মনজুর আহমদের স্মৃতিকথা, সাংবাদিকতা ও ইতিহাসের মিশেল হাসান ফেরদৌস

সংবাদপত্রকে বলা হয় ইতিহাসের প্রথম খসড়া লেখক। সংবাদপত্রঅথবা সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনহল সেই রসদ অথবা কাঁচামাল যা ব্যবহার করে গবেষকের নিবিড় বিশ্লেষণে নির্মিত হয় সেই বয়ান ব্যাখ্যা যাকে আমরা ইতিহাস বলি। এই দুইয়ের মধ্যে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রভেদ। দুটোই সত্যকে জানার জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি: একটি তাৎক্ষণিকতার তাগিদে গড়া, অন্যটি ব্যাখ্যার প্রয়োজনে শৃঙ্খলাবদ্ধ পুণঃনির্মাণ। ফলত, সাংবাদিকতা সত্য প্রতিষ্ঠায় জরুরী কিন্তু তাতে আমরা সত্যকে পুরোপুরি পাই না, কারণ  সত্যকে জানতে হলে প্রয়োজনে সময় স্থানগত দূরত্ব, যে দূরত্ব আমরা পাই ইতিহাসে। 

প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদের দুই খন্ডের স্মৃতিকথনআমার সেই সময় আমার এই সময় (আগামী, ঢাকা, ২০২৪/২০২৫)— সাংবাদিকতাও নয়, ইতিহাসও নয়, বরং এই দুইয়ের সাহসী মিশেল। নিজের ৮৫ বছর জীবনের দুইতৃতীয়াংশ তিনি ব্যয় করেছেন পেশাদারী সংবাদকর্মী হিসাবে। শুধু দর্শক বা পর্যবেক্ষক হিসাবে নয়কখনো কখনো  অনাগ্রহী অংশগ্রহণকারী হিসাবেও ইতিহাসের যে তাৎক্ষণিক নির্মাণ প্রত্যক্ষ করেছেন, এই দুই খন্ডে বিবৃত বয়ান সেই ইতিহাসের সরলীকৃত পুনঃনির্মাণ। এই পুনঃনির্মাণের কেন্দ্রে রয়েছেসরকারীবয়ানের উর্ধে উঠে ক্রমাগত প্রশ্ন তোলার সাহস, যার উৎস সংশয় বা স্কেপ্টিসিজম, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চার জন্য যা অপরিহার্য। মনজুর আহমদের ভাষ্যে সেই সংশয়ের সংযত প্রকাশ পাঠক হিসাবে আমাকে আগ্রহী করেছে।

ভস্নাদিমির নবোকফ স্মৃতিকথাকে ডায়েরির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যে ডায়েরি আমরা সর্বক্ষণ নিজের সঙ্গে নিয়ে ঘুরি। সে অর্থে এই গ্রন্থ মনজুর আহমদের ব্যক্তিগত ডায়েরি। অন্যদিকে জর্জ ওরওয়েল স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনীর ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, এতে সত্যিকথা রয়েছে খুব সামান্যই, কারণ অপ্রিয় সকল সত্যকে স্মৃতিচারী লেখক লিপিবদ্ধ করার বদলে তা এড়িয়ে চলেন। তাঁর কথায়, অহ ধঁঃড়নরড়মৎধঢ়যু রং ঃড় নব ঃৎঁংঃবফ যিবহ রঃ ৎবাবধষং ংড়সবঃযরহম ফরংমৎধপবভঁষ

মনজুর আহমদ তাঁর গ্রন্থে এই বিবাদকে এড়িয়ে গেছেন মূলতব্যক্তিগতেরবদলে সেইসব ঘটনা বিবরণ পুনঃনির্মাণে ব্যাপৃত থেকে যাকে আমরাসামষ্টিকহিসাবে অভিহিত করতে পারি। তার চোখের চশমাটি নিজস্ব, অর্থাৎ ব্যক্তিগত, কিন্তু যা দেখছেনÑ এবং যা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পুনরুদ্ধার করেছেন তার অধিকাংশ সামষ্টিক।  

ব্যক্তিগত জীবনে, মননে ভাবনায় মনজুর আহমদ প্রবল রকম রাজনৈতিক। ফলে তার ব্যক্তিগত অবলোকন সমূহও প্রায়  অনিবার্য ভাবে রাজনৈতিক। শৈশব কেটেছে ঝিনাইদহে, সে সময়ের একটি ঘটনার উদাহরণ দেই। ১৯৫৭ সাল, তখন নবম শ্রেণির ছাত্র হলেও রাজনীতিক পিতার প্রভাবে ততদিনে পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়েছে মনজুর আহমদের। একদিন  দলীয় কাজে অংশ নিতে শহরে এসেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তার পিতৃগৃহে রাতে খাবারের ব্যবস্থা হয়েছিল। খেতে বসে হাত গুটিয়ে গম্ভীর মুখে বসে বঙ্গবন্ধু। সবাই তো অবাক। শুরু করার অনুরোধ করতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, মরিচ কই। ফরিদপুরের মানুষ, মরিচ ছাড়া কি খেতে পারি।

ঘটনাটি সামান্য, কিন্তু মানুষ বঙ্গবন্ধুর সারল্য নিরাভরনতা স্পষ্ট। যে গুরুত্বের সঙ্গে গল্পটি বিবৃত হয়েছে তাতে আমার মনে হয়েছে আজকের পরিণত মনজুর আহমদ মানুষ হিসাবে বঙ্গবন্ধুর সেই সারল্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন। এটি তাঁর রাজনৈতিক ঘরানার ইঙ্গিতবাহীও বটে। সেদিন এক সুযোগে মনজুর আহমদ বঙ্গবন্ধুর কাছে আবদার ধরেছিলেন, তিনি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করতে চান। সেজন্য সাহায্য চাই। প্রায়বালক মনজুরের সেই অনুরোধ শুনে বঙ্গবন্ধু বিস্মিত হয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও সকল সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ঢাকায় ফিরে তাঁর নামে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। মনজুর আহমদের সে পত্রিকা বের করা হয়নি, কিন্তু তাঁর নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে সারা জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে রইল সেই চিঠি। 

ক্লাস নাইনে পড়ার সময়েই মনজুর আহমদ দৈনিক ইত্তেফাকের মফস্বল প্রতিনিধির দায়িত্ব পান। সেখান থেকে প্রথমে সংবাদ এবং পরে দৈনিক বাংলায় পেশাদারী সাংবাদিকতা। আরো একাধিক পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ নানা দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এমনকি ২০০০ সালে যখন ঢাকা ছেড়ে নিউ ইয়র্কে থিতু হন, সেখানেও পেশা  সাংবাদিকতা। 

তাঁর স্মৃতিকথনের প্রথম খন্ড শেষ হয় একাত্তরের ডিসেম্বরে বিজয় দিবসের ঘটনায়। দ্বিতীয় খন্ডের পুরোটাই স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর সাংবাদিক জীবনের গল্প, যা শেষ হয় ২০০০ সালের নভেম্বরে ঢাকা ত্যাগ দিয়ে।

১৯৫৭ থেকে ২০০০ সাল, এই ৪৩ বছরে বাংলাদেশে বিস্তর ঘটনা ঘটেছে যার তিনি প্রত্যক্ষ্যদর্শী। কিন্তু মনজুর আহমদ বেছে বেছে সেইসব ঘটনাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন যা শুদ্ধ রাজনৈতিক। যেমন ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ঘিরে আয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৪ সালের হিন্দুমুসলিম  দাঙ্গা, ১৯৬৮ সালের ছয় দফা আন্দোলন, এবং সবশেষে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালি কীভাবে তার দাসত্ব ছেড়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে উঠল, এই ঘটনাবলী সে পথপরিক্রমার প্রায় আনুপূর্বিক বৃত্তান্ত। 

ব্যক্তিগত কহনকথন যে নেই তা নয়। যেমন, অভিনয় শিল্পী রেখা আহমদের সঙ্গে তাঁর প্রেম বিয়ে। নানা নাটকীয়তায় ভরা সে কাহিনী। বিয়ের পর প্রায় কিশোরী রেখা কীভাবে একদম একা ঢাকায় মনজুরের বাসায় ওঠেনতা নিয়ে অনায়াসে একটি চমৎকার প্রেমোপাখ্যান লেখা যেত, কিন্তু মনজুর আহমদ অতি রক্ষণশীল বাঙালি পুরুষ, সেপথে গেলেনই না। রেখার সঙ্গে প্রেম করছেন, অথচ লিখতে গিয়ে জানাচ্ছেন, রেখার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক ছিল। হায়রে বাঙালি পুরুষ!  

দ্বিতীয় খন্ডের পুরোটাই স্বাধীন বাংলাদেশকে ঘিরে। কত ঘটনারই না তিনি সাক্ষী। বঙ্গবন্ধু যেদিন ঢাকা ফেরেন, দলীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে সাংবাদিক হিসাবে তিনিও উপস্থিত। জানিয়েছেন, এই প্রত্যাবর্তনের যে কাহিনী সরকারী উদ্যোগে তথ্যচিত্রাকারে বর্ণিত হয়েছে তার অনেকটা বানানো, অতিনাটুকেপনায় ভরা। তথ্যচিত্রে রয়েছে বঙ্গবন্ধু বিমান  থেকে নেমে বাংলার মাটিতে চুমু খেলেন। মনজুর আহমদ জানাচ্ছেন এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি। একই ফিল্মে বঙ্গবন্ধুর বিয়ের যে গল্প রয়েছে তাতেও বাস্তবের চেয়ে কল্পনাই বেশি। 

বঙ্গবন্ধুর প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা সত্ত্বেও একাত্তর পরবতীর্ স্বাধীন বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক অব্যবস্থা, নিরাশক্ত ভাবে তার বিবরণ লিপিববদ্ধ করেছেন মনজুর আহমদ। সেই কঠিন সময়ে প্রয়োজন ছিল একটি বহুদলীয় জাতীয় সরকারের। বঙ্গবন্ধু রাজি হননি। মনজুরের বয়ানিতে জানছি, সেসময় তিনি ঐক্যের ডাকের জবাবে বলেছিলেনঐক্য ঐক্য করে আমাকে পাগল করে তুলছে। কিসের ঐক্য, কার সাথে ঐক্য? আগে নির্বাচন করে আসুন, তারপর দেখব ঐক্য করা যায় কি না।

১৯৭৩ সালের সে নির্বাচনে যে অভাবনীয় জালিয়াতি ঘটে, আজকের বাংলাদেশের যে গভীর অসুখ, তার সংক্রমণের  সেই শুরু। সেসময়েই ঘটে আমাদের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিতর্কেরও সেই শুরু। মনজুর আহমদ জানাচ্ছেন, সেসময় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সখেদে  বলেছিলেন, ‘ইতিহাস শেখ সাহেবেরে স্টেটসম্যান হইবার একটা সুযোগ দিছিল। তিনি এইডা কামে লাগাইবার পারলেন না।

১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫, এই দুইতিন বছর বাংলাদেশ একের পর এক দুর্যোগের ভেতর দিয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় দুর্যোগ ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যা। এমন হত্যাকান্ড কেন, তার কোন ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণে যাননি মনজুর আহমদ, কিন্তু একটি আশ্চর্য মন্তব্য তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর তার প্রতিবাদে রাস্তায় মানুষ নামেনি। বরং মানুষ নেমেছিল হত্যাকান্ডের সমর্থনে। 

রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মত একের পর এক ঘটনা। অধিকাংশই আমাদের জানা ইতিহাস, কিন্তু মনজুর আহমদের বয়ানিতে তা শেষ পর্যন্ত শুধু স্মৃতিকথা হিসেবে পড়ার দাবি করে না; বরং এগুলো এক ধরনের অপেক্ষমান উৎসউপাদান বা ংড়ঁৎপব সধঃবৎরধষংরহ ধিরঃরহম হয়ে দাঁড়ায়। এই গ্রন্থদ্বয় তুলনীয় উপমহাদেশের আরেক সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারেরবিয়োন্ড দি লাইনসস্মৃতিকথার সঙ্গে। তাঁরা দুজনেই ঘটনাবহুল ইতিহাসের সাক্ষী। এক মফস্বল শহরে কাটানো শৈশবের উদ্বেগ, সংবাদপত্রের অন্দরের নৈতিক সমঝোতা, রাজনৈতিক বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিকতা, তাঁরা দুজনেই এই অভিন্ন অভিজ্ঞতার অংশীদার। সম্ভাবনার অর্থে এই অভিজ্ঞতা বিগত সময়ের সেইসব ঘটনাবলি যা একটি সময় বা কালকে সংজ্ঞায়িত করতে সক্ষম। 

আর এখানেই মনজুর আহমদের দুইখন্ডের এই স্মৃতিকথনের গুরুত্ব। কোনো সন্দেহ নেই, সমসাময়িক দলিলপত্র, আর্কাইভ স্মৃতিকথা, যাদের পন্ডিতেরাঁংধনষব ংঁনলবপঃরারঃুবা ব্যবহারযোগ্য বিষয়সত্তা নামে অভিহিত করে থাকেন, মনজুর আহমদের গ্রন্থদ্বয় সেই রকম তথ্যউৎস। ইতিহাসবিদরা এই তথ্যউৎসে ফিরে যান কেবল মৌলিক কোন তাত্ত্বিক বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য নয়, বরং একথা বোঝার জন্য যে এই তথ্যাবলি কীভাবে জীবিত অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছিল, কীভাবে তা মীমাংসিত হয়েছিল, এবং পরে কীভাবে তা আমাদের অভিন্ন স্মৃতিসত্তার অন্তর্গত হল। 

আমার স্থিও বিশ্বাস, ভবিষ্যতে যারা বাংলাদেশের প্রথম অর্ধ শতকের গল্পটি লিখবেন, এই গ্রন্থদ্বয়ে তাদের বারবার ফিরে আসতে হবে কোনো চূড়ান্ত বা নিরঙ্কুশ বয়ান উদ্ধারের জন্য নয়; বরং একটি রূপান্তরমান সমাজের বুননকে উপলব্ধি করতে। 




Related Posts