সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের নামে ভারত বিদ্বেষী অপতথ্য || আনিস আহমেদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে এক ধরনের  আন্তঃক্রিয়ামূলক (ইন্টারঅ্যাক্টিভ) তথ্য প্রযুক্তি।  এই যোগাযোগ মাধ্যমের  দ্বারা বিভিন্ন রকমের তথ্য অভিব্যক্তি প্রকাশ করা হয় যা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফোনে কিংবা কম্পিউটারে পোস্ট করা হয় এবং তাতে পাঠক কিংবা দর্শকদের অভিমত প্রকাশেরও সুযোগ থাকে। এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূচনা ১৯৯০ দশকে এবং নতুন শতকে এসে তা ব্যাপক  বিস্তৃতি লাভ করে। এখন সংবাদ তথ্যের জন্য, অভিমত অভিব্যক্তির  জন্য এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সামাজিক মাধ্যমের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে আমরা দ্রুতই অনেক খবর পাই। বিশেষত সেই সব তথ্য যা সংবাদপত্র প্রকাশ করতে পারে না বা নিজেরাই স্বআরোপিত সেন্সরশীপ প্রয়োগ করে। সেদিক দিয়ে সামাজিক মাধ্যমের একটি সদর্থক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমকে অপব্যবহার করে বেশ কিছু অপতথ্যও প্রচারিত হচ্ছে এবং সেগুলো ফেসবুকে উদ্ধৃত করে কিছু ব্যক্তি বিকৃত আনন্দ পাচ্ছে। সম্প্রতি একজনের ফেসবুকে দুটি অপতথ্যমূলক পোস্ট দেখলাম। একটি পোস্টে ভারতীয় লোকসভার সদস্য  প্রিয়াংকা গান্ধীকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়েছে, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য নয়, বরং পাকিস্তানকে দুর্বল করতে ভারত মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিলো ছদ্ম কাব্যিক নামধারী এই ব্যক্তি এই পোস্টের শুরুতে লিখেছেন, ‘আমরা যদি পাকিস্তান বিভিক্তির ফাদে পা না দিয়ে বাংদেশকে স্বাধীন করার লড়াইয়ে সামিল হতে পারতাম। তাহলে হয়তো এতদিনে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পেতে পারতাম লক্ষ্য করুন তার পোস্টে সাধারণ কিছু বানান ভুল কিন্তু তার চেয়েও ভুল কথা হচ্ছে, ‘পাকিস্তান বিভক্তির ফাঁদে পা দেওয়াবিষয়ক। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে পাকিস্তান বিভক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে খর্ব  করা হয়। পাকিস্তান বিভাজিত না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো কিভাবে এই কথা কি এই ব্যক্তি বোঝে না? বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা প্রস্তাবে নিরাপোষ থাকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের প্রকৃত বীজ নিহিত। আর তারই মধ্যে পাকিস্তানের বিভাজন নিহিত। তদানীন্তন পাকিস্তান না ভেঙে কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো সেটি কোনো পন্ডিতই গবেষণা করেও বলতে পারবেন না। আর ভারত যদি চেয়েও থাকে যে পাকিস্তান ভাঙুক সেটি তার ভূরাজনৈতিক স্বার্থ। তাতে তো বাংলাদেশের জন্য শাপে বর হয়েছে। ভারত ইচ্ছে করে পাকিস্তানে আক্রমণ চালায়নি, বাংলাদেশের আহ্বানে তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নিঃশর্ত সহায়তা করেছে এবং এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে।

আরও একটি অপতথ্য জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’ এক সদস্যের  ফেসবুকে দেখলাম। সেখানে শিরোনাম ছিল সেনাবাহিনীর সাথে বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী, অথচ ভেতরে লেখা আছে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘আমি ভারতবর্ষের যদি কোনো উপকারও না করি, আমি একটা মাত্র কাজ করেছি যার সুফল ভারতবর্ষ  যুগ যুগ ধরে ভোগ করবে ওই পোস্টে লেখা আছে আদালত তাঁকে জিজ্ঞেস করে, ‘কি সেই কাজ?’ উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের চিরশত্রু পাকিস্তানকে ভেঙে দুই টুকরো করে দিয়েছি ওই পোস্টের লেখা যে সত্যিকারের কোন উদ্ধৃতি নয় সেটা বোঝা গেল যখন দেখি পোস্টের লেখা নানান রঙের এবং সেখানে পাকিস্তান বাংলাদেশের পতাকার অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কথা বোঝাতে যে পাকিস্তান ভেঙেই বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়। যিনি ওই পোস্টটি প্রকাশ করেন এনসিপির ওই সদস্য সম্ভবত খেয়াল করেননি যে পোস্টের সূত্রে ইংরেজিতে লেখা আছে আই কন্টেন্টঅর্থাৎ এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। এই পোস্টটি আসলে নির্বুদ্ধিতারই পরিচায়ক। আর যদি তর্কের খাতিরে মেনে নিই যে পাকিস্তান ভাঙাকে ইন্দিরা গান্ধী তাঁর একটি বিশাল কৃতিত্ব বলে মনে করেন, তাহলে তো এতে ভুল কিছু দেখি না। কারণ এতে নিশ্চয়ই ভারতের ভূরাজনৈতিক সুবিধা হয়েছে। তার পূর্ব সীমান্তে সামরিক ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। তবে ধরনের উক্তিকে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কেন বিবেচনা করা হচ্ছে? বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি বাঙালির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২৩টি বছরের নিপীড়ননির্যাতন এবং নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ শেষে  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে স্বাধীনতা পেল তাকে অবমূল্যায়ন করার জন্যই কি পাকিস্তান ভাঙার এই কল্পিত কষ্ট প্রচার, নাকি সত্যিকারেরই কষ্ট এই সব পাকিস্তানপন্থিদের!

আসলে ভারতকে ভিলেন বানানোর অপচেষ্টা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে এই সব পোস্ট দিয়ে। সম্প্রতি আরেকটি পোস্টে দেখলাম আলজাজিরার নাম নকল করা কার্টুনের একটা পোস্ট কপি করে জনৈক ব্যক্তি লিখছে, ‘এতদিন খালি আপা আসবে, আপা আসবে শুনতেসিলাম। কিন্তু দিল্লীর অবস্থা দেখেতো মনে হচ্ছে এখন আপার সাথে দুলাভাই চলে আসবে’!  সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে মোদী বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই কার্টুনটি তৈরি করা হয়েছে। কার্টুন তৈরি করাই যায়, কিন্তু মোদীর এই কার্টুনের সঙ্গে শেখ হাসিনাকে সংযুক্ত করাটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মোদীর স্ত্রী হিসেবে হাসিনাকে চিত্রিত করা গর্হিত অপরাধ।  ভারত বিরোধিতা এখন তথাকথিত দেশপ্রেমিকদের একটা অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বার বার তারা মুক্তিযুদ্ধের অবমূল্যায়ন করেন একথা বলে যে পাকিস্তান ভাঙার উদ্দেশ্য নিয়েই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। তারা কি বোকার স্বর্গে বাস করেন! পাকিস্তান না ভাঙলে কি বাংলাদেশ হতো? তাহলে এই অদ্ভূত অপপ্রচার কেন? ১৯৭১ সালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বহু দেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য ভ্রমণ করেছেন এবং শেষে রাশিয়ার সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিও সম্পাদন করেন। ভারতের সমর্থন অতএব কেবল সামরিক ক্ষেত্রে নয়, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে যৌক্তিকতা দিয়েছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে ১৯৭১ সালে ভারত নয়, পাকিস্তানই প্রথমে ভারতে আক্রমণ চালায়। তারা সম্ভবত বুঝে গিয়েছিল যে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। তাই ১৯৭১ সালের নভেম্বর তারা ভারতের কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। শুরু হয়ে যায় পাকিস্তানের উভয় প্রান্তে ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে গুরুত্বহীন করার উদ্দেশে একে কেবল মাত্র ভারতপাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে দেখানোর জন্য ইয়াহিয়ার নির্দেশে ভুট্টো জাতিসঙ্ঘে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতির কাকুতি মিনতি করেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার ভেটো প্রদানে এবং তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে পাক সেনাদের আত্মসমর্পণ এবং সেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতাা হস্তান্তরের একটি প্রস্তাবে ভুট্টো কাগজপত্র ছিঁড়ে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে নিরাপত্তা পরিষদ থেকে বেরিয়ে আসেন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পর ভারত একতরফাভাবে পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। অথচ ভারত ইচ্ছে করলে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানও ভারতের দখলে চলে যেতো কিন্তু প্রায়োগিক বিবেচনায় ভারত সে পথে এগোয়নি।  সুতরাং কেবল মাত্র ভারত বিরোধিতা পাকিস্তান ভাঙনের কষ্টে যারা মাতম করছেন অহর্নিশ, তাঁরা যে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়াচ্ছেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। 

Related Posts