স্টারমারের পদত্যাগÑ জনমতই গণতন্ত্রের ভিত্তি || ড. জীবন বিশ্বাস
২০২৬ সালের ২২ জুনের বিষণ্ণ আলোয় কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণাটি কেবল টেমস নদীর তীরে আরেকজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুকুট খসে পড়ার গল্প নয়, এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও বটে। একবিংশ শতাব্দীর পরিশীলিত রাষ্ট্রদর্শনে ও ক্ষমতার মনোস্তত্ত্বে এই পদত্যাগকে এক নির্মম ও নিরাসক্ত পরীক্ষা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু জনমতের কাছে মাথা নত করে বিদায় নেয়ার যে অভাবনীয় গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য এখানে ঔজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে তা স্বীকার না করে উপায় নেই। বিশাল সংসদীয় ম্যান্ডেটও যে সামাজিক সম্মতির চোরাবালিতে আকস্মিক হারিয়ে যেতে পারে, কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ সে দিকটিকেও গভীর বিশ্বাসে তুলে ধরেছে। দুই বছরেরও কম সময় আগে যে লেবার পার্টি এক জাদুকরী ও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের চাবি হাতে পেয়েছিল, তাদের সেই বিজয়ের অন্দরেই লুকিয়ে ছিল এক অলিখিত ট্র্যাজেডি। হাউস অব কমন্সে আসনের জৌলুস থাকলেও জাতীয় ভোটের মাত্র এক—তৃতীয়াংশ ছিল তাদের ঝুলিতে। ফাস্টর্—পাস্ট—দ্য—পোস্ট বা ‘প্রথমে যে শেষ রেখা ছোঁবে’—এমন নির্বাচনী পাটিগণিতে সেই বিজয় সাংবিধানিকভাবে অবিসংবাদিত হলেও রাজনৈতিকভাবে ছিল এক সতর্কবার্তা। নতুন সরকারের বৈধতা কেবল বিজয়ের উল্লাসে নয়, বরং প্রাত্যহিক শাসনদক্ষতার কষ্টিপাথরে যাচাই হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তবুও কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ বর্তমান অস্থির বিশ্বে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই নতুন করে উর্ধ্বে তুলে ধরেছে। এ প্রসঙ্গেই আজকের উপসম্পাদকীয়।
মধ্যপন্থার মরীচিকা ও জনমানসের ক্লান্তি
বিপুল বিজয় সত্ত্বেও কিয়ার স্টারমারের পক্ষে সেই কাক্সিক্ষত শাসনদক্ষতা ধরে রাখা ক্রমশ এক সুদূরপরাহত মরীচিকায় পরিণত হয়। স্টারমার প্রশাসন খুব দ্রুতই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ঘনঘন নীতি বদলের দোলাচল আর এক গভীর নাগরিক ক্লান্তির বৃত্তে। তথাকথিত ‘ব্যবস্থাপনামুখী মধ্যপন্থা’ যে সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু বন্ধন জোড়া লাগাতে পারে না, তা ব্রিটিশ জনমানসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের মে মাসে ইউগভ—এর এক জনমত জরিপে যখন তাঁর জনপ্রিয়তার পারদ নেমে মাইনাস ৪৬ শতাংশে ঠেকে, তখন তা ছিল এক স্বল্পভাষী—গম্ভীর স্বভাবের নেতার জন্য চূড়ান্ত দেউলিয়া হওয়ার ইঙ্গিত। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে পরাজয় সেই ক্ষতকে আরও জটিল করে দেয়। লেবার পার্টির সাজানো দুর্গগুলো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে। সেখানে মাথা তোলে রিফর্ম ইউকে, গ্রিন পার্টি কিংবা স্বতন্ত্র ধারা। শ্রমজীবী ও শহুরে অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত রাজনৈতিক আনুগত্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়। অবশেষে মেকারফিল্ড উপনির্বাচনে অ্যান্ডি বার্নহ্যামের জয় দলের ভেতরের ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা অসন্তোষকে এক প্রকাশ্য ও অনিবার্য নেতৃত্ব—সংকটের রূপ দেয়।
দ্বিমুখী আয়নায় স্টারমারের প্রস্থান
স্টারমারের এই বিদায়কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিদগ্ধজনেরা দু’টি ভিন্ন ও চমৎকার বৈপরীত্যের আলোয় বিশ্লেষণ করতে পারেন। প্রথম পাঠটি আশাবাদের, যেখানে সংসদীয় গণতন্ত্রের এক শাশ্বত সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে। যে নেতা জনসমর্থন এবং নিজ দলের আস্থা হারান, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজের চিরস্থায়ী জমিদারী বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে না করার শুভবুদ্ধি তাঁর থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে কিয়ার স্টারমারকে সাধুবাদ জানাতেই হবে। নতুন নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্রেফ একজন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনের এই সিদ্ধান্ত সংসদীয় ব্যবস্থার এক নিজস্ব আত্মসংশোধনের ক্ষমতা প্রদর্শন করে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এটি প্রমাণ করে যে, একজন শাসক কেবল তখনই বৈধ, যতক্ষণ তাঁর পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্মতি অক্ষুণ্ণ থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে পদত্যাগ কোনো পরাজয় বা গ্লানি নয়, এটি হলো সাংবিধানিক বিনয় ও গণতন্ত্রের প্রতি নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তবে এর দ্বিতীয় পাঠটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রিত্ব যেন এক ঘূর্ণায়মান দরজায় পরিণত হয়েছে। এক দশকের এই অস্থিরতা অর্থনৈতিক কৌশল, দীর্ঘমেয়াদি জনসেবা সংস্কার এবং পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। যে শাসনব্যবস্থা ব্যর্থ নেতাকে সরিয়ে দিতে পারে, তা নিশ্চয়ই স্বাস্থ্যকর। কিন্তু যে ব্যবস্থা কোনো নীতি পূর্ণতা পাওয়ার আগেই তার রূপকারদের গ্রাস করে ফেলে, তা এক গভীর প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। তাই আজ প্রশ্ন শুধু এটিই নয় যে স্টারমারের সরে দাঁড়ানো কতটা যৌক্তিক, বরং প্রশ্ন হলোÑব্রিটেনের প্রাচীন প্রতিষ্ঠানগুলো জবাবদিহিতা ও স্থায়িত্বের এই চিরন্তন দ্বৈরথকে একসঙ্গে সামাল দিতে পারবে কি না।
টেমস ও পদ্মার দূরত্ব: একটি তুলনামূলক পাঠ
এই পটভূমিতে বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে এক তীব্র ও বেদনাদায়ক বৈসাদৃশ্য চোখে পড়ে। বাংলাদেশের অশান্ত রাজনৈতিক ইতিহাসে জনআস্থা হারানোর পর স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার নিয়মতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়েই ওঠেনি। সেখানে বরং এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী ধারা দৃশ্যমান, যেখানে শাসকেরা নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষয়কে নির্দ্বিধায় অস্বীকার করে যান। বাংলাদেশের ভঙ্গুর রাজনীতিতে জনমত নয়, ক্ষমতাই সব। সংসদীয় জবাবদিহিতা বা জনমতের কাছে মাথানত করে ক্ষমতা ছাড়ার কথা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আদৌ সম্ভব কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
বাংলাদেশের নির্বাচনী বৈতরণী মূলত ম্যান্ডেটের ভেতরের কঙ্কাল ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রধান বিরোধী দলগুলোর নির্বাচন বর্জন, ভোটারদের চরম উদাসীনতা এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সেই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নই যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের ক্যামোফ্লেজে জোর করে পাওয়া আসনসংখ্যা কখনো নৈতিক বৈধতা এনে দেয় না। এমন ব্যবস্থায় শাসকেরা আইনের মারপ্যাঁচে আইনি বৈধতার বড়াই করতেই পারেন, কিন্তু প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন সেই ক্ষমতা আসলে এক গভীর রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ওপর বিছানো পাতলা মখমলের চাদর ছাড়া আর কিছুই নয়। ড. মোঃ ইউনুসের অন্তর্বতীর্কালীন সরকারের বৈধতা নিয়েই যেখানে প্রশ্ন ছিলো, সেখানে একটি বিশাল দলকে নিষিদ্ধ করে সুডো—গণতন্ত্রের নির্বাচনী খেলা যে আসলে গণতন্ত্র নয়, সে নিয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই।
সংশোধনের পথ ও গণতন্ত্রের শেষ পাঠ
ব্রিটেন ও বাংলাদেশের মৌলিক ফারাকটি এই নয় যে একটি নিখাদ স্বর্গ আর অন্যটি নরক। ব্রিটেনের সমাজেও আজ তীব্র ত্রুটি বিদ্যমানÑঅসম নির্বাচন পদ্ধতি, দলীয় কোন্দল, জনতুষ্টিবাদের সস্তা রাজনীতি এবং বিপর্যস্ত জনসেবায় নাগরিক ক্ষোভের আগুন ইত্যাদি রয়েছে। আবার বাংলাদেশের মাটিতেও রয়েছে এক অদম্য মুক্তির বা স্বাধীনতার স্পৃহা, অসীম নাগরিক সাহস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগের এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। একাত্তরই তার উজ্জ্বল উদাহরণ। আজ একাত্তরকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে উঠেপড়ে লেগেছে দেশবিরোধীরা। তাই আসল পার্থক্যটি লুকিয়ে আছে সংশোধনের নিজস্ব প্রক্রিয়ার ভেতর। ব্রিটেনে দলীয় অসন্তোষ, উপনির্বাচন, সংবাদপত্রের তীক্ষè নজরদারি এবং সংসদীয় রীতিনীতির আবহ রাষ্ট্রকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে এক শান্তিপূর্ণ নেতৃত্ব—পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অথচ বাংলাদেশে রূপান্তর ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি আর প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙচুরের চড়া মূল্য চুকিয়ে।
নেতার পদত্যাগ যে বিশাল প্রাপ্তি তা নয়, বরং কখনো কখনো তা গভীর দিশাহীনতারই লক্ষণ। কিন্তু ব্যাপক আস্থাহীনতার মুখেও ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখার একগুঁয়েমি আরও ধ্বংসাত্মক। তা সমাজকে এই ভয়ানক বার্তা দেয় যে, ক্ষমতা কেবল বুলেটের কাছে মাথা নোয়ায়, ব্যালট বা বিবেকের কাছে নয়। বাংলাদেশে সামরিক শাসকদের দুঃশাসন ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। গণতন্ত্র কোনো অলৌকিক স্পর্শে বাঁচে না, তা বাঁচে এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের শক্তিতে যা শাসকের অহংকারকে চড়া মূল্যে পরিমাপ করতে শেখায়। স্টারমারের বিদায় তাই সচেতন ও শান্তিপ্রিয় মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, গণতান্ত্রিক ক্ষমতা কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, এটি জনমতের এক সাময়িক আমানত মাত্র। যখন শাসকেরা সংখ্যাতত্ত্বকে নৈতিক অধিকার ভেবে ভুল করেন, তখনই ক্ষমতার সেই অহংকারী ম্যান্ডেট একদিন রোদের আলোয় বরফের মতো গলে যায়।
কুডোস টু ইউ, প্রাইম মিনিস্টার কিয়ার স্টারমার!
আদর্শভিত্তিক গণতন্ত্রের জয় হোক!
