লেলিহান প্রান্তর হুয়ান রুলফো অনুবাদঃ শাহাব আহমেদ

ওরা মাকুকুরটিকে মেরে চলে গেছে কিন্তু এখনও রয়ে গেছে কুকুরছানাগুলো..’—জনপ্রিয় লোকগীতি। 

পেত্রোনিলো ফ্লোরেস জিন্দাবাদ!’ চিৎকারটি গিরিখাতের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ওপরে উঠে আমাদের কাছে পৌঁছায়। তারপর মিলিয়ে যায়।

নিচ থেকে ধেয়ে আসা বাতাস বয়ে নিয়ে আসে অসংখ্য মানবকণ্ঠের কোলাহল, শোনা যাচ্ছিল পাথরের ওপর দিয়ে নদীতে ফুঁসে ওঠা জল গড়িয়ে পড়ার শব্দের মত। 

সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি চিৎকার, সেই একই জায়গা থেকে বের হয়ে গিরিখাতের বাঁকের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে পাক খেতে খেতে সজোরে আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়, ‘জেনারেল পেত্রোনিলো ফ্লোরেস জিন্দাবাদ!’

আমরা পরস্পরের দিকে তাকাই। 

লা পেররা ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়িয়ে বন্দুক থেকে কার্তুজ বের করে শার্টের পকেটে রাখে। এরপর বেনাভিদে পরিবারের চারজনের কাছে এসে বলে, ‘আমাকে অনুসরণ করো জোয়ানরা, দেখি কোন্ ধরনের ষাঁড় আমাদের প্রতিপক্ষ।বেনাভিদে পরিবারের চার ভাই একটু সামনে ঝুঁকে তার পেছনে হেঁটে যায়; কেবল লা পেররা অনমনীয় ঋজু এবং তার পাতলা দেহের অর্ধেকটা বেড়ার ওপরে দৃশ্যমান রেখে রেকি করতে করতে এগিয়ে যায়। আমরা নিজের অবস্থানেই থাকিস্থির অনড়, বেড়ার নিচে চিৎ হয়ে সটান সারিবদ্ধভাবে, ঠিক যেভাবে ইগুয়ানারা রোদ পোহায়। 

পাথরের বেড়াটা সাপের মত পাহাড় বেয়ে কখনও ওপরে উঠে গেছে, কখনও নেমে এসেছে বড় বড় শিলাখন্ডের ওপর দিয়ে। লা পেররা চারজন বেনেভিদে এগিয়ে যাচ্ছে একই সর্পিলভাবে যেন তাদের পাগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধা। দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ওদের এভাবেই দেখা গেছে। 

তাদের দেখার জন্য আমরা ছায়া দেওয়া নিচু চায়নাবেরি ঝোঁপগুলোর ফাঁক দিয়ে আবার তাকাই। রৌদ্রতাপে দগ্ধ ছায়ায় পচা চায়না বেরির গন্ধ ভুরভুর করছিল। মধ্যাহ্নের ঘুমে ঢুলুঢুলু ছিল আমাদের চোখ। 

কিছুক্ষণ পরপর নিচের গিরিখাত থেকে আসা উচ্চ কোলাহলের শব্দে কেঁপে উঠতে হচ্ছিল বলে আমরা ঘুমাতে পাছিলাম না। কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করি, কিন্তু পাথুরে রাস্তায় ঘুরন্ত গরুর গাড়ির চাকার শব্দের মত সেই কোলাহল গুঞ্জনের তরঙ্গটুকুই শুধু শুনতে পাই। 

হঠাৎ গুলির শব্দ। শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়, মনে হয় গিরিখাতকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হচ্ছে। শব্দটা সবকিছু জাগিয়ে তোলে, চায়নাবেরি ঝোঁপের লাল রংয়ের টটোচিলো পাখিগুলো উড়ে যায় এবং দুপুরের দাবদাহে ঘুমিয়ে পড়া ঝিঁঝি পোকার দল জেগে উঠে পৃথিবীকে তীব্র ঝিঁঝি শব্দে পূর্ণ করে দেয়। 

কী এটা?’—মধ্যদিনের নিদ্রা ভেঙে আধাজাগ্রত পেদ্রো সামোরা প্রশ্ন করে। 

চিউইলা উঠে দাঁড়ায় তার বন্দুকটা টেনে, যেন বন্দুক নয়, এক টুকরো কাঠ, রওনা দেয় যেদিকে অন্যেরা গেছে। 

দেখে আসি কী হচ্ছে।সে বলে অন্যদের মতো দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।

ঝিঁঝি পোকার চিৎকার বেড়ে বধির করে দেয়। 

 

বুঝতেই পারিনি কখন ওরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছে। যখন আসার সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে, ওরা সরাসরি আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে আমরা প্রত্যেকেই ছিলাম অপ্রস্তুত। 

সম্ভবত ওরা জায়গাটা পার হয়ে যাচ্ছিল। তাই মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়ে বন্দুকের সাইটে চোখ রেখে তাদের লক্ষ্য করি। প্রথম দলটি চলে যায়, দ্বিতীয় দলটি যায়, তারপরে আরও কয়েক দল, শরীরগুলো সামনের দিকে আনত, যেন ঘুমে বাঁকা হয়ে গেছে। মুখগুলো ঘামে চিকচিক করছে, নদী পার হওয়ার সময় জলে ডুব দিয়ে এলে যেমন হয়। 

ওরা জায়গাটি পার হয়ে যেতে থাকে।

তারপরে সংকেত আসে। একটা প্রলম্বিত হুইসেল বাজে, পর মুহূর্তেই রাইফেলগুলোর ইয়াক ইয়াক গর্জন শোনা যায় দূরে, যেখানে লা পেররার দলটি গিয়েছে। শব্দগুলো এখানে এসে আছড়ে পড়ে। জটিল কোনো ঘটনা নয়। স্থূল দেহগুলো বন্দুকের লক্ষ্য নির্ণয়কারী সাইট প্রায় ঢেকে দিয়েছিল, তাই খুব কাছ থেকে গুলি করলে যেমন হয়, তেমনই তারা ধপাস করে পড়ে যেতে থাকে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই। 

খুব দীর্ঘায়িত নয়, সম্ভবত এক বা দুই রাউন্ডের গুলিবর্ষণ। বন্দুকের সাইট দিয়ে আমরা শুধু তাদেরই দেখতে পাই যারা রাস্তায় পড়ে আছে আধা বাঁকা, আধা মোচড়ানো অবস্থায়, যেন এই মাত্র কেউ এসে তাদের ফেলে রেখে গেছে। ওদের আবার দেখা যায়, তারপরে হঠাৎ করেই আর দেখা যায় না।

পরের রাউন্ড গুলিবর্ষণের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়। আমাদের একজন চিৎকার করে ওঠে, ‘পেদ্রো সামোরা জিন্দাবাদ!’

অন্য দিক থেকে ওরা উত্তর দেয় প্রায় ফিসফিস করে, ‘দয়া কইরা মাইরেন না, আটোচার পবিত্র পুত্র আমাদের বাঁচান।

পাখি উড়ছিল। কয়েক ঝাঁক তর্দোস মাথার ওপর দিয়ে পাহাড়ের দিকে উড়ে যায়।

গোলাগুলির তৃতীয় রাউন্ড আসে আমাদের পেছন থেকে এবং আমাদেরই হাতে নিহত লোকগুলোকে টপকে আমাদেরকে দেয়ালের অন্য দিকে লাফিয়ে পড়তে বাধ্য করে। 

তারপর ঘন ঝোঁপের আড়ালে থেকে দৌড়াতে শুরু করি। মনে হয় গুলিগুলো গোড়ালির কাছে এসে ফাটছে এবং আমরা ফড়িংয়ের ঝাঁকের মধ্যে পড়ে গেছি। মাঝে মাঝে, কখনও আরও বেশি উপুর্যপরি গুলি আমাদের সরাসরি আঘাত করতে থাকে, একজনকে তো ছুঁড়েই ফেলে হাড়ের কড়কড় শব্দ করে।

আমরা দৌড়াচ্ছি। 

গিরিখাতের প্রান্তে পৌঁছে ছত্রভঙ্গ বিশৃংখল অবস্থায় পিছলে নিচে নেমে যেতে থাকি। ওরা তখনও গুলি করে যাচ্ছিল। চলতেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না ত্রস্ত ভীত অবস্থায় চার হাতপা ব্যবহার করে আমরা হঠাৎ আলো দেখে সন্ত্রস্ত ভোঁদরের মত গিরিখাতের অন্য দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে যাই। 

জেনারেল পেত্রোনিলো ফ্লোরেস, জিন্দাবাদ, আর তোরা সব কুত্তার বাচ্চা!’ আমাদের লক্ষ্য করে ওরা চিৎকার করে। তাদের সেই চিৎকার শতকণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়ে গিরিখাত ধরে ছড়িয়ে পড়ে। 

আমরা দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কিছু বিশাল গোলাকার পাথরের পেছনে ভয়ে গুটিশুটি মেরে থাকি। পেদ্রো সামোরার দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে প্রশ্ন করি, এটা কী করে হল, কিন্তু সে কোনো কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেন কথা ফুরিয়ে গেছে অথবা টিয়া পাখির জিভের মত জিভগুলো কুন্ডলি পাকিয়ে গেছে। জিভের জট ছাড়িয়ে কোনো কিছু বলা কষ্টকর হবে। 

 পেদ্রো সামোরা তখনও আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন কখনও ঘুমায়নি, লাল চোখগুলো দিয়ে আমাদের গুনছিল একজন একজন করে। এখন সে জানে আমাদের কতজন বাকি আছে কিন্তু মনে হচ্ছিল সে নিশ্চিত হতে পারছে না। কারণেই গুনছে বারবার।

লা পেররা, চিউইলা এবং অন্য যারা তাদের সাথে গেছে, তাদের হিসেবে না ধরেও এগারোবারোজন তো হবেই, এর মধ্যেই হারিয়ে গেছে। চিউইলা হয়তো ওপরে চায়নাবেরির ঝোঁপে গুটিশুটি মেরে বন্দুকের বাটে হেলান দিয়ে ফেডারেল বাহিনীর চলে যাবার অপেক্ষা করছে

পেদ্রো সামোরার নির্দেশের অপেক্ষায় দুই হোসে, লা পেররার দুই ছেলে প্রথমে মাথা, তারপরে শরীরের অন্য অংশ তুলে দাঁড়িয়ে একদিক থেকে অন্যদিকে হেঁটে যায়। সে বলে, ‘এমন আরেকবার হলে তো আমরা খতম হয়ে যাবো।সাথে সাথে মুখভর্তি রাগ গিলতে গিলতে হোসে ভাইয়েদের উদ্দেশে চিৎকার করে ওঠে, ‘আমি জানি তোমাদের পিতাকে পাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু অপেক্ষা করো, অপেক্ষা করো আরও কিছুক্ষণ, আমরা অবশ্যই তার খোঁজে বের হবো।

দূর থেকে একটা বুলেটের শব্দ হয় এবং একঝাঁক পাখি বিপরীত দিকে উড়ে যায়। দ্রুত গিরিখাত অতিক্রম করে আমাদের অতি নিকট দিয়ে উড়তে গিয়ে পাখিগুলো আমাদের দেখতে পাওয়া মাত্র ভয় পেয়ে অর্ধচক্রাকারে ঘুরে, সূর্যের উল্টা দিকে চিকচিক করে গাছগাছালি ভরে ফেলে কলরব করতে করতে। 

হোসে ভাইয়েরা আগের জায়গায় ফিরে এসে নিঃশব্দে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। আমরা ওখানে থাকি সারা বিকাল। রাত নামার সাথে সাথে চিউইলা ফিরে আসে বেনেভিদো চারভাইয়ের একজনকে নিয়ে। বলে, নিচের পিয়েদ্রা লিসা থেকে এসেছে তারা, জানে না ফেডেরাল বাহিনী চলে গেছে কিনা। তবে সবকিছু খুব শান্ত মনে হচ্ছিল। মাঝে মধ্যে কেবল কয়োটির চিৎকার শোনা যায়। 

এই পিচন’, পেদ্রো সামোরা আমাকে বলে, ‘তোকে একটা দায়িত্ব দিচ্ছি, হোসে ভাইয়েদের সাথে নিয়ে দেখে আয় লা পেররার কী হল। যদি সে মারা গিয়ে থাকে, তাকে মাটি দিস, অন্যদেরও। আহতদের উঁচু কোথাও রেখে আসিস যাতে রাখালরা তাদের দেখতে পায়। তবে কাউকে নিয়ে আসিস না।’ 

ঠিক আছে।

আমরা রওনা দিই।

খামারঘরের কাছে যেখানে ঘোড়াগুলো রেখে এসেছিলাম, সেখান থেকে কয়োটির ডাক শোনা যায়।

কোনো ঘোড়া নেই, আছে শুধু একটি ভারবাহী শীর্ণ গাধা। আমাদের আসার আগেই ওটা ওখানে ছিল। ঘোড়াগুলো নিশ্চিতই ফেডেরাল বাহিনী নিয়ে গেছে। বেনেভিদে পরিবারের বাকিদের দেখতে পাই কিছু ঝোঁপের পেছনে, তিনজন একসাথে, একজনের ওপরে অন্যজন, যেন তাদের একত্রে স্তুপ করা হয়েছে। তাদের মাথা তুলে মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে দেখি জীবনের কোনো চিহ্ন আছে কিনা, নাকি মৃত পাথর। পশুদের খাদ্য জল দেবার জাবনাভান্ডে দেখি আমাদের আরও একজন, তার পাঁজরগুলো বের হয়ে আছে যেন চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়েছে। বেড়ার সর্বত্র অনুসন্ধান করে এখানে একজন, ওখানে অন্যজন, যাদেরই খুঁজে পাই প্রায় সবারই মুখে কালো দাগ। 

ওরা সত্যিই এদের খুন করে গেছে, একজনেরও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই।হোসে ভাইদের একজন বলে।

অন্যদের দিকে নজর না দিয়ে আমরা লা পেররাকে খুঁজতে শুরু করি, কিন্তু জনপ্রিয় পেররার হদিশ মেলে না।

ওরা হয়তো সাথে করে নিয়ে গেছে।আমরা ভাবি, ‘সাথে করে নিয়ে গেছে সরকারকে দেখানোর জন্য।কিন্তু তা সত্ত্বেও কোথাও বাকি না রেখে তন্নতন্ন করে খুঁজি। সারারাত ধরে কয়োটিগুলোর চিৎকারে বিরাম নেই। 

কয়েকদিন পরে এল্ আর্মেরিয়ায় নদী পার হবার সময় আমরা পেত্রোনিলো ফ্লোরেসের বাহিনীর মুখোমুখি হই। পেছনে ফেরার চেষ্টা করে কাজ হয় না, দেরি হয়ে গেছে। আমরা যেন গুলিবিদ্ধ হয়েছি। পেদ্রো সামোরা ফুটকিওয়ালা সর্বসেরা খচ্চরটিকে নিয়ে দ্রুতগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দলবদ্ধভাবে ঘোড়ার ঘাড়ের ওপর নিচু হয়ে আমরা তাকে অনুসরণ করি। এক ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ। প্রথমে বুঝতেই পারিনি যে, আমার মৃত ঘোড়াটির নীচে নদীতে ডুবে গিয়েছিলাম। স্রোত আমাদের দুজনকে অনেক দূরে ভাসিয়ে বালুভরা অগভীর এক জলাশয়ে নিয়ে ফেলেছিল। 

পেত্রোনিলো ফ্লোরেসের সৈন্যদের সাথে সেটাই ছিল আমাদের শেষ যুদ্ধ। এরপরে যুদ্ধ বন্ধ করে দিই, আরও সঠিকভাবে বললে, যুদ্ধ না করেই কিছু সময় আত্মগোপনে থাকি। আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট কয়জন শাস্তির হাত থেকে বাঁচার লক্ষ্যে পাহাড়ে উঠে বনের ভেতরে লুকিয়ে ছিলাম। দলটি এত ছোট হয়ে গিয়েছিল যে কেউ আর আমাদের ভয় পেত না।সামোরার লোকেরা এসেছে!’ বলে কেউ আর চিৎকার করে ছুটে যেতো না। বৃহৎ বিস্তীর্ণ সমভূমিতে শান্তি ফিরে এসেছিল।

কিন্তু বেশিদিনের জন্য নয়।

যেখানে আর্মেরিয়া নদী বহু ঘণ্টার জন্য আটকে থাকার পর দ্রুত ঝাঁপ দিয়েছে উপকূলে, সেই টোজিন গিরিখাতের একটি গোপন জায়গায় প্রায় আট মাস লুকিয়ে ছিলাম। সিদ্ধান্ত নিই, লোকালয়ে না গিয়ে এখানেই কয়েক বছর কাটিয়ে দেব যাতে লোকজন আমাদের ভুলে যায়। মুরগি পালতে শুরু করি এবং যখন ইচ্ছা পাহাড়ে যাই হরিণ শিকারের জন্য। আমরা পাঁচজন ছিলাম, আসলে প্রায় চারজন, কারণ শত্রুর গুলি খেয়ে হোসে ভাইয়েদের একজনের পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়েছিল। 

ওখানেই ছিলাম। মনে হতে শুরু করে আমরা অকেজো অনাবশ্যক হয়ে গেছি, আর কোনো কাজই আমাদের দিয়ে হবে না। ফাঁসিতে ঝোলার ভয় না থাকলে সরকারের সাথে শান্তিচুক্তি করে ঘরে ফিরে যেতাম। ঠিক এই সময়ে পেদ্রো সামোরার বার্তা চিঠি নিয়ে আরমানসিও আলকালা নামে এক লোক এসে উপস্থিত হয়। ভোরবেলা সদ্য জবাই করা গরুটি কাটার সময় হুইসেল বাজার শব্দ হয়। শব্দটি আসে সমভূমির অনেক দূর থেকে। একটু পরে আবারও তা শুনতে পাই। যেন একটি ষাঁড়ের চিৎকার, প্রথমে তীক্ষè, তারপরে কর্কশ, তারপরে তীক্ষè আবার। প্রতিধ্বনিত হয়ে আমাদের কাছে এসে ডুবে যায় নদীর কলকল শব্দের মধ্যে। 

সদ্য সূর্য উঠছে, আরমানসিও আলকালা সাইপ্রেস গাছেদের মধ্য দিয়ে এসে উপস্থিত হয়। তার কাঁধ থেকে৪৪কার্তুজের দুটো বেল্ট আড়াআড়ি করেছিল বুকের ওপর, এবং ঘোড়ার পিঠে স্যুটকেসের মত ঝুলছিল রাইফেলের পাহাড়। 

সে ঘোড়া থেকে নেমে আসে। আমাদের প্রত্যেককে একটি করে রাইফেল দেয় এবং বাকিগুলো একসাথে বেঁধে রাখে।আজ বা কাল তোমাদের জরুরি কোনো কাজ না থাকলে, সান বুয়েনাভেন্তুরার উদ্দেশে রওনা দেবার জন্য প্রস্তুত হও। পেদ্রো সামোরা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। এই ফাঁকে আমি সানাতেসদের খোঁজে আরও একটু নিচের দিকে গিয়ে ফিরে আসব।এবং হ্যাঁ, সানাতেসদের সাথে নিয়ে পরের দিন বিকেলে সে ফিরে আসে। গোধূলির আলোতে তাদের কালো মুখগুলো দেখা যাচ্ছিল। সাথে ছিল আরও তিনজন, আমাদের অচেনা। 

পথে ঘোড়া পাওয়া যাবে।তারা বলেছিল। আমরা তাদের অনুসরণ করি। সান বুয়েনাভেন্তুরা পৌঁছানোর অনেক আগেই বুঝতে পারি, ্যাঞ্চ ভবনগুলিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওই বাড়িগুলো থেকে আগুনের শিখা এত ওপরে উঠেছিল যেন কোনো তেলের কূপ পুড়ছে। স্ফুলিঙ্গগুলি সর্পিলাকারে উড়ে তমিস্র আকাশে বড় বড় দীপ্ত মেঘের আকার ধারণ করছিল। সান বুয়েনাভেন্তুরার অগ্নিচ্ছটায় প্রজ্জ্বলিত হয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি, যেন কিছু একটা বলছে, আমাদের কাজ আসলে এখানেই, যা অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছিল তা সম্পন্ন করা। 

কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই দ্রুতগামী অশ্বারোহীদের প্রথম দলটিকে দেখতে পাই। তাদের কেউ কেউ গুলিবিদ্ধ কিন্তু হাতের ওপরে ভর দিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম ব্যক্তিদের জিনের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের হাতও নাই, তাদের ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। 

তাদের চলে যেতে দেখলাম। পেছনেই আসে অশ্বারোহী পেদ্রো সামোরা এবং আরও অসংখ্য লোক। এত লোক আগে কখনই দেখিনি। এটা আমাদের ভীষণভাবে উৎসাহিত করে। 

লোকজনের এই বিশাল দলটিকে বিস্তীর্ণ সমভূমি পার হতে দেখে বিগত সুদিনগুলোর মত আনন্দে উৎফুল্ল হই, সেই প্রথম দিকটায়, যখন মাটির গহীন থেকে উঠে এসে বাতাসে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া আগাছার পাকা বীজের মত, আমরা সমভূমির সমস্ত অঞ্চলে ত্রাস আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিছুদিনের জন্য সবকিছু এমনই ছিল। এখন যেন সেই সময়টা আবার ফিরে আসছে।

আমরা সান পেদ্রোর দিকে যাত্রা শুরু করি। জায়গাটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এগিয়ে যাই পেতাকালের দিকে। ভুট্টা কাটার সময় হয়ে এসেছে। শুকনো ভুট্টা গাছগুলো সমভূমির প্রবল মৌসুমী বাতাসে আনত। 

চারণভূমির মধ্য দিয়ে দ্রুতগতিতে আগুনের ছড়িয়ে পড়া দেখতে কী যে ভালো লাগে! প্রায় পুরো সমভূমিটি আগুনে জ্বলছে জ্বলন্ত কয়লার মত, এবং ইক্ষুক্ষেতে ছড়িয়ে পড়া আগুনের ধোঁয়ায় আখ মধুর গন্ধ। 

আমরা ধোঁয়া থেকে বের হয়ে আসি কালো মুখ নিয়ে কাকতাড়ুয়ার মতো। তারপরে মাঠের গবাদি পশুগুলো এদিক সেদিক তাড়িয়ে একত্রিত করি চামড়া ছুলে নেবার জন্য। ওটাই ছিল আমাদের ব্যবসা, চোরাই চামড়া বিক্রি করা। 

পেদ্রো সামোরা বলেছিল, ‘আমরা এই বিপ্লব সম্পন্ন করবো ধনীদের টাকা দিয়ে। তারা অস্ত্র এবং বিপ্লবের খরচ বহন করবে। যদিও এই মুহূর্তে আমাদের কোনো আদর্শগত ঝান্ডা নেই যার জন্য লড়াই করবো, আমাদের তাড়াহুড়ো করা দরকার এবং দ্রুত টাকা জমানো দরকার, যাতে সরকারি সৈন্যরা এসে দেখতে পায়, আমরা শক্তিশালী।’ 

হ্যাঁ, সে কথাই বলেছিল।

অবশেষে সৈন্যরা এসে আগের মতোই নির্বিচারে আমাদের হত্যা করতে লাগলো, যদিও এবার অতটা সহজ ছিল না। অনেক দূর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে তারা আমাদের ভয় পাচ্ছে।

ভয় পাচ্ছিলাম আমরাও। নির্দিষ্ট রাস্তায় তাদের জন্য এম্বুশ করে থাকার সময় হঠাৎ লাগাম টানার শব্দ শুনলে বা পাথরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ কানে এলেই আমাদের অন্ডকোষগুলো সুরুত করে একেবার গলায় উঠে যেতো। সত্যিই দেখার মতো দৃশ্য ছিল। ওরা চলে যাবার সময় মনে হতো ট্যারা চোখে আমাদের দেখছে, আর মনে মনে বলছে, ‘ঠিকই তোমাদের গন্ধ পেয়েছি, কেবল ভান করছি না দেখার, এটুকুই।

এমন মনে হবার আরও একটি কারণ ছিল, ওরা যার যার ঘোড়ার পেছনে নিজেদের নিরাপদ করে হঠাৎ করেই মাটিতে লুটিয়ে পড়তো। আমাদের অগ্রগতি থমকে যেতো, ওদের অন্যদল ধীরে ধীরে আমাদের ঘিরে ফেলতো আটকে পড়া মুরগির মতো। তখনই বুঝতে পেরেছি, লোকবল কম না হলেও আমাদের খুব বেশিদিন আর নেই। 

কারণ হল এরা, প্রথম দিকে আমাদের বিরুদ্ধে পাঠানো জেনারেল উরবানোর লোক নয়, যারা কেবল সামান্য চিৎকার এবং টুপি নাড়ানো দেখেই ভয় পেয়ে পালিয়ে যেত। আমাদের সাথে লড়াই করার জন্য তাদের জোর করে খামার বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়েছিল। আমাদের লোকজন কম দেখলেই তারা শুধু আক্রমণ করার সাহস করত। ওদের সবগুলোকেই খতম করা হয়েছে। তাদের জায়গা দখল করেছে যারা তারা ভীষণ হিংস্র। ওলাচিয়া নামে এক ব্যক্তি তাদের নেতা। তার লোকেরা সাহসী, সহ্যশক্তি অনেক, তেওকালতিচের পাহাড়ি এলাকা থেকে আসা। তাদের সাথে আছে উত্তরের তেপেউয়ান ইন্ডিয়ানরা, যাদের মাথাভর্তি ঘন চুল, দীর্ঘদিন না খেয়ে বাঁচে এবং প্রয়োজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পলকহীন স্থির চোখে আমাদের দিকে গুপ্তচরের মত তাকিয়ে থাকে, অপেক্ষা করে কখন কার মাথা দেখা দেয়, তারপরে সরাসরি গুলি ছোঁড়ে, দীর্ঘ দূরত্বের সেই ৩০৩০ বুলেট পচা ডালের মত মেরুদন্ড ভেঙে ফেলে। 

ফেডারেল বাহিনীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ করার চেয়ে খামারগুলিতে ঝাঁপিয়ে পড়া সহজ হলে কেন আমরা সরাসরি যুদ্ধে জড়াবো? তাই ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যাই, এখানে সেখানে চোরাগোপ্তা আক্রমণ করে আগের চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতিসাধন করি। সব সময় দৌড়ের ওপরে থাকতে হয়। 

আক্রমণ করো, ছোটো পাগলা খচ্চরের মত...

একদিকে যখন আমাদের কেউ কেউ আগ্নেয়গিরির ঢালের জেসমিন খামারগুলিতে আগুন ধরাচ্ছে, অন্যরা তখন ঢালু বেয়ে উইসাচে গাছের ডাল পিঠে বেঁধে ক্রল করে নেমে এসে সামরিক বাহিনীর ওপর অকস্মাত ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাই ধুলোর মেঘ, শোরগোল চিৎকারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আমাদের দলটি বেশ বড় মনে করে ওরা ভয় পায়।

সৈন্যদের সেখানে অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। কিছু সময়ের জন্য তারা একদিক থেকে অন্যদিকে, কখনও সামনে কখনও পেছনে উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করে। এখান থেকে পাহাড়ের ওপরে আগুন দেখা যায়, বিশাল এক বহ্নোৎসব, তারা ফাঁকা জায়গাগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা দিনরাত খামার এবং ছোট ছোট গ্রাম আগুনে জ্বলতে দেখি, এবং কখনও কখনও তুসামিলপা, সাপোতিতলানের মতো বড় শহরগুলির আকাশও আলোকিত হয়ে ওঠে। ওলাচিয়ার লোকজন সেই জায়গাগুলো আক্রমণ করার জন্য দ্রুতগতিতে যেই পৌঁছায়, তাদের পেছনে অনেক দূরে হয়তো তোতোলিমিস্পা জ্বলতে শুরু করে।

দেখার মত খুবই চমৎকার দৃশ্য সেটা। হঠাৎ করেই টেপেমেস্কিট গাছের ঝোঁপ থেকে বের হয়ে দেখা যায় যুদ্ধের জন্য উন্মুখ সৈন্যরা দূরে বিজন সমভূমি পার হয়ে যাচ্ছে, আশেপাশে কোনও শত্রুর দেখা নেই, যেন তারা পাহাড় ঘেরা সেই বিশাল ঘোড়ার নালের মত সমভূমির গভীরতায় ডুব দিচ্ছে।

আমরা কুয়াস্তেকামাতে পুড়িয়ে দেয়ার পরে ষাঁড়ের লড়াইয়ে মেতে উঠি। পেদ্রো সামোরা খেলাটিতে খুব উত্তেজনা বোধ করে। ফেডেরাল সৈন্যরা লা পুরিফিকাসিওন নামে একটি জায়গার সন্ধানে আউতলানের দিকে গেছে। তাদের ধারণা দুষ্কৃতকারীরা সেখানে লুকিয়ে আছে। কিন্তু আমরা ইতোমধ্যেই সেখান থেকে সরে এসেছি কুয়াস্তেকামাতে। গ্রামটি এখন আমাদের হাতে। আমরা ষাঁড়ের লড়াই খেলার সুযোগ পাই। সম্ভবত ভুলক্রমে তারা আটজন সৈন্য পেছনে ফেলে গেছে। এছাড়া আছে খামারবাড়ির পাহারাদার ম্যানেজার। তারা আমাদের দুইদিন খেলার মত বুলফাইটার হয়।

ছাগল রাখার গোলাকার একটি খোঁয়ার ঘরকে বুল রিং হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমরা বেড়ার ওপর বসে থাকি তাড়া খেয়ে যাতে বুলফাইটাররা রিং থেকে পালাতে না পারে। কারণ পেদ্রো সামোরা ষাড়ের ভূমিকায় উদ্যত ছোরা হাতে আঘাত করার জন্য ধাওয়া করলে তারা পড়ি মরি করে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। 

এক বিকেলের জন্য আটজন সৈন্য মন্দ ছিল না। অন্য দুজন ছিল অন্য দিনের জন্য। বাঁশের খুঁটির মতো লম্বা লিকলিকে পাহারাদারটি আমাদের সবচেয়ে বেশি হয়রানি করেছে। সে পাশের দিকে সামান্য একটু পিছলে পথ থেকে সরে সরে যাচ্ছিল। অন্যদিকে ম্যানেজার মারা যায় তৎক্ষণাৎ। সে ছিল খুবই খাটো এবং ঝোলা ভুড়ির। তাছাড়া জল্লাদের হাত থেকে বাঁচার কোনো চেষ্টাই করেনি। কিছু না বলে, প্রায় নড়াচড়া না করে খুব শান্তভাবে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়, যেন চাইছিলই তাকে ছোরা মারা হোক। কিন্তু পাহারাদার লোকটা সত্যিই খুব ঝামেলার সৃষ্টি করে।

পেদ্রো সামোরা তাদের প্রত্যেককে একটি করে কম্বল দিয়েছিল। কারণেই অন্তত পাহারাদারটি জল্লাদের হাত থেকে আত্মরক্ষা করেছে মোটা কম্বলটি ব্যবহার করে। যে মাত্র সে বুঝতে পারে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে কম্বলটি নেড়ে সরাসরি তার দিকে আসা ছুরিটি এড়ানোর জন্য গোপ্তা খেয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যেতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না পেদ্রো সামোরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। খুব স্পষ্ট চোখে পড়ছিল সে কী পরিমাণ ক্লান্ত হয়েছে পাহারাদারকে আক্রমণ করতে গিয়ে। কয়েকটি অগভীর আঁচড় কাটা ছাড়া আর কিছু করতে না পেরে সে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। কিন্তু সে একই কৌশলে আরও কিছুক্ষণ লড়াই চালিয়ে যায়, তারপরে হঠাৎ ষাঁড়ের মত সরাসরি এগিয়ে না গিয়ে, এক হাত দিয়ে ওর কম্বলটি সরিয়ে অন্যহাতে ছোরাটি পাহারাদারের পাঁজরে ঢুকিয়ে দেয়। সে সম্ভবত প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি কী হল, কারণ বোলতা তাড়ানোর মত সে বেশ কিছুক্ষণ ধরে তার কম্বলটিকে ওপর নিচ করছিল।

কোমর বেয়ে রক্ত ঝরতে দেখার পর সে প্রথমে ভয় পেয়ে যায়, থামে এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়া পাশের ক্ষতটা হাত দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করে। রক্তশূন্য হয়ে সে দ্রুত ফ্যাকাশে হয়ে উঠছিল। শেষমেশ সে আমাদের সবার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে গোয়ালঘরের মাঝখানে মেঝেতে পড়ে যায়। সেখানেই থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা তাকে তুলে ফাঁসিতে লটকিয়ে দিই, নইলে তার মারা যেতে আরও অনেক সময় লেগে যেত।

এরপর থেকে পেদ্রো সামোরা যখনই সুযোগ পেত, নিয়মিতই ষাঁড়ের লড়াই খেলতো।

সেই সময় আমাদের প্রায় সবাই ছিল নিচুভূমি থেকে আসা, পেদ্রো সামোরা থেকে শুরু করে নিচু স্তরের অন্য সবাই; পরে, অন্যান্য অঞ্চল থেকে লোকজন এসে আমাদের সাথে যোগ দেয়। লম্বা এবং ঢ্যাঙা পা, দুধের ছানার মত মুখ ফর্সা চামড়ার রেড ইন্ডিয়ানরা এসেছে সাকোয়ালকো থেকে। শীতল উঁচুভূমি মাসামিতলা থেকে আসা অন্যেরা সারাক্ষণই শাল পরে থাকে, ভাবটা এমন যেন বিরতিহীন তুষারপাত চলছে। গরমে তাদের ক্ষুধা মরে যায় এবং সেই কারণেই পেদ্রো সামোরা তাদের অনেক উঁচুতে, যেখানে শুধু বালি আর বালি এবং বাতাসে ঠেলে আনা পাথর চূর্ণ, সেই আগ্নেয়গিরির দিকে যাবার পথটা পাহারা দিতে পাঠায়।

কিন্তু ফর্সা ত্বকের রেড ইন্ডিয়ানরা শীঘ্রই পেদ্রো সামোরার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং তাকে আর ছেড়ে যেতে চায় না। সবসময় থাকে তার পায়ের কাছাকাছি, পাহারা নিরাপত্তা দেয় এবং তার সমস্ত আদেশনির্দেশ পালন করে। কখনও আবার শহরের সেরা মেয়েদেরও ধরে এনে পেদ্রো সামোরাকে ভোগ করতে দেয়।

——

 আমার সবই খুব ভালো করে মনে আছে। যে রাতগুলো আমাদের পাহাড়ে কেটেছে নিঃশব্দে মার্চ করে ঘুম ঘুম চোখে, সৈন্যরা তখনও ছিল আমাদের পেছনে পেছনে অদূরেই। এখনও পেদ্রো সামোরাকে দেখতে পাই, তার বেগুনি লাল কম্বল কাঁধে জড়িয়ে, লক্ষ্য রাখছে যাতে কেউ পিছিয়ে না পড়ে: ‘এই পিতাসিও, ঘোড়ার পেটে স্পার দাবা, তাড়া দে! এই, তুই, রেসেন্দিজ, ঘুমিয়ে পড়িস না, কথা চালিয়ে যা।

হ্যাঁ, সে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে ভীষণ সতর্ক ছিল। ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে রাতের অন্ধকারে মার্চ করার সময় আমাদের মাথা ছিল ফাঁকা কোনোরকমের কোনো চিন্তা ছাড়া, কিন্তু সে সবাইকে খুব ভাল করে চিনতো এবং কথা থামাতো না যাতে আমরা ঘুমিয়ে না পড়ি। তার সম্পূর্ণ খোলা চোখের দৃষ্টি অনুভব করতাম, যে চোখগুলো কখনও ঘুমায় না, রাতের অন্ধকারেও দেখতে পায় এবং আমাদের প্রত্যেককে চিনতে পারে। সে আমাদের একজন একজন করে গুনতো, যেমন করে মানুষ টাকা গোনে। তারপর একজনের পাশ থেকে আরেকজনের কাছে আসত। তার ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পেতাম। জানতাম যে তার চোখ সদা সতর্ক। সেই কারণেই সবাই, শীত বা ঘুম নিয়ে অভিযোগ না করে, চুপচাপ তাকে অন্ধের মত অনুসরণ করতাম।

কিন্তু সবকিছু সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে সায়ুলা পাহাড়ে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর। যদি তা না ঘটত, তাহলে হয়তো পেদ্রো সামোরা, চিনো আরিয়াস, চিউইলা এবং আরও অনেকেই এখনও বেঁচে থাকতো এবং আমাদের বিদ্রোহ সঠিক পথে থাকতো। কিন্তু সায়ুলায় ট্রেন লাইনচ্যুত করার মাধ্যমে পেদ্রো সামোরা সরকারকে ভীষণভাবে চটিয়ে তোলে। 

যেখানে মৃতদেহগুলো জমা করে পোড়ানো হয়েছিল, সেই আগুনের ঝলক এখনও দেখতে পাই। লাঠি ব্যবহার করে বা বৃক্ষকান্ডের মত পাহাড় থেকে গড়িয়ে নিচে ফেলে লাশগুলো স্তুপিকৃত করা হয়েছিল।

স্তুপটি বিশাল হয়ে গেলে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাতাসে তার দুর্গন্ধ অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক দিন পরেও সেই পোড়া মাংসের গন্ধ পাওয়া যেতো।

ঘটনাটি ঘটার সামান্য আগেও ভালো করে জানতাম না কী ঘটতে চলেছে। আমরা রেললাইনের পুরো অংশ জুড়ে গরুর হাড় এবং শিং ছড়িয়ে দিয়েছিলাম, এবং সেটাও যথেষ্ট ছিল না, যেখানে ট্রেনটি বাঁক নিতে শুরু করার কথা সেখানে লাইনগুলো বাঁকা করে একে অন্যের থেকে সরিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। ভোরের আলো দেখা দিতে শুরু করেছিল। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল বগিগুলোর ছাদে অসংখ্য মানুষের ভিড়। কেউ কেউ গান গাইছিল। পুরুষ নারীর কণ্ঠ। তারা আধো অন্ধকারে আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেল। দেখতে পেলাম সৈন্য তাদের নারীদের। অপেক্ষা করতে থাকি, ট্রেন থামে না।

চাইলে ট্রেনটিকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে পারতাম, কারণ হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে খুব ধীরে চলছিল, যেন পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করছিল ঘোঁতঘোঁত শব্দ করে। আমরা লোকজনের সাথে একটু আধটু কথাও বলতে পারতাম। 

কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে ওঠে। যখন মনে হল যে বগিগুলো ঘুরছে এবং ট্রেনটি এমনভাবে দুলছে যেন কেউ এটিকে ঝাঁকাচ্ছে, তাদের বুঝতে বাকি রইলো না কী ঘটতে যাচ্ছে। লোকভর্তি ভারী বগিগুলোর টানে ইঞ্জিনটি একটু পেছনে চলে এলো। একটি কর্কশ, বিষণ্ণ দীর্ঘায়িত হুইসেল বেজে উঠল কিন্তু তাকে সাহায্য করার কেউ ছিল না। অন্তহীন লম্বা ট্রেনটির টানে ইঞ্জিনটি পেছনের দিকে পিছলাতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না নীচে কোনও সমতল ভূমি না থাকে, তারপরে পাশে হেলে গিরিসঙ্কটের অতলে পড়ে যায়। বগিগুলো একের পর এক, ছোট ছোট টুকরো হয়ে প্রতিটি নিজ নিজ জায়গায় গড়িয়ে পড়ে। পরে, সবকিছু স্থির হয়ে যায়, যেন সবাই মারা গেছে, এমনকি আমরাও। 

এমনটাই ঘটেছিল।

বেঁচে যাওয়া লোকেরা ভাঙা বগিগুলোর ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসতে শুরু করলে আমরা ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাই। কয়েকদিন লুকিয়ে ছিলাম, কিন্তু ফেডেরাল সৈন্যরা আমাদের নির্মূল করার জন্য এগিয়ে আসে। আর শান্তিতে থাকতে দেয়নি, এমনকি এক টুকরো শুকনো মাংসে কামড় দেবার সময়ও দেয়নি। খাবার বা ঘুমানোর সময় ছিল না, দিন এবং রাত এক হয়ে যায়। আমরা তোজিন গিরিখাতে পৌঁছানোর চেষ্টা করি, কিন্তু ওরা আমাদের আগেই সেখানে পৌঁছে যায়। আমরা আগ্নেয়গিরির পাশ দিয়ে এগিয়ে যাই। সর্বোচ্চ পর্বতমালায় আরোহণ করি। এল ক্যামিনো দি দিওসে এসে সরকারি সৈন্যদের মুখোমুখি হই। ওরা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিবর্ষণের তীব্রতায় মনে হয় চারপাশে বাতাস তপ্ত হয়ে গেছে। এমনকি আমরা যে পাথরগুলোর পেছনে লুকিয়ে ছিলাম সেগুলোও মাটির ঢেলার মত একের পর এক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। পরে জানতে পেরেছিলাম, ঝাঁঝির মত অসংখ্য ছিদ্রে শরীরকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া যে অস্ত্র দিয়ে তারা আমাদের দিকে গুলি ছুঁড়ছিল সেগুলো ছিল মেশিনগান। কিন্তু সেই সময় আমাদের মনে হয়েছে ওখানে সৈন্য অনেক, হাজার হাজার। আমাদের একমাত্র আকাংখা ছিল যত দ্রুত সম্ভব তাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া।

কয়েকজন পালাতে পেরেছিলাম। চিউইলা রয়ে যায় এল ক্যামিনো দে দিওসে, মাদ্রোন গাছের আড়ালে গলায় কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়ে, যেন ঠান্ডা থেকে নিজেকে রক্ষা করছে। মৃত্যুকে আমাদের সাথে ভাগাভাগি করে সেখানে শুয়েই সে আমাদের একে একে চলে যেতে দেখে। মনে হচ্ছিল রক্তে লাল হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো বের করে সে আমাদের নিয়ে হাসছে। 

আমরা যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলাম তা অনেকের জন্যই মঙ্গলজনক ছিল, যদিও কারও কারও জন্য তা ছিল না। রাস্তায় কোনো কোনো গাছে আমাদের কোনো সঙ্গীকে পা বাঁধা অবস্থায় ঝুলন্ত না দেখাটা ছিল অস্বাভাবিক। তারা সেখানেই ঝুলতে থাকে যতদিন পর্যন্ত না মৃতদেহ জীর্ণ হয়ে আসে অথবা ট্যানহীন চামড়ার মতো কুঁচকে যায়। শকুনেরা তাদের ভেতরটা খেয়ে নাড়িভুড়িগুলো টেনে হিঁচড়ে বের করে কঙ্কালটি ফেলে রাখে। যেহেতু উঁচুতে ঝুলানো, তারা সেখানে অনেক দিন, কখনও কখনও অনেক মাস ধরে বাতাসে নড়ে ঝিরঝির শব্দ করে, অথবা কখনও মনে হয় রৌদ্রে শুকাতে দেওয়া প্যান্টের পাগুলো হাওয়ায় উড়ছে। এসব দেখে আমরা বুঝতে পারছিলাম যে ব্যাপারটা সত্যিই গুরুতর হয়ে উঠছে।

কেউ কেউ বড় পাহাড়ে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে সমতলের দিকে তাকিয়ে সময় কাটাই, নীচের সেই জমির দিকে যেখানে আমরা জন্মেছি, বাস করেছি এবং যেখানে তারা আমাদের হত্যা করার জন্য অপেক্ষা করছে। কখনও কখনও মেঘের ছায়াও আমাদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিত। 

যদি কাউকে গিয়ে বলতে পারতাম, আমরা আর যুদ্ধ করছি না, আমাদের শান্তিতে থাকতে দাও! কিন্তু আমরা আশেপাশে লোকজনের এত বেশি ক্ষতি করেছি, যে তারা আমাদের বিরুদ্ধে চলে গেছে এবং আমাদের একমাত্র অর্জন হয়েছে শত্রু সৃষ্টি করা। এমনকি এখানকার রেড ইন্ডিয়ানরাও আমাদের প্রতি আর সহানুভূতিশীল ছিলো না। বলেছে, আমরা তাদের গবাদিপশু হত্যা করেছি। এখন তারা সরকারের দেওয়া অস্ত্র হাতে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের কাছে বার্তা পাঠিয়েছে, দেখা পেলেই হত্যা করবে। 

আমরা তোমাদের দেখতে চাই না, যদি দেখি, জীবন নিয়ে ফিরতে দেব না।তারা কথাই বলেছিল।

সারা পৃথিবীতে আমাদের যাওয়ার প্রায় কোনো জায়গা অবশিষ্ট ছিল না। খুব একটা জমিও বাকি ছিল না আমাদের কবর দেওয়ার জন্য। কারণেই আমাদের শেষ জন আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রত্যেকে যে যার পথে চলে যাই। আমি পেদ্রো সামোরার সাথে প্রায় পাঁচ বছর ছিলাম। ভাল দিন, মন্দ দিন, পাঁচ বছর এক সাথে। এরপর তাকে আর দেখিনি। লোকে বলে সে মেক্সিকো সিটিতে গিয়েছিল কোনো মহিলার পিছুপিছু এবং সেখানে তাকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিল, কিন্তু অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্তি এসে যায়। সে আর ফিরে আসেনি। তাকে সত্যিই সেখানে হত্যা করা হয়েছে। আমার সাথে কারাগারে থাকা একজন লোক বলেছিল, সেই তাকে হত্যা করেছে। 

আমি জেল থেকে বেরিয়েছি তিন বছর আগে। ওরা আমাকে বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছে, কিন্তু সামোরার সহযোগীদের একজন বলে নয়। ওরা তা জানতো না। তারা আমাকে ধরেছে অন্যসব বাজে কাজের জন্য, যার মধ্যে মেয়েদের অপহরণ করা ছিল আমার খারাপ অভ্যাস। এখন ওদের একজন আমার সাথেই থাকে, হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর এবং সেরা নারী। সেই জেলের বাইরে অপেক্ষা করে থেকেছে আমার জন্য, জানা নেই ঠিক কত দীর্ঘ সময়, কারণ কেউ জানতো না আমাকে কবে ছাড়বে। 

পিচন, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছি।সে আমাকে বলেছিল, ‘দীর্ঘ দিন ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছি।

আমার ধারণা হয়েছিল, সে অপেক্ষা করছে আমাকে হত্যা করার জন্য। অস্পষ্টভাবে, যেন স্বপ্ন দেখছি, মনে পড়ল সে কে। আবার সেই ঝড়ের রাতের ঠান্ডা জল অনুভব করলাম, যখন আমরা তেলকাম্পানা শহরে প্রবেশ করে লুটতরাজ করি। আমি প্রায় নিশ্চিত যে, তার বাবাই ছিল সেই বৃদ্ধ যাকে চলে যাওয়ার সময় আমরা শেষ বিশ্রামস্থলে পাঠিয়েছিলাম। আমাদের মধ্য থেকে একজন তার মাথায় গুলি করেছিল। আমি তার মেয়েকে ঘোড়ার জিনের ওপর টেনে তুলে নিয়েছিলাম। তাকে কয়েকবার সজোরে আঘাত করতে হয়েছিল কামড়ানো বন্ধ করে শান্ত হবার জন্য। বয়স ছিল চৌদ্দের কাছাকাছি, ছোট্ট একটি মেয়ে, সুন্দর দুটো চোখ। সে এত তীব্র লড়াই করেছিল যে, তাকে বাগে আনতে আমার ভীষণ পরিশ্রম করতে হয়েছে। 

তোমার ঔরসে আমার এক ছেলে আছে।সে আমাকে বলে, ‘ওই যে ওখানে।সে তর্জনি দিয়ে ভীত চোখের লম্বা, রোগা একটি ছেলের দিকে দেখায়, ‘সম্ব্রেরোটা নামা, তোর বাবা তোকে দেখুক।ছেলেটি টুপি খুলে ফেলে। দেখতে একদম আমার মত কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে কী একধরনের নীচুতা আছে। এমন কিছু একটা সে নিশ্চয়ই ওর বাবার কাছ থেকেই পেয়েছে। 

লোকে ওকেওএল পিচনবলে ডাকে’—মেয়েটি, যে এখন আমার স্ত্রী, বলতে থাকে। 

কিন্তু সে ডাকাত বা খুনি নয়। নিতান্তই একজন ভাল মানুষ।

আমি মাথা নিচু করি। 

Related Posts