মুখোশে ঢাকা অভ্যুত্থান

সামরিক অভ্যুত্থান ছাড়া যে কোনো অভ্যুত্থানই হয় সমাজের চেহারা বা রাষ্ট্রক্ষমতা ইতিবাচক অর্থে পরিবর্তনের জন্য। বিপ্লবও তাই। অবশ্য এই ইতিবাচক শব্দটি কে কিভাবে বিচার করবেন তা তার ওপর নির্ভর করে। কেউ জনগণের ওপর গুলি চালায় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য (খুব কম ক্ষেত্রেই তা অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়), কেউ জনগণের লাশ না পড়লেঅভ্যুত্থানসফল হয় না বলে মনে করে। এটা বিভ্রান্তি, আবার বিভ্রান্তি নয়। বিভ্রান্তি নয় কারণে যে যুগে যুগে যেসব আন্দোলন এবং অভ্যুত্থান হয়েছে বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সমাজে, বিভিন্ন ইস্যুতে সেগুলো মিথ্যাচার করে হয়নি। যেমন আমাদের দেশে যারা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছেন বিভিন্নভাবে তাদের সেসব আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। কিন্তু বৃটিশ উপনিবেশবাদী শাসকরা দেশের মানুষকে পদানত করে রাখার উদ্দেশে নানা ষড়যন্ত্র করেছে, জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে। তাদের মূল ষড়যন্ত্র ছিলডিভাইড এন্ড রুল দীর্ঘদিন দেশের মানুষকে শাসন শোষণ করলেও তা চিরস্থায়ী হয়নি। আর দেশের মানুষ নজরুল আর দীনবন্ধু মিত্রের মত সরাসরি কথা বলেছিল। যে আন্দোলন সরাসরি প্রকাশ্যে হয়, যেমন বঙ্গবন্ধু কী চেয়েছিলেন তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে বসেই বলেছিলেন, তার ফল আমরা পেয়েছি। এর ফলাফল সমাজকে পরিবর্তন করে, নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করে, নিজের দেশ সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে। অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতেও শেখায়। এর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো বাংলাদেশে গেছেন সরকারি সফরে, আমেরিকার কিসিঞ্জার বাংলাদেশে গিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্যমূলক মন্তব্য করে ফিরে এসেছেন নিজ দেশে। আবার বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে গেছেন, আমেরিকায় এসে প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সাথে দেখা করেছেন হোয়াইট হাউজে।সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়বঙ্গবন্ধুর এই লিবারেল মানসিকতা তিনি নিজের জীবন দিয়ে পালন করেছেন। কেউ কাউকে ট্যাগ করেনি, কেউ কারো প্রতি কটুকথা বলেননি।

২০২৪ সালে যা কিছু হয়েছে মিথ্যা শ্লোগান দিয়ে, মিথ্যা ইস্যুতে আন্দোলন করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। তৎকালীন সরকারের নানা বাহিনীর নানা আকৃতির গোয়েন্দারা সেই মিথ্যা বুঝতে পারেনি। আর সরকার কিছু না বুঝেই বেপরোয়া গুলি চালিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করে জনগণের এবং সব বাহিনীর সমর্থন হারিয়ে ফেললে পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।

পরিচয় গোপন রেখে মিথ্যাচারিতার আশ্রয় নিয়ে কেন রাস্তায় নামতে হয়েছে, তা আজ আর গোপন নেই। তাদের মুখোশও খুলে পড়েছে। তাদের মিথ্যাচারিতাও প্রকাশ হয়ে গেছে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার নেতা বঙ্গবন্ধুর বংশকে নিমূর্ল করা। তারপর চারনেতাকে কারান্তরালে রাতের অন্ধকারে সব নিয়মকানুন, আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক আইন ভঙ্গ করে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ধ্বংস করা। এন্থনি ম্যাসকারেনহাস তারলিগাসি অব ব্লাডবইতে জানিয়েছেন এর পিছনে পরাশক্তির হাত ছিল। আর ২০২৪ এর এই সরকার পতনের ষড়যন্ত্রেও পরাশক্তির সরাসরি জড়িত থাকার কথা এখন আর গোপন নেই।

আমরা খুব অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, বরাবর, বাংলাদেশে রাজনীতির দুটি ধারা চলে আসছে, একটি আওয়ামী লীগের, আর সবই আওয়ামী বিরোধী। এখানে স্বীকার করতে হবে ভারত কোনো ফ্যাক্টর নয়। ভারত একটি অজুহাত। স্বাধীনতা অর্জনের সাথে সাথে ভারতের সৈন্য বাংলাদেশের মাটিতে কেন? এই প্রশ্ন তুলে খুব দ্রুত মানুষদের বোঝানো হয় যে পাকিস্তানকে বিতাড়নের উদ্দেশ্য হলো ভারতের ছত্রছায়ায় চলে যাওয়া। বঙ্গবন্ধু প্রোইন্ডিয়ান ছিলেন না, তিনি স্বাধীনতার আগে ভারতের সাহায্য চাননি, এমন কি কোনো বন্দোবস্তও করে রাখেননি। আগরতলা মামলাতেও তা প্রমাণ হয়নি। ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরার আগেই তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের সৈন্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রম্নতি আদায় করেন এবং বাস্তবায়নও করেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান হওয়ায় ভারত বিরোধী ইস্যুগুলো খুব কার্যকর হয়।

আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশে ২৬ লক্ষ ভারতীয় কাজ করছে, পুলিশ বাহিনী সেনাবাহিনীতে গোপনে ভারতীয় নিয়োগ দেয়া হয়েছে, মসজিদে এবার উলুধ্বনি দেয়া হবে, ইত্যাদি কথা বলে একদিকে আফগান পাকিস্তান মার্কা জঙ্গিদের উত্থান ঘটানো হয়েছে, অপরদিকে আওয়ামী বিরোধী মানসিকতা ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

এখানে কোনো দল মুখ্য নয়। বরং এসব বলে বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি উপড়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। তাদের ভাষ্যে মুক্তিযুদ্ধ মানেই আওয়ামী লীগ। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে হাস্যরস করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন হতেই পারে, দুইবার দুটি নির্বাচন নিয়ে সরকার (রাতের ভোট আমিডামি) যে প্রহসন করেছে তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন হতেই পারে। তার ফলে সরকার পরিবর্তনও হতেই পারে। কিন্তু যখন দেখা গেল ৭৫এর মত কেবল নেতাদের হত্যা করলে বা বিতাড়িত করলে আবার দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, তাই দলের কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধ নয়, একাত্তরকে মুছে ফেলা, বাহাত্তরের সংবিধান ছুঁড়ে ফেলার মত যখন ম্যান্ডেটহীন কার্যক্রম শুরু হলো, তখন সব মুখোশ খুলে পড়ল।

যারা এইসব সিদ্ধান্তের পিছনে ছিল, যারা রিসেট বাটন পুশ করা সহ মুখ ফসকে ২৪এর ঘটনাকেমিটিক্যুলাস ডিজাইনেকরার কথা বলে ফেলেছেন, তারা জানিয়ে দিয়েছেন তাদের উদ্দেশের কথা। তাদের যদি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থাকত, তাহলে বুঝত মিথ্যাচার করে সরকারর পতন বড় কথা নয়, সেই পতনের পরবতীর্ সময়ের পরিকল্পনা জরুরী। তাছাড়া গণতন্ত্রের প্রকৃত সত্য জনগণে। ৫১% মানুষের সমর্থনে কোনো দল বা কোয়ালিশন জয়ী হলেও পরাজিত ৪৯% মানুষকে ফেলে দেয়া যায় না। তাদের আদর্শও মুছে ফেলা যায় না। জনগণই জানাবে তারা ক্ষমতায় কাকে চায়, কাকে চায় না। ১৯৯১ সালে, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ হেরে গিয়েছিল। রাজনীতিতে হারজিৎ থাকবে। সেটা এক বা দুই বা তিন মেয়াদের জন্য হতে পারে। কিন্তু কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে কাউকে দাবিয়ে রাখা গেছে, এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তাছাড়া কোনো বড় দল নিষিদ্ধ থাকলে দেশে অশান্তি বাড়তেই থাকবে। অশান্তি থামাতে গণহত্যা করে পাকিস্তান টেকেনি আওয়ামী লীগও হেরেছে।

ইতিমধ্যেই রাজনীতিতে যে অসহিষ্ণুতা দেখা যাচ্ছে পরস্পরকে সহ্য না করতে পারার, একাত্তরকে অস্বীকার করার, মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা এবং অশ্লীল ভাষা ব্যবহারের যে তথাকথিত নতুন সংস্কৃতির উদ্ভব হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসাও সহসা সম্ভব হবে না। ২৪উত্তর বাংলাদেশের সমাজে যে উল্টোধারা তা সোজাধারায় নিয়ে আসতে না পারলে এটা চলতেই থাকবে। কোনো আন্দোলন যদি জাতিকে ভুল পথে চালিত করার উদ্দেশে হয়, তার পরিণতি কী হতে পারে, সময়ই বলে দেবে।

Related Posts