বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে দুইদিন ব্যাপি || শতাধিক শিল্পী নিয়ে বিপার মাইলফলক অনুষ্ঠান
বাঙালী প্রতিবেদনঃ দেশেও এমন হয় কিনা সন্দেহ। প্রায় ৪ বছরের শিশু থেকে শতাধিক শিল্পী ও শিক্ষার্থী একই মঞ্চে গান গেয়ে, নাচ করে, একক অভিনয় করে বাংলা নতুন বছরকে বর্ণাঢ্য উচ্ছ্বাসে বরণ করলেন। এই আয়োজন ছিল প্রবাসের দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সংগঠন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস বা বিপা’র। বিপা যেমন প্রবাসীদের প্রত্যাশাকে তুঙ্গে নিয়ে গেছে একটির পর একটি সৃজনশীল মন জয় করা অনুষ্ঠান উপহার দিয়ে, তাই তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণে বারবার আরো বেশি পরিশ্রমী ও সনিষ্ঠ হতে হয়। গত শনি ও রবিবার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিপা তাদের সৃজনশীলতার পরাকাষ্ঠা আবার তুলে ধরল। দুদিনের অনুষ্ঠানেই ছিল দর্শকদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার অকুণ্ঠ চেষ্টা।
জ্যামাইকার মূলধারার মঞ্চ জেপ্যাকেই আয়োজিত হয় দুদিনের অনুষ্ঠান দর্শনীর বিনিময়ে। শনিবারের আয়োজন ছিল গান দিয়ে সাজানো আর রবিবারের আয়োজন নাচের। তবে এদিন বাড়তি পাওনা ছিল বাংলাদেশের স্বনামধন্য নৃত্যশিল্পী, যিনি নৃত্যসারথী নামে পরিচিত লায়লা হাসানের সংবর্ধনা আর নতুন প্রজন্মের তরুণী রূপন্তি ওয়াজিদের একক অভিনয়।
শনিবার অনুষ্ঠান শুরু হয় ‘ধূসর বৈশাখ’ দিয়ে। এতে কমলা রঙের পোশাক পরে অর্ধ চন্দ্রাকৃতিতে তিন স্তরে বসে শিশু, কিশোর—কিশোরীরা পরিবেশন করে একটির পর একটি গান। কখনো সমবেত কণ্ঠে, কখনো দ্বৈতকণ্ঠে। তবে এত বিপুল সংখ্যক শিশুকে সমবেত কণ্ঠে একই তালে লয়ে একীভূত করে গান করিয়ে নেয়ার যে কৃতিত্ব তাতে প্রমাণিত হয় বিপা এই শিশুদের যথার্থই তালিম দিচ্ছে। সংগীত শিক্ষক নিলোফার জাহানের নেতৃত্বে এই ধূসর বৈশাখকে উজ্জ্বল করে তোলে যেসব গান সেগুলো হলো এসো হে বৈশাখ এসো এসো, খোল খোল দ্বার, আলো আমার আলো, ঝড় এসেছে ঝড় এসেছে, ওই যে আকাশের গায় সুরের বলাকা ভেসে যায়, এবং দেখো দেখো চেয়ে দেখো। এর সাথে কবিতা আবৃত্তিও। সম্পূর্ণ মুখস্থ এবং সুরে ও লয়ে ধরে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সম্মেলক কণ্ঠ হয়ে ওঠা শিশুদের গানের পরিবেশনা যে কাউকে মুগ্ধ করবে।
পরের পর্বটি ছিল ‘ঢাক ঢোল ঝাঝর বাজে’ শিরোনামে আবৃত্তি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের আবৃত্তি পরিবেশনা। এই পর্বটিকে সাজানো হয় মৃদুল আহমেদের গ্রন্থনায় ছড়া দিয়ে। ছড়ার সাথে মৃদঙ্গ বাজিয়ে শিশুদের ছন্দজ্ঞান বুঝিয়ে দেন মৃদুল আহমেদ। এই পর্বটি পরিচালনা করেন আবৃত্তি শিক্ষক সাবিনা শারমিন। তিনি নিজেও আবৃত্তি করেন।
শেষ পর্বটি ছিল বিপার কান্ডারি সেলিমা আশরাফের। নাম ‘ফাগুন লেগেছে শাখে শাখে’। অনুষ্ঠান শুরুর বেলায় বিপার এক ঝাঁক কমীর্ উপস্থিত দর্শকদের একটি করে ফুল প্রদান করে এবং সেই সাথে মুখে রং মাখিয়ে দেয়। এর পরপরই শিল্পীরা নেচে নেচে মঞ্চে প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করেন। সমবেত কণ্ঠে ঝরো ঝরো ঝরে রঙিন ঝরণা গেয়ে আপ্লুত করে দেয় দর্শকদের। পুরো থিয়েটার হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। নতুন প্রজন্মের ইয়াং এডাল্ট শিল্পী আলভান চৌধুরীর দরাজ কণ্ঠে জাগিল প্রচন্ড আজি গানের পর নতুন প্রজন্মের শায়ান মঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্যাক্সোফোনে দুটি রবীন্দ্রসংগীতের সুর বাজিয়ে শুধু বসন্তকে নয় নতুন বছরকেও আবাহন করে। এর পর মঞ্চটিকে সত্যিই উৎসবমুখর এবং উল্লাসমুখর করে তোলে শিল্পীরা। সমবেত কণ্ঠে শিল্পীরা যখন গান গাইছেন, তখন একদল শিল্পী মঞ্চের সম্মুখভাগে এসে সেই গানের তালে তালে ছন্দে ছন্দে নেচে অন্য এক আবহ তৈরি করেন। এ সময় মৃদুল আহমেদের বাজানো মৃদঙ্গ এবং শহীদউদ্দিনের মন্দিরা পরিবেশকে আরো বর্ণাঢ্য কর তোলে। শুধু গানই নয় এর মাঝে মাঝেই ছিল সাবিনা শারমিন, তাহরিনা প্রীতি, ফাতেমা খান, মৃদুল আহমেদের আবৃত্তি।
আগের সপ্তাহে এই মঞ্চেই পরিবেশিত হয়েছে সমবেত কণ্ঠে ভাওয়াইয়া, লালনগীতি। আর এই অনুষ্ঠানে সবকিছু ছাপিয়ে সমবেত কণ্ঠে রাগাশ্রয়ী গান গেয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয় শিল্পীরা। তাদের যে সংগীত পরিচালক সেলিম আশরাফ এবং লিমন চৌধুরী নিবিড় রেওয়াজে তৈরি করেছেন তা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে ফাগুয়া ব্রিজো দেখানা, যাও যাও মোছে, চৈতালি চাঁদনি রাতে, তানা নারে তানা নারে, যাও ওজি যাও করোনা বাতিয়া, জাগিল কী ছন্দ, আজি এ আনন্দ প্রভাতে ইত্যাদি। ১২ মাসে ১২ ফুল রের গায়কী অন্য এক মাত্রায় নিয়ে যায় পুরো অনুষ্ঠানকে। শাহ আবদুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে’ গেয়ে শেষ হয় ধ্রুপদীর আলো ছড়ানো, উৎসবমুখর বিপার বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের প্রথম দিনের পর্ব। সব শেষে সঙ্গীত পরিচালক সেলিমা আশরাফ শিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
রবিবার ছিল মূলত নাচের অনুষ্ঠান। পুরো অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ছিলেন নাচের শিক্ষক, কোরিওগ্রাফার, পরিকল্পক ও বিপার অন্যতম কান্ডারি এ্যানি ফেরদৌস। এদিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় এসো হে বৈশাখ গানের সাথে দশ কিশোরীর নাচ দিয়ে। তাদের এই ছন্দবদ্ধ নাচটি শুধু অনুষ্ঠানের সমাগত দর্শকদের স্বাগতই জানালো না, এটি যে বর্ষবরণের উৎসব তারই পূর্বাভাস দিল। এরপরে নতুন একটি আয়োজন। এই আয়োজনের জন্য দর্শকরা প্রস্তুত না থাকলেও তাদের পুরো দৃষ্টি টেনে নেয় রূপন্তি ওয়াজিদ। একটি তরুণী ডর্ম থেকে নিউইয়র্কে এসে তার অভিজ্ঞতার কথা বলছে বাংলা এবং ইংরেজি মিলিয়ে। তার পরিচয় দিয়ে জানাল তার মা সবসময় চেয়েছে সে যেন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়। কারণ এই পেশায় অনেক অর্থ আয় করার সুযোগ থাকে। কিন্তু সে চায় অভিনয়কে পেশা করতে। সে শেষ পর্যন্ত অভিনয় নিয়ে লেখাপড়া করেছে। এই একক অভিনয় পর্বের নাম ‘লাভ লেটার টু মাই পিপল’।
আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছোটদের নাচ শেখার অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান রুমঝুম। সেই রুমঝুমকে মঞ্চে নিয়ে এলো তিন গ্রুপে ৩০ জন শিশু। উন্মুক্ত মঞ্চে ‘প্রজাপতি প্রজাপতি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা’ গানের তালে শিশুরা যখন নাচছিল পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সুন্দর সমন্বয়ে, তখন কে বলবে এই ছোট ছোট শিশুদের জন্ম এদেশে? কে বলবে ওরা প্রজাপতি নয়? নাচ শেষে মঞ্চে আসেন বিটিভির রুমঝুম অনুষ্ঠানের খোদ পরিচালক বাংলাদেশের নাচের কিংবদন্তী প্রতিভা লায়লা হাসান। আর তখনই মঞ্চে প্রবেশ করে সব শিশু। তারা লায়লা হাসানকে ঘিরে নাচতে থাকে। আপ্লুত লায়লা হাসান যেন ফিরে যান ৪৫ বছর আগের রুমঝুম অনুষ্ঠানে। নতুন প্রজন্মের মাইশা জেরিন এবং নৃত্যশিক্ষক মধুমিতা দাসগুপ্ত লায়লা হাসানের হাতে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেন। এ সময় এ্যানি ফেরদৌস লায়লা হাসানের সাথে তার স্মৃতি তুলে ধরেন সংক্ষেপে। জানান, তিনিও রুমঝুম অনুষ্ঠানে দুটি বেনি দুলিয়ে নাচতেন। তিনি বলেন, আমরা শুধু লায়লা হাসানের কাছে নাচই শিখিনি, শালীন হতেও শিখেছি। শিখেছি সংসারধর্ম পালন করেও নাচকে ধরে রাখতে হয় কীভাবে।
লায়লা হাসান বলেন, সে সময় ঢাকায় খুব বেশি নাচের স্কুল ছিল না। ফলে অগণিত বাবা মা তাদের মেয়েদের নাচ শেখানোর জন্য বিটিভিতে রুমঝুম দেখত। তিনি বিপার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, এই সংগঠনটি ৩৩ বছর ধরে তিন নারীর নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে। তারা বিপার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে প্রবাসে।
বিপা’র দুইদিনব্যাপি বর্ষবরণের শেষ পর্বের নাম ‘রূপালী স্মৃতি’। বাংলাদেশের পঞ্চাশের, ষাটের, সত্তরের ও আশির দশকের যেসব জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ততোধিক জনপ্রিয় গান সেসময় ঘরে ঘরে বাজত তার মধ্য থেকে ৬টি গান দিয়ে সাজানো হয় এই পর্ব। যেসব ছবি থেকে গান নেয়া হয়েছে তার সিকোয়েন্স ও নাচ নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রতিটি গানই বিপার শিক্ষক ও সিনিয়র শিল্পীরা লাইভ পরিবেশন করেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। প্রথমে সেলিমা আশরাফ গান তৎকালীন পূর্ববাংলার প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশের গান ‘মনের বনে দোলা লাগে’। দ্বিতীয় গানটি ছিল হারানো দিন ছবির ‘আমি রূপনগরের রাজকন্যা’, গেয়ে শোনান ফাবলিহা নিসা। তৃতীয় গানটি আবির্ভাব ছবির ‘সাতটি রঙের মাঝে আমি’, গান নিলোফার জাহান। এরপর দীপ নেভে নাই ছবির ‘ওই দূর দূরান্তে’, গান আলভান চৌধুরী। পরের গানটি ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’ নাচের পুতুল ছবির। গেয়ে শোনান কাজী মাহমুদুল হক। শেষের গানটি উসিলা ছবির ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভাল’, গান লিমন চৌধুরী।
প্রত্যেকটি গান যেমন শিল্পীরা গেয়েছেন মূলানুগভাবে তাদের সম্পূর্ণ আবেগ ও অনুভব সমর্পন করে, তেমনই প্রতিটি গানের সাথে শতাধিক শিল্পী বিভিন্ন গ্রুপে উজার করে নাচ করেছে। নৃত্য পরিচালক ও কোরিওগ্রাফার গানের লিরিকের সাথে মিলিয়ে নিজের মত করে সিকোয়েন্স তৈরি করেছেন, আর এই শিল্পীরা সে সিকোয়েন্সকে নাচের মুদ্রায় ও ফিউশনে পরিস্ফুট করেছেন। শিল্পীদের সমন্বয় ছিল মনে রাখার মত। এই পর্বে মঞ্চে আলোর ব্যবহার ছিল যেমন সুষম, পরিবেশনানুগ তেমনই সাযুজ্যময়। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল বিপারই নিজস্ব কীবোর্ড বাদক নতুন প্রজন্মের মাহাদিন রহমান ও রিসাব নাথ। লিড গিটারে ছিল সাফির স্বপ্নিল আর কর্ড গিটারে সুমিত রায়হান। ধারা বর্ণনায় ছিলেন মাইশা জেরিন খান ও ইউসুফ খান। মিউজিক এ্যারেঞ্জমেন্টে ছিলেন নাদিম আহমেদ। নাচের সহকারী ইন্সট্রাক্টর ছিলেন মধুমিতা দাসগুপ্ত, নাদিয়া ইসলাম, মাইশা জেরিন খান, নাহরিন ইসলাম ও রাইসা জেরিন।
এই দুইদিনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিপা আরেক স্তরে নিজেদের নিয়ে গেল। দুই দিনই হলভর্তি দর্শক হৃদয়ে আনন্দ ভরে ঘরে ফেরেন বলে অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
দুদিনের অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাদিয়া ইসলাম দৃষ্টি।
