশাপ থেকে কেউই আর বের হতে পারছে না।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যখন জামায়াতের এই কাণ্ডের পর বিভিন্ন সমালোচনামূলক মন্তব্য করছে, তখন জামায়াতও একটি কৌশলী খেলা খেলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের চালানো সাংবাদিক নির্যাতনের একটি চিত্র প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে, গুলশানে, ত্রিশালে, পটিয়ায়, রাজশাহীতে কীভাবে বিএনপি, ছাত্রদল নেতারা সাংবাদিক পিটিয়েছেন, তারই খবর সেগুলো। এতে কী প্রমাণ হয়? যেকোনো বিচক্ষণ মানুষ বলবে, এতে প্রমাণ হয়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি সাংবাদিকদের নির্যাতন করছে। ঠিক কথা। বিএনপি তার দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। তাঁরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হচ্ছেন। আরও কী প্রমাণ হয়? প্রমাণ হয়, জামায়াত বিএনপির চালানো সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো সংগ্রহে রাখে। নিজেরা যখন একই রকম অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে রাখার জন্য বিএনপির অপকর্মগুলোর ফিরিস্তি দেয়।

এতে করে কি গণতন্ত্র তার স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পায়? নাকি প্রতিটি রাজনৈতিক দলই সুযোগ পেলে একই রকম অপকর্ম করে থাকে বলে সাধারণ মানুষ মনে করবে? বিএনপির অপকর্ম জামায়াত দেখিয়ে দিচ্ছে, জামায়াতের অপকর্ম বিএনপি দেখিয়ে দিচ্ছেএতে দলগুলো সম্পর্কে ভালো কোনো তথ্য পাচ্ছে না দেশের জনগণ। মাস্তানি আর পেশিশক্তির অধিকার যে একচেটিয়া কারও নয়, সেটাই প্রমাণিত হয় এই ধরনের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি থেকে। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, যাঁরা নির্যাতিত হচ্ছেন, তাঁরা কোনোভাবেই সুবিচার পাচ্ছেন না।

. অনেকেরই জানা আছে, তারপরও মনে করিয়ে দেওয়া ভালো, গণতন্ত্রে যেমন আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগের গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি গুরুত্ব রয়েছে গণমাধ্যমের। অকারণেই গণমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় না। আমাদের দেশে কি সাংবাদিকেরা ঠিকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন? অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের একটি অংশকে দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিতে। সাংবাদিক মানুষ, দেশের নাগরিক। তাই তিনি যেকোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতেই পারেন। তাঁর সেই সমর্থন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে স্পর্শ করবে না, সেটাই আরাধ্য। কিন্তু অনেক সাংবাদিকই যা করে থাকেন, তা সরাসরি চাটুকারিতায় পর্যবসিত হয়। সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোও বিভিন্ন দলের উপদলে পরিণত হয়। এগুলো সবারই দেখা আছে। প্রেসক্লাব, বিভিন্ন ইউনিয়ন কীভাবে বিভক্তিকে মেনে নিয়েছে, তা দেখে দুঃখও হয়। সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে হলে এই বিভক্তি থেকে উঠে আসতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সৎ সাংবাদিকতা করতে হবে। প্রেসক্লাব এবং ইউনিয়নগুলো কারও তাঁবেদারি না করে সাংবাদিকদের পেশাদারি করে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। সেটা না করলে সাংবাদিকতা বিপদে পড়বে। তাঁদের জবাবদিহি না থাকলে সাংবাদিকতার তো কোনো মানে হয় না।

কিন্তু তাই বলে জামায়াতের দেওয়া বিএনপিছাত্রদলের সাংবাদিক পেটানো কিংবা দোসর আখ্যা দিয়ে জামায়াতের সাংবাদিক পেটানো কি কোনো নিয়মের মধ্যে পড়ে? খবরগুলোয় দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিবিদেরা কোনো নিয়মনীতির মধ্যে দাঁড়াননি। নিয়মনীতি ভঙ্গ করেই সাংবাদিক পিটিয়েছেন। যে দেশে ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো রকম নৃশংস আচরণ করতে পারে, সেই দেশে সত্যিই কি গণতন্ত্র নিরাপদ? পেশির ভাষাই তো তখন গণতন্ত্রের ভাষা হয়ে যায়।

. গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে। বর্তমানে কারও মধ্যে কি সেই অঙ্গীকারের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে?

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন কথা হচ্ছে, তখন কয়েকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো যাক। সামনের নির্বাচনগুলো কেমন হবে বলে মনে হয়? আদৌ কি তাতে জনগণ ভোট দিতে পারবে? আওয়ামী লীগ নির্বাচন নিয়ে যে ছেলেখেলা করেছে, তা থেকে কি বেরিয়ে আসতে পারবে দেশ? বার কাউন্সিলের নির্বাচনগুলো কিন্তু ভিন্ন বার্তা দেয়। সেখানেওআমরা আর মামুরাধরনের নির্বাচন করা হয়েছে, ফলে ইতিমধ্যেই জনগণের মধ্যে আগামী নির্বাচনগুলো নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি রয়েছে? অভিজ্ঞতা কী বলে? মানবাধিকার পরিস্থিতির অবস্থা কী? যত দিনদোসরআখ্যা দিয়ে মানুষ হত্যা কিংবা নির্যাতন চলতে থাকবে, তত দিন পর্যন্ত কিগণতন্ত্রের সুবাতাসবইবে এই দেশে? কেউ কি খেয়াল করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অধ্যাপক ইউনূসের অনুসারী কিংবা এনসিপির কোনো নেতার লেখা পোস্টের নিচের মন্তব্যগুলো? বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ সেখানে যা লিখছে, তাকে বলা হয় কঠোর সমালোচনা। মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু জেগে উঠেছে দুঃস্বপ্ন নিয়েএই বাস্তব অবস্থা কাউকেই স্বস্তি দিচ্ছে না। সরকারি দল আর বিরোধী দলের কার্যক্রমকে অনেকেই আঁতাতের রাজনীতি বলে অভিহিত করছে, সেটা কি কারও নজরে পড়েছে?

আর সক্রিয় নাগরিক সমাজের কথাও কি একটু বলতে হবে না? সেই যে সোচ্চার নাগরিক সমাজবহুদিন ধরে কুম্ভকর্ণ ঘুম দিচ্ছে কেন, তা কি কেউ ভেবে দেখেছে?

যদি বলা হয়, গণতন্ত্র এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছে, তাহলে কি ভুল কিছু বলা হবে?


Related Posts