স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে পরিবর্তন করার সুযোগ আছে || আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি বাতিলের দাবি

বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশের বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে বিতর্ক এবং এটি বাতিলের দাবি আবারও সামনে এসেছে। যদিও বিএনপি সরকার চুক্তিটি বাতিল করবে না বলেই এই সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ধারণা দিচ্ছে। কিছু রাজনৈতিক দল নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী অনেকে এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেএকপক্ষীয়বাঅসমবলে অভিযোগ করছে এবং তারা এটি বাতিলের দাবিতে কর্মসূচিও নিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি সই করে, তখনও নিয়ে সমালোচনা হয়।অত্যন্ত গোপনীয়তারসাথে চুক্তিটি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যখন চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়েছে, তখনই কেবল বিষয়গুলো জানা গেছে। যদিও বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টরা গোপনীয়তার অভিযোগ অস্বীকার করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এখন নির্বাচিত বিএনপির রাজনৈতিক সরকারের অবস্থান আসলে কী হবে? চুক্তি বিরোধীরা মনে করেন, সরকার চাইলে জাতীয় সংসদে আলোচনাপর্যালোচনা করে চুক্তির ব্যাপারে অবস্থান নিতে পারে। এটি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়।

অবস্থান কী বিএনপি সরকারের

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আলোচনা এবং শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর করাএই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্বে ছিলেন . খলিলুর রহমান। তিনি ওই সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন।

খলিলুর রহমানকেই নির্বাচিত বিএনপি সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের পাশাপাশি রাজনীতিকদেরও কেউ কেউ বলছেন, খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার পেছনেই একটি বার্তা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন গত চৌঠা মার্চ। তার উত্তর ছিল, এই চুক্তিতে প্রধান দুই দল বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সম্মতি ছিল।

তিনি বলেছিলেন, ‘ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের প্রধান দুটি দলের প্রধানের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই কথা বলেছেন এবং তারাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন

তখন তা অস্বীকার করে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ওই চুক্তি নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।

তবে বিষয়টাতে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেও এই সরকারের অবস্থানের ইঙ্গিত রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

এই চুক্তি নিয়ে বিতর্ক যে চলছেই এবং অনেক প্রশ্ন উঠছে, তা বিএনপি সরকার আমলে নিচ্ছে না বলেই মনে হয়। কারণ চুক্তিটি নিয়ে সরকারে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি এবং এমনকি অনানুষ্ঠানিক কোনো আলোচনাও নেই বলে জানা গেছে।

বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণাই পাওয়া যায় যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সরকারের সম্পর্কের উন্নতি এবং ভূরাজনীতি বিবেচনায় নিয়েছেন। আর সেই বিবেচনা থেকে সরকার চুক্তিটি বাতিল করবে না।

চুক্তি বাতিল বা পর্যালোচনার সুযোগ কী আছে

সেই সুযোগ আছে; জাতীয় সংসদে আলোচনাপর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তি সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া এবং বাতিল করা যায় বলে দাবি করছেন চুক্তিটির বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারীরা।

তারা ওই দাবিই তুলেছেন।

বুধবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বলেছেন, চুক্তিতেই ষাট দিনের মধ্যে তা বাতিলের কথা বলা আছে। তিনি চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনা করা এবং তা বাতিলের দাবি জানান।

চুক্তিতে ষাট দিনের একটা প্রবেশনারি সময়ের কথা বলা আছে। এই সময়ের মধ্যে তা বাতিল করা যায়। এছাড়া কোনো দেশের সঙ্গে যে কোনো চুক্তি যে কোনো সময় বাতিল করা যায় বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।

যদিও অতীতে বাংলাদেশের সংসদে আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তি নিয়ে আলোচনা করার নজির তেমন নেই।

তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেই প্রক্রিয়ায় গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছিল।

তখন আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তি জাতীয় সংসদে আলোচনা করার ব্যাপারে বিএনপিজামায়াতসহ আলোচনায় অংশ নেওয়া দলগুলো একমত হয়েছিল।

সেই প্রসঙ্গে টেনে নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনকারী অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংসদে আলোচনা করে চুক্তি ঘিরে বিতর্ক বা প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের জন্য সহজ হত।

সরকার কি সেই সুযোগ নেবে বা জাতীয় সংসদে আলোচনা করবে? এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত নেই।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, সরকারের কেউ কেউ মনে করেন, চুক্তিটি নিয়ে তাদের সরকারের উচ্চ পর্যায়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাদের একজন বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, পর্যালোচনা করার বিষয়টি তিনি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তুলে ধরবেন।

কিন্তু সরকারের আরেকটি সূত্র বলছে, প্রায় দুই দশক পর বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। আর এই সরকারের বয়স দুই মাসের কিছুটা বেশি। সেই সরকার চুক্তিটির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি করবে কেন?

চুক্তি নিয়ে এত বিতর্ক বা আলোচনা কেন?

এটি সই করার প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন সমালোচনা রয়েছে, এর বিষয়বস্তু নিয়েও অনেক প্রশ্ন উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি করা হয়েছে, এমন অভিযোগ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তি নিয়ে যখন আলোচনা চলছিল, সেই আলোচনার বিষয়ও গোপন রাখার অভিযোগ আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই চুক্তির বিষয়বস্তু প্রকাশের পর তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে, জন্ম দিয়েছে বিতর্কের।

Related Posts