আটলান্টায় বাংলা সাহিত্যের দুই সন্ধ্যা

বিশেষ প্রতিবেদনঃ প্রবাস মানে যে শুধু জীবিকার সংগ্রাম নয় আটলান্টার বাঙালিরা সেই ধারণাকে বারবার ভুল প্রমাণ করে চলেছেন। ভিনদেশের মাটিতেও বাংলা ভাষা সংস্কৃতির শিকড় যে কতটা গভীরে প্রোথিত সেটা গত ২৫ ২৬ এপ্রিল জর্জিয়ার এই শহরে দুটি অনুষ্ঠান সাক্ষ্য দিল।

শনিবার ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হলো আটলান্টার প্রথম কবিতা প্রদর্শনী বাংলা বইমেলা। উৎপল দত্ত, সবুর খান স্বপন, অঙ্কন বসু, রাশেদ চৌধুরী, নাহিদ ফারজানা কল্পনা ব্যানার্জিÑ এই ছয়জন কবির কবিতার সঙ্গে দেয়ালে সাজানো চিত্রকর্ম মিলে তৈরি করেছিল এক অপূর্ব সৌন্দর্য। কবিতার সঙ্গে চিত্রকলার এই মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন স্থানীয় শিল্পী অমিতাভ চৌধুরী বাংলাদেশের তরুণ শিল্পী সৈকত শিকদার। রেজোয়ান হৃদয়, জয়শ্রী চৌধুরী, জয়ীতা চক্রবর্তী, কাকলি বিশ্বাস, নিবেদিতা আহমেদ ব্যাসদেব সাহা রানার কণ্ঠে ওই জন কবির কবিতার আবৃত্তি অনুষ্ঠানকে দিয়েছিল এক আলাদা আবেগের মাত্রা। সবুর খান স্বপন কল্পনা ব্যানার্জির নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন বিজ্ঞানী কথাসাহিত্যিক দীপেন ভট্টাচার্য এবং কবি মানস দে। মাহবুব মোর্শেদ আনোয়ার, সোমা মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, নীলাভ্র মুখোপাধ্যায়সহ আরও অনেকের উপস্থিতিতে সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল এক প্রাণবন্ত মিলনমেলা।

অনুষ্ঠানের একটি অনন্য মানবিক মাত্রাও ছিল। শিল্পীদের আঁকা ছবি বিক্রির অর্থ থেকে ১৮৬৮ মার্কিন ডলার দান করা হয়েছে শিশু ক্যান্সার গবেষণার বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান সেন্ট জ্যুড চিল্ডে্রন্স রিসার্চ হসপিটালকে। কবিতা শিল্পকলার এই সন্ধ্যা এভাবেই হয়ে উঠল মানবসেবারও সন্ধ্যা।

পরদিন রবিবার সন্ধ্যায় সেবা বাংলা লাইব্রেরিতে জমে উঠে এক ভিন্ন আসর। বিষয়— ‘মহাকাশ মানুষ: শূন্যতার মধ্যে কথাসাহিত্যের ঘর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আগত জ্যোতির্বিজ্ঞানী কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ডঃ দীপেন ভট্টাচার্য সেদিন দুটি পরিচয়েই উপস্থিত ছিলেনএকজন বিজ্ঞানী হিসেবে যিনি মহাবিশ্বের অতল রহস্য ব্যাখ্যা করেন, এবং একজন লেখক হিসেবে যিনি সেই রহস্যকে বাংলা কথাসাহিত্যের ভাষায় রূপ দেন। নাসিম জাফর শুভশ্রী নন্দী রাইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর উপন্যাস গল্পের জগৎদিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্নসহ বিভিন্ন রচনায় কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের বেদনা, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার দুর্ভেদ্য প্রশ্ন আর অস্তিত্ববাদী দর্শন একসূত্রে গাঁথা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ থেকে আইজ্যাক আসিমভসাহিত্য বিজ্ঞানের এই অপূর্ব সংলাপে ঘরভর্তি শ্রোতা তিন ঘণ্টা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে বসে রইলেন।

আটলান্টার বাঙালিদের এই সাহিত্য বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সাধনা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমসেবা বাংলা লাইব্রেরি। ২০০০ সালে জর্জিয়ায় প্রতিষ্ঠিত এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আজ চার হাজারেরও বেশি বাংলা বই নিয়ে সমৃদ্ধযুক্তরাষ্ট্রে বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক সম্ভবত একমাত্র এমন লাইব্রেরি। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান কারিগর মোহাম্মদ হারুন রশিদের স্বপ্ন অক্লান্ত পরিশ্রমে একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ রূপান্তরিত হয়েছে জীবন্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। তাঁর পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রাইহানা লস্কর, রেজোয়ান হৃদয়, রাশেদ চৌধুরী, নাহিদ ফারজানা, ফিরোজ আহমেদ সাবিনা চৌধুরী পিঙ্কিসহ আরো অনেকেযাঁদের নিঃস্বার্থ নিবেদন ছাড়া এই প্রতিষ্ঠান আজ যা তা হয়ে উঠত না।

পঁচিশ বছরে সেবা লাইব্রেরি আয়োজন করেছে বিশ্বসাহিত্য সম্মেলন, বিজ্ঞান সেমিনার, নাটক, কবিতার আসর। প্রতিটি অনুষ্ঠানে যে মানুষগুলো ছুটে আসেনদিনের কাজের ক্লান্তি সরিয়ে রেখেতাঁরাই প্রমাণ করেন যে বাঙালির আত্মা শুধু ভাতেমাছে নয়, কবিতায়, গানে, মহাকাশের অসীমতায়ও সমান সজীব। আটলান্টার এই দুই সন্ধ্যা তারই আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Related Posts