গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— ষোল আধুনিক সুরের বৈপ্লবিক রূপকার সলিল চৌধুরী

. জীবন বিশ^াসঃ বাংলা সংগীতে সলিল চৌধুরীর আবির্ভাব কোনো মন্থর বিবর্তন নয়, বরং এক আপোষহীন নন্দনতাত্ত্বিক দ্রোহ। তার আগমন যেন স্থাপত্যের ক্যানভাসে এক সাহসী জ্যামিতি, কর্ষিত ক্ষেতে এক কালান্তরের বীজ আর নিঝুম জনপদে এক সচকিত জাগরণ। তাঁর পূর্বে গান ছিল প্রথাবদ্ধ, সুর ছিল চেনা আলোছায়ায় বন্দি, কাব্যের সুষমা আর রাগসংগীতের ঐশ্বর্যও ছিল মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমের অলংকার। সলিল চৌধুরী এসে সেই জমাটবদ্ধ সুরের রাজপ্রাসাদ ভেঙে তাকে রাজপথের মিছিল আর সাধারণ মানুষের হৃৎস্পন্দনের সাথে একাত্ম করে দিলেন। তিনি দেখালেনÑ গান একই সঙ্গে মিছিলের পা, প্রেমিকের নিঃশ্বাস, শ্রমিকের ঘাম, শিশুর বিস্ময়, চলচ্চিত্রের দৃশ্য, আর সিম্ফনির বিস্তার হতে পারে। পঞ্চকবির ঐতিহ্যের পর বাংলা গানে যে কয়েকজন স্রষ্টা নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে সলিল চৌধুরীর নাম তাই বিশেষ মর্যাদায় সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়। বাংলা গানের একরৈখিক মেলোডির শান্ত সলিলে সলিল চৌধুরী ছিলেন এক আকস্মিক কালবৈশাখী। তাঁর আবির্ভাব যেন সুরের একঘেয়েমিকে ভেঙে চুরমার করে এক উত্তাল তরঙ্গের জন্ম দিয়েছিল। গান যে কেবল নিভৃত অন্তপুরের বিলাসিতা কিংবা অলস বিকেলের দীর্ঘশ্বাস নয়, তা যে হতে পারে কারখানার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, রাজপথের মিছিলে ফেটে পড়া শতসহস্র বুটের আওয়াজ, কিংবা ক্ষুধার্ত শিশুর কান্নার এক তীব্র অবিনাশী প্রতিধ্বনি, তা তিনি দেখিয়ে দিলেন। তিনি সুরের জমিনে কোনো প্রথাগত আলপনা আঁকেননি, বরং গড়ে তুলেছিলেন এক জটিল মহিমান্বিত সাঙ্গীতিক স্থাপত্য। যেখানে প্রতিটি সুরের ওঠানামা এক একটি ইটের মতো দৃঢ়, আর তার ভেতরে স্পন্দিত হতো এক বিশ্বজনীন সিম্ফনির মহাকাব্যিক বিস্তার। সলিল চৌধুরীর জন্ম ১৯ নভেম্বর ১৯২৫ সালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার গাজীপুরহরিনাভি অঞ্চলে। ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর কলকাতায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, কবি, গল্পকার, বাঁশিবাদক, পিয়ানোবাদক, অর্কেস্ট্রেটর এবং সর্বোপরি এক গভীর সামাজিক চেতনার শিল্পী। 

আসামের অরণ্যছায়া এবং এক বিরল শ্রবণমেধার অন্বেষণ

সলিল চৌধুরীর সাঙ্গীতিক বীজটি রোপিত হয়েছিল সুদূর আসামের চাবাগানের অরণ্যঘেরা পরিবেশে। পিতা জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী ছিলেন ব্রিটিশ চাকুরিজীবী চিকিৎসক। তবে কেবল মানুষের নাড়ি দেখাই তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিল না, তাঁর অন্দরে বাস করত এক গভীর সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ। তার সংগ্রহে ছিল বিটোভেন, মোজার্ট, বাখ কিংবা চায়কভস্কির মতো পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের অজস্র দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড। শৈশবের সেই দিনগুলোতে একদিকে যখন ড্রয়িংরুমে বাজত ওয়েস্টার্ন সিম্ফনির জটিল কর্ড আর হারমনি, অন্যদিকে তখন জানালার ওপারে চাবাগানের কুলিমজুরদের কণ্ঠ থেকে ভেসে আসত ঝুমুর আর মাদলের মাটির সুর। এই দুই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সুরের স্রোত কিশোর সলিলের মননে এক অদ্ভুত রসায়ন তৈরি করেছিল। তিনি কান পেতে শুনতেন প্রকৃতির সংযত কোলাহল, পাতার মর্মর আর ঝড়ের গর্জন। এই বিরল শ্রবণক্ষমতাই পরবর্তীতে তাঁকে কেবল একজন সুরকার নয়, বরং একজন আন্তর্জাতিক মানের অর্কেস্ট্রেটর হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

দুর্ভিক্ষের রাস্তা থেকে গণনাট্যের বারুদস্বাক্ষর

কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজের ছাত্রজীবনে পা রাখার পর সলিল চৌধুরীর সামনে উন্মোচিত হলো এক অন্য বাস্তবতার ক্যানভাস। ১৯৪০এর দশকের সেই উত্তাল সময়Ñএকদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালো ছায়া, অন্যদিকে তেভাগা আন্দোলনের বারুদ আর পঞ্চাশের মন্বন্তরের সেই বীভৎস হাহাকার। বাংলার ফুটপাতে যখন ক্ষুধার্ত মানুষ এক ফোঁটা ভাতের মাড়ের জন্য চিৎকার করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছে, সেই নির্মম দৃশ্য তখন তরুণ সলিলের কবি শিল্পীহৃদয়কে আমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিল। শিল্পকে কেবল উচ্চবিত্তের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখার বুর্জোয়া মানসিকতাকে তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। যুক্ত হলেনভারতীয় গণনাট্য সংঘ সঙ্গে। এই পর্বে তাঁর হাত দিয়ে জন্ম নিল গণসংগীতের এক নতুন ব্যাকরণ। আলোর পথযাত্রী’, ‘হেই সামালো ধান হোকিংবাবিচারপতি তোমার বিচার’—এই গানগুলোর ভেতরে ছিল ক্ষুরধার বক্তব্য, মার্চরিদম, কোরাল হারমনি আর হঠাৎ ছন্দবদলের এক অভূতপূর্ব পাশ্চাত্য কৌশল। তিনি গণসংগীতকে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা কোনো মাটির প্রদীপ নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক একটি সুরের আগ্নেয়াস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।

আধুনিক গানের জ্যামিতি এক অনন্য শব্দচিত্রের জাদু

রাজনৈতিক দ্রোহের সমান্তরালে বাংলা আধুনিক গানের প্রাঙ্গণেও সলিল চৌধুরী এনেছিলেন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তিনি যখন প্রেমের গান লিখলেন, সেখানেও রোমান্টিকতাকে কেবল আবেগের গন্ডিতে আটকে রাখলেন না। তাঁর গানে প্রেম এলো এক অমোঘ সত্যের মতো, যেখানে বিরহের সমান্তরালে এসে দাঁড়ায় সমাজ ব্যক্তিসত্তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট।কোনো এক গাঁয়ের বধূগানটির কথাই ধরা যাকÑতা কেবল ছয় মিনিটের একটি আধুনিক গান নয়, বরং সুরের তুলিতে আঁকা এক সম্পূর্ণ কাহিনীমূলক রচনার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেন সাংগীতিক উপন্যাসের নিখুঁত অডিও রূপান্তর। আবারআমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারাগানে একবিংশ শতাব্দীর নাগরিক মানুষের অস্তিত্বের সংকটকে তিনি মহাকাশের একাকীত্বের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। সলিলের সুরের গঠনশৈলী ছিল অত্যন্ত জটিল জ্যামিতিক। তিনি কেবল একটি সরল মেলোডি বা সুরের লাইন তৈরি করেই ক্ষান্ত হতেন না, গানের প্রিলিউড, ইন্টারলিউড, কাউন্টারমেলোডি এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সূক্ষ¥ প্রয়োগের মাধ্যমে এক একটি গানকে পূর্ণাঙ্গ দৃশ্যকল্পে রূপ দিতেন। পিয়ানোর একটি কর্ড কিংবা বাঁশির একটি তান কোথায় থামবে এবং কোথায় গিয়ে মেজর স্কেলটি আচমকা মাইনর স্কেলে রূপান্তরিত হয়ে শ্রোতার বুকের ভেতর হাহাকার জাগিয়ে তুলবে, সেই নিখুঁত সাঙ্গীতিক গণিত তাঁর নখদর্পণে ছিল।

বোম্বাইয়ের রুপালি জগৎ থেকে কেরালার সমুদ্র উপকূল

চলচ্চিত্রের রুপালি জগতেও সলিল চৌধুরীর পদার্পণ ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিল। তাঁর নিজের লেখা ছোটগল্পরিকশাওয়ালাঅবলম্বনে কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা বিমল রায় নির্মাণ করেছিলেন কালজয়ী হিন্দি ছবিদো বিঘা জমিন এই ছবির সংগীত পরিচালনার মাধ্যমেই বোম্বাইয়ের সিনেমা জগতে সলিলের রাজকীয় অভিষেক ঘটে। এর পরমধুমতি’, ‘আনন্দ’, ‘কাবুলিওয়ালা মতো কালজয়ী হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত পরিচালনা ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতের ব্যাকরণকে চিরকালের জন্য বদলে দেয়। তবে কেবল হিন্দি বা বাংলাতেই নয়, সলিল চৌধুরীর প্রতিভার ডানা প্রসারিত হয়েছিল সুদূর দক্ষিণ ভারতের মালয়ালম চলচ্চিত্রেও। কেরালা তথা দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় জীবনের পটভূমিতে নির্মিতচেম্মিনচলচ্চিত্রের আবহ গান তৈরি করে তিনি যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, তা কোনো মালয়ালি বা বাঙালি সুরকারের জন্য ছিল এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সুরের কোনো ভৌগোলিক সীমানা বা ভাষার প্রাচীর থাকে না।

কণ্ঠের পরীক্ষাগার এক অবিনাশী সুরের কারিগরি

সলিল চৌধুরীর সুরের জাদুকরি স্পর্শ পাননি, এমন গুণী শিল্পী ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে বিরল। তিনি প্রতিটি কণ্ঠের অন্তর্নিহিত শক্তিকে চিনতেন এবং সেই অনুযায়ী সুরের ক্যানভাস সাজাতেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের উদাত্ত গম্ভীর কণ্ঠে তিনি এনেছিলেন এক সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের শীতল ছায়া; লতা মঙ্গেশকরের স্ফটিকস্বচ্ছ কণ্ঠে যোগ করেছিলেন ঊর্ধ্বাকাশের নক্ষত্রের দীপ্তি; সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গায়কিতে দিয়েছিলেন এক পরিমিত আবেগ; আর মান্না দে কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলেছিলেন ধ্রুপদী পান্ডিত্যের অত্যুচ্চ মুন্সিয়ানা। এছাড়াও শ্যামল মিত্র, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সুবীর সেনÑপ্রত্যেকেই সলিলের সুরের স্পর্শে নিজেদের চেনা গায়কিকে ভেঙে এক নতুন রূপ আবিষ্কার করেছিলেন। সলিল চৌধুরী কেবল গান তৈরি করেননি, তিনি এক একটি কণ্ঠকে তাঁর সুরের পরীক্ষাগারে নিয়ে গিয়ে এক নতুন সাঙ্গীতিক দ্যোতনা দান করেছিলেন।

সলিল চৌধুরীর সুর বাণীতে কয়েকটি বিখ্যাত গান

১। আলোর পথযাত্রী, ২। হেই সামালো ধান হো, ৩। বিচারপতি তোমার বিচার, ৪। কোনো এক গাঁয়ের বধূ, ৫। নৌকা বাওয়ার গান, ৬। ঢেউ উঠছে কারা টুটছে, ৭। আমাদের নানান মতে, ৮। আয় রে আয় রে, ৯। ধিতাং ধিতাং বোলে, ১০। পথে এবার নামো সাথী, ১১। পথ হারাব বলেই এবার, ১২। আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা, ১৩। আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম, ১৪। শোনো কোনো একদিন, ১৫। না যেও না, রজনী এখনও বাকি, ১৬। সাত ভাই চম্পা, ১৭। ওগো আর কিছু তো নাই, ১৮। মোর ময়না গো, ১৯। উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা, ২০। যা রে যা ফিরে যা, ২১। গুনগুন মন ভ্রমরা, ২২। যদি নাম ধরে তারে ডাকি, ২৩। আহা ওই আঁকাবাঁকা যে পথ, ২৪। যদি কিছু আমারে শুধাও, ২৫। বাজে গো বীণা

পরিশেষ

বাঙালির মননে সলিল চৌধুরীর অবস্থান এক চিরন্তন ধ্রুবতারার মতো। সলিল চৌধুরীকে শোনা আসলে বাংলা গানের চিন্তাশক্তি বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনাকেই শানিত করা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, গণমানুষের গানও উচ্চমানের শিল্প হতে পারে, চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক সুরও জ্যামিতিক গভীরতা পেতে পারে, এমনকি শিশুদের জন্য তৈরি গানও হতে পারে সাঙ্গীতিক পরীক্ষানিরীক্ষার এক জটিল গবেষণাগার। তিনি সুরের ভেতরে কোনো সাময়িক মোহের কুয়াশা তৈরি করেননি, বরং এঁকে দিয়ে গেছেন এক অবিনাশী মানচিত্র। সলিল চৌধুরীর দ্রোহ প্রেমের সুর বাঙালির সাংগীতিক বাতিঘর হয়ে অনন্তকাল আলোক বিচ্ছুরণ করে যাবে।

Related Posts