শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের মন্টু মামা || মিথুন আহমেদ নিউইয়র্ক
সেই শিশুবেলা সাদাকালো টেলিভিশনের টেলপে তাঁর নাম দেখতাম। একটু জ্ঞান হবার পর জেনেছি ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের অসাধারণ নির্মাতা হিসেবে। এরপর বহুবার বহুভাবে তাকে দেখেছি, তাকে পেয়েছি। পেয়েছি তাঁর একান্ত সাহচর্য। পেয়েছি শিল্পচর্চার ক্লাসে—শ্রেণীকক্ষের শিক্ষক হিসেবে। সবার আড়ালে বকা খেয়েছি রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে গিয়ে। সেই বকা খেয়ে কাঁদতে পারাটা যে কতটা সুমধুর মূল্যবান ছিলো তা আজো এত যুগ পর মনে হলে কী এক অদ্ভুত ঐশ্বর্যবান মনে হয় নিজেকে।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন শিল্পের শতধারায় বিস্তৃত এক গুণীপ্রজ। বিচ্ছিন্ন স্মৃতিচারণ ছাড়া তাঁর সৃষ্টিশীল কাজের সাথে আমার দীর্ঘমেয়াদী সরাসরি সংশ্লিষ্টতা একেবারেই ক্ষীণ। তবু তাঁর স্নেহ পেয়েছি অকারণে। মধ্য আশির দশকের বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক ছিলেন তারপর এফ.ডি.সি. এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক হন। হয়তো কোনো বিশেষ কারণ ছাড়াই তাঁর কক্ষে ঢোকার অনুমতি পেয়েছি। এও ছিলো আমার জন্য অনেক বাড়াবাড়ি রকমের প্রাপ্তি।
শিশুদের মঞ্চ নাটকের দলে অভিনয় আর বিভিন্ন পর্যায়ে বছরের পর বছর স্কুল প্রতিযোগিতাগুলোতে আবৃত্তি, অভিনয়, গল্প বলায় আমরা কেউ কেউ ছিলাম একই চেনামুখ। বিজ্ঞানী আব্দুল্লাহ আল মুতি সরফুদ্দিন, বেগম মমতাজ হোসেন এবং মুস্তাফা মনোয়ার প্রায়ই আমাদের বিচারক, প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি হতেন। আমাদের চেহারা নাম তাদের প্রায় মুখস্থের তমালিকায় ছিলো। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময়ে আন্তরিকতা ও বিশেষ স্নেহ অনুভব করেছি বারংবার।
খুব ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে বহুবার বেড়াতে গেছি মায়ের কাকা বাড়ি—মা’র কাকিমা অর্থাৎ লুৎফুর রহমান শিকদারের স্ত্রী ছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সহোদরা এবং অভিনেত্রী নিমা রহমানের মামা। সেখানে দু’একবার খুব শিশুবেলায় শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে দেখেছি।
এরপর একটু একটু করে যখনই বিটিভির ছোটদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে রামপুরা টিভি ভবনে গেছি তখন থেকেই আমাদের কিশোর বয়সী অনেকেই শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে ‘মন্টু মামা’ নামে ডেকেছি। অনেক পরে এসে প্রযোজক ফখরুল আবেদীন দুলালের কাছে জানতে পেরেছি অভিনেত্রী নিমা রহমানের কাছ থেকেই ‘মন্টু মামা’ সম্বোধনটির সূত্রপাত।
যতদূর মনে আছে সম্ভবত নব্বই পরবর্তী সময়ে মন্টু মামা আর সরকারি চাকুরিতে বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, তাই তাঁর সাথে ইচ্ছে করলে সহজেই দেখা করবার সুযোগটা কমে আসতে থাকে। ধানমন্ডির তিন নাম্বার রোডে মন্টু মামা পাপেটের একটি স্টুডিও করেছিলেন। ধানমন্ডি এই সড়কের একটু অদূরেই শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুর ‘গ্যালারি টোন’, সেখানে সকাল সন্ধ্যা আমার নিত্য আনাগোনা। এই গ্যালারির উপর তলার বাসিন্দা আমার সেকালের বাহুলগ্না বন্ধু জেসরিনা হায়দার। জেসরিনা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খ্যাতিমান বিতর্কিত। একদিন জেসরিনার কাছে খবর পাই আমাকে মন্টু মামার কাছে যেতে হবে পাপেটের ভয়েস ওভারের কাজে। দু’একবার গিয়ে নিয়মিত সময় দেয়ার অভাবে পাপেটের কাজের সাথে আমার যুক্ত হওয়া আর হয়নি। মধ্য আশির দশক থেকে মধ্য নব্বই পুরোটাই ছিল দুরন্ত দস্যিপনাময় এক সাংস্কৃতিক উন্মাদনার কাল। আবৃত্তির দল, মঞ্চ নাটক, রামপুরা টেলিভিশনে আসা—যাওয়া, বাংলাদেশ বেতারের কথিকা লেখা আর পাঠ তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, স্বৈরাচার বিরোধী সমাবেশ এত কিছু থেকে সময় বের করার সময় কোথা! মন্টু মামা খুবই যত্ন করে নিখুঁতভাবে খুবই ধীরস্থির ভাবে সময় নিয়ে কাজ করতেন। মন্টু মামার সৃষ্টিশীল নির্মাণের সাথে তাঁর পরিকল্পনা বা নির্দেশনা সরাসরি সামান্যতম কাজ করতে না পারার আক্ষেপটি আমার সারা জীবন রয়ে গেছে।
কখনো কখনো দুপুর হতে না হতেই আমি আর জেসরিনা ঘন্টার পর ঘন্টা মুখোমুখি বসিবার মত গুমোট অভিমানের নীরবতা ভেঙে নিরিবিলি ‘গ্যালারি টোন’ থেকে পৌঁছে গেছি মন্টু মামার পাপেট ঘরে পুতুলদের সংসারে। জীবনের বহু কারণহীন বিনা কারণগুলো আর সেদিনের সব অহেতুক সব কিছুই আজ এতকাল পরে যেন কত বড় কিছু হয়ে ভেসে ওঠে মনে।
‘নীল! নীল! সবুজের ছোঁয়া কিনা, তা বুঝি না, ফিকে গাঢ় হরেক রকম কম—বেশি নীল!’
কবি প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ‘মিলনসাগর’ কবিটাতাটি যা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গানও করেছিলেন। সেই কথাগুলো দিয়ে মন্টু মামা প্রকৃতিকে শেখাতেন আর শেখাতেন রংএর বহুমাত্রিকতা ও তার ব্যবহার। এতকাল পরেও সেই উদাহরণটি আজো মনের গভীরে গাঁথা রয়ে গেছে। তিনি খুব সহজ করে নন্দনতত্ত্ব বোঝাতেন।
রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে দূরত্ব আর অগমতার মধ্যে পার্থক্য বোঝাতেন।
তুমি থাকো সিন্ধু পারে ওগো বিদেশিনী.../
ভুবন ভ্রমিয়া শেষে আমি এসেছি নতুন দেশে.../
আমি আকাশে পাতিয়া কান শুনেছি শুনেছি তোমারি গান.../
কী অসাধারণ তার বর্ণনা আর কী অসাধারণ তার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের ভঙ্গি। দূরত্বকে পরিমাপ করবার উপলব্ধি আর সেই বোধকে তৈরি করবার ক্ষমতা অর্জনের অনুশীলন কৌশল! মন্টু মামা একই সাথে অনেক কিছু। অনেক কিছু করতে পারতেন তিনি। ছবি আঁকা ছাড়াও অসাধারণ গান গাইতে পারতেন তিনি। কারুবিদ্যা, ভাস্কর্য, ডিজাইন।
আমরা কে না জানি জাতীয় শহীদ মিনারের পেছনের সূর্যটি তাঁরই ডিজাইন করা। তিনি ১৯৮৫ সালে ঢাকায় আয়োজিত দ্বিতীয় সাফ গেমসের স্ত্রী হরিণ শাবকের আদলে তৈরি করা ‘মিশুক’ মাস্কটটি নির্মাণ করেছিলেন। মন্টু মামার কাছেই শুনেছি ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ঢাকায় এলে তিনি ভেলভেট কাপড়ের পরিবর্তে বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাটের বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে শিল্পনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র।
মূলত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর পরামর্শে তিনি পদার্থবিজ্ঞান অধ্যয়ন ছেড়ে কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। এবং তিনি সেখানে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে গোল্ড মেডেল পেয়ে স্নাতক শেষ করেন। এরপর জয়নুল আবেদীনের পরামর্শে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। তার সরাসরি শ্রেণিকক্ষের ছাত্র ছিলেন রনবী নামে খ্যাতিমান শিল্পী রফিকুন নবী এবং আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য শিল্পী মনিরুল ইসলাম সহ আরো অনেক বিদগ্ধ চিত্রকর। বেশিদিন ঢাকা কলেজের শিক্ষকতার সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন না। তিনি ছবি আঁকাকে, শিল্পচর্চাকে শুধু ড্রয়িং রুমে আটকে রাখতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন শিল্পচর্চার এই শাখাটিকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। এবং চারু ও কারুকলা চর্চার বহুমাত্রিক আবেদনকে গণমাধ্যম ও টেলিভিশনের সাথে সংযুক্ত করতে। তাই ১৯৬৪ সালে যখন ঢাকার ডিআইটি ভবনে প্রথম টেলিভিশন স্টেশন প্রতিষ্ঠার সূচনা হয় তখন থেকেই শিল্পী মোস্তাফা মনোয়ার টেলিভিশনে যোগ দেন।
মন্টু মামা কোনো এক গল্পে অথবা শিল্পবিদ্যার কোনো এক শ্রেণীকক্ষে আমাদের বলেছিলেন তৎকালীন এনালগ টিভি ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণ প্রসঙ্গে। তিনি উত্তল লেন্স ও অবতল লেন্স আর ভাঙ্গা স্ফটিক টুকরো ব্যবহার করে কী করে অভূতপূর্ব বিশেষ বিশেষ এফেক্ট তৈরি করতেন সেসব কথা।
২০০৮ এর জুলাই মাসের মাঝামাঝি কৌশিক আহমেদের ফোন—‘আপনার মামা আপনাকে খোঁজ করছেন’ আমি কিছুক্ষণ চুপ। আমি বুঝে উঠতে সময় নিচ্ছি।
আমাকে প্রশ্ন করবার সুযোগ না দিয়ে কৌশিক ভাই কথা বলে চলেছেন।
—‘তিনি এখন কানেক্টিকাটে আছেন। আপনাকে যোগাযোগ করতে বলেছেন।’
—‘মন্টু ভাই থাকবেন কিছুদিন’।
আমি তখন কর্মসূত্রে এমিরেটস এয়ারলাইন্সে জে.এফ.কে. স্টেশনে। ভেবেছি বিমান টিকেটের তারিখ পরিবর্তন বিষয়ে কারো কথা বলতে চাইছেন। তখন হামেশা এরকম বার্তাতেই অভ্যস্ত। তখন দুপুরের দিক। কিছুক্ষণ পরই দুবাই থেকে থ্রি এইটি এয়ারক্রাফটের ওয়ান ও ওয়ান ফ্লাইটি ল্যান্ড করবে। আমাকে ফ্লাইট মিট করতে হবে জেড ব্রীজ অপারেটের জন্য। আমি তাড়াহুড়ো করে র্যাম্প দিয়ে দৌড়াচ্ছি। চারিদিকে রানওয়ের এয়ারক্রাফট আর ওয়াকিটকির শব্দ। কিছুই আর শোনা যাচ্ছে না। আমার হাতে তখনকার দিনের মটোরোলা ফ্লিপ বাটন ফোন। সিগনালটা ড্রপ করলো...
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে কৌশিক ভাইয়ের সাথে টেলিফোনে কথা হতেই পরিষ্কার হলো বিষয়টি। মামা মানে ‘মন্টু মামা’ অর্থাৎ মুস্তাফা মনোয়ার। কী যে ভীষণ এক ভালোলাগার আবেশে পুলকিত বোধ করেছি তা বোঝানোর উপায় নেই। তিনি অনেকের কাছে আমার পরিচয় বলতেন ‘মিথুন আমার এক ভাগনে’।
পরদিন আশরাফুল হাসান বুলবুল আর মাহফুজা আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে ছুটলাম মন্টু মামাকে নিউইয়র্কে আনবার জন্য। এরপর কতদিন সারাবেলা এদিক ওদিক ছুটোছুটি। নিউইয়র্কের ডাউনটাউনে তখন ‘ব্লিক’ নামে বহুতল বিশিষ্ট দুটো বিশাল আকারের আর্ট সাপ্লাই এর দোকান ছিল। মন্টু মামার সাথে সারা দুপুর বিকেল। মাদাম তুসো মিউজিয়াম, গঙগঅ আর্ট গ্যালারিতে কত কী যে স্মৃতিময় ঘন্টার পর ঘন্টা দিনের পর দিন।
এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন ফোন পাই ঠিকানার সাইদুর রব এবং সাংবাদিক মহম্মদ ফজলুর রহমানের কাছ থেকে—মন্টু মামা আর আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মন্টু মামাকে নিয়ে যেতে হবে ইস্ট রিভারের পাড়ে। বিকেলের পড়ন্ত আলোর নীচে আমরা নদীর পাড়ে বসে আছি। ঘটনাটা কী ঘটছে আর কী ঘটবে আমরা কেউ তেমন কিছু জানি না। সেই একই সময়ে বঙ্গ সম্মেলন উপলক্ষে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ চিত্রকরেরা এসেছিলেন লস এঞ্জেলসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম বিশাল দুই মাইক্রোবাস থেকে নামছেন বারো কী চৌদ্দ জন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী। সাথে বাংলাদেশের শিল্পী মনিরুল ইসলামও আছেন। দূর থেকে শিল্পী মনিরুল ইসলাম শিল্পী মনোয়ারকে দেখে স্যার স্যার বলে পরম আবেগে ও শ্রদ্ধায় গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরলেন। কিছুক্ষণ পর আরেক অভিভূত দৃশ্য—এই শিল্পী দলে ছিলেন ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রকর প্রকাশ কর্মকার। কলকাতা আর্ট কলেজে তিনি ছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার এর সহপাঠী। বহুদিন পর প্রিয় সহপাঠীকে দেখার পর দুজনই বাষ্পরুদ্ধ হয়েছিলেন বেশ কিছুক্ষণ। আমরা গভীর রাত পর্যন্ত ইস্ট রিভারের ধারে এক চমৎকার বিলাসবহুল রেস্টুরেন্টে ছবি আঁকা, খাওয়া দাওয়া, আনন্দ বেদনার গান গাইতে গাইতে জীবনের এক শ্রেষ্ঠ সময় কাটিয়ে দিলাম। শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার সম্পর্কে শিল্পী প্রকাশ কর্মকারের কাছে কত কী যে জানলাম আর ইতিহাসের চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে রইলাম তা আজ পুনর্বার মনে হতেই শিহরণ বোধ হচ্ছে। শিল্পী প্রকাশ কর্মকারের কাছে শুনলাম মন্টু মামা ছিলেন জলরঙের মাস্টার। তাঁর কলকাতা আর্ট কলেজের গল্প ছেলেবেলাকার কথা, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের সেই গল্পগুলো। এরকম আরো কত কী যে! মন্টু মামা নিজের কথা কিছুই বললেন না শুধু শুনে যাওয়া ছাড়া। আমাদের মন্টু মামা ছিলেন এ রকমই।
নিউইয়র্ক থাকতেই একদিন মন্টু মামা এক পরিকল্পনা করলেন রবীন্দ্রনাথের গান কবিতা আর কথাকে লাইভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেখে তিনি জলরঙে ছবি আঁকবেন। গান গাইবেন শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। আর আমাকে থাকতে হবে কবিতা ও কথনে। মন্টু মামা অনুষ্ঠানের নাম ঠিক করলেন ‘জলছবিতে কাব্য কথন’। সে ছিলো আমার জন্য এক অনন্যসাধারণ বিচিত্র অভিজ্ঞতা। এবং এটাই ছিল শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সাথে আমার সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে প্রথম একমাত্র একটি কাজ। সন্ধ্যার এক শান্ত উপহার ‘জলছবিতে কাব্যকথন’ শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার দীর্ঘক্ষণ একাধারে এঁকে চলেছেন ছবি।
মন্টু মামা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার কাছে ব্যারাকপুরের শরণার্থী শিবিরে প্রথম পাপেট প্রদর্শনী করেছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুস্তাফা মনোয়ার চাকরি করতেন পাকিস্তান টেলিভিশনে। যুদ্ধ শুরু হতেই সব ছেড়ে চলে গেলেন কলকাতায়। শরণার্থী শিবিরে সেই সময় পাপেটের খেলার মধ্যে দিয়ে তিনি দেখাতেন— ইয়াহিয়া খানকে মারছে কৃষক। আর জিজ্ঞেস করছে— ‘আর কেউ কি মারতে চাও?’ তখন সবাই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে এগিয়ে আসছে অত্যাচারী ইয়াহিয়াকে মারতে।
এভাবে পাপেটের কথা বলা দেখে দেশ ছেড়ে আসা দুঃখী মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটে। এরপর থেকে তার পাপেট শো ছিল শরণার্থী শিবিরের অসহায় মানুষগুলোর কাছে আনন্দের উৎস। তিনি যেখানে যেতেন শিশুরা তাকে ঘিরে ধরত ‘পুতুলওয়ালা’ ‘পুতুলওয়ালা’ বলে।
মুস্তাফা মনোয়ারের অনেক গৌরবময় পরিচয়ের মধ্যে একটি হল তিনি একাত্তরের রণাঙ্গনে পাপেট শো। মুক্তির গানের চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেভিনের ধারণ করা মুক্তিযুদ্ধের ফুটেজেও অম্লান হয়ে আছে একাত্তরের পুতুলওয়ালা মুস্তাফা মনোয়ারের এই কীর্তি।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ভারতে অবস্থানকালীন বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ প্রবাসী সরকারের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করেন।
