দয়াহীন দেয়াল || মনিজা রহমান
মানুষ আড়াল খোঁজে জনাকীর্ণ সংসারে এবং জনান্তিকে
মানুষ আড়াল খোঁজে বিবিধ কারণে ও সংজ্ঞায়
ভাগ্যবান চিল, একাকী ওড়ে আড়ালহীন আকাশে
ছায়া পড়ে অতলান্তিকে
সব কিছুতেই নাকি স্বচ্ছতার প্রয়োজন
তবু মানুষ পোশাক পরে নিজেকে ঢাকার জন্য
শাড়ি পরে আমি যখন দ্রৌপদী হয়ে যাই
এ আমার নগ্নতার বিরুদ্ধে অলৌকিক প্রতিবাদ
মানুষ বাস্তবেও আছে, অলৌকিকেও আছে।
যে স্বচ্ছতার জন্য অপেক্ষা করে থাকি
জানি তা আসবে না কোনোদিন
কারণ স্বচ্ছতারও দেয়াল আছে
কখনো কখনো সে হয়ে যায় প্রতারক
পাখিরা স্বচ্ছতাকে বিশ্বাস করে আছড়ে পড়ে কাচে,
আহত হয়। আহা, আমাদের নিষ্পাপ পাখিগুলো
ওরা জানে না, স্বচ্ছতাও মুখোশপরা দেয়াল।
কখনো শুনেছে কেউ, দেয়ালও নক্ষত্র হয়ে যায়?
দেয়াল তখন আড়াল নয়, পর্যটকের পথ
যৌথ হেঁটে যায় পিছনে রেখে দ্বৈরথ।
কবে প্রথম নির্মিত হয়েছিল দেয়াল?
কে ছিল নির্মাতা?
অস্বচ্ছ ইতিহাসে লেখা আছে মিলিয়ে বিষণ্ণ শব্দজাল
আসলে প্রথম দেয়াল গড়ে ওঠে মনের ভেতরে
সামনের দেয়াল দিয়ে যতটা আড়াল হয়
তার চেয়ে ঢের বেশি ভেতরের আড়াল
বাম চোখের আড়াল যেমন ডান চোখ।
অন্ধকার পৃথিবীর চেয়েও দেয়াল আদিম
ঘরও চার দেয়ালের কারাগার, তথাপি সুখের উৎস
দু’জনের নিবিড় আনন্দযজ্ঞের জন্য
আড়ালের বিকল্প নেই
দেয়ালের আড়ালে তোমার বুকে বুক রাখি,
কপোলে কপোল, ঠোঁটে ঠোঁট
কৃতজ্ঞতার ঋণ জমতে থাকে দেয়ালের গায়ে।
পৃথিবীর সীমান্তে কোনো দেয়াল নেই
দেয়াল নেই চিন্তার এবং ভালোবাসারও
সত্যিই কি দেয়াল নেই চিন্তার ও ভালোবাসার?
এ জগত কারাগার, যেমন কারাগার ভালোবাসা
ভালোবাসা ঈর্ষার দেয়াল তোলে
এপারের মানুষ চেনে না ওপারের জনকে
দেয়াল মানুষকে একাকী করে।
প্রতিদিন দেয়ালের দৈর্ঘ্য বাড়ে, উঁচু হয়,
মানুষ দেয়াল ভালোবাসে, দেয়াল তুলতেও ভালোবাসে
দেয়ালে ভাগ হয় এক্কা—দোক্কা খেলার উঠোন
ছিপ ফেলে মাছ ধরার পুকুর এবং যৌথ পরিবার
দেয়ালে ভাগ হয় মানুষের মন, নিরীহ সম্পর্ক
ভাগ হয়ে যায় আকাশও।
খোলা—মেলা ভেবে পাখিরা বন্দি হয় খাঁচার দেয়ালে,
বাঘ—হরিণ অভয়ারণ্যের জালে।
দয়াহীন দেয়াল অন্যের স্বাধীনতা হরণ করে
কারণ দেয়ালের কোনো নিজস্ব স্বাধীনতা নেই।
—নিউইয়র্ক
