“...তবু ভয় কেন তোর যায় না” আনিস আহমেদ

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ মন্তব্য করেছিলেন যে আওয়ামী লীগ নামের কোন দলের অস্তিত্বই নেই। তাঁর এই উক্তি একটি পরিহাসে পরিণত হলো যখন দেখা গেছে যে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত একাধিক অনুষ্ঠান ঠেকানোর জন্য লক্ষাধিক পুলিশ হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছে। যে দলটির অস্তিত্বই নেই বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোচ্চার হলেন সেই দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পন্ড করার জন্য তার নির্দেশে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করার এই প্রচেষ্টা কেন? প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে তো কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটানোর কথা নয়, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী হচ্ছে আনন্দ উৎসব, আনন্দের আয়োজন। নিয়ে দুশ্চিন্তারই বা কী ছিল? তবে বোঝা গেল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন . ইউনুস, সেটি সম্পূর্ণ রূপে বাস্তবায়নের জন্য সালাহউদ্দিন সাহেব এই গুরু দায়িত্ব নিলেন তাঁর লঘু স্কন্ধে। আর দ্বিতীয় কারণ ছিল সম্ভবত তাদের প্রধান বিরোধী দল, যাকে কার্যত সহযোগী দলও বলা যেতে পারে সেই জামায়াতে ইসলামি দলকে তুষ্ট করা। তারা যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল সেটা অস্বীকার করবে কে? অথচ এই ঐতিহাসিক সত্যকে তারাই অস্বীকার করে পরিহাসমূলক বক্তব্য রেখেছে সম্প্রতি। তারা এখন অন্তত এটা বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে তারা টিকতেই পারবে না। তাই হাস্যকরভাবে এখন বলতে শুরু করেছে যে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষেই ছিল, বিরোধিতা করেছে কেবল মাত্র ভারতের! ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পূর্ণাঙ্গভাবে সমর্থন করেছিল। তারপরও ভারত বিরোধিতার অর্থ তো পাকিস্তানকে সমর্থন করা। এই সহজ সমীকরণটি সকলেই বোঝে। কাজেই জামায়াত যত চেষ্টাই করুক না কেন তাদের কথায় চিড়ে ভিজবে না। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে এই যে ধরনের অপতথ্যকে বিএনপি সরকার পরোক্ষভাবে গ্রহণ করে চলেছে। প্রত্যক্ষভাবে তাদের পক্ষেও গ্রহণ করা সম্ভব নয়, কারণ তাহলে স্বয়ং জিয়াউর রহমানকেও ভারতের দালাল বলে চিহ্নিত করবে জামায়াত। বিএনপি যদি জামায়াতে ইসলামি দলকে তোয়াজ করে চলে তাহলে বিএনপি নিজের কবর নিজেই খুঁড়বে, তখন আর খাল খনন করার সুযোগ থাকবে না, সেখান থেকেই কুমির চলে আসবে নির্ভয়ে। 

তারেক রহমান, যাঁকে কেউ কেউ অত্যন্ত চৌকস এক আধুনিক নেতা মনে করেন, তিনি যদি স্বয়ং বিষয়টি বুঝেও না বোঝার ভান করেন তাহলে দেশের সর্বনাশ ঘটতে বেশি দেরি হবে না। এই যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির কবর খোঁড়া হলো সেটি কি বিএনপি জন্য খুব সুবিধাজনক হবে? আওয়ামী লীগ তো বিএনপি রাজনীতির ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। আওয়ামী লীগের সময়ে একমাত্র জামায়াতে ইসলামি দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। তার প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের দেশ বিরোধী ভূমিকা, বাঙালির ঘাতক রাজাকার আল বদরদের লালন করা। তবু বলবো এই নিষেধাজ্ঞা জারি না করলে হয়তো আওয়ামী লীগ ভালোই করতো। কারণ এই নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নিয়ে জামায়েত শিবির গুপ্ত অবস্থায় আওয়ামী লীগের ভেতরে অনুপ্রবেশ করে এবং সুযোগ মতো কথিত কোটা আন্দোলনের নামে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনকে নিশ্চিত করে। . ইউনুসের সমালোচকরা তাঁকে নানানভাবে দোষারোপ করেন, অনেক বিষয়ে তিনি অসত্য কথা বলেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে এসে তিনি দুটি সত্য কথা বলেছেন। যার জন্য বাংলাদেশের মানুষ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। তার একটি হচ্ছে, ইতিহাসে রিসেট বোতাম টেপার কথা, অর্থাৎ ইতিহাসকে ভুলে যাওয়ার, ভুলিয়ে দেওয়ার কথা এবং আরেকটি হচ্ছে আন্দোলনটি যে মেটিক্যুলাস ডিজাইন বা সূক্ষ্ম পরিকল্পনার ফলাফল ছিল সেই কথাটিও। কোটা আন্দোলনের নামে ২০২৪ এর সেই আন্দোলনকে শিক্ষার্থীদের কাছে এক ধরনের যৌক্তিক আন্দোলন করে তোলার প্রচেষ্টা যে মেটিক্যুলাস ডিজাইনের অংশ ছিল সেটি পরিষ্কারভাবে বোঝা গেল; বুঝিয়ে দিলেন স্বয়ং তিনি যিনি নিজেই এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনার সুবিধাটুকু ভোগ করেছেন। এই রকম আরেকটি সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে জামায়েতে ইসলামি দল এবং তাদের অনুগামী এনসিপি যে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করবে না তার নিশ্চয়তা কতখানি। 

এনসিপি দলের জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তারপরও নাহিদ ইসলাম বলছেন যে আওয়ামী লীগকে আর কখনও ফিরে আসতে দেয়া হবে না। রকম ঔদ্ধত্যপূর্ণ স্বৈরাচারী বক্তব্য এখন নাহিদের মতো লোকরাই বলছেন যারা এক সময় হাসিনাকে স্বৈরাচারী বলেছিলেন। আওয়ামী লীগকে দূরে সরিয়ে এখন নাহিদ ইসলামরা বিএনপিকেও কোণঠাসা করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন জুলাই গণহত্যাসহ গুমখুনের বিচার না করলে বর্তমান সরকার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না। বিএনপি প্রতি এরকম আরও প্রচুর হুমকি দিয়ে চলেছেন নাহিদ ইসলাম। সম্প্রতি আরেকটি ভাষণে নাহিদ ইসলাম বলেন বিএনপি ক্ষমতায় এসে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা, প্রতিশ্রুতিÑসবকিছুর সঙ্গে প্রতারণা করছে। এনসিপির এই নেতা বলেছেন, বাহাত্তরের সংবিধানের ধারাবাহিকতার নামে আওয়ামী লীগের আদর্শ রাজনীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার বা বারবার ফিরে আসার একটা দরজা সব সময় খোলা রাখা হচ্ছে। যেকোনো একটা টেকসই সংস্কার, একটা নতুন যাত্রা করার জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ লাগবে। সংসদে সম্প্রতি নাহিদ কথাও বলেন, বিএনপির ওপর আর আস্থা রাখতে পারছেন না। বিএনপির জন্য এটা বোঝা দরকার যে নাহিদ ইসলামের মতো জামায়েত ঘেঁষা লোকজন দেশের খোলনলচে পাল্টে দেয়ার প্রয়াস চালাচ্ছে। বাহাত্তরের সংবিধানকে নাহিদ ইসলাম আওয়ামী লীগের আদর্শ বলে অপতথ্য দিয়েছেন অথচ তিনিও জানেন বাহাত্তরের সংবিধান মূলত মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে তুলে ধরেছে। 

আর এমন সংকট কালে, যখন স্বয়ং ক্ষমতাসীন দলও সংকটাপন্ন, তখন বিএনপি যদি জামায়েতে ইসলামি এবং তাদের অনুরাগী এনসিপিকে খুশি করার জন্য আওয়ামী লীগের সকল আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে দেশ দল কারো পক্ষে সহায়ক হবে না সে কথা বোঝার সময় এখনই। ধর্মীয় উগ্রবাদিদের খুশি করার চেষ্টা করেছিলেন শেখ হাসিনাও কিন্তু ফলাফল হয়েছে বিপরীত। তারা বাইরে থেকে হাসিনা অনুরাগী হয়ে, ভেতরে ভেতরে হাসিনার বৈরিপক্ষ হয়ে ওঠে সেই মেটিক্যুলাস ডিজাইনে। এদের বিরুদ্ধে সক্রিয় না হয়ে, আওয়ামী লীগকে নিয়ে তাদের যত ভয়, যত আশংকা। তারা তো দাবি করে যে তারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে, তবু তাদের ভয় কেন যায় না। তাহলে প্রশ্ন আসে আসলেই কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তারা জয়লাভ করেছে? যদি তাই হতো, তাহলে আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তারা এতখানি শংকিত কেন


Related Posts