গণভোটে হ্যঁা ভোটের পক্ষে প্রচারণায় || বাংলাদেশ ব্যাংক কাকে কত টাকা দিয়েছে
ঢাকা থেকেঃ গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১ কোটি টাকা অনুদান পেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশা। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে দেশের নাগরিক সংগঠন ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক’ বা ‘সুজন’ আড়াই কোটি টাকার অনুদান পেয়েছিল। আর এ তহবিল থেকে বিতর্ক সংগঠন ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ও ২০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিল। তবে এই টাকা কীভাবে এসেছে এবং ব্যয় হয়েছে কীভাবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক পক্ষের নেতারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বেশ বিতর্ক চলছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই খাতে অর্থ দিতে পারে কিনা প্রশ্ন উঠায় এ বিষয়ে অডিট তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সাধারণত বঞ্চিত ও অনগ্রসর মানুষের সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নয়নে দেশের ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অর্থ ব্যয় হতো। তবে গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সিএসআর’র অর্থ ব্যবহার হয়েছে। অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ বলেন, ভোটের প্রচার করবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। ব্যাংকের টাকায় এই প্রচার করা ঠিক হয়নি। যে প্রক্রিয়ায় টাকা দেয়া হয়েছে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ। সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ব্যাংক নীতিমালা অনুযায়ী টাকা দিয়েছে কিনা সেটি দেখার বিষয়।
জানা গেছে, গত ১১ জানুয়ারি দেশের সব ব্যাংক এমডি বা শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। ‘ব্যাংকার্স সভা’— নামে পরিচিত ওই বৈঠকে গভর্নরের পক্ষ থেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’—এর প্রচারে সহযোগিতা করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরামর্শেই ‘সুজন’, ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’ ও ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’কে অনুদান দেয়ার প্রস্তাব তোলা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র বলছে, ২০২৬ সালের ২১শে জানুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফাউন্ডেশন যৌথমূলধনী ও ফার্মসমূহের অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হয়। গণভোট—২০২৬ কে সফল করার লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনটি কাজের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চেয়ে আবেদন করে। অনলাইন রেফারেন্ডাম প্রচারণা, রেফারেন্ডাম কনসার্ট ও স্ট্র্যাটেজিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যা নেশনওয়াইড ইয়ুথ এনগেজমেন্ট ক্যাম্পেইন— এই তিন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য অর্থ চাওয়া হয়। অর্থ খরচের পূর্ণাঙ্গ অডিট রিপোর্ট জমা দেয়ার শর্তে ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অনুদানের অর্থ খরচের বিষয়ে অডিটেড রিপোর্ট জমা দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এতথ্য জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, রিপোর্ট জমা হয়েছে, যা পর্যালোচনাধীন রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে। গণভোটের প্রচারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কোটি টাকা পাওয়ার বিষয়টি প্রথমে প্রকাশ্যে আসে গত ২৩শে এপ্রিল।
সেদিন বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র সিনথিয়া জাহীন আয়েশাসহ কয়েকজন নেতা। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ফান্ড (তহবিল) গ্রহণ এবং তা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, সেটা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছে। তারা সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ওই এক কোটি টাকার পাওয়ার তথ্য গোপনের অভিযোগ করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে রিফাত রশিদ বলছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। সেই সঙ্গে কীভাবে ওই টাকা পেয়েছিলেন, তা উল্লেখ করেছেন রিফাত রশিদ। একই সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা করিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। রিফাত রশিদ বলেন, এই অভিযোগ আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, দুদকসহ বাংলাদেশের যেকোনো ধরনের তদন্তকারী সংস্থা যদি এই অভিযোগের তদন্ত করতে চায়, আমরা তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবো। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘স্যাড ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ১ কোটি টাকা দিয়েছিল।
এ বিষয়ে এবিবি চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, এরই মধ্যে এবিবি’র পক্ষ থেকে সুজন ও ডিবেট ফর ডেমোক্রেসিকে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে ‘সুজন’কে। বাকি ২০ লাখ টাকা ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’কে দেয়া হয়েছে। এ অর্থে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার ও নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজন করা হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও পরামর্শেই আমরা এ টাকা দিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমে বলেছিলেন, নাগরিক সংগঠন হিসেবে ‘সুজন’ বহুল পরিচিত। আর বিতর্ক আয়োজনের জন্য ‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র পরিচিতি রয়েছে। তাদের কার্যক্রম সমাজে দৃশ্যমান। সংস্থা দু’টির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই ওই অর্থ দেয়ার বিষয়টি ব্যাংকার্স সভায় তোলা হয়। টাকার অঙ্ক কম হওয়া ও প্রস্তাবের যৌক্তিকতার বিচারে ব্যাংক নির্বাহীদের কেউ এ বিষয়ে আপত্তি জানাননি।
সুজনের পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে উদ্বুদ্ধ করতেই ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে এবিবি’র মাধ্যমে আড়াই কোটি টাকার অনুদান নেয়া হয়।
‘ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র পক্ষ থেকে বলা হয়, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে নয়, বরং নির্বাচনী বিতর্ক আয়োজনের জন্য অনুদান নেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো প্রজ্ঞাপন জারি করে সিএসআর খাতে ব্যয় করার জন্য ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২০২২ সালের ৯ই জানুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মোট সিএসআর’র ৩০ শতাংশ শিক্ষায়, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি প্রশমন ও অভিযোজন খাতে ২০ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে (আয়—উৎসারী কার্যক্রম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং অন্যান্য) ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয়ের নির্দেশনা দেয়। একই বছরের ২৯শে নভেম্বর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট তহবিলে মোট সিএসআর ব্যয়ের ৫ শতাংশ অনুদান হিসেবে দিতে হবে। একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের আগে গণভোটে প্রচারণায় সিএসআর খাত থেকে টাকা দেয়া যৌক্তিক হয়নি।
