আপনি এখনো বেঁচে আছেন? মনজুর কাদের
এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা একটা রেডিও কিনতে গেলেন।
—ঠাম্মা, এই রেডিওটা নিতে পারেন। এটা বেস্ট।
—তা কয়দিন টিকবে তো?
— কী যে বলেন! একদম লাইফ লং গ্যারান্টি!
— দেখো বাবা, নাহলে কিন্তু টাকা ফেরত দিতে হবে।
দুবছর পর বৃদ্ধা দোকানে এসে অভিযোগ করলেন,
— বললে তো লাইফ লং গ্যারান্টি, দুবছরও তো টিকলো না হে!
দোকানী চোখ গোল করে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন, ও ঠাম্মা, আপনি এখনো বেঁচে আছেন?
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতিকে আশার বাণী শুনিয়ে বলেছেন, এখন থেকে চতুর্থ বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি নিশ্চয়ই ঠাম্মার রেডিওর গল্পটা কারো কাছে শুনে থাকতে পারেন। নাহলে পরিস্থিতি আঁচ করে তিনি এমন ভবিষ্যত বাণী কীভাবে করলেন!
তিনি বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী মানুষ। বহু আগে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি থাকাকালে তিনি এমন কিছু কিছু আশার বাণী শুনিয়ে ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন।
সেসব হয়তো অনেকেরই মনে নেই। কিন্তু একেবারে কারোই মনে নেই তা কী করে হতে পারে?
ইতর প্রাণির স্মৃতিশক্তি খুবই নগণ্য বা ক্ষণস্থায়ী। কোনো কোনো প্রাণির সে অর্থে কোনো স্মৃতিশক্তিই থাকে না। মানুষ তো আর ইতর প্রাণি নয়। মানুষের স্মৃতিশক্তি আছে। এটা আছে বলেই এদের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব বা শত্রুতা তৈরি হয়।
তবে একথাও ঠিক, বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষই আসলে সহজ সরল ও স্বল্প স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন। এরা খুব দ্রুতই সব ভুলে যায়। ভুলে যায় না বলে বরং বলা ভালো, মনে রাখার তেমন প্রয়োজন বোধ করে না।
আমীর খসরু বুদ্ধিমান ও কৌশলী রাজনীতিক। তিনি দেশের মানুষের মেজাজ ভালোই বোঝেন। তিনি তিনটি কারণে চতুর্থ বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলে ভবিষ্যত বাণী করেছেনঃ
এক. চতুর্থ বছরেই তার সরকারের সর্বশেষ বাজেট। কাজেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াক কি থমকে থাকুক তাতে তার তেমন কিছু যাবে আসবে না।
দুই. যদি ঘুরে দাঁড়ায়, ভালো। না দাঁড়ালে আরো ভালো। কারণ বরাবরের মতো তখন পরবর্তী সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে বেশ ভাতঘুম দেয়া যাবে।
তিন. তিনি রেডিও বিক্রেতার অভিজ্ঞতার পথে হাঁটবেন। কারণ চার বছর আগে তিনি কি বলেছিলেন, সাধারণ অধিকাংশ জনগণ তা বেমালুম বিস্মৃত হবে।
এতো কিছুর পরও নানা জায়গায় নানা কথা আলোচিত হচ্ছে। সদ্য সাবেক সরকার যদি একেবারেই রাজকোষ খালি করে দিয়ে থাকে, তাহলে কিসের ওপর দাঁড়িয়ে খসরু সাহেব নয় লক্ষ কোটি টাকার বাজেট দিলেন। এই একটি সূচকই প্রমাণ করে, যতোই ঢাকঢোল পিটিয়ে সাবেক সরকারকে পাচারকারী, ফ্যাসিস্ট ইত্যাদি বদনামে আখ্যায়িত করে চলুক না কেন, তাতে কিন্তু সন্দেহের আঁচড় কাটা শুরু হয়েছে। তাছাড়া, রাজকোষ খালি থাকলে কোন যোগান থেকে সরকারি কর্মচারিদের এমন একটি পে স্কেল দেয়া হচ্ছে যেখানে শতভাগ বেতন বৃদ্ধির আয়োজন করা হয়েছে।
আগের সরকারের সময় সর্বোচ্চ রিজার্ভ চল্লিশ বিলিয়নের ঘরে ছিলো যা এখনো চল্লিশের ঘরেই থিতু আছে। এটা ঠিক, রাশিয়া—ইউক্রেন যুদ্ধ বা আরব—ইসরাইল যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জ্বালানী ও খাদ্যশস্য সহ নিত্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের রুট অবরুদ্ধ থাকায় অতিরিক্ত বিদেশি মুদ্রা ব্যয়ের কারণে রিজার্ভে টান পড়েছে। তাছাড়া সরকারের কিছু দুষ্ট বলয়ের প্রশ্রয়ে এস আলম গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, নজরুল ইসলাম মজুমদারের এঙ্মি ব্যাংক ও নাসা গ্রুপ বা সালমান এফ রহমানের বেঙ্মিকে গ্রুপ আন্ডার ইনভয়েস ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের তান্ডব উল্লাসে মেতে রিজার্ভে রীতিমতো ডাকাতি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের দাবী অনুযায়ী এখন যদি পাচার বন্ধ হয়ে থাকে এবং রিজার্ভের অপব্যবহার না ঘটে তাহলে এক দুই বছরের মধ্যে তা বেড়ে ষাট—সত্তর বিলিয়নে পৌঁছে যাওয়ার কথা। তাছাড়া বিগত সরকারের শেষ দিকে টাকার মূল্যমানে ধ্বস নেমে ডলারের দাম যে ১২৫ টাকায় ঠেকেছে এখনো তো সেখানেই আছে। উন্নতিটা তাহলে হলো কোথায়!
এরই মধ্যে সরকার ঘোষণা করেছে পদ্মা সেতুর মতো আরও একাধিক সেতু, তিস্তা ব্যারেজ, পদ্মা ব্যারেজ সহ অনেকগুলো রিজার্ভয়ার তৈরি করা হবে।
বাংলাদেশে সরকারগুলোর একটা সুবিধা হলো, তারা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে বা বড়জোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেই পাবলিককে বছরের পর বছর মুলা দেখিয়ে চলে। তারপর তাদের মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তীতে কোনো সরকার অনুরূপ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন করলে তারা চিল্লিয়ে দুনিয়া একাকার করে ফেলে যে, এসব আসলে তাদের সরকারের স্বপ্ন ছিলো। এসব কথার মারপ্যাঁচে পাবলিক অনেক সময় ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়।
আমাদের অর্থমন্ত্রী দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, আসলে ক্রমাগত পূর্ববর্তী সরকারের দুর্নাম করে করে আর নতুন নতুন উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েই দিব্যি একটা সরকারের মেয়াদ অনায়াসে পার করে দেয়া যায়। তখন পাঁচ বছর আগে কী কী উন্নয়নের আশ্বাস দেয়া হয়েছিলো সেসবের প্রায় সবটাই আমাদের সহজ সরল স্বল্প স্মৃতির আম—জনতা বেমালুম ভুলে যায়। আর যে দু চারজনের স্মৃতিশক্তি প্রখর তারা সরকারের পর সরকারে এসব উন্নয়নের ভবিষ্যত বাণী শুনতে শুনতে ও সেসবের বাস্তবায়ন না দেখতে না দেখতে টায়ার্ড হয়ে যায়।
এখন দেখার বিষয়, আগামী চার বছর পর অর্থমন্ত্রীর অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতির বিস্মরণ, বাংলাদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কতোটা ঠেকিয়ে রাখতে পারে।
