শিশুকে খাওয়ানোর নিয়ম—নীতি
প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার চৌধুরীঃ জন্মের পর শিশু খেতে পারার মতো অবস্থায় থাকলে যতটা সম্ভব আগে আগে খাওয়ানো শুরু করা উচিত। শিশু সুস্থ—স্বাভাবিক হলে, সজাগ সতর্ক তাকালে, যদি চুষে কিংবা ভালোমতো কান্না করে, তবে তাকে খাওয়ানোর মতো অবস্থা আছে বলে বিবেচনা করা যায়। আর এই খাওয়ানোর মাধ্যমে মাতৃজঠর থেকে সদ্য পৃথিবীতে আসা শিশুটির প্রয়োজনীয় শক্তি ও চাহিদাই শুধু পূরণ হয় না, তা মা ও শিশুর বন্ধন গাঢ় করে এবং অন্যান্য অনেক ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশুকে রক্ষা করে।
নবজাতক শিশুর শরীরে জলীয় পদার্থের পরিমাণ কম থাকার কারণে বিশেষত গরমকালে কম দুধ পান করার ফলে শিশুর শরীরের তাপ বেড়ে গেছে বলে ভ্রম হতে পারে।
তা জ্বর হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না। যে মা সন্তান ভূমিষ্ঠের পরপরই শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর চেষ্টায় রত থাকেন, তাঁকে সবিশেষ উৎসাহ জোগানো উচিত। বেশির ভাগ নবজাতক জন্মের পরপরই বুকের দুধ পান করতে সমর্থ হয়, অন্যরা চার থেকে ছয় ঘণ্টা সময়ের মধ্যে তা রপ্ত করে নেয়। তবে যখন কোনো নবজাতক শিশুর দৈহিক বা স্নায়বিক কারণে অসুস্থ থাকে, বা সে মুখে খেতে পারবে কি না এমন সংশয় দেখা দেয়, তখন তাকে খাওয়ানোর জোর চেষ্টা না করে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
শিশুকে প্রথম খাবার যতটা আগে সম্ভব শুরু করতে গিয়ে তড়িঘড়ি না করাটাই উত্তম, বরং মাকে ধৈর্য ও আশ্বাসের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, শিশুকে খাওয়ানোর আছে নিয়ম—নীতি। আর সেসব গুরুত্বসহকারে মনে রাখতে হবে।
● ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই যত আগেভাগে সম্ভব বুকের দুধ পান শুরু করানো উচিত, অন্ততপক্ষে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে।
জন্ম হতে প্রথম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো এবং ছয় মাস বয়স থেকে ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার যেমন—খিচুড়ি শুরু করা।
● শিশুকে দুই বছর বা ততোধিক সময় পর্যন্ত সে যখন খেতে চাইবে তখন, এই নীতি মেনে বুকের দুধ পান অব্যাহত রাখা।
● শিশুকে তখন বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য খাবার দেওয়া হবে, তা প্রথমে অল্প পরিমাণে, পরে ধীরে ধীরে তার পরিমাণ ও বার বাড়াতে হবে, তবে সঙ্গে মাতৃদুগ্ধ পান চলবে।
● ধীরে ধীরে শিশুর খাবারের ঘনত্ব ও পুষ্টিমান বাড়াতে হবে।
● শিশুকে উৎসাহপূর্বক, ধৈর্য ধরে খাওয়াতে হবে।
● শিশুকে খাওয়ানোর প্রতিটি পদক্ষেপে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। তার খাবার তৈরি, খাওয়ানোর আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান—জলে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে।
● অসুস্থ অবস্থায় শিশুকে বেশি বেশি পানীয় ও তরল খাবার খাওয়াতে হবে। এ সময় তাকে পছন্দনীয় খাবার চালিয়ে যেতে হবে। অসুখের পর শিশুকে দৈনিক অতিরিক্ত এক বা দুই বেলা বেশি আহার দিতে হবে।
● শিশুর এনিমিয়া প্রতিরোধে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষত ছোট শিশু, কিশোরী মেয়ে ও গর্ভবতী—প্রসূতি মেয়েদের। শিশুকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ভিটামিন ও মিনারেল (খনিজ পদার্থ) সরবরাহ করতে হবে।
৬ মাস বয়সের আগে শিশুকে বুকের দুধ ভিন্ন অন্য কিছু খাওয়ানোর বিপদ
পুরো শিশু বয়সে সুষম পুষ্টি জোগান থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষত প্রারম্ভিক শৈশব অর্থাৎ জীবনের প্রথম পাঁচ বছর বয়সে। জীবনের প্রথম দু—তিন বছর বয়সে শিশুর গ্রোথ হয় দ্রুতগতিতে। তা ছাড়া এ বয়সের শিশু তার সঠিক খাবার ও খাওয়ানো নিয়ে পুরোটাই মা—বাবা ও পরিবারের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
শিশুকে ছয় মাস বয়স পূরণের আগে বুকের দুধ ব্যতিরেকে অন্য কিছু খাওয়ানো হলে যেসব কুফল দেখা দেয় :
● অন্য যেকোনো খাবার প্রদান (যেমন—পানি, স্যুপ, ভাতের মাড়, ডালের পানি) তার বুকের দুধ পানকে বাধাগ্রস্ত করে। এগুলো শিশুর ছোট পাকস্থলী আগেভাগে ভরিয়ে রাখে। তার তৃষ্ণা মিটে যায়। সে বুকের দুধ পানে আগ্রহ দেখায় না। ফলে মায়ের বুকের দুধ নিঃসরণ কমে যায়।
● শিশু ওসব খাবারের অ্যালার্জিতে ভোগার ঝুঁকিতে থাকে। শিশুর অন্ত্রনালি এসব অ্যালার্জি ঠেকানোর মতো পরিপক্ব হয়ে ওঠে না। বুকের দুধ বাদে খাবার হজমের যেসব এনজাইম দরকার তা ছয় মাস বয়সের আগে শিশুতে মেলে না।
● ছয় মাস বয়সের আগে শিশুকে বুকের দুধ বাদে অন্য যেকোনো খাবার দেওয়া হলে তা জিভ দিয়ে ঠেলে বের করে দেওয়ার রিফ্লেক্স খুব সক্রিয় থাকে।
● এ বয়সে মাতৃদুগ্ধ ভিন্ন অন্য যেকোনো খাবার প্রদানে শিশু নানা রকম সংক্রামক রোগ ও অপুষ্টিতে ভোগার ঝুঁকিতে থাকে। শিশুর কিডনি এই খাবারের ভার সহ্য করতে পারে না। পরবর্তী জীবনে সে স্থূলকায় হওয়া, উচ্চ রক্তচাপ ও করোনারি হৃদরোগের ঝুঁকিতে পড়ে।
● শিশুর কম স্তন্যপান করার ফল হিসেবে মা শিগগিরই আবার গর্ভবতী হয়ে পড়তে পারে।
৬ মাস বয়সের পর শিশু কী খাবে, কিভাবে খাবে
● বুকের দুধ চলবে। কেননা ছয় থেকে ১২ মাস বয়সে বুকের দুধ তার পুষ্টি চাহিদার অর্ধেক জোগান দেয়, আর ১২ থেকে ২৪ মাস বয়সে পুষ্টি চাহিদার প্রায় এক—তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে।
পরিপূরক খাবারের উপাদান : চটকানো কলা, আটা—ময়দা, ভাত, সুজি, সিদ্ধ ফলমূল (মিষ্টিকুমড়া, গাজর, শাক, আলু) টমেটো এসব উপাদান তার জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও আয়রনের চাহিদা পূরণ করে। শিশুকে মৌসুমি ফলমূল খাওয়ানো যায়। ধীরে ধীরে তার খাবারে ঘি বা তেল মিশিয়ে তার এনার্জির ঘনত্ব বাড়ানো যায়। এর পর তাকে পারিবারিকভাবে গ্রহণযোগ্য মাংস, মাছ এসব দেওয়া যায়।
● একবারে এক উপাদানের বেশি জোগান না দেওয়া ভালো। নতুন কোনো খাবার যুক্ত করতে এক সপ্তাহ সময় নিয়ে করা ভালো, তাতে কোন কোন খাবার সে সহ্য করতে পারে না, তা বোঝা যায়। যে শিশু একবারে বেশি খায় না, তাকে ফল, দুধ ও খাবার দু—তিন ঘণ্টা বিরতিতে উৎসাহপূর্বক পরিবেশন করা যায়, তবে কখনো জোরাজুরি করা যাবে না। এই সময়ে কোনো কোনো শিশু কাপ, চামচ ব্যবহার করতে পারে। তাকে তা করতে দিলে সে এভাবে খাবার নিজের মুখে দিয়ে বেশ আনন্দ পায়।
● সাত মাস বয়সে এসে কোনো কোনো শিশু তদ্রুপ খেতে চায় না। মা—বাবার উচিত এতে প্যানিক না হওয়া, বরং নতুন স্বাদের কোন খাবারে তার আগ্রহ আছে তা যাচাই করে দেখা। শিশুকে খাওয়ানোর সময় যদি কিছু (হয়তো বা আধাচামচ পরিমাণ) খাবার বাকি থেকে যায়, তবে তার খিদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তা খাওয়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত। কখনো তা জোর করে খাওয়াতে নেই। যে বয়সে শিশু গ্লাস হতে নিজে নিজে পানি পান করতে পারে, তাকে তাতে উৎসাহ দিতে হবে।
● শিশুর শাক—সবজি বেশি ফুটানো ভালো নয়, ভাত বা শাক—সবজি সিদ্ধ করলে যে পানি থাকে তা ফেলে না দেওয়া উত্তম। ভালোভাবে পরিষ্কার করা তাজা ফল বাচ্চাকে হাতে ধরে খেতে দিলে সে জিভে স্বাদ পায়। বেশির ভাগ শিশু মাঝারি মাত্রার ঝাল সহ্য করতে পারে এবং তা শরীর উপযোগীও।
শিশু যেসব খাবার খাবে না : যদি পরিবারের কারো কোনো খাবারে অ্যালার্জির ইতিহাস থাকে, যেমন—পিনাট, তবে প্রথম বছরে শিশুকে তা খেতে না দেওয়া ভালো। যেসব খাবার বেশি চিনিযুক্ত বা লবণযুক্ত তা—ও শিশুর খাদ্যতালিকায় না রাখা উত্তম।
অসুখে শিশুকে খাওয়ানো : অসুখে শিশু খেতে চায় না, কিন্তু অসুস্থ শিশু প্রায়ই বুকের দুধ পান চালিয়ে যায়। এ অবস্থায় তাকে প্রচুর তরল ও পুষ্টিকর খাবার অল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে। অসুখ থেকে সেরে উঠলে তাকে এক মাস পর্যন্ত দৈনিক অতিরিক্ত দু—একবার খাবার খাওয়াতে হয়।
● শিশুকে বোতলজাত খাবার, জুস, কোল্ড ড্রিংকস, পুষ্টি ড্রিংকস এসব না খাওয়ানো ভালো। চা, কফি ও বিভিন্ন পানীয় কখনো দেওয়া উচিত হবে না।
● শিশুকে খাওয়ানোর সব থালা, বাটি, চামচ ভালোমতো পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। শিশু যেসব খাবার হাতে ধরে খেতে পারে তা তাকে চিবিয়ে খেতে সুযোগ করে দিতে হবে। গরম পানিতে শিশুর খাবারে বেশি জীবাণু সংক্রমণ ঘটে, ফ্রিজে রাখা হলে জীবাণু সংক্রমণের হার কিছুটা কমে। যদি সম্ভব হয় শিশুর খাবার তৈরির দুই ঘণ্টার মধ্যে খাওয়ানো উচিত। আর যে খাবার ফ্রিজে রাখা হয় তা—ও দু—এক দিনের মধ্যে খাওয়াতে হবে।
● শিশুর পাকস্থলী ছোট, যার ক্ষমতা ৩০ মিলি/কেজির মতো, সুতরাং সাত—আট মাস বয়সী একটি শিশু, যার ওজন আট কেজি, তার পাকস্থলীর ক্ষমতা ২৪০ মিলির সমান, যা একবারে এক বড় কাপ পরিমাণ খাবারের বেশি গ্রহণে সমর্থ থাকে না। মা—বাবার জানা উচিত এক বছরের একটি শিশুর দৈনিক প্রয়োজন এক হাজার কিলোক্যালরি, যা একজন বয়স্ক ব্যক্তির প্রায় অর্ধেকের মতো।
● সুতরাং শিশুর পাকস্থলীল ধারণক্ষমতা, তার জন্য দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরি চাহিদা এসবের ওপর ভিত্তি করে শিশুকে তার বয়স অনুযায়ী খেলনা দিয়ে, প্রশংসা করে ধৈর্য ধরে আনন্দযোগে খাওয়াতে হয়। খাওয়ানো নিয়ে জোরাজুরি করা, ভয় দেখানো, শাস্তি দেওয়া অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তা তার মানসিক বিকাশে সমস্যা সৃষ্টি করে। অনেক মা—বাবা টেলিভিশন দেখিয়ে শিশুকে খাওয়াতে থাকেন, টেলিভিশন সামনে নিয়ে শিশুকে খাওয়ানো সম্পূর্ণ পরিহার করা উচিত।
● শিশুকে সঠিকভাবে খাওয়াতে গেলে বিশেষ করে ইনফ্যান্ট অর্থাৎ এক বছরের কম বয়সী শিশুকে ঠিকমতো খাওয়ানোর জন্য মা ও শিশুর মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকা অপরিহার্য। যার শুরু আনকোরা অভিজ্ঞতা দিয়ে, অথচ শিশু নিজে নিজে খেতে না শেখা পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করতে হয়। শিশুকে খাওয়ানোর কাজ যখন সুস্থ ও তৃপ্তিকর হয়ে ওঠে, তা মা ও শিশুর মনে স্বস্তি আনে।
● শিশুকে খাওয়ানোর সময় এমনভাবে বেছে নিতে হবে, যেন তা মা ও শিশু উভয়ের জন্য সুবিধাজনক ও সুখকর হয়। যেহেতু মায়ের আবেগ—অনুভূতি অতিদ্রুত শিশুর কাছে ধরা দেয়, যেহেতু মায়ের এই ভাবাবেগ শিশুকে সুন্দরভাবে খাওয়ানোর ওপর বিশেষ নিয়ন্ত্রণ রাখে, সেহেতু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, উত্তেজিত, অল্পে ভেঙে পড়া কিংবা মানসিক অস্থিরভাবসম্পন্ন মা আপন শিশুকে খাওয়ানোর কাজে সফল হতে পারেন খুব কম। অন্যদিকে একজন আত্মবিশ্বাসী মা, যিনি স্বামী, বন্ধু, আত্মীয়—পরিজন ও চিকিৎসকের কাছ থেকে সহযোগিতা, সুপরামর্শ ও সুনির্দেশনা লাভ করেন তিনি শিশুকে খাওয়ানোর কাজে পেয়ে যান আনন্দময় এক ছন্দ।
পরামর্শের জন্য যোগাযোগঃ মেডেক্স ডায়াগনস্টিক এন্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার— ৭১৮—২৭৫—৮৯০০
