গানের ভেলায় স্মৃতির খেয়ায়— ত্রিশ সুরের ভুবনে এক অনিঃশেষ পথিক শিল্পী মাহমুদুন্নবী

ড. জীবন বিশ্বাসঃ কিছু কণ্ঠ প্রথম উচ্চারণেই শ্রোতাকে চমকে দেয়, আর কিছু কণ্ঠ নিঃশব্দে হৃদয়ের কাছে এসে বসেÑকথার মতো সহজ, অথচ সুরের মতো গভীর; একসময় টের পাওয়া যায়, সেই কণ্ঠ অজান্তেই আমাদের অনুভবের অন্তর্লোক বদলে দিয়েছে। মাহমুদুন্নবী ছিলেন এই দ্বিতীয় ধারার শিল্পী। তাঁর গায়কীর শক্তি উচ্চকিত কণ্ঠপ্রদর্শনে নয় বরং ভরাট স্বর ও সংযমের এক দুর্লভ মেলবন্ধনে। প্রেম, নিঃসঙ্গতা, কোমলতা, সামাজিক বিষাদ কিংবা জীবনের মৃদু পরাজয়Ñসবকিছুকেই তিনি ধারণ করতে পারতেন আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে। বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে কেবল সফল নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী নয়, বরং অন্যতম বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী কণ্ঠে পরিণত করেছে।

আসা—যাওয়ার অমোঘ পথে

মাহমুদুন্নবী ১৯৩৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বর্ধমানের কেতু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, আর ১৯৯০ সালের ২০ ডিসেম্বর, চুয়ান্নতম জন্মদিন পেরোনোর মাত্র চার দিনের মাথায় থেমে যায় তাঁর জীবন, রয়ে যায় কেবল কণ্ঠের দীর্ঘ অনুরণন। তাঁর শিল্পীজীবনের উন্মেষ ষাটের দশকেÑএমন এক সময়ে, যখন রেডিও, গ্রামোফোন এবং দ্রুত বিকাশমান চলচ্চিত্রশিল্প সম্মিলিতভাবে নির্মাণ করছিল সংগীত—শ্রবণের নতুন ভূগোল। বেতারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর অল্প সময়েই চলচ্চিত্রে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি হয়। বাংলা গানের পাশাপাশি তিনি উর্দু গানও গেয়েছেনÑযা মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে তাঁর পেশাজীবনের প্রথম অধ্যায় গড়ে উঠেছিল এক দ্বিভাষিক চলচ্চিত্র ও বেতার—সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে। 

স্বাতন্ত্রে্য স্মরণীয়

মাহমুদুন্নবীর স্বাতন্ত্র্য শুধু তাঁর কণ্ঠের বর্ণে নয়, বরং কথা ও গানের মধ্যকার তাঁর নির্মিত আশ্চর্য সেতুবন্ধে। তাঁর কথা বলার কণ্ঠ আর গানের কণ্ঠের মধ্যে তেমন কোনো ব্যবধান ছিল না, এই পর্যবেক্ষণটি তাঁর গায়কীর একটি মৌলিক গুণকে স্পষ্ট করে। গাইতে গিয়ে মাহমুদুন্নবী খুব কমই কোনো কৃত্রিম ‘গায়কসুলভ’ ব্যক্তিত্ব ধারণ করতেন। তাঁর বাক্যাংশে কথোপকথনের স্বাভাবিক রেখা থেকে যেত, শব্দ স্পষ্ট থাকত, স্বরবর্ণ প্রসারিত হতো, কিন্তু অলংকারে ভারাক্রান্ত হতো না। আর আবেগ প্রকাশ পেত স্বরের সূক্ষ¥ আলোছায়ায়Ñঅতিরঞ্জিত নাটকীয়তায় নয়। ফলে পর্দায় বৃহৎ কোনো দৃশ্যের অংশ হয়েও তাঁর কণ্ঠ যেন একান্তে একজন মানুষের কাছেই কথা বলত। এই অন্তরঙ্গতাই বাংলা আধুনিক প্রেমের গানে তাঁকে অসামান্য করে তুলেছিল। ‘তুমি যে আমার কবিতা’, ‘তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো আমার অজান্তে’, ‘বড় একা একা লাগে তুমি পাশে নেই বলে’, ‘প্রেমের নাম বেদনা’Ñএই গানগুলো কাছাকাছি অনুভূতির অন্তর্জগতে অবস্থান করলেও মাহমুদুন্নবীর কণ্ঠে তারা একই আবেগের পুনরাবৃত্তি হয়ে ওঠে না। কোথাও প্রেমের স্বীকৃতি, কোথাও আকুলতা, কোথাও অনুপস্থিতির শূন্যতা, আবার কোথাও নীরব মেনে নেওয়া। প্রেম, অভাব, নিঃসঙ্গতা ও বেদনাকে তিনি স্বরের ক্ষুদ্রতম ভঙ্গিতেও আলাদা করে চিনিয়ে দিতে পারতেন। আবেগের তীব্রতম মুহূর্তেও তাঁর কণ্ঠে এক ধরনের অন্তর্গত স্থিরতা থেকে যেত। আর ঠিক সেই স্থিরতাই বেদনাকে গভীর করে তুলত।

শিল্পীজীবনের অভিনব ব্যাপ্তি

ষাটের দশক এবং স্বাধীনতা—উত্তর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গড়ে ওঠার দশকগুলোর সঙ্গে তাঁর শিল্পীজীবন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কাগজের নৌকা, নীল আকাশের নিচে, আবির্ভাব, দর্পচূর্ণ, স্বরলিপি, নাচের পুতুল, আলো তুমি আলেয়া, মধুমিতা এবং দি রেইনসহ বহু চলচ্চিত্রে তিনি নেপথ্যকণ্ঠ দিয়েছেন। সত্য সাহা, সুবল দাস, রবিন ঘোষ, আনোয়ার পারভেজ প্রমুখ সুরকার এবং গাজী মাজহারুল আনোয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ গীতিকারের সঙ্গে তাঁর কাজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রসংগীতের এক নির্মাণপর্বের সাক্ষ্য বহন করে। তখন একটি সফল গান ছিল বহু সৃষ্টিশীল মানুষের সম্মিলিত রচনাÑকথা, সুর, দৃশ্য, সংগীতায়োজন ও কণ্ঠব্যাখ্যা মিলেই তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ আবেগমুহূর্তে পরিণত করতে হতো। এই সহযোগিতার উজ্জ্বল উদাহরণ ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’Ñনাচের পুতুল চলচ্চিত্রের গান; কে. জি. মোস্তফার কথায় এবং রবিন ঘোষের সুরে। আবার নীল আকাশের নিচে ছবির ‘প্রেমের নাম বেদনা’—য় সত্য সাহার সুরের ভেতর দিয়ে মাহমুদুন্নবীর সংযত বিষাদ এক অন্য মাত্রা লাভ করে। দর্পচূর্ণ—এর ‘তুমি যে আমার কবিতা’, সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠে, চলচ্চিত্রের দৃশ্যগত সীমানা অতিক্রম করে স্বতন্ত্রভাবেই বাঙালি শ্রোতার স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। 

স্বীকৃতি

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দিক থেকে তাঁর শিল্পীজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিখর দি রেইন (১৯৭৬) চলচ্চিত্রের ‘আমি তো আজ ভুলে গেছি সবই’। এই গানের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নেপথ্যকণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ঐতিহাসিকভাবে এই স্বীকৃতির বিশেষ তাৎপর্য আছেÑকারণ সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ যখন নিজস্ব চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে সুসংহত করছিল, তখন তাঁর কণ্ঠ সেই নতুন রাষ্ট্রের জনপ্রিয় সংগীতভাষা নির্মাণের অন্যতম অংশ হয়ে উঠেছিল। তবু পুরস্কার তাঁর মাহাত্ম্যের আংশিক পরিমাপ মাত্র। তাঁর বড় সাফল্যÑআজও কয়েকটি মাত্র স্বর শুনে শ্রোতা একটি সম্পূর্ণ যুগের আবেগ চিনে ফেলতে পারে। 

সংগীতে বহুমুখী সুরের অনুরণন

মাহমুদুন্নবীর গানের পৃথিবী শুধু রোমান্টিক নেপথ্যসংগীতে সীমিত ছিল না। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও সত্য সাহার সুরে ‘সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম’ অর্থনির্ভর সমাজের বৈষম্য ও নৈতিক বিকৃতির দিকে মুখ ফেরায়। এই গান মনে করিয়ে দেয়Ñমাহমুদুন্নবীকে শুধু প্রেমের গায়ক হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনালোচিত থেকে যায়। যে সহৃদয়, কোমল স্বরে তিনি প্রিয় মানুষকে সম্বোধন করতেন, সেই কণ্ঠেই অন্যায় পৃথিবীকেও প্রশ্ন করতে পারতেন। তাঁর প্রতিবাদের জন্য উচ্চকিত ঘোষণা দরকার হতো না; অনেক সময় সহমর্মিতাই হয়ে উঠত প্রতিবাদের ভাষা। 

মাহমুদুন্নবীর গাওয়া কয়েকটি স্মরণীয় গান

১। তুমি যে আমার কবিতা, ২। তুমি কখন এসে দাঁড়িয়ে আছো, ৩। আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে, ৪। আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন, ৫। ওগো মোর মধুমিতা, ৬। সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম, ৭। খোলা জানালার পাশে একা বসে আছি, ৮। সুরের ভুবনে আমি আজও পথচারী, ৯। গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে, ১০। বড় একা একা লাগে তুমি পাশে নেই বলে, ১১। ও মেয়ের নাম দেব কী, ১২। এই স্বপ্নঘেরা দিন রাখব ধরে, ১৩। প্রেমের নাম বেদনা, ১৪। আমি ছন্দহারা এক নদীর মতো, ১৫। এক অন্তবিহীন স্বপ্ন ছিল, ১৬। আমি তো আজ ভুলে গেছি সবই, ১৭। মনে তো পড়ে না কোনোদিন, ১৮। কে যেন আজ আমার চোখে, ১৯। গীতিময় এই দিন সেই দিন চিরদিন রবে কি, ২০। আমি যে তোমার ওগো আপন ভেবে, ২১। ওগো রূপসী তোমারে ভালোবেসেছি, ২২। যারে আমি মন দিয়েছি, ২৩। কে আমায় আলোর ঠিকানা বলে দেবে, ২৪। নেই অভিযোগ কারো কাছে, ২৫। দু’চোখ আমার এ কোন আলোয়।

পরিশেষ

মাহমুদুন্নবীর কণ্ঠ ছিল বিস্তৃত ও ভরাট, অথচ কখনো উচ্চকিত নয়। রূপালি পর্দার জন্য নিবেদিত সেই স্বরেও রয়ে যেত আপন কথোপকথনের কোমলতাÑযেন গান নয়, হৃদয়ের খুব কাছ থেকে বলা কোনো নিবিড় কথা। প্রেমের গানকে আপন করে নিয়েছে, অথচ সামাজিক বেদনাও বহন করেছে; নিজের সময়ের গভীরে প্রোথিত থেকেও নিছক ‘পুরনো দিনের গান’ হয়ে যায়নি। তাই তাঁর গানগুলো কেবল কোনো সোনালি যুগের স্মারক নয়Ñআজও তারা অনুভবের জীবন্ত ভাষা। পুরনো কোনো রেকর্ডে কিংবা নতুন কোনো শিল্পীর কণ্ঠে স্মরণÑপরিবেশনায় যখন আবার ভেসে আসে ‘সুরের ভুবনে আমি আজও পথচারী’, তখন গানটির উপমা যেন তাঁর জীবনের সত্য হয়ে ওঠে। মাহমুদুন্নবী এই নশ্বর পৃথিবীতে আজ আর নেই কিন্তু সুরের ভুবনের তার পথচলা থামেনি। তাঁর কণ্ঠে আবেগ কখনো উচ্চস্বরে নিজেকে ঘোষণা করেনি; সংযত সুর আর নিভৃত বিষাদের ভিতর দিয়েই তা পৌঁছেছে শ্রোতার অন্তরেÑআর সেই নীরবতাই হয়ে উঠেছে তার গভীরতম অনুরণন।

Related Posts