কাগজের ক্যানভাসে পৃথিবীর গল্প—পনের মার্কিন ডলারের রঙিন সিলমোহর || আখতার আহমেদ রাশা নিউজার্সি
আসছে ৪ঠা জুলাই, আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। আড়াইশ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় কত যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট আর রাজনৈতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে এই দেশÑ তারই এক জীবন্ত দলিল লুকিয়ে আছে আমাদের মানিব্যাগে কিংবা পকেটে থাকা ডলারের ভিতরে। সাধারণত আমরা মার্কিন ডলার বলতে কেবল সবুজ নোট বা ‘গ্রিনব্যাক’ (এৎববহনধপশ) বুঝি। ডলার বলতেই চোখে ভেসে ওঠে চারকোনা সবুজ রঙের কিছু কাগজের টুকরো। কিন্তু একজন মুদ্রা সংগ্রাহকের অ্যালবাম ওল্টালে দেখা যাবে এই মার্কিন ডলার সবসময় শুধু একরঙা ছিল না। ডলারের গায়ে থাকা গোল সিলমোহর (ঞৎবধংঁৎু ঝবধষ) এবং সিরিয়াল নম্বরের রঙের আড়ালে লুকিয়ে আছে আমেরিকার ইতিহাস, যুদ্ধকালীন রণকৌশল আর সোনা—রূপার চমকপ্রদ সব গল্প। মার্কিন কাগজের মুদ্রায় সিলের রঙ মূলত নির্দেশ করে যে নোটটি কোন ধরনের আর্থিক ও আইনি ব্যবস্থার অধীনে ইস্যু করা হয়েছিল। আজ আমরা সন্ধান করব মার্কিন ডলারের সেই রঙিন সিলমোহরের গোপন ইতিহাস। আমরা যে চিরচেনা সবুজ ডলার চিনি তার আড়ালে রয়েছে লাল, নীল, বাদামি আর হলুদ রঙের এক বৈচিত্র্যময় জগত যা আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার বিবর্তনের কথা বলে। আমাদের সবচেয়ে পরিচিত আধুনিক ডলারে রয়েছে সবুজ সিল। ১৯২৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই সবুজ সিল ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি নির্দেশ করে যে নোটটি আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ‘ফেডারেল রিজার্ভ’ দ্বারা ইস্যু করা এবং এর আর্থিক মান সম্পূর্ণ সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত। বিশ্ব অর্থনীতিতে আজ যে ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য তার মূল ভিত্তি এই সবুজ সিলের ফেডারেল রিজার্ভ নোট।
নীল সিলের নোটগুলো ইতিহাসপ্রেমী ও সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এর মানে হলো এই নোটটি একটি ‘সিলভার সার্টিফিকেট’ (ঝরষাবৎ ঈবৎঃরভরপধঃব)। ১৯২৮ থেকে ১৯৫৭ সালের সিরিজের নোটে এই নীল সিল ও নীল সিরিয়াল নম্বর দেখা যায় (যেমন বিখ্যাত ১৯৫৭ সালের ১ ডলারের নোট)। এর পেছনের গল্পটি চমৎকার। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে আমেরিকায় নিয়ম ছিল, আপনার কাছে যদি একটি নীল সিলের সিলভার সার্টিফিকেট থাকে, তবে আপনি যেকোনো ব্যাংকে গিয়ে সেটির বিনিময়ে সমমূল্যের বিশুদ্ধ রূপার মুদ্রা (ঝরষাবৎ উড়ষষধৎং) বা সমপরিমাণ রূপা দাবি করতে পারতেন। অর্থাৎ, কাগজের নোটটির বিপরীতে সমপরিমাণ রূপা সরকারি কোষাগারে জমা রাখা থাকত। ১৯৬৪ সালের পর মার্কিন সরকার কাগজের নোটের বিপরীতে রূপা দেওয়ার এই নিয়মটি বন্ধ করে দেয় এবং ১৯৬৮ সালের পর এই নোটগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর পুরোপুরি শেষ হয়। তবে সংগ্রাহকদের কাছে আজ এই নীল সিলের সিলভার সার্টিফিকেটগুলো ভীষণ কাক্সিক্ষত।
লাল সিলের নোটগুলো সরাসরি মার্কিন সরকারের ট্রেজারি (ঋবফবৎধষ জবংবৎাব ব্যাংক নয়) থেকে ইস্যু করা হতো। এগুলোকে বলা হতো ‘ইউনাইটেড স্টেটস নোটস’ বা ‘লিগ্যাল টেন্ডার’। ১৮৬২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৬০—এর দশক পর্যন্ত এই লাল সিলের নোট প্রচলিত ছিল। মূলত আমেরিকার গৃহযুদ্ধের (ঈরারষ ডধৎ) সময় সরকারি ব্যয় মেটাতে এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এই নোটগুলো প্রথম বাজারে ছাড়া হয়েছিল। আমেরিকার ইতিহাসের এক সংকটময় অধ্যায়ের সাক্ষী এই লাল সিল।
বাদামি সিলের মূলত দুটি বড় ইতিহাস আছে। প্রথমত, ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে আমেরিকার স্থানীয় বিভিন্ন ‘ন্যাশনাল ব্যাংক’ যখন নিজস্ব উদ্যোগে নোট ইস্যু করত তখন বাদামি সিল ব্যবহার হতো। তবে এর দ্বিতীয় ইতিহাসটি রোমাঞ্চকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন ডলার ভাগ হয়ে গেল দুই রঙের চতুর রণকৌশলে। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৪ সালের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এবং ওদিকে ভূমধ্যসাগর ও উত্তর আফ্রিকার তপ্ত বালুক্ষেত্রে লড়াই করা মার্কিন সৈন্যদের পকেটে পৌঁছে দেওয়া হলো বিশেষ ‘ইমার্জেন্সি নোট’। হাওয়াইয়ের জন্য বরাদ্দ হলো বাদামি সিলমোহর (এবং নোটের পেছনে বড় অক্ষরে ঐঅডঅওও ওভারপ্রিন্ট), আর উত্তর আফ্রিকার সৈন্যদের জন্য হলুদ সিলমোহরের বিশেষ ডলার। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারীÑজাপান বা জার্মানি যদি ওই অঞ্চলগুলো দখল করে প্রচুর মার্কিন ডলার লুটও করে, তবে মার্কিন সরকার যেন এক আদেশে ওই নির্দিষ্ট বাদামি বা হলুদ সিলের নোটগুলোকে রাতারাতি বাতিল বা মূল্যহীন ঘোষণা করতে পারে, যাতে শত্রুপক্ষ সেই অর্থ বিশ্ববাজারে ব্যবহার করতে না পারে।
আমেরিকার মুদ্রায় রঙের ইতিহাস কিন্তু শুধু অতীতেই আটকে নেই, বর্তমানেও এর একটি বড় বিবর্তন ঘটেছে। ১৯৯৬ সালের আগের ডলারকে বলা হতো ‘মনোক্রোম্যাটিক’ বা একরঙা সবুজ ও কালো নোট। কিন্তু ২০০৩ সালের পর থেকে শুরু হয় ‘নেক্সট জেনারেশন কারেন্সি’ (ঘবীএবহ) বা আধুনিক ডলারের যুগ। আমরা যদি আধুনিক ১০, ২০ বা ৫০ ডলারের নোটগুলো ভালো করে লক্ষ্য করি, দেখবো এগুলো আর স্রেফ ‘সবুজ’ নেই। ডলারের জালিয়াতি ঠেকাবার জন্য মার্কিন সরকার নোটে রঙের এক নতুন খেলা শুরু করেছে। ২০ ডলারের নোটে এখন হালকা সবুজ ও নীলের মিশ্রণ (ইধপশমৎড়ঁহফ ঈড়ষড়ৎ), ১০ ডলারের নোটে কমলা ও হলুদের আভা, আর ৫০ ডলারের নোটে গোলাপী ও নীলের জলছাপ ব্যবহার করা হচ্ছে।
রঙের এই আধুনিক খেলার সবচেয়ে জাদুকরী রূপটি দেখা যায় আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রচলিত নোট—১০০ ডলারের বিলে। জালিয়াতি চক্রকে রুখতে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এই নোটে যুক্ত করেছে এমন কিছু অভাবনীয় প্রযুক্তি যা আগে কখনো আমেরিকার মুদ্রায় দেখা যায়নি। বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিনের চিরচেনা প্রতিকৃতির ঠিক পাশেই রয়েছে একটি ত্রিমাত্রিক নীল রঙের সিকিউরিটি রিবন। নোটটি সামান্য নাড়াচাড়া করলেই এই রিবনের ভেতরের ঘণ্টা এবং ‘১০০’ সংখ্যাগুলো এক অদ্ভুত হলোগ্রামের মতো নড়াচড়া করে রঙ বদলাতে শুরু করে। শুধু তাই নয় নোটের তামাটে রঙের কালির দোয়াতটির দিকে তাকালে দেখা যায় নাড়াচাড়ার সাথে সাথে তার ভেতর থেকে একটি সবুজ রঙের ঘণ্টা জাদুকরী উপায়ে ভেসে উঠছে। কাগজের নোটে প্রযুক্তির এই রঙিন ব্যবহার আধুনিক মার্কিন মুদ্রা ব্যবস্থাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়।
আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের এই লগ্নে মার্কিন ডলারের রঙিন সিলমোহরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় এগুলো কেবল দৈনন্দিন লেনদেনের উপায় বা কাগজের টুকরো নয়Ñএর পেছনে লুকিয়ে আছে এক বিশাল ইতিহাস। লাল সিলের গৃহযুদ্ধ, নীল সিলের রূপার জোগান, বাদামি ও হলুদের বিশ্বযুদ্ধ, সবুজের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য, আর সর্বাধুনিক ১০০ ডলারের এই হাই—টেক রঙের জাদুÑসব মিলিয়ে ডলারের প্রতিটি রঙ আসলে আমেরিকার ইতিহাসের একেকটি বাঁক পরিবর্তনের গল্প বলে। একজন সংগ্রাহক হিসেবে এই নোটগুলো যখন আমার অ্যালবামে সাজিয়ে রাখি, তখন মনে হয় আমি কেবল মুদ্রা জমিয়ে রাখিনি, বরং নিজের অজান্তেই বন্দি করে রেখেছি আমেরিকার আড়াইশ বছরের চড়াই—উতরাইয়ের এক রঙিন ইতিহাস।
