যা দেখেছি যা বুঝেছি—২১ || মনিরুল ইসলাম, সাবেক রাষ্ট্রদূত
নিজের খোঁজে
তৃপ্তি/ ঈড়হঃবহঃ: ভোগের নির্যাস, উচ্চতর স্তর, যেখানে অনুতাপ—অনুযোগ নেই। যেমন: পাখিটা গাইছে।
বিমগ্ন/ ঊপংঃধংু/ঞৎধহপব: সৌন্দর্যপূর্ণ আনন্দযজ্ঞে আত্মমগ্নতায় ‘ভাসমান’ (ঋষড়ি) থাকা অবস্থাকে বলে বিমগ্ন, যা সুফি মতবাদের মূলমন্ত্র। জগৎ সংসারের বাইরে গিয়ে একটিমাত্র বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিপাত ও মনোযোগ নিবদ্ধ করা হয় বলে তখন অখণ্ড একাগ্রতা, নিরবচ্ছিন্ন প্রশান্তি, অনন্তে অবগাহন এবং নিজেকে হারিয়ে নিজেকে পাওয়ার অনুভূতি জাগ্রত হয়। শিল্পী যখন স্বর ও সুরে, নর্তক যখন দেহভঙ্গিমার প্রকাশে, কবি যখন শব্দে—ছন্দে পরিপূর্ণভাবে বিমোহিত, সাধক যখন জ্ঞানে—ধ্যানে ঈশ^রে সমর্পিত, তখন তাদের চিত্তে বিমগ্নের ধারা প্রবহমান হয়। এটা দুঃখবোধ থেকে নয়, সুখবোধ থেকে সৃষ্ট।
প্রশান্তি/ ইষরংং: নীরব শান্ত পূর্ণসুখ উপভোগকালে চিত্তে যে অনন্য স্থায়ী অনুভূতি বিরাজ করে, তা—ই হল প্রশান্তি। যেমন: পাখিটা আমারই মতো। বাইরের জাগতিক কিছু থেকে আসে শান্তি, ভিতরের অন্তর থেকে আসে প্রশান্তি। এজন্য দরকার শুভচিন্তা, শুভভাব, শুভকর্ম। লাও—জি বলেছেন, মড় রিঃয হধঃঁৎব, কারণ মানুষ প্রকৃতির অংশ বলে প্রকৃতির সাথে থাকবে, প্রকৃতির নিয়মে চলবে। কামনা অহং বর্জন করলে দুঃখ দূরীভূত হবে। খ্যাতি ও প্রশান্তি একসাথে বসবাস করতে পারে না।
মৃত্যু/ উবধঃয: জীবন বিকাশের যে কোনো সময়ে বা সর্বশেষ স্তরে এসে যখন দেহের সকল জৈবিক ক্রিয়া (নরড়ষড়মরপধষ ভঁহপঃরড়হং) বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের অনিবার্য ফলাফল বা অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল মৃত্যু।
নির্বাণ/ ঊসধহপরঢ়ধঃরড়হ: সকল আসক্তি থেকে মুক্তিলাভ করে পরমে অনন্তে একীভূত হওয়ার অবস্থাকে বলে নির্বাণ, যা বৌদ্ধ মতবাদের নির্যাস। ক্রমোন্নতির পর্যায়ে আসে মোক্ষ—স্বস্তিÑতৃপ্তিÑশান্তি—প্রশান্তি—নির্বাণপ্রাপ্তি।
উপর্যুক্ত মানসিক প্রক্রিয়াগুলোর পরিমাপ করা যায় শ্রেণিগতভাবে, সংখ্যাগতভাবে নয়। মানুষ উত্তাধিকারসূত্রে তার পূর্বপুরুষদের জ্ঞানভাণ্ডারও প্রাপ্ত হয় কিন্তু একক একজন ব্যক্তিমানুষের এই যে অনন্ত অসীম প্রাণশক্তি চিন্তাশক্তি, বোধ বুদ্ধি জ্ঞান প্রজ্ঞাÑএসব কোথায় যাবে, কেন শেষ হয়ে যাবে, এই ভাবনা আমাকে ব্যাকুল করে।
জীবন/ খরভব কী জিনিস? প্রতিদিন আমি যা করি ভালমন্দ, যা আসে সুখ—দুঃখ, তার সমষ্টিই জীবন। সেসব যদি সুখপ্রদ হয়, তাহলেই জীবন সার্থকভাবে সমাপ্ত হবে। সুতরাং জীবনের লক্ষ্য হবে প্রতিদিন ভাল থাকা, সুখী হওয়া। এই জীবন সুন্দর হতে হলে চাই কর্ম, অব্যাহত আমৃত্যু কর্ম। চাই ত্যাগ, সাধনা ও সাফল্যÑতবেই জীবন সার্থক। নিজেকে বিকাশ করতে, আপন শক্তির মহিমা দেখাতে নীরবে নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকলে চলবে না, জগতের তালে পা চালাতে হবে।
জীবন হল গন্তব্যবিহীন পথচলা, পথের চারপাশে যখন যা পাই দেখে যাই। জীবনের অজানা অচেনা পথচলায়ই মানুষের আগ্রহ বেশি। বন্ধনহীন সীমাহীন পথ চলার সময় আমরা যেমন বলি: দেখি না আরেকটু এগিয়ে, কী আছে, আর কী আছে দেখার বাকি। জীবনও সেরকম অনিশ্চিত অনির্ধারিত পথে এগিয়ে যাওয়াÑআরেকদিন বেঁচে থেকে আরেকটু দেখি কী আছে আগামীকালের সূচিতে, যদি পাই কিছু নূতন অর্থের নূতন স্বাদ, নূতন সম্ভাবনার নূতন গন্তব্য। মাঝেমধ্যে পা ফসকে যাক, তাতে আতঙ্কিত হবার দরকার নেই। খারাপ জিনিস জীবনে ঘটবেই, বসে না পড়ে দাঁড়িয়ে থেকে সমানে সামনে হাঁটতে হবে। আর নিজের খঁুজে বের হয়ে শুধু নিজের দিকে তাকালে নিজেকে পাওয়া যাবে না, অন্যের মধ্যে নিজেকে খঁুজতে হবে, কারণ অন্যের মধ্যেই আমি প্রতিফলিত হই। অন্যকে দেখে, অন্যকে বুঝে নিজেকে চিনতে পারি।
জীবনকে বোঝার জন্য জীবনের সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে। ভয় বিড়ম্বনায় এড়িয়ে গেলে জীবনের স্বরূপ অধরা থেকে যাবে। নিজের কাছে নিজের সত্যকে তুলে ধরতে হবে। আমি কি বন্দি, সংসার সমাজ রাষ্ট্র কি বিধি—বিধান দিয়ে আমাকে বন্দি করে রেখেছে? না, অন্যেরা বন্দি করেনি, আমি নিজেই আমাকে বন্দি করে রেখেছি স্বাধীনতার ভয়ে। মানুষ স্বাধীন হতে ভয় পায়, সে কারো না কারো ভালবাসার অনুশাসনে থাকা নিরাপদ বোধ করে। তাই একটা মানুষের জীবনব্যাপী ভালোবাসা লাগে, জন্ম থেকে বার্ধক্য অবধি সে ভালবাসায় বেঁচে থাকতে চায়।
একটি সুস্থ শান্ত জীবনযাপনের জন্য দরকার প্রতিমুহূর্তের জগতকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করা, বর্তমানকে উদযাপন করা, নিজেকে বিশ^াস করা, ইতিবাচক দায়িত্ব নেয়া, বিশ^জীবনপ্রবাহে নিজেকে নিঃশর্ত যুক্ত করা। জীবন হল অর্থহীন ঘটনা ও অভিজ্ঞতার সমষ্টি, ক্রমাগত সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়া। জীবনের অর্থ খঁুজতে গেলে জীবন হারিয়ে যায়। জীবনের উদ্দেশ্য নিজেকেই ঠিক করতে হবে, করণীয় এবং পরিহার্য।
আমাদের মন মস্তিষ্ক ও ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞানের বাইরে কী আছে তা জানি না। আমার অন্তর্লোকে বা ভবিতব্যে কী আছে জানা অসম্ভব কিন্তু আমি এখন কী, তা জানা সম্ভব। আমি যা, তা—ই আমার পরিচয়Ñসারা জীবন যা করেছি, তারই নাম জীবন। সুতরাং জীবন স্থির নয়, একটি চলমান প্রক্রিয়া, প্রতিমুহূর্তে পরিবর্তনশীল প্রবাহমান ধারা। নিজেকে পুরোপুরি জানা যেমন সম্ভব নয়, আবার পূর্ণভাবে না—জানাই মঙ্গলজনক, তাতে অজ্ঞাত অনাগত জীবনের প্রতি আগ্রহ অব্যাহত থাকে।
